রাশিয়ান কল্পবিজ্ঞান লেখক আলেকজান্দর বেলায়েভের ইকথিয়ান্ডর অর্থাৎ মৎস্যকুমার এক অপূর্ব সৃষ্টি। আলেক্সান্ডার বেলায়েভকে বলা হয় রাশিয়ার কল্প বিজ্ঞানের জনক। ছোটবেলায় বেলায়েভের মনে হতো, মানুষ যদি পাখির মতো উড়তে পারতো! পাখির মতো উড়তে ছাদ থেকে লাফ দিলেন তিনি। ফলাফল- ভাঙা মেরুদণ্ড এবং অস্থিক্ষয় রোগ।

উভচর মানুষ সেরকমই একটা বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফসল। সাধারণ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী বলতে আমরা বুঝি – মহাকাশযান, খটমটে নাম ওয়ালা কিছু মানুষরূপী এলিয়েন, প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন। বেলায়েভ এসবের কোনো শর্তই মেনে চলেননি। তিনি চিরাচরিত সায়েন্স ফিকশনের সংগা বদলে ছেড়েছেন। তিনি তৈরি করেছেন অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এক মানুষ। কারণ, তার ধারণা ছিলো, বিবর্তনের ফলে মানুষের বর্তমান রূপ আসার আগে মানুষ জলে-ডাঙায় উভয় জায়গাতেই বিচরণ করতে পারতো। তিনি তার বিজ্ঞানপ্রসূত চিন্তাভাবনা থেকে সৃষ্টি করেছেন উভচর মানুষ।

অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যান চলচ্চিত্রের পোস্টার; Image source : Google. Com

১৯৬১ সালে রাশিয়াতে অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যান উপন্যাসটির কাহিনী অবলম্বনে চলচ্চিত্র বানানো হয়, যা সাধারণ মানুষের কাছে বইটির মতোই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলো। মুক্তি পাওয়ার পর প্রাথমিক অবস্থায় ৬৫.৫ মিলিয়ন ডলার আয় করা, যা পরে ১০০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। সায়েন্স ফিকশন জনরার ছবিটি ভ্লাদিমি চিবোতারয়োভ  ও জেন্নাদি কাযানাস্কি পরিচালনা করেছিলেন।  অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যান পশ্চিমের দেশগুলোতে একটু কম পরিচিতি পেয়েছে, তবে এটি একটি উচ্চশ্রেণির রচনা।

কাহিনি সংক্ষেপ

লোকে তাকে দরিয়ার দানো হিসেবে চেনে। নিজের পোষা ডলফিনের পিঠে চড়ে শঙ্খ বাজিয়ে সমুদ্রে চরে বেড়ায়। জেলেদের জাল টেনে নিয়ে যায়, জাহাজভর্তি মাছ ছেড়ে দেয়, আবার উদ্ধার করে ডুবে যাওয়া মানুষদের। তবে তার বেশি ভালো লাগে ঝড়ের সময় বালিয়াড়িতে আছড়ে পড়া সামুদ্রিক জীবগুলোকে বাঁচাতে। উভচর বলে পানি আর ডাঙা-দুই জায়গাতেই থাকতে পারে। ঝড়ের পর দুর্ভাগ্যক্রমে ডাঙায় পড়ে থাকা মাছ আর সামুদ্রিক প্রাণী কুড়িয়ে সমুদ্রে ছেড়ে দেয়। ইকথিয়ান্ডর ডাঙায় তাই সমুদ্রবাসীর বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক।  কিন্তু সমুদ্রে সে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কারণ, ডাঙার কড়া বাতাসে ইকথিয়ান্ডরের কানকো তেতে শুকিয়ে ওঠে, তখন তাকে পানিতে ডুব দিয়ে কানকো ভিজিয়ে নিতে হয়। 

অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যান ইংরেজি বইয়ের প্রচ্ছদ; Image source : instantlibrary.com

মনের খুশিতে যা ইচ্ছে তাইই করে বেড়ায় ইকথিয়ান্ডর। সমুদ্রের অতলের গভীর রহস্য উন্মোচন করতে পারে সহজেই। ভয়াবহ সব জলজ প্রাণীর সাথে যুদ্ধ করে জিতে যায় অনায়াসেই। কারণ, সাঁতরাবার সময় জলজ প্রাণীগুলো যখন পানিতে কাঁপন তোলে, তা সে বুঝতে পারে কান দিয়ে, গোটা শরীর দিয়ে। সমুদ্রের দামী রত্ন খুঁজে নেয় সাবলীলভাবে। সাধারণ মানুষ তাকে ঘাটায় না। দানব ভেবে সবাই দূরে দূরে থাকে।

তার এই নির্ভার জীবন বদলে যায় হঠাৎ করেই। সমুদ্রের পানিতে একদিন সে দেখতে পায় নীল চোখের অপূর্ব সুন্দরী এক মানবীকে। কোনো কারণে পানিতে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। মেয়েটিকে ডাঙায় পৌঁছে দিয়ে লুকিয়ে পড়ে। মেয়েটি জ্ঞান ফেরার পর সৈকত থেকে চলে যায়। ইকথিয়ান্ডর কিন্তু মেয়েটিকে ভুলতে পারে না। এই মেয়েটির খোঁজে সে প্রথমবারের মতো পা বাড়ায় শহরের দিকে। মেয়েটিকে তো খুঁজে পায়ই, সেই সাথে জানতে পারে মেয়েটি তারই জন্মদাতা বাবা বালতাজারের পালিতা কন্যা।

অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যান চলচ্চিত্রের ইকথিয়ান্ডর ও নীল নয়না গুত্তিয়ের; Image source : horrornews.net

এদিকে দরিয়ার দানো যে মোটেও দরিয়ার দানো নয়, তা জেনে গেছে এক লোভী ক্যাপ্টেন জুরিতা। সে বুঝতে পারে একে দিয়ে সে সাগরের রত্ন উদ্ধার করে খুব সহজেই ধনী হতে পারবে। তাই তার ভালোবাসার নীলনয়না গুত্তিয়েরেকে জোর করে ধরে নিয়ে বিয়ে করে ক্যাপ্টেন জুরিতা। যেই ডাঙায় থাকতে তার শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়, নিজের ভালোবাসাকে উদ্ধার করতে সেই ডাঙাতেই উঠে আসে উভচর মানব। বন্দি হয় জুরিতার ফাঁদে। নিজের হাতে সৃষ্ট এই উভচর মানবকে উদ্ধার করতে ছুটে আসেন ডাক্তার সালভাদর।

উভচর মানুষ কি পারবে লোভী জুরিতার হাত থেকে  বাঁচতে?
নিজের ভালোবাসাকে উদ্ধার করতে?

পাঠ প্রতিক্রিয়া

প্রায় একশ বছর আগেকার  লেখা বই। উভচর মানুষ পড়ার আগেই সূচনা পড়ে নেওয়া ভালো, যাতে করে বোঝা যাবে এটি কোন সময়ে লেখা বই। এতে বই পড়ার আগেই নিজের বোঝানো যাবে যে, এটি আজকালকার লেখা উপন্যাস নয়। এখনকার লেখকদের লেখা বইয়ের সাথে একে তুলনা করে পড়লে চলবে না।

অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যান ইংরেজি বইয়ের প্রচ্ছদ; Image source : মাদিহা মৌ

সত্যি বলতে কী, প্রথম দিকের কয়েকটা অধ্যায় পড়তে খুব আগ্রহ লাগলেও, তার ঠিক পরের কয়েকটা অধ্যায় পড়তে কিছুটা একঘেয়ে লাগবে। খুব মনোযোগ দিয়ে না পড়লে বোঝাই যাবে না, ইকথিয়ান্ডর আসলে কী।

তবে একবার কাহিনীতে ঢুকে যেতে পারলে বইটা খুবই টানবে। একশ বছর আগে এইরকম চিন্তা সত্যিই খুব অভূতপূর্ব। যাদের খটমটে সায়েন্স ফিকশন পড়তে ভালো লাগে না, তাদের কাছে উভচর মানুষ বেশ ভালো লাগবে। কারণ, সায়েন্স ফিকশন মানেই মহাকাশযান আর খটমটে নামধারী রোবট নয়। মায়া, ভালোবাসা, আবেগকে জড়িয়েও যে সায়েন্স ফিকশন লেখা যায়, সেটা উভচর মানুষ পড়লেই বোঝা যাবে। লেখক একশ বছর আগেই এটি করে দেখিয়েছেন।

শেষটা চমৎকার লাগবে। পড়তে পড়তে একটা হাহাকার জন্মাবে, না যেন সব শেষ হয়ে যায়, আহাজারি নিয়েই বইটা পড়ে শেষ করতে হবে।  তবে বইটা শেষ করার পর খুব স্বস্তি লাগবে। পরিপূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যাবে বইটা পড়ে। যেকোনো পাঠকের ক্ষেত্রেই তার পড়া সেরা সায়েন্স ফিকশন হতে পারে উভচর মানুষ।

আলেকজান্ডার বেলায়েভ; Image source : Google.com

লেখক পরিচিতি

আলেক্সান্ডার বেলায়েভের জন্ম ১৮৮৪ সালে। ছোটবেলা থেকেই বেড়ে উঠেছেন দৈন্যতার মধ্য দিয়ে। নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে অর্কেস্ট্রায় সুর তুলতেন, রঙ্গমঞ্চের স্ক্রিপ্ট লিখতেন, সেই সাথে সাংবাদিকতাও করতেন। তিনি আইন ও সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। পরবর্তীতে আইনবিদ হিসেবে চাকরিজীবন শুরু করলেও সুরকে ছাড়েননি। লেখালেখি করার জন্য ১৯২৫ সালে চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। পরের বছর প্রকাশিত হয় তার প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী প্রফেসর ডয়েলের মস্তক। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা- জীববিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যাসহ মহাকাশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রচুর কল্পকাহিনী লিখেছেন তিনি। অস্থিক্ষয় রোগের শিকার হয়ে বছরের পর বছর শয্যাশায়ী ছিলেন আলেক্সান্ডার বেলায়েভ। ১৯৪২ সালের জানুয়ারি মাসে এই জীবনবাদী বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীকার মারা যান।

বই পরিচিতি


বই: উভচর মানুষ
লেখক: আলেক্সান্ডার বেলায়েভ
অনুবাদক: ননী ভৌমিক
মূল্য: ২০০ টাকা (মলাট মুল্য)
প্রকাশনী: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র

Feature Image : মাদিহা মৌ

Related Article

0 Comments

Leave a Comment