উপমহাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মধ্যে বলিউড সর্বাপেক্ষা সফল হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বলিউড এখনো কিছু দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ক্ষেত্র হলো হরর বা ভূতুড়ে ঘরানার সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে। কখনো কখনো মৌলিক গল্পের অভাব কখনো বা অপারদর্শী পরিচালনা সর্বদা কোনো না কোনো কারণে হরর মুভি বানানোর ব্যাপারে বলিউড পিছিয়ে রয়েছে। এছাড়া প্রযুক্তিগত অনগ্রসরতা এবং দুর্বল ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট তো আছেই।

তবে এত প্রতিবন্ধকতার ভিড়েও যে ভালো কাজ একদমই হয়নি তা নয়। হলিউডের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে বেশ কিছু হরর এবং হরর থ্রিলার মুভি বলিউডে নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছে। সেই তালিকায় সর্বশেষ যদি কোনো মুভি সংযুক্ত হয়ে থাকে তবে তা হলো বিগত ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি তুম্বার (Tumbbad)। তবে চলুন জেনে নেওয়া যাক এ মুভিটি সম্পর্কে।

কাহিনী সংক্ষেপ

তুম্বার (Tumbbad) সিনেমার কাহিনী তিন খন্ডে বিভক্ত। এক ব্রাহ্মণ পরিবারের তিন প্রজন্মের লোভ লালসার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে সিনেমাটিতে। মুভিটি শুরু হয় এক পৌরাণিক গল্পের বিবরণের মাধ্যমে। গল্পটির মতে, সমৃদ্ধির দেবীর এক হাতে ছিল অফুরন্ত স্বর্ণমুদ্রা, অপর হাতে ছিল অফুরন্ত খাদ্যভান্ডার। দেবী তারপর নিজ গর্ভ হতে ষোল কোটি দেব-দেবীর জন্ম দেন। কিন্তু তার সবচেয়ে প্রিয় ছিল তার প্রথম সন্তান হস্তর। তবে হস্তর অত্যন্ত লোভী এক দেবতা। সে মায়ের ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে দেবীর সকল স্বর্ণমুদ্রা লুটপাট করে নেয়।

এরপর যখন সে খাদ্যের ভান্ডারের দিকে হাত বাড়ায় তখন তা বাকি দেবদেবীদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। তারা হস্তরকে বাধা দেয় এবং তাকে আক্রমণ করে বসে। হস্তরকে বাকিরা পুরোপুরি মেরে ফেলার পূর্বে তার মা তাকে সে যাত্রায় কোনো মতে বাঁচিয়ে পুনরায় তাকে নিজ গর্ভে নিয়ে আসেন। তবে দেবী শর্ত দেন যে হস্তর চিরকাল তার গর্ভেই থাকবে। এছাড়া হস্তরকে কেউ পুজো করবে না এবং তার নাম ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে।

হস্তরের মূর্তি; Source: koimoi.com

তারপর থেকে মাতৃগর্ভে অফুরন্ত স্বর্ণমুদ্রা এবং একই সাথে অফুরন্ত ক্ষুধা নিয়ে বাস করা হস্তর এ দুনিয়া থেকে হারিয়ে যেতেই বসেছিল। তবে মানবজাতির খেয়াল বড়ই বিচিত্র। প্রাচীন ভারতবর্ষের তুম্বার গ্রামের কিছু মানুষ গুপ্তধন লাভের আশায় এ নির্বাসিত দেবতা হস্তরের নামে একটি মন্দির স্থাপন করে এবং তার প্রতিমা গড়ে তার পূজা করা শুরু করে। তারপর থেকে দেবতাদের ক্রোধের স্বীকার হতে থাকে তুম্বার গ্রামটি। তাদের লানতসরূপ সর্বদা বৃষ্টি হতে থাকে গ্রামটিতে। তুম্বার গ্রামের সেই হস্তর পূজারীদের বংশধরদের এবং তাদের গুপ্তধনের প্রতি লোভ লালসাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে তুম্বার সিনেমার কাহিনী।


বিনায়ক এবং সদাশিবের বিধবা মা; Source: youtube.com

সিনেমার প্রথমার্ধে এরকম এক পরিবারের গল্প দেখা যায়। ব্রাহ্মণ কিশোর বিনায়ক এবং তার ভাই সদাশিব তাদের বিধবা মায়ের সাথে তুম্বার গ্রামের এক অপেক্ষাকৃত নির্জন এলাকায় একটি ছোট কুটিরে বসবাস করে। বিনায়কের মা গুপ্তধনের আশায় মুমূর্ষু এক ভূস্বামীর সেবাযত্ন করতে থাকে। তখন জানা যায়, সেই ভূস্বামী আসলে হস্তরের একজন পূজারী।

বিনায়কের মাকে সে হস্তরের স্বর্ণমুদ্রা এবং গুপ্ত সম্পদের লোভ দেখিয়ে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করতো। তাদের সাথে বসবাস করত আরো এক রহস্যময় বৃদ্ধা, যার খাবারের জন্য প্রতিনিয়ত আর্তচিৎকার দুই ভাইকে সদা তটস্থ রাখতো। তবে একটি দুর্ঘটনা দুই ভাই তথাপি এ পরিবারের জীবন চিরকালের জন্য পাল্টে দেয়। তাদের কপালে কী পরিণতি রয়েছে শেষ পর্যন্ত তা জানতে উপভোগ করুন তুম্বার মুভিটি

পরিচালনা ও চিত্রনাট্য

তুম্বার মুভিটি পরিচালনা করেছেন আনন্দ এল. রায়। ২০১৮ সালে দুটি মুভি পরিচালনা করেছেন এ পরিচালক। একটি তুম্বার (Tumbbad) ও অপরটি কিং খান খ্যাত শাহরুখ খান এবং আনুশকা শর্মা অভিনীত জিরো (Zero)। ২০০ কোটি রুপি বাজেটের জিরোতে তিনি যা করতে পারেননি, তা তিনি করে দেখিয়েছেন মাত্র পাঁচ কোটি খরচে নির্মিত তুম্বারে।


তুম্বার ছবিটির একটি দৃশ্য; Source: quora.com

তুম্বার ছবিটির পরিচালনা এবং দৃশ্যায়ন সমালোচকদের আশ্চর্যজনকভাবে মুগ্ধ করেছে। সচরাচর স্বল্প বাজেটের ছবিতে ক্যামেরার কাজ খুব একটা ভালো না হলেও এ মুভিটিতে প্রতিটি দৃশ্য ছিল অত্যন্ত সংগতিপূর্ণ এবং চোখে পড়ার মতো ভালো। তবে ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট ও গ্রাফিক্সের বেশ কিছু ব্যবহার ছিল। কাঁচা হাতের গ্রাফিক্সের কাজ মুভিটির দৃশ্যায়নের জৌলুস কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে বলা যায়।

গুপ্তধনের আশায় সোহম শাহ; Source: youtube.com

তুম্বার ছবিটির চিত্রনাট্য ছিল ছবিটির প্রাণ। একদমই অপিরিচিত শিল্পীদের নিয়ে নির্মিত এ ছবিটি যেটুকু পরিচিতি পেয়েছে তা ছবিটির গল্প এবং চিত্রনাট্যের জোরেই পেয়েছে। বিশেষ করে তিন পর্বে মুভিটির কাহিনীর বিবরণ দেওয়া এবং সর্বশেষে তিন প্রজন্মেরই ভুলের মাধ্যমে লোভ লালসার পরিণতির ব্যাপারে শিক্ষা দেওয়ার বিষয়টি চিত্রনাট্যের মাধ্যমে খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

অভিনয় এবং সংগীত

তুম্বার মুভিতে ছিল না কোনো তারকা সমাগম অথবা বলিউডের কোনো নামিদামি পরিচিত মুখ। তবে তারপরও ছবিটির প্রত্যেকেই মোটামুটি ভালোই অভিনয় করেছেন। মূল চরিত্রে ছবিটির প্রয়োজক ও অভিনেতা সোহম শাহ থাকলেও চোখে পড়ার মতো ভালো অভিনয় করেছে তার পুত্রের চরিত্রে অভিনয় করা মোহাম্মদ সামাদ। ইতোমধ্যে নওয়াজউদ্দীন সিদ্দিকীর বিপরীতে হারামখোর সিনেমায় অভিনয় করা শিশু শিল্পী সামাদের এ মুভিতে অভিনয় সকলের মন কেড়ে নিতে বাধ্য।

তুম্বার ছবিতে শিশু শিল্পী মোহাম্মদ সামাদ; Source: bollywoodmdb.com

মুভিটিতে ছিল না বলিউডের প্রচলিত সব সিনেমার মতো নাচ-গানের সমাহার। যে দুই একটি গান রয়েছে সেগুলোও আবহ সংগীত হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। খুব একটা গান না থাকার বিষয়টি যেন মুভিটির ভুতুড়ে এবং রহস্যময় ভাবমূর্তি বজায় রাখতেই সহায়তা করেছে বলা যায়।

বক্স অফিস এবং রেটিং

মাত্র ৫ কোটি বাজেটে নির্মিত হয় তুম্বার মুভিটি। তারকার অভাব এবং প্রচার বিমুখতার কারণে মুভিটি মুক্তির দিন মাত্র ৬৫ লাখ রুপি আয় করে। দর্শক, সমালোচকদের প্রশংসার কারণে পরবর্তীতে হলে লোক সমাগম বৃদ্ধি পায়। সর্বসাকুল্যে মুভিটি আয় করে মাত্র ১৩ কোটি ৫৭ লক্ষ রুপি।

সোহম শাহ; Source: quora.com

ভারতে এবং বিদেশে সমালোচকদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয় বক্স অফিসে হতদরিদ্র অবস্থায় থাকা এ মুভিটি। ভারতের প্রথম ছবি হিসেবে এটি ৭৫ তম ভেনিস ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়। এছাড়া আইএমডিবিতে মুভিটির রেটিং ৮.৪ এবং রটেন টমেটোতে মুভিটিকে ৮৯ পার্সেন্ট ফ্রেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

মুভিটি যে কারণে দেখবেন

আপনি যদি তথাকথিত তারকাখচিত বলিউডি সিনেমা দেখে অভ্যস্ত হয়ে থাকেন তবে তুম্বার আপনার জন্য নয়। কিন্তু যদি ছবিটির কলাকুশলী অপেক্ষা কাহিনী আপনার কাছে প্রাধান্য পায় তবে নিঃসন্দেহে আপনি মুভিটি উপভোগ করবেন। যেকোনো হরর এবং থ্রিলার মুভিপ্রেমীদের মুভিটি ভালো লাগবে তবে আপনি যদি স্বল্প বাজেটের এ মুভিটি থেকে হলিউডের দ্য নান, দ্য কনজুরিং মুভিগুলোর মতো গ্রাফিক্স আশা করেন, তবে আপনাকে সন্তুষ্ট করা এ মুভিটির পক্ষে সম্ভব নয়।

Related Article

2 Comments

Zakia February 26, 2019 at 7:01 am

আমাদের চিরচেনা হরর মুভি গুলো থেকে একে বারে ই আলাদা ।এরকম কোনও কিছুর যে অস্তিত্ব থাকতে পারে, লোভ মানুষ কে কোথায় নিয়ে যেতে পারে? ? তুমূল বৃষ্টি, অনবদ্য অভিনয় ! এমন একটা ছবি তেমন প্রচার পায়নি, দুঃখ জনক! (আমি একবার দেখে ই ভয়ে ছবি ডিলিট করে দিয়েছি )

RIPAN March 27, 2019 at 7:50 am

খুব সুন্দরভাবে রিভিউ দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

Leave a Comment