একটা সময় সবার ধারণাই ছিল বাংলা সিনেমার গল্প মানেই প্যানপ্যানে প্রেমের গল্প অথবা পারিবারিক দুঃখ দূর্দশার সুখ সমাপ্তি। আশার কথা হচ্ছে, নায়ক, নায়িকা, ভিলেন, ছয়টা গান আর দশটা মারপিটের দৃশ্য রাখা সেই বাঁধাধরা ফ্রেম থেকে বেরিয়ে আসছে বাংলা সিনেমা।

কলকাতার টলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির উত্তরণকে যদি বিভিন্ন অধ্যায়ে ভাগ করতে যাই, সবচেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পেছনে যে নামটি থাকবে, সেটি সৃজিত মুখার্জি। সেই অটোগ্রাফ দিয়ে শুরু, তারপর বাইশে শ্রাবণ দিয়ে সৃজিতের যেন প্রমাণ করা, দমবন্ধ করা থ্রিল বাংলা সিনেমায়ও হতে পারে, হতে পারে একদম আমাদের নিজস্ব গল্পেই সম্ভব টুইস্টের বাজিমাত।

ভিঞ্চি দা সিনেমার পোস্টার ; Image Source: timesofindia.indiatimes.com

সৃজিত মুখার্জি এবার নিয়ে এসেছেন ভিঞ্চি দা। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, মুক্তির আগেই, শুধু পোস্টার, ফার্স্ট লুক আর টিজারের বদৌলতে রেকর্ড সংখ্যক মানুষের ওয়াচলিস্টে মুভিটিকে রাখতে দেখা যায়৷

কাহিনী সংক্ষেপ

উবারমেন্‌শ। শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন ফ্রিডরিখ নীৎশে (‘Thus Spake Zarathustra’)।

তিনিই ঘোষণা করেছিলেন ঈশ্বরের মৃত্যু। উবারমেন্‌শ বা সুপারম্যান, সুপারহিউম্যান আসলে নিচুতলার মানুষেরাই। কিন্তু ওপরতলার কতিপয় ব্যক্তি বাস্তবত ‘সুপারম্যান’ হয়ে ওঠে।

নাৎসিরাও শব্দটা ব্যবহার করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে। এ ভাবেই শব্দটির অপব্যবহার হতে থাকে।

ক্রাইম থ্রিলার জেনরের মুভি ভিঞ্চি দা ; Image Source: laughalaughi.com

‘ভিঞ্চিদা’-র আদি বোস ‘উবারমেন্‌শ’-এর প্রসঙ্গ আনে। সে-ও জানায়, ঈশ্বর মৃত, ঠুঁটো জগন্নাথ। তাই উবারমেন্‌শ-রাই শায়েস্তা করবে কতিপয় ক্ষমতাধরদের। এ ভাবেই আদি বোস ঘোষণা করে তার লক্ষ্য।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নাম থেকেই ভিঞ্চি দা ; Image Source: buzzle.com

গল্পের কথক ভিঞ্চিদা নিখুঁত প্রস্থেটিক মেকআপ আর্টিস্ট হয়েও বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার সুযোগ পায় না। বিতাড়িত হতে হতে হয়ে পড়ে কোণঠাসা। পাড়ার নাটকের দল আর বিয়ের কনের মেকআপ করে সন্তুষ্ট হতে হয় তাকে। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রতি জমা হয় ক্ষোভ। স্বপ্ন দেখে ইতালীয় রেনেসাঁ যুগের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতো সে-ও আঁকবে মোনালিসা। প্রেমিকা জয়া তার মোনালিসার মডেল।

ঠিক এ রকম এক অবস্থায় আদি বোস খুঁজে বের করে ভিঞ্চিদাকে। প্রস্তাব দেয় ফিল্মের জন্য প্রস্থেটিক মেকআপ করার। ভিঞ্চিদা খুশিতে ডগমগ। রাজি হতে দেরি হয় না তার। কিন্তু একি! একটা ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে সে। একটার পর একটা ‘ক্রাইম’ সংঘটিত হতে থাকে। শুধু শিল্পী হয়ে বেঁচে থাকা আর সম্ভব নয়। ফেরার পথ নেই। চুরমার হয় তার সত্তা।

সাধারণ মানুষের অধিকার আদায় করতে গিয়ে ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ তো কিছু হবেই। আদি বোস জানায় তাকে। ড্যামেজ হয় ভিঞ্চিদার। কোল্যাটারাল ড্যামেজের নামে ধর্ষিত হতে হয় প্রেমিকা জয়াকে।

মোনালিসার মতো ভিঞ্চি দা’ও নিজের প্রেমিকা জয়াকে আঁকতে চায় ; Image Source: hammock.com

প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে ভিঞ্চিদা। আর সিনেমার মজাটাও শুরু সেখানে। ওপরের গল্পটুকু নেহায়েতই সিনেমার গল্পের বিল্ড-আপ।

সিনেমার গল্পের এই পর্যায় থেকে দর্শক চমকের পর চমক পেতে থাকবেন, চমকাতে থাকবেন। সিনেমা দেখে চমকে যাওয়ার মজাটুকু নষ্ট করার ইচ্ছে নেই গল্প বলাটা এখানেই থামিয়ে দিচ্ছি, বাকিটা না হয় পর্দাতেই দেখুন।

অভিনয়

অনির্বাণের পান চিবোতে চিবোতে অভিনয় না-করা অভিব্যক্তি মনে থাকবে। ঋত্বিকের মুখের পেশিগুলো নড়াচড়া করে শরীরী ভাষার যে বিভঙ্গ তৈরি করে তা ভুলে যাওয়ার নয়।

প্রধান দুই চরিত্র ; Image Source: londonindianfilmfestival.co.uk

অনির্বাণ, ঋত্বিক, ঋদ্ধি, সোহিনীর দক্ষতা অতুলনীয়। কিন্তু রুদ্রনীল এই ফিল্মে একেবারেই অন্য রকম। অভিনয়, ডায়ালগ, ডেলিভারি ইত্যাদিতে অসাধারণ। দারুণ গল্প তো রয়েছেই, এমন চমৎকার অভিনয় দেখার জন্যও নিষ্পলক তাকিয়ে থাকা যায়।

ভিঞ্চি দা এবং প্রেমিকা জয়া ; Image Source: photogallery.indiatimes.com

আদিবোসের চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী, আদিবোসের ছোটবেলার চরিত্রে ঋদ্ধি, পুলিশ ইন্সপেক্টর পোদ্দারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য, জয়ার চরিত্রে সোহিনী।

আর ভিঞ্চি দা’র চরিত্রটি করেছেন রুদ্রনীল ঘোষ।

কাহিনী ও চিত্রনাট্য

টলিউডের মেকআপ আর্টিস্ট সোমনাথ কুন্ডুর জীবনের ছায়া থেকে এই সিনেমার ভিঞ্চি দার চরিত্রটি নির্মাণ করা হয়৷ সিনেমার চিত্রনাট্য তৈরী করেন রুদ্রনীল ঘোষ এবং সৃজিত মুখার্জি৷

পরিচালনা

রান্না যেমন পুরোপুরি ভাবেই রাঁধুনির উপর নির্ভর করে, কেননা একজন রাঁধুনি রাধতে যেমন জানে, তেমনি জানে বাজার থেকে ঠিকঠাক উপকরণগুলো তুলতেও৷

সিনেমার পরিচালকও রাঁধুনীর মতোই৷ তাই সৃজিত যখন কাজ করেন, তার আশেপাশে সবাই সেরা কাজটাই করেন অথবা বলা যায় সেরাটা বের করে আনেন পরিচালক। তাই ক্যামেরা হোক আর অভিনয়, সেরা পরিচালনার গুণে সবক্ষেত্রেই প্রশংসা পাচ্ছে সৃজিত মুখার্জির ভিঞ্চি দা৷

ক্যামেরা

প্রথম শটে দেখা যায় ছোট আদি বোস-এর (ঋদ্ধি) মুখ ঢাকা একটা বই। মগ্ন হয়ে পড়ছে সে ‘ল অব ক্রাইমস’। তার পিছনের দেয়ালে সাঁটা ‘সেভেন’ ফিল্মের পোস্টার। এক ভয়ংকর সিরিয়াল কিলার যে ফিল্মের মুখ্য চরিত্র। ক্যামেরা এগিয়ে যায় তার মুখের দিকে। বাবার চ্যাঁচামেচির শব্দ আছড়ে পড়ছে তার কানে। বাবা মারছে মাকে। ক্যামেরা স্থির ধরে রাখে এই দৃশ্য। যত ক্ষণ না বাবাকে খুন করে আদি, নড়ে না ক্যামেরা।

রুদ্রনীল-সোহিনীর প্রেমের এক দৃশ্য। পোড়ো এক বাড়ির অন্দরে দু’জনে কথা বলে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন রচনা করে, ক্যামেরা এগিয়ে যায় তাদের দিকে, আর এই দৃশ্যের শেষে তারা যখন ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে, ক্যামেরা পিছিয়ে আসে ধীরে, দূরে চলে যেতে থেকে তারা— কী সুন্দর এক্সপ্রেশন সোহিনীর, লজ্জায়-বিভায় জ্বলজ্বল করে সে!

ক্যামেরায় এমন চমৎকার সব কাজই তুলেছেন সুদীপ্ত মজুমদার।

সিনেমাটোগ্রাফি

এ জায়গায় এসে একরকম মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেয়া যায়, কিছু জায়গায় চমৎকার কাজ যেমন রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে কিছুটা অবহেলার চিহ্নও পাওয়া যায়৷

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটা দৃশ্যে যখন শেষতম খুন করতে অস্বীকার করছে ভিঞ্চিদা আর আদি বোস বোঝানোর চেষ্টা করছে, সেখানে কী করে একই দিকে দু’জনের লুক হয়? পরস্পর মুখোমুখি। আদি বোস ফ্রেমের বাঁ দিকে তাকালে ভিঞ্চিদা লুক দেয়ার কথা ডান দিকে।

এমন খুঁটিনাটি ভুল চাইলেই এড়িয়ে যাওয়া যায় তবে কাজটা যখন সৃজিতের, নিখুঁতের নিখুঁত কাজ প্রত্যাশা করে দর্শক৷

মিউজিক

অনুপম রয় যখন কোন সিনেমার মিউজিক করেন, তখন স্বভাবতই সেটা শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে। আলাদাভাবে যে কথাটা বলা যায়, সারেগামাপা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দুই বাংলায় ভীষণ জনপ্রিয়তা পাওয়া মইনুল আহসান নোবেল এই সিনেমায় অনুপমের কম্পজিশনে প্রথম প্লে ব্যাক করেন।

রেটিং

আইএমডিবি রেটিং – ৭.৩

কেন দেখবেন সিনেমাটি

ইনস্পেক্টর পোদ্দার (অনির্বাণ) কি ধরতে পারেন আসল অপরাধীকে? আদি বোসের কী হয়? ভিঞ্চিদা কি পারে ফাঁদ কেটে বেরোতে? ভিঞ্চিদা ও জয়ার সম্পর্কের পরিণতিই বা কী দাঁড়ায়?

এমন সব প্রশ্নের উত্তর পেতে সিনেমাটি তো দেখতেই হবে। সাথে আর একটা কথা বলাই যায়, ‘বাইশে শ্রাবণ’ ও ‘চতুষ্কোণ’-এর পরে তার এই তৃতীয় ক্রাইম থ্রিলারেও পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় তাঁর নিজস্বতা বজায় রেখেছেন, তাই না দেখলে ক্ষতিটা আপনারই।

কোথায় পাবেন সিনেমাটি

ভারতীয় মুভি ডাউনলোড ওয়েবসাইটগুলো থেকে অনলাইন স্ট্রিমিং করে কিংবা ডিরেক্ট ডাউনলোড এবং টরেন্ট থেকেও চাইলে ডাউনলোড করে দেখতে পারেন।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment