কখনো কি ভেবেছেন, কেমন হতো আজকের পৃথিবী যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিণতি হতো জার্মানদের বিজয়? এমনই একটি পৃথিবী দেখানো হয়েছে দ্য ম্যান ইন দ্য হাই ক্যাসল এ। যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনী (Allied Force) নয়, অক্ষীয় শক্তির জয় হয়েছে। যুদ্ধ বিজয়ের পর পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই জার্মান বা জাপানিদের দখলে। যুক্তরাষ্ট্রও তার ব্যতিক্রম না ।

কাহিনী সংক্ষেপ

১৯৫০ এর দশক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের বিজয়ের পর পুরো যুক্তরাষ্ট্র এখন তিন ভাগে বিভক্ত। ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যসহ পশ্চিম উপকূলের কিছু অংশ জাপানিদের অধীনে, যার নাম জাপানিজ প্যাসিফিক স্টেট। মাঝের কিছু অংশ হচ্ছে নিউট্রাল জোন অর্থাৎ নিরপেক্ষ অঞ্চল, যে অংশ জাপান বা জার্মানি কারো অধীনে নেই।

বাকি অর্ধেকের বেশি অংশ জার্মানদের অধীনে; গ্রেট নাৎসি রাইখ (Great Nazi Reich)। নাৎসি রাইখের অধীনে থাকা নিউ ইয়র্ক শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঝুলছে নাৎসি ব্যানার। জাপানিজ প্যাসিফিক স্টেটের রাস্তায় রাস্তায় এখন জাপানি চিহ্নযুক্ত বিলবোর্ড।

নিউ ইয়র্কের আকাশে উড়ছে নাৎসিদের পতাকা; Image Source: indiewire.com

১৯৬২ সালের এমনই এক আমেরিকার দুই বাসিন্দা জুলিয়ানা ক্রেইন এবং জো ব্লেইক। জুলিয়ানা থাকেন প্যাসিফিক স্টেটের অধীনে স্যান ফ্রান্সিস্কোতে। অপরদিকে, জো থাকেন নাৎসি রাইখের অধীনে নিউ ইয়র্কে। দুইজনের ভৌগোলিক অবস্থান যেমন বিপরীত, স্বভাব চরিত্রেও দুইজন খানিকটা বিপরীত মেরুরই। জো হচ্ছেন মনে প্রাণে একজন নাৎসি। আর জুলিয়ানা মনে প্রাণে নাৎসিদের ঘৃণা করেন।

এদিকে, জুলিয়ানার বোন ট্রুডি হচ্ছেন আমেরিকান রেজিস্ট্যান্স নামক একটি দলের সদস্য, যাদের উদ্দেশ্য এই জাপানি আর জার্মানদের শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করা, স্বাধীন আমেরিকাকে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু ট্রুডির এই গোপন পরিচয়ের ব্যপারে জুলিয়ানা বা তার পরিবারের অন্য কোনো সদস্যরই জানা নেই।

এক রাতে ঘরে ফেরার পথে হঠাৎ জুলিয়ানার সাথে ট্রুডির দেখা হয়। ট্রুডি তার হাতে দ্য গ্রাসহপার লাইজ হেভি  নামের একটি নিউজ রিল ধরিয়ে দিয়ে বলে এটাই একমাত্র পথ এবং সাথে সাথেই সেখান থেকে পালিয়ে যায়। তার কিছুক্ষণ পরেই জাপানি পুলিশ ট্রুডিকে গুলি করে হত্যা করে।

হতবিহ্বল জুলিয়ানা তখন ঘরে ফিরে এসে রিলটি চালিয়ে দেখে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির জয় হয়েছে। এবং অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, পুরো ঘটনাটি দেখতে মোটেও বানোয়াট মনে হয় না বরং মনে হয় এটাই বাস্তবতা।

ফিল্ম দেখে হতবিহ্বল জুলিয়ানা; Image Source: inverse.com

জুলিয়ানা জানতে পারে, দ্য ম্যান ইন দ্য হাই ক্যাসল নামের এক নাম পরিচয়হীন লোক এসব টেপ বানায়। আর ট্রুডির মিশন ছিল এই টেপটি নিউট্রাল জোনের অধীনে কলোরাডোর ক্যানন সিটিতে পৌঁছানো। জুলিয়ানার ধারণা হয়, এই ভিডিও আসলে কোনো ভিন্ন বাস্তবতা। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে এবং তার বোনের অসমাপ্ত মিশন শেষ করতে সে এই টেপ নিয়ে ক্যানন সিটির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

অপরদিকে, নাৎসি মিলিটারি অফিসার জন স্মিথের অধীনে কাজ করা একজন দ্বৈত এজেন্ট জো ব্লেইকের প্রথম মিশন থাকে আমেরিকান রেজিস্ট্যান্সের ছদ্মবেশে একটি ট্রাক চালিয়ে নিউইয়র্ক থেকে ক্যানন সিটিতে যাওয়া এবং সেখানে গিয়ে আমেরিকান রেজিস্ট্যান্স এজেন্টের কাছ থেকে সেই রিলটি নেওয়া এবং তা জন স্মিথের হাতে পৌঁছে দেওয়া।

জন স্মিথ এবং তার সহকারী; Image Source: IMDb.com

অবশেষে জো আর জুলিয়ানা ক্যানন সিটিতে পৌঁছান। জো তার পরিচয় গোপন রেখে জুলিয়ানার সাথে বন্ধুত্বও করে ফেলেন। আর নিজের জীবন নিয়ে আশঙ্কায় থাকা জুলিয়ানা তার নিউজ রিলটি জোর কাছে রেখে যান। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, জো তার ট্রাকেও এই একই নামের একটি লুকানো নিউজ রিল খুঁজে পেয়েছেন।

ক্যানন সিটিতে জুলিয়ানা ক্রেইন (ডানে) এবং জো ব্লেইক (বামে); Image Source: syfywire.com

এই গেল প্রাথমিক প্লট। এখান থেকে সবকিছু আরও জটিল হতে থাকে। কে এই ম্যান ইন দ্য হাই ক্যাসল? কেন সে এসব ফিল্ম বানাচ্ছে? এসব ফিল্মের অর্থই বা কী? সিরিজ জুড়ে এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে।

সেই সাথে জাপান আর জার্মানির পারস্পরিক রেষারেষি বাড়তে থাকে। জার্মান মিলিটারির কতিপয় সদস্য সেই রেষারেষিকে কাজে লাগিয়ে দুই সাম্রাজ্যকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে। ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে পুরো পৃথিবী।

চিত্রনাট্য

অনেক বেশি আকর্ষণীয় একটি প্লট। এক্সিকিউশনও অসাধারণ। সিরিজটি এতই মনোযোগ আকর্ষণী যে একবার দেখা শুরু করলে পুরো সিজন শেষ না করে ওঠা যায় না। সিনেমাটোগ্রাফি, প্রোডাকশন ডিজাইন, ভিজুয়াল ইফেক্টস প্রতেক্যটি বিষয়ই দারুণ। আর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর বিশেষ করে ওপেনিং থিমটা এক কথায় অসাধারণ!

জুলিয়ানা ক্রেনের চরিত্রে আলেক্সা ডাভোলাস, জো ব্লেকের চরিত্রে লুক ক্লেইন্তাংক দুজনই দারুণ অভিনয় করেছেন। অন্যান্য চরিত্রের ভূমিকায় যেসব অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলেন তাদের পারফরমেন্সও অসাধারণ ছিল। সিরিজটির মূল থিম বিখ্যাত লেখক ফিলিক কে ডিক এর লেখা ‘ম্যান ইন দ্য হাই ক্যাসল বই থেকে নেয়া হলেও মূল বইয়ের কাহিনী খুব একটা অনুসরণ করা হয়নি।

রেটিং

২০১৫ এর ডিসেম্বর এ স্ট্রিমিং সাইট আমাজন প্রাইমে সিরিজটির প্রথম সিজন মুক্তি পায়। ২০১৬ এর ডিসেম্বরে দ্বিতীয় সিজন মুক্তি পায়। দুই বছর অপেক্ষার পর ২০১৮ এর শেষের দিকে এর তৃতীয় সিজনও মুক্তি পেয়েছে। সিরিজটির আইএমডিবি রেটিং ৮.১ এবং রটেন টম্যাটোস রেটিং ৮১%। সমালোচক এবং দর্শক উভয়ের কাছেই প্রশংসা কুড়ানো সিরিজটি ক্রিয়েটিভ এমি অ্যাওয়ার্ডস এ বেশ কিছু নমিনেশন এবং অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment