আমাদের জীবনে সময় ব্যাপারটা প্রচন্ড রকম আপেক্ষিক। ছুটির দিন গুলোর গতি কমিয়ে দিতে চাই আমরা, যেন খুব ধীরে চলুক, শেষ না হোক, তবু ছুটির দিনগুলোই কেন যেন উড়ে উড়ে দ্রুত ফুরিয়ে যায়। আবার মাসের শেষ দিনগুলো বড্ড ধীরে চলে যেন, বেতনের অপেক্ষায় থাকা গরীবি দিনগুলো যেন ফুরোতেই চায় না।

এ তো গেল কর্মজীবনের গল্প, তার আগে ফেলে আসা ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই রকম। বোরিং সাবজেক্টের ক্লাসে প্রফেসরের লেকচার যেমন শেষ হতে চায় না, তেমনি ঘোরে না ঘড়ির কাঁটাও। আবার একই রুমের ঘড়ির কাটা উসাইন বোল্টের মত দৌড়াতে থাকে পরীক্ষা চলাকালীন শেষ ঘন্টায়।

আপেক্ষিক সময়ের এইসব দোলাচলে কেটে যাওয়া দিনরাত্রিতে আমরা কি কখনো খেয়াল করি, প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত কেটে যাওয়া মানে ফুরিয়ে যাওয়া জীবন থেকে, এগিয়ে যাওয়া একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে। আর মৃত্যু মানেই জমাট নীল আকাশ আর দেখতে না পাওয়া, যে আকাশ ফেলে রাখি ভীষণ অবহেলায়, তাকানো হয় না, দেখা হয় না শুদ্ধতম ভালবাসায়, মায়ায়।

ভালোবাসা, মায়া কেবল যার মৃত্যু সন্নিকটে তারাই ভালো টের পায়। আর বার্ধক্যের আগে মৃত্যুর নৈকট্য যারা আগেই জেনে যায়, যারা আগেই জানতে পারে তার হাতে আছে গুনতে পারা কয়েকটা দিন, কী হয় তাদের অনুভূতি? ঠিক কী চলতে থাকে তাদের মনের ভেতর?

দ্য প্রফেসর মুভি পোস্টার ; Image Source: joblo.com

বেপরোয়া এসব অনুভূতির গল্প নিয়েই ‘দ্য প্রফেসর‘।

কমেডি জেনরের মুভিটিতে হাসিঠাট্টার আড়ালে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জীবনের এক গভীর দর্শন।

কাহিনী সংক্ষেপ

রিচার্ড ব্রাউন, একটি ইন্সটিটিউটের প্রফেসর, একজন দায়িত্ববান বাবা, একজন স্নেহময় বাবা। এসব দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সাধারণ অন্যসব মানুষের মতো একটা গড়পড়তা স্বাভাবিক জীবন কেটে যাচ্ছিল প্রফেসরের। আর ঠিখ তখনই বজ্রপাতের মতো এক খবর সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। রিচার্ডের ক্যান্সার ধরা পড়ে, লাস্ট স্টেজ, হাতে সময় আছে কয়েকমাস।

ছাত্র ছাত্রীদের সাথে প্রফেসর ; Image Source: hollywoodreporter.com

জীবন উল্টে পাল্টে যাওয়ার জন্য এইটুকু খবরই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এখানেই শেষ হয় না, ক্যান্সারের খবর যে দিন আসে, সে রাতে খাবার টেবিলে নিজের রোগের কথা পরিবারকে জানাতে চাইলেও তার আগেই জানতে পারে আরো দুইটি বিষাদ সত্য।

রিচার্ডের স্ত্রী ভেরোনিকা কনফেস করে তার পরকীয়া সম্পর্কের কথা, সে পরকীয়াও আবার চলছে রিচার্ডের সবচেয়ে খারাপ সম্পর্ক ইন্সটিটিউটের যে কলিগের সাথে। আর কন্যা অলিভিয়া নিজের যৌনজীবনের সত্য জানাতে গিয়ে বলে, সে সমকামী (লেসবিয়ান)।

‘অল্প শোকে কাতর আর অধিক শোকে পাথর’ প্রবাদটিকে একটু বদলে দিয়ে এখানে বরং বলা যায় রিচার্ডের অধিক শোকে বেপরোয়া হয়ে ওঠা।

আর গল্পের শুরুটা এখানেই,

ক্লাসের দৃশ্যে প্রফেসর চরিত্রে জনি ডেপ ; Image Source: meaww.com

মাতাল হয়ে ক্লাসে যাওয়া, ছাত্রদের সাথে বসে ধুমপান করা, ক্লাসের লেকচারেও স্ল্যাং ব্যবহার করা সহ আরো বহু উদ্ভট কাজ করতে থাকে রিচার্ড৷ তবে আপাত দৃষ্টিতে এসব কাজকে উদ্ভট মনে হলেও আমরা যদি নিজেদেরকে ঢেকে রেখে মেকি এক মুখোসের প্রকাশ না ঘটাই নিজের ব্যাক্তিত্ব হিসেবে, তাহলে আমরা সবাই বোধহয় এমন বেপরোয়া একজনই হতাম।

উদ্ভট বেপরোয়া এসব কর্মকাণ্ড দেখে হাসা যায়, কমেডি মুভি হিসেবে দ্য প্রফেসর যথেষ্টই হাসিয়েছে। তবে কমেডির আড়ালে সিনেমাটিতে পাওয়া যায় এক গভীর জীবনবোধের গল্প, যা সত্যিকারের অনুধাবন বোধহয় জীবনসায়াহ্নে পৌছলেই করা সম্ভব।

অভিনয়

যখন মুভিতে চমকপ্রদ কোন গল্প থাকে না, ধরে রাখার মতো রহস্য থাকে না , এমনকি কমেডি মুভিতেও হেসে কেশে পড়ে যাওয়ার মতো হিউমারও থাকে না, কিন্তু আপনাকে তবুও স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তাকতে বাধ্য করা হয়, তকন বুঝে নিতে হবে সেখানে জনি ডেপের মতো একজন অভিনেতা আছে যে একাই একশ গল্পের শক্তি নিয়ে হাজির হয় ক্যামেরার সামনে।

প্রফেসরস মুভিতেও হয়নি ব্যতিক্রম, গল্পের দূর্বলতা কাটিয়ে উঠতে গিয়ে জনি ডেপ দিয়েছেন তার সর্বোচ্চ। তাই সমালোচকরা মুভিটিকে তেমন সমাদর না করলেও জনি ডেপ তার করা প্রফেসর চরিত্রটিকে নিয়ে গেছেন অন্যরকম এক উচ্চতায়।

অভিনয়ে জনি ডেপ ছাপিয়ে গেছেন অন্য সবাইকে ; Image Source: dailymotion.com

প্রফেসর রিচার্ড ব্রাউনের চরিত্রে জনি ডেপ ছাড়াও রিচার্ডের স্ত্রী ভেরোনিকার চরিত্রে রোজমেরি ডেউইট, মেয়ে অলিভিয়ার চরিত্রে ওডেসা ইয়ং অভিনয় করেছেন । রিচার্ডের বন্ধু পিটারের চরিত্রে ড্যানি হুস্টনও আসাধারণ অভিনয় করেছেন।

এছাড়া বিভিন্ন চরিত্রে ছিলেন জোয়ি ডাচ, ডেভন টেরেল, রন লিভিংস্টন, লিন্ডা এমন্ড সহ আরো অনেকেই অভিনয় করেছেন।

চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা

দ্য প্রফেসরস মুভিটির গল্প ও চিত্রনাট্য ওয়েন রবার্টস তৈরী করেন।

চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ছিলেন ওয়েন রবার্টস ; Image Source: vimooz.com


মুভিটি পরিচালনাও ওয়েন রবার্টস নিজেই করেন।

মিউজিক

ডেজনার ব্রাদারস একসাথে দ্য প্রফেসরস মুভিতে কাজ করেন। এ্যারন ডেজনার এবং ব্রাইস ডেজনার মুভির আবহ সঙ্গীত পরিচালনা করেন।

সিনেমাটোগ্রাফি

দ্য প্রফেসরস মুভিতে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন টিম ও’র।

রেটিং

আইএমডিবি রেটিং – ৬.৭

মেটাক্রিটিক – ৩৭%

রোটেন টমেটো – ১০%

কেন দেখবেন মুভিটি

সমালোচকরা দ্য প্রফেসরকে ভালোভাবে নেন নাই তা সিনেমাটির রেটিং এর দিকে তাকালে ভালোই টের পাওয়া যায়। তবে আপনি যদি রেটিং এর উপর পরিপূর্ণ আস্থা রেখে সিনেমাটি এড়িয়েই যান, তাহলে হয়তো গভীর এক জীবনদর্শনবোধকে আরো দূরে ঠেলে দিলেন।

যারা প্রতিনিয়ত ফ্রাস্ট্রেশনে ভুগে ডিপ্রেশনে পড়ে যাচ্ছেন, তাদের জন্য দ্য প্রফেসরের ফিলোসোফি চমৎকার এক শিক্ষা হতে পারে। জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কত মূল্যবান, ছোট ঠুনকো সব ব্যাপারে মন খারাপ করে সে মূল্যবান সময় নষ্ট করার কী ই বা অর্থ হতে পারে?

আর ‘লোকে কী ভাববে’ ভেবে অনেক কিছুই আমাদের করা হয় না। মেকি এক ভদ্রতার মুখোশ পরে নকল এক জীবন কাটিয়ে দিই আমরা, যে জীবন আমাদের নয়। কখনো কখনো সে মুখোস ছুড়ে ফেলে এক আধবার সত্যিকারের নিজে হয়ে ওঠার শিক্ষাই বোধহয় দিয়ে যায় দ্য প্রফেসর।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment