সাম্প্রতিক সময়ে সুপারহিরো  সিরিজ বানানো যেন একটি নতুন ধারা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিসি, মার্ভেল থেকে শুরু করে পরিচিত-অপরিচিত অসংখ্য কমিক অবলম্বনে বানানো হচ্ছে অসংখ্য সুপারহিরো টিভি সিরিজ। এই ক্যাটেগরিতে সর্বশেষ সংযোজন নেটফ্লিক্সের সিরিজ আমব্রেলা একাডেমি।

কাহিনী সংক্ষেপ

১ অক্টোবর, ১৯৮৯। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন প্রান্তে ঠিক একই সময়ে জন্ম নেয় একে একে ৪৩টি শিশু। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এর আগমুহূর্ত পর্যন্তও এই তাদের জন্মদাত্রীদের কেউই অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন না। এমন অদ্ভুতুড়ে ঘটনার পর, চোখের পলকেই মা হয়ে যাওয়া সেই নারীরা উটকো ঝামেলায় পড়েন। তাদের এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন খ্যাতনামা বিলিয়নিয়ার রেজিনাল্ড হারগ্রিভস। টাকার বিনিময়ে এই ৪৩টি শিশুর মধ্য থেকে ৭টি শিশুকে দত্তক নিয়ে নেন তিনি।

বিলিয়নেয়ার রেজিনাল্ড হারগ্রিভস; Image Source: geekculture.co

জাতি-বর্ণ, স্বভাব-চরিত্র সব দিক দিয়েই একে অপরের থেকে আলাদা তারা প্রত্যেকেই। কিন্তু তাদের মাঝে রয়েছে একটি বিশেষ মিল। তারা কোনো না কোনো সুপারপাওয়ারের অধিকারী। (যদিও এই নিয়মের ব্যতিক্রম তাদের পরিবারের সপ্তম সদস্য, ভানিয়া)।

বুঝতেই পারছেন, তাদেরকে দত্তক নেয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল তাদের এই সুপারপাওয়ার। জগৎ সংসারের প্রতি উদাসীন হারগ্রিভসের মূল উদ্দেশ্য ছিল তার এই ৭ ছেলেমেয়ে নিয়ে সুপারহিরোদের একটি একাডেমি গড়ে তুলবেন। তিনি এতটাই উদাসীন ছিলেন যে, তার ছেলেমেয়েদেরকে তিনি ‘নাম্বার ওয়ান’, ‘নাম্বার টু’ এভাবে অভিহিত করতেন, তাদেরকে কোনো আলাদা নাম দেয়ারও প্রয়োজন বোধ করেননি।

সংখ্যাই যখন নিজের পরিচয়; Image Source: collider.com

সেই শিশুকাল থেকেই শুরু হয় তাদের সুপারহিরো হবার প্রশিক্ষণ। নাম্বার ওয়ান থেকে সিক্স পর্যন্ত সবাই এই প্রশিক্ষণের অংশ হলেও নাম্বার সেভেনের একমাত্র প্রশিক্ষণ ছিল বেহালা বাজানো। প্রশিক্ষণ শেষে এই খুদে সুপারহিরোদের নিয়ে গড়ে ওঠে ‘আমব্রেলা একাডেমি’। কিছুদিনের মধ্যেই তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এই খুদে সুপারহিরোদের দল। কিন্তু সময়ের সাথে ভাইবোনদের সম্পর্কে ফাটল দেখা দেয়।

বাবার আচরণে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে একে একে সবাইই এই একাডেমি ছেড়ে চলে যায়। থেকে যায় শুধু ভানিয়া। ছোটবেলা থেকেই ভাইবোনদের সুপারপাওয়ার দেখতে দেখতে বড় হওয়া ভানিয়ার মাথায় সেই ছোটবেলা থেকেই ধারণা জন্মে যায় – আমি খুবই সাধারণ একজন মানুষ। সেই ধারণা আরো পাকাপোক্ত হয় যখন তার ভাইবোনরা সেই দুঃসহ একাডেমিতে তাকে একা ফেলে চলে যায়।

আমব্রেলা একাডেমির খুদে সুপারহিরোরা; Image Source: inverse.com

এরপর পেরিয়ে যায় প্রায় ২০টি বছর। আমব্রেলা একাডেমির সদস্যদের কেউ এখন জনপ্রিয় অভিনেত্রী, কেউ হেরোইন আসক্ত, তো কেউ আবার বছরের পর বছর ধরে নিখোঁজ। দুনিয়ার একেক প্রান্তে থাকা এই ভাইবোনদের আবার একত্র করে তাদের বাবার আকস্মিক মৃত্যু।

বাবার মৃত্যুতে একত্রিত আমব্রেলা একাডেমির সদস্যরা; Image Source: endgadget.com

অনেক বাকবিতণ্ডার পর তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, তাদের বাবার মৃত্যুটি স্বাভাবিক ছিল না। অতঃপর আমব্রেলা একাডেমির সদস্যরা নেমে পড়েন তাদের বাবার রহস্যময় মৃত্যুর কারণ খুঁজে বের করতে। সেই রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে আবার বেরিয়ে আসে আরেক ভয়াবহ তথ্য- কয়েকদিনের মধ্যেই এই পৃথিবী ধ্বংস হতে যাচ্ছে। তারা কি পারবে পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে?

চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা

আমেরিকান কমিক প্রকাশনা ডার্ক হর্স কমিকস থেকে প্রকাশিত কমিক সিরিজ দ্য আমব্রেলা একাডেমি অনুসারে বানানো এই টিভি সিরিজ। কমিক সিরিজের প্রথম কিস্তি দ্য আমব্রেলা একাডেমি: অ্যাপক্যালিপ্স স্যুট অনুসারেই মূলত টিভি সিরিজটির প্রথম সিজন।

খুবই সাধারণ একটি প্লট। কিন্তু যে ব্যপারটি এই সিরিজকে আর দশটা সুপারহিরো সিরিজ থেকে আলাদা বানিয়েছে তা হচ্ছে এর পরিচালনা। অতি সাধারণ একটি গল্পকে স্টাইলিশভাবে তুলে ধরা, সিরিজজুড়ে হাস্যরস আর গম্ভীরতার দারুণ সংমিশ্রণ। সেই সাথে আছে মনোমুগ্ধকর কিছু সাউন্ড ট্র্যাক।

তবে কিছু নেতিবাচক দিকও ছিল। সিরিজটি বেশ ধীর গতিতে এগিয়েছে। বিশেষ করে শুরুর দিকের পর্বগুলোতে। এই ধীরগতির কারণে অনেকে দেখা শুরু করেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। পুরো সিজন ১০ পর্বের না হয়ে ৬-৮ পর্বের হলে হয়তো এমনতা মনে হতো না। এছাড়া, সিরিজের ডার্ক টোনটি অনেকেরই হয়তো ভালো লাগবে না।

অভিনয়

অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মুখ হচ্ছেন মার্ভেলের বিখ্যাত সুপারহিরো মুভি সিরিজ এক্স-মেন এ কিটি প্রাইড এর ভূমিকায় অভিনয় করা এলেন পেজ, যিনি নাম্বার সেভেনের (ভানিয়া) ভূমিকায় ছিলেন। ক্ষেত্রবিশেষে তার চরিত্রটি কিছুটা বিরক্তকর মনে হতে পারে।

ভানিয়া চরিত্রে এলেন পেজ; Image Source: geekculture.com

নাম্বার ফোর (ক্লাউস) এবং নাম্বার সিক্স (বেন) এই দুটি চরিত্র বেশ মজার ছিল। তবে ৭ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল নাম্বার ফাইভ চরিত্রটি। নাম্বার ফাইভের ভূমিকায় ১৫ বছর বয়সী এইডেন গ্যালাঘার এর অভিনয় দারুণ ছিল।


নাম্বার ফোর এবং নাম্বার ফাইভ; Image Source: collider.com

মুক্তি এবং রেটিং

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখে স্ট্রিমিং সাইট নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া সিরিজটির প্রথম সিজনে ১০টি পর্ব। ভিন্ন ধাঁচের সুপারহিরো সিরিজ হিসেবে সমালোচকদের কাছে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। জনপ্রিয় রিভিউ সাইট IGN তো এটিকে ২০১৯ এর সেরা সুপারহিরো সিরিজ হিসেবেও আখ্যায়িত করে ফেলেছে। তবে অনেকে সিরিজটি নিয়ে বেশ মিশ্র রিভিউও দিয়েছেন। কমিক পাঠকরাও কমিকটির টিভি সংস্করণে সন্তুষ্ট। যেটা কমিক অ্যাডাপটেশনর ক্ষেত্রে বেশ বিরল একটি ব্যাপার।

সিরিজটির আইএমডিবি রেটিং ৮.৩ এবং রটেন টম্যাটোস রেটিং ৭৩% ফ্রেশ।

ভিন্ন ধাঁচের সুপারহিরো সিরিজের খোঁজে থাকলে দেখে ফেলুন আমব্রেলা একাডেমি টিভি সিরিজটি!

Related Article

0 Comments

Leave a Comment