বর্তমানে গ্রাফিক্স এবং আ্যানিমেশনের যুগে সিজিআই এর কল্যাণে হলিউডে এসেছে অনেক বৈচিত্র। সুপারহিরো মুভির মত নতুন ঘরানার জন্ম হয়েছে এবং জমজমাট ব্যবসাও চলছে যা কিনা মাত্র দুই দশক আগেও ভাবা কল্পনাতীত ছিল।

তবে এ সকল সুযোগ সুবিধা থেকে যে ধরণের মুভির সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল, সে হরর মুভিগুলোই দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। গ্রাফিক্স প্রতিনিয়ত আরো দৃষ্টিনন্দন হলেও কিসের যেন অভাব থেকেই যাচ্ছে। মূলত যেদিক দিয়ে হরর ক্যাটাগরি পিছিয়ে রয়েছে তা হল নতুনত্বের অভাব।

আস মুভিটির একটি দৃশ্য; Source: verge.com

একই রকম ফর্মুলার অতিরিক্ত ব্যবহার দর্শকদের যেন হরর মুভির প্রতি অনেকটা বিষিয়ে তুলেছে। তবে এর ব্যতিক্রম যে একেবারেই নেই তা নয়। কিছু কিছু এরকম মুভি দর্শকদের সামনে এমন কিছু নিয়ে হাজির হচ্ছে যা দর্শকদের হরর মুভির প্রতি পুনরায় আগ্রহী করে তুলছে। এরকম মুভির তালিকায় সর্বশেষ সংযোজনের একটি হলো ২০১৯ সালের মার্চে মুক্তি পাওয়া আস (Us) মুভিটি। স্বল্প বা নামমাত্র বাজেটে তৈরি মুভিটি বক্স অফিস কাপিয়েছে শুধুমাত্র মানসম্মত নির্মাণ ও অভিনয়ের গুণে। চলুন জেনে আসা যাক এ মুভিটির সম্পর্কে।

কাহিনীসংক্ষেপ

১৯৮৬ সালে তরুণী এডিলেড থমাস তার বাবা-মার সাথে ছুটি কাটাতে সান্টা ক্রুজের একটি মেলায় যায়। সেখানে সে হঠাৎ তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং একটি নির্জন রাইডে উঠে। সেখানে সে মুখোমুখি হয় অদ্ভুত এক ঘটনার। সে ঠিক হুবুহু তারই মত দেখতে আরেকটি মেয়ের মুখোমুখি হয়। সে ঘটনার আকস্মিকতায় এতটাই ভয় পেয়ে যায় যে, ঐ ঘটনার পর নিজের বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে। তবে তার বাবা মার পরিচর্যায় সে খুব দ্রতই সে ধাক্কা কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক জীবনে ফেরত যায়।

শিশু এডিলেড; Source: youtube.com

এরপর আমরা দেখতে পাই বর্তমান সময়ের এডিলেডকে, স্বামী গেইব এবং দুই সন্তান জোরা এবং জেসনকে নিয়ে তাদের সুখের সংসার। পারিবারিক ছুটি কাটাতে এ হাস্যোজ্জ্বল পরিবার আসে সান্টা ক্রুজের একটি লেক হাউজে। কিন্তু ছোটবেলার ভয়ংকর অভিজ্ঞতার স্মৃতি তাকে এখানেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল এবং ক্রমাগত তাকে অস্থির করে তুলছিল।

স্বামী গেইব পারিবারিক ছূটি উপভোগ করতে চাইলেও কৈশোরে ঘটে যাওয়া সে ঘটনা তাকে খারাপ কিছুরই পূর্ভাবাস দিচ্ছিল। তার সব আশংকা সত্য প্রমাণ করেই যেন হঠাৎ আবির্ভাব ঘটে অদ্ভুত এক পরিবারের। এডিলেডের পুত্র জেসন আবিষ্কার করে যে তাদের বাসের বাইরে উঠোনে চারজনের একটি পরিবার দাঁড়িয়ে রয়েছে। এডিলেড ও গেইব গিয়ে দেখে রহস্যময় সে পরিবারের ছায়ামূর্তি ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পরে তার আবিষ্কার করে যে সে ভূতুড়ে ছায়ামূর্তি গুলো তাদের প্রত্যেকের নিজেরই প্রতিচ্ছবি।

ভূতুড়ে সে পরিবার; Source: nytimes.com

তবে ঘটনার শেষ এখানেই না, বরং মুভির শুরুই অনেকটা এই জায়গা থেকে বলা যায়। এরপর এগিয়ে যেতে থাকে ঘটনা, খুলতে থাকে রহস্যের জট। আর এরই সাথে বের হয়ে আসতে থাকে অজানা আর অপ্রিয় সব সত্য। বিশেষ করে মুভির শেষাংশে প্রচুর চমক রয়েছে যা মুভিটিকে আর দশটা হরর মুভি থেকে অনেকটা আলাদা করে তুলেছে।

নির্মাণ, অভিনয় ও দর্শক প্রতিক্রিয়া

আস মুভিটি নির্মানের দায়িত্বে ছিলেন পরিচালিক ও মুভিটির লেখক জর্ডান পীল। তার সাথে আরো প্রযোজক জেসন ব্লুম এবং শন ম্যাক্রিটিক। ইতোপূর্বে এই তিনজন একত্রে আরেকটি ভিন্ন ধারার হরর মুভি নির্মাণ করেছিলেন আর ২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত গেট আউট (Get Out) মুভিটি কি পরিমাণ জনপ্রিয় হয়েছিল তা মনে হয় কারোই অজানা নয়।

এডিলেড ও তার পরিবার; Source: youtube.com

পূর্বে উল্লেখিত মুভিটির মত আস মুভিটিতেও আফ্রিকান বংশদ্ভূত চরিত্রের আধিক্য দেখা যায়। এ মুভিটিতে যে সকল কলাকুশলী অভিনয় করেছেন তাদের অধিকাংশই আফ্রিকান বংশদ্ভূত। মুভিটির মূল চরিত্র এডিলেড হিসেবে অভিনয় করেছেন কেনিয়ান অভিনেত্রী লুপিটা নইয়োংগো। টুয়েলভ ইয়ারস এ স্লেভ (Twelve years a slave) মুভির মাধ্যমে অস্কারজয়ী এ অভিনেত্রী এ মুভিতেও নিজের সবটুকু নিংড়ে দিয়েছেন। যার ফলে তার অভিনয়ের জন্য সমালোচকদের নিকট হুয়েছেন ব্যাপক প্রশংসিত। এছাড়া মুভিটির ছোট বড় সকল চরিত্রে অভিনয় করা অভিনয় শিল্পীরা এমনকি শিশু শিল্পীদের অভিনয়ও দর্শকদের বেশ নজর কাড়ে৷

মুভিটির সবচেয়ে বেশি যে দিকটি নজর কাড়ে তা হল মুভিটির একেবারে নতুন চিন্তাধারার চিত্রনাট্য। শুধুমাত্র চিত্রনাট্যের জোরে স্বল্প বাজেট নিয়েও মুভিটি বক্স অফিসে বড় হিট হিসেবে আবির্ভূত হতে সক্ষম হয়। মাত্র ২০ মিলিয়ন ডলারে নির্মিত এ মুভিটি বক্স অফিসে আশাতীত ফলাফল দেখায় এবং প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের উপর আয় করে।

সন্তানসহ ভীত-সন্ত্রস্ত এডিলেড; Source: pinterest.com

সমালোচকদের কাছেও মুভিটি বেশ ভালোভাবে উতরে গেছে। রটেন টমেটোতে মুভিটিকে ৯৪ শতাংশ ফ্রেশ দেখানো হয়েছে এবং হরর ঘরানার এরকম ভিন্ন ধরণের উপস্থাপন সমালোচকরা বেশ পছন্দ করেছেন। মুভিটির আইএমডিবি রেটিং ৭.১ এবং মেটাক্রিটিকেও মুভিটি ৮১ শতাংশ স্কোর করেছে। মোদ্দাকথা সবদিক থেকেই মুভিটির সফলতার সূচক উর্ধ্বমূখীই আছে।

মুভিটি যে কারণে দেখবেন

আপনি যদি হরর মুভির ভক্ত হয়ে থাকেন এবং দীর্ঘদিন ধরে গতানুগতিক বস্তাপঁচা ফর্মুলার মুভি দেখতে দেখতে বিরক্ত তবে আপনার জন্য নতুনত্ব নিয়ে হাজির হবে এ মুভিটি। এছাড়া মুভিটির প্লট কিছুটা অদ্ভুত হলেও পুরোটা সময় আপনার মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম হবে। আপনি যদি তথাকথিত হরর মুভির মত একটু পরপর ভূত আসার চমক আশা করে থাকেন তবে হতাশ হবেন। তবে ধৈর্য ধরে মুভিটি পুরোপুরি দেখলে শেষ পর্যন্ত হতাশ হবেন না আশা করি।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment