সায়েন্স ফিকশন মুভি বানানো অন্যান্য মুভি থেকে বরাবরই একটু বেশি কঠিন। কেননা এ ধরনের মুভিতে উন্নত প্রযুক্তি দেখানোর জন্য যেরকম চিন্তাশীল মানসিকতা থাকতে হয় এবং একই সাথে একটি ভালো গল্পের দরকার হয় তা অনেক নির্মাতাই তুলে ধরতে পারেন না। এছাড়া গ্রাফিক্সের দুর্বলতা তো আছেই। তবে এরই মধ্যে অনেকে ভালো কাজ করেছেন। স্বল্প বাজেটের মধ্যেও তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন কিভাবে আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের প্রযুক্তির হাতে সঁপে দিচ্ছি এবং প্রযুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি।

স্টেম নামক সেই মাইক্রোচিপ; Source: tumblr.com

এরকম একটি মুভি হলো ২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সায়েন্স ফিকশন, আ্যাকশন, থ্রিলার মুভি আপগ্রেড (Upgrade)। ২০১৮ সালের বেশির ভাগ সায়েন্স ফিকশন মুভি হতাশ করলেও আপগ্রেড মুভিটি তাদের থেকে আলাদা। গতানুগতিক সায়েন্স ফিকশন গল্পের ফর্মুলা থেকে বের হয়ে ভিন্ন কিছু করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে মুভিটিতে। তবে চলুন জেনে নেওয়া যাক কী এমন আছে এ মুভিটিতে?

কাহিনী সংক্ষেপ

আপগ্রেড মুভিটির সময়কাল বর্তমান থেকে কিছুটা উন্নত সময়ে। গ্রে ট্রেস একজন শখের মেকানিক। তিনি কোনো চাকরি না করলেও ঘরে বসে গাড়ি মেরামতের কাজ করেন। স্ত্রী আশার সাথে তার সুখের সংসার। আশা একজন পুরোদস্তুর কর্পোরেট নারী যিনি কিনা কোবল্ট নামক একটি কোম্পানির জন্য কাজ করেন যারা মানুষের বিভিন্ন শারীরিক অক্ষমতা দূরীকরণে কম্পিউটারের ব্যবহার নিয়ে কাজ করেন।

গ্রে ট্রেস এবং আশা; Source: hollywoodreporter.com

এর মধ্যে গ্রে ইরন কিন নামক এক টেক জায়ান্টের গাড়ি মেরামতের কাজ করেন। মেরামতের পর গাড়িটি নিয়ে তিনি সস্ত্রীক ইরনের বাসায় যান ডেলিভারি দেওয়ার জন্য। সেখানে ইরন তাদের দুজনকে তার নতুন আবিষ্কৃত একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্পন্ন মাইক্রোচিপ দেখান। তার মতে, স্টেম (STEM) নামক এ চিপটি মানুষের মস্তিষ্কের কাজ করতে সক্ষম।

স্টেমের আবিষ্কারক ইরন; Source: variety.com

ইরনের বাসা থেকে চিপটি দেখে ফেরার পথে গ্রে এবং আশার গাড়িতে সমস্যা দেখা দেয় এবং তারা দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। কিন্তু দুর্ঘটনার পর কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কিছু দুষ্কৃতিকারী আশাকে হত্যা করে এবং গ্রেকে আহত অবস্থায় ফেলে যায়।

স্ত্রীর মৃত্যুশোকে কাতর গ্রে তারপর থেকে প্যারালাইজড অবস্থায় দিনযাপন করতে থাকেন। এর মধ্যে উপযুক্ত প্রমাণ এবং সুস্পষ্ট ক্যামেরা ফুটেজের অভাবে আশার হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয় পুলিশ। এমন সময় গ্রে কে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন ইরন। তার মতে, তার নতুন আবিষ্কার স্টেম যদি গ্রে এর মস্তিষ্কে অপারেশনের মাধ্যমে স্থাপন করা হয় তবে গ্রে পুনরায় চলাফেরা করতে সক্ষম হবেন। বিনিময়ে তিনি শুধু তার আবিষ্কার কতটুকু সফল তা দেখতে চান।

দুর্ঘটনার পর গ্রে; Source: theverge.com

ইরনের বাসভবনে গোপনে করা এ অপারেশনের পর গ্রে সত্যি সত্যিই পুনরায় চলাফেরা করতে সক্ষম হন। কিন্তু তিনি ধীরে ধীরে আবিষ্কার করেন যে স্টেমের একটি আলাদা সত্তা রয়েছে যে কিনা তার সাথে কথা বলতে সক্ষম। স্টেম তারপর গ্রেকে জানান যে তিনি গ্রে এর শরীর ব্যবহার করে আরো অনেক কিছু করতে সক্ষম এমনকি আশার হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতেও সাহায্য করতে পারেন। এরপর সকলের অগোচরে গ্রে নেমে পড়েন তার স্ত্রীর হত্যার প্রতিশোধ নিতে। কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়। শেষ পর্যন্ত যে পরিমাণ রহস্য উন্মোচন হয় তাতে গল্পটি আর সোজাসাপ্টা প্রতিশোধের গল্প থাকে না।

পরিচালনা ও চিত্রনাট্য

আপগ্রেড মুভিটির চিত্রনাট্য লিখেছেন এবং মুভিটি পরিচালনা করেছেন লেই ওয়ানেল (Leigh Whannell)। তিনি ইতোপূর্বে স (SAW), ইনসিডিয়াস (Insidious) এর মতো মুভিগুলোর সাথে যুক্ত ছিলেন। তাই আপগ্রেড মুভিতে সেই ছাপ কিছুটা হলেও দেখা যায়। মুভিতে সহিংসতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি ছিল যা কিনা সাধারণত বাণিজ্যিক ধারার মুভিগুলোকে এড়িয়ে চলতে দেখা যায়। এছাড়া মুভির আ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে ক্যামেরার কাজে বেশ ভিন্নতা দেখা যায়।

পরিচালক লেই ওয়ানেল; Source: theguardian.com

ছবিটির চিত্রনাট্য ভালো এবং এতে বেশ ভিন্নতা রয়েছে। মুভিটি বেশ দ্রুতগতির এবং পুরোটা সময় আপনাকে মুভির দিকে মনোযোগী করে রাখবে। এছাড়া মুভির প্লট সাধারণ প্রতিশোধ সংক্রান্ত প্লট হলেও মুভির শেষভাগে বেশ কিছু চমক রয়েছে। এর সাথে শেষ দৃশ্যে আরো কিছু চমক মুভিটিকে একদম পরিপূর্ণ থ্রিলারের রূপ দিয়েছে বলা যায়।

অভিনয় এবং রেটিং

আপগ্রেড মুভিটিতে কোনো বড় তারকার সমাহার নেই। বেশিরভাগই অস্ট্রেলিয়ান ফিল্ম তারকা, তবে নিজ নিজ চরিত্রে তাদের পারফর্মেন্স কাজ চালানোর মতো ভালো বলা যায়। মুভিটির মূল চরিত্র গ্রে ট্রেস হিসেবে অভিনয় করা লোগান মার্শাল গ্রিন আমেরিকান অভিনেতা। পূর্বে তাকে স্পাইডারম্যান: হোমকামিং, এলিয়েন: কোভেনেন্ট, প্রমিথিউসের মতো মুভিগুলোতে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গেলেও আপগ্রেড মুভিটির মাধ্যমে তিনি হলিউডের লাইম লাইটে এসেছেন বলা যায়। মুভিতে তাকে দেখে অনেকে টম হার্ডি মনে করে ভুল করতে পারেন!

মুভিটির অ্যাকশন দৃশ্যের একটি; Source: pinterest.com

আপগ্রেড মুভিটি অত্যন্ত স্বল্প বাজেটের, মাত্র তিন মিলিয়নের। তবে এ স্বল্প বাজেটের মধ্যেও মুভিটি সমালোচকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে। মুভিটির আইএমডিবি রেটিং ৭.৬ এবং মুভিটিকে রটেন টমেটোস ৮৭ শতাংশ ফ্রেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

মুভিটি যে কারণে দেখবেন

আ্যাকশন, থ্রিলার, সাসপেন্স এবং সাই ফাই উপাদানে ভরপুর এ ধরণের মুভি যদি ভালো লাগে এবং সহিংসতায় আপত্তি না থাকে তবে মুভিটি নিঃসন্দেহে ভালো লাগবে আপনার। এছাড়া আপনি যদি একের পর এক গতানুগতিক ধারার সাই ফাই দেখে বিরক্ত হয়ে থাকেন তবে আপনার জন্য পরিবর্তনের এক পশলা হাওয়া নিয়ে এসেছে এ মুভিটি।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment