দ্য আদার সাইড অভ মি আসলে সংক্ষেপে সিডনী শেলডনের আত্মজীবনী। বইটি মৃত্যুর মাত্র দুই বছর আগে ২০০৫ সালে লিখেছেন তিনি। এটিই শেলডনের লেখা প্রকাশিত শেষ উপন্যাস।

কাহিনী সংক্ষেপ

আমেরিকায় বেড়ে ওঠা তরুণ সিডনি শেলডন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন জীবনসংগ্রাম কাকে বলে। সেই সময় লাখ লাখ মানুষ বেকার, শেলডনের পরিবার কাজের খোঁজে দিশেহারার মতো ঘুরে বেড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্য। যে কাজ পেয়েছেন তা-ই আঁকড়ে ধরেছেন শেলডন। বাস-বয়, ক্লার্ক, সিনেমা হলের টিকেট-চেকারের কাজসহ হেন কাজ নেই যা তিনি করেননি। তবে সবসময়ই বড় কিছু একটা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। যে কাজেই যেতেন, সেটায় বড় কিছু হতে চাইতেন।

সিডনি শেলডনের স্বপ্ন ছিল লেখক হবেন। ভাগ্যক্রমে হলিউডে আসার সুযোগ হয়ে যায় তার। প্রখ্যাত চিত্র-প্রযোজক ডেভিড সেলজনিকের রিডার হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটতে থাকে ধীরে ধীরে।

দ্য আদার সাইড অভ মি এর প্রচ্ছদ; Image Source: Amazon UK

লেখক হবার আগে শেলডন সারারাত জেগে চলচ্চিত্র এবং মঞ্চনাটকের জন্য কাহিনী লিখতেন। এসময় তিনি অন্য স্ক্রিপ্ট লেখকদের তার সাথে সহযোগী হিসেবে নিতেন। আস্তে আস্তে খ্যাতি অর্জন শুরু করেন তিনি। একসময় আবিষ্কার করেন হলিউডের সেরা তারকা এবং প্রয়োজকরা তার দ্বারে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন চলচ্চিত্র এবং মঞ্চনাটকের জন্য কাহিনী লিখে দেওয়ার জন্য। তিনি দুশোটির বেশি টেলিভিশন স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন। সেই সাথে ২৫টি বড় সিনেমা এবং ৬টি নাটক তৈরি করেছিলেন।

সেসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিলো। সিডনি শেলডন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শিবিরে পাইলট হিসেবে যোগ দেন। কিছুদিন সেখানে যুদ্ধকর্মে যুক্ত থেকেছেন। যুদ্ধ দেখার আগে তার শিবিরের সৈন্যবাহিনী ভেঙে দেওয়া হয়েছিলো। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই আবার ফিরে আসেন হলিউডে। আবার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়ে যায় তার জীবনে। শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হিসেবে অস্কার পুরস্কার জিতেছেন।

কিন্তু তারপরও হঠাৎ জীবনে নেমে এসেছিল দুর্দশা, নতুন করে সইতে হয়েছে বেকারত্বের জ্বালা। কিন্তু এ মানুষটি কীভাবে সমস্ত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে একসময় হয়ে ওঠেন পৃথিবী সেরা থ্রিলার লেখক, তারই কাহিনী এটি। বইয়ের নামটা একদম যথাযথ। ‘দ্য আদার সাইড অভ মি’ বইটি ‘লেখক সিডনি’র আত্মজীবনী নয়, বইটিতে তিনি তার জীবনের অন্য দিকটি তুলে ধরেছেন।

দ্য আদার সাইড অব মি এর অন্য প্রচ্ছদ; Image Source: Goodreads

পাঠ প্রতিক্রিয়া

বইটা পড়তে শুরু করেই পাঠক হয়তো আঁতকে উঠবেন। সিডনি যে বয়সে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন, শৈশবের এই বয়সটিতেই বেশিরভাগ কিশোর কিশোরীরা হীনমন্যতা, হতাশা আর বিষণ্ণতায় ভোগে। বেশিরভাগ কিশোর কিশোরীরই মনে হয়, বেঁচে থেকে কোনো লাভ নেই, সত্যি সত্যিই যেন মরে যেতে ইচ্ছা হয়। সিডনি নিজের প্রেক্ষাপটটি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

বইটি পড়তে পড়তে পাঠক পরিচিত হবেন হলিউড কাঁপানো এমন একজন লেখকের সাথে, যিনি ছিলেন একাধারে প্রযোজক, পরিচালক এবং পান্ডুলিপি লেখক। যাকে পাঠককূল একজন বিখ্যাত লেখক হিসেবে চেনেন, তিনি হলিউডের সিনেমা জগতের সাথে এমন ওৎপ্রোতভাবে জড়িত, তা কে ভাবতে পারবেন? সিনেমা, মঞ্চনাটক, টেলিভিশন সিরিজ-সিনেমা জগতের সকল শাখায় ছিলো তার সদর্প পদার্পণ। এমনকি লেখক হবার আগে মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে তিনি তার ‘দ্য ব্যাচেলর অ্যান্ড দ্য ববি সক্সার’ চলচ্চিত্রের জন্য অস্কার জিতেছেন।

সিডনি শেলডনের অন্যান্য বই; Image Source: good reads

এত সফল একজন মানুষ, কিন্তু তারপরও তিনি তার জীবনের বিভিন্ন সময়ে অর্থ সংকটে ভুগেছিলেন। একজন মানুষের জীবনে উত্থানপতন দুটোই থাকে, বইটি পড়ে তা বোঝা যাবে। তার চিত্রনাট্যকার থেকে লেখক হবার অধ্যায়গুলো পড়ে পাঠক অবাক হবেন। সিডনি শেলডন তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য নেকেড ফেইস’ লিখেছেন ৬১ বছর বয়সে। দ্য নেকেড ফেইস বইটি ১৮০টি দেশে বিক্রি হয়েছিল। বইটি ৫২টি ভাষায় অনুদিত হয়েছিল। আমেরিকার বেস্ট সেলার বইয়ের মধ্যে এই বইটি অন্যতম।

তবে থ্রিলার লেখার ক্ষেত্রে তার ভালো দিক ছিলো, তিনি যেখানেই তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়েছেন, যত সংরক্ষিত এলাকাই হোক না কেন, অনায়াসে সেসব জ্ঞান নিতে পেরেছেন। এমন সব জিনিস দেখতে পেরেছেন, যা সাধারণ কোনো মানুষ কখনোই দেখতে যেতে পারবে না। এর সবকিছুর পেছনে তার পূর্বে অর্জিত খ্যাতি যে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সিডনি শেলডনের উক্তি; Image Source: AZ quotes

যেকোনো পাঠকেরই বইটি ভালো লাগবে। শুধু মাঝের দুয়েকটি অধ্যায় একটু একঘেয়ে লাগতে পারে। এই অধ্যায়গুলোতে সিডনি শেলডনের একের পর এক ছবি বানানো আর ছবিগুলোর মতামত নিয়ে লেখা হয়েছে। অবশ্য আগ্রহী পাঠকের এই জায়গাগুলোতেও বিরক্তি আসবে না।

অনুবাদ প্রসঙ্গ

ইংরেজিতে পড়তে না চাইলে দ্য আদার সাইড অব মি বইটির বাংলা অনুবাদ পড়তে পারেন। অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে অনুবাদ করেছেন প্রখ্যাত অনুবাদক অনীশ দাস অপু। অনীশদার অনুবাদ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। অনুবাদ খুব ঝরঝরে। বইয়ের কোথাও আড়ষ্টতা আসেনি।

দ্য আদার সাইড অভ মি এর বাংলা অনুবাদের প্রচ্ছদ; Image Source: মাদিহা মৌ

লেখক পরিচিতি

সিডনি শেলডন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর ইলিনয়ে ১৯১৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বইয়ের বিক্রেতা হিসেবে লেখক সিডনি শেলডন ষষ্ঠ অবস্থানে আছেন। তার লেখা ১৮টি থ্রিলার উপন্যাস এখন পর্যন্ত ৩০০ মিলিয়ন কপির বেশি বিক্রিত হয়েছে। হলিউডে শেলডনের প্রথম কাজ ছিল ‘দ্য বাচেলর অ্যান্ড দ্য ববি সক্সার’, যা ১৯৪৭ সালে একাডেমি অ্যাওয়ার্ড জয় করে।

সিডনি শেলডন; Image Source: Goodreads

তার লেখা উপন্যাসগুলো হলো দ্য নেকেড ফেস, দ্য আদার সাইড অফ মিডনাইট, এ স্ট্রেঞ্জার ইন দ্য মিরর, ব্লাড লাইন, রেজ অব অ্যাঞ্জেলস, মাস্টার অব দ্য গেম, ইফ টুমরো কামস, উইন্ডমিলস অব দ্য গড, স্যান্ডস অব টাইম, মেমোরিজ অব মিডনাইট, দ্য ডুমসডে কন্সপ্রিরেসি, দ্য স্টারস সাইন ডাউন, নাথিং লাস্টস ফর এভার, মর্নিং, নুন অ্যান্ড নাইট, দ্য বেস্ট লেইড প্লানস, টেল মি ইয়োর ড্রিমস, দ্য স্কাই ইজ ফলিং, আর ইউ অ্যাফ্রেইড অব ডার্ক।

বই পরিচিতি

বই: দ্য আদার সাইড অভ মি
লেখক: সিডনি শেলডন
অনুবাদক: অনীশ দাস অপু
জনরা: আত্মজীবনী
পৃষ্ঠা: ২৭০
মূল্য: ৩৫০ টাকা
প্রকাশনী: অনিন্দ্য প্রকাশ

Feature Image: মাদিহা মৌ

Related Article

0 Comments

Leave a Comment