‘মনীষা সম্পর্কে আমি প্রথম ভুল করি এক মেঘলা সন্ধ্যেবেলায়’ – সুনীলের কলমে এই চমৎকার লাইনটি উঠে আসার মাধ্যমে শুরু হয়েছে উপন্যাসটি। সুনীল মানে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজেই এই গল্পের নায়ক। অবশ্য নায়ক কিনা তা নিয়ে বিস্তর তর্ক আছে। কেননা এই গল্পের কোথাও নিজেকে তিনি নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করেননি। যদিও পুরো গল্প জুড়ে তার ভাবনার বিস্তৃত জগতের ওপর পা দিয়ে পাঠক নিজেকে অন্য কোনো আসনে সহসা বসাতে পারবেন না। তথাপি সুনীল সম্পর্কে মনীষার নিরব উপেক্ষার আরেক নাম বিরহ ছাড়া আর কিছু নয়। সেটা অবচেতন মনেও নায়কেরই প্রাপ্য।

হেমন্ত, কমার্শিয়াল অফিসের বড় অফিসার। সে মনীষার দাদা অরুণের বন্ধু। সুনীল নিজেও সেই তালিকাতেই। কলকাতায় নিজেদের বাড়ি আছে। দেখতে শুনতেও মন্দ নয়। অন্তত মনীষা তাকে অপছন্দ করে বলে মনে হয় না। তাহলে সে কেন এগোচ্ছে না? কেন মুখ ফুটে বলছে না – মনীষা, আমি তোমাকে চাই। চাঁপা ফুলের মতো তোমার শরীরের ঐ গন্ধ আমি আমার বুকে ধারণ করব।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়; Source : youtube.com

কিংবা সুনীল? তার কেন এতো মনীষাকে চাইতে ভয় করে? যে নামটা তার মুখ উচ্চারণ করেছে বলে সে আর মিথ্যঅ্যা বলতে পারেনি কখনো। যে হাত দিয়ে কালেভদ্রে কথার ছলে মনীষাকে ছুঁয়েছে বলে, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেই হাতে ঘুষ নেবার কথা কখনো ভাবতে পারে না সে। কিংবা যে মনে মনীষার মতো পবিত্র অনুভূতি বাস করে, সেখানেও কোনো পাপবোধ জন্ম নেবারও সুযোগ পাচ্ছে না। তাহলে কীসের এত দ্বিধা তার?

এই একতরফা মনীষার জীবনে মূল্যহীন এক প্রতিবন্ধকতা ছাড়া কিছুই নয় – এমনটা মনে হবার পর পিছিয়ে যাওয়াই কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়? নাকি সে ভাবছে; মনীষাকে ঘিরে তার এই সমস্ত স্বপ্ন বড় বেপরোয়া। মুখোমুখি হলেই একটা খোলা ময়দানের মতো উন্মুক্ত হয়ে যাবে। সুনীল তার যোগ্য নয়। তবু স্বপ্ন এত লজ্জাহীন হতে পারে! এই একটি জীবন্ত স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখতে চাওয়া, আর না চাওয়ার মধ্যে যে দ্বিধা; তার নামই বুঝি লজ্জা?

পাঠ প্রতিক্রিয়া

ষাটের দশকে কলকাতার শিল্প-সংস্কৃতির মজ্জায় ঢুকে আছে মধ্যবিত্ত নামক ধারণাটি। যাদের হাড়িতে দু’বেলা নিয়ম করে কিছু দানা উঠছে, তাদের কাছে খাওয়া-পরার চিন্তা বাদে আর কী থাকে! যা থাকার কথা, তা হলো নিজের কাছে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার ভাবনা। অনেককাল আগে এই ভাবনাটিই বাঙালি মধ্যবিত্তরা যেমন করে সংস্কৃতির ঠোঙায় মুড়ে আনন্দের উপলক্ষ্য তৈরি করছিল – সেই গল্পটির মধ্যেই যেন সুনীল নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন।

এই সংস্কৃতির আরেক নাম হলো মনীষা। গল্পের মধ্যে ঢুকতেই যাকে খুব অসামান্য এক নারী মনে হয়। অনেক অনেক দুঃখের মধ্যে দিয়ে হেঁটে এসে একদিন এক শান্ত নদীর ধারে ধ্যানরত সন্ন্যাসীর মতো বটগাছটার গোড়ায় পিঠ ঠেকিয়ে বসলে যেমন প্রশান্তি লাগবে, মনীষাকে দেখে তেমনি অনুভূতির জন্ম হয়। আপনাআপনি হৃদয় নিংড়ে সমস্ত প্রেম অঞ্জলি হয়ে ওর পায়ে লুটোপুটি খায়। বুকের ভেতরকার সমস্ত স্বপ্ন লজ্জাহীন হয়ে ওঠে।

‘স্বপ্ন লজ্জাহীন’র প্রচ্ছদ; Source : Prothom Al

সুনীলের লেখার ধর্মই এমন যে, তিনি পাঠকের কাছে তার মনস্তত্ত্ব নিয়ে পৌঁছাতে পারেন। যেমন ধরা যাক, প্রত্যেকবার যখন সুনীল স্বপ্নে কিংবা মুহূর্মুহু কল্পনায় মনীষার কাছে এসে ধর্ণা দিচ্ছিলেন, কখনো মনে হয়নি – এটা খুব অস্বাভাবিক কিছু। যেন সেসব আমারই কথা। আমিই খুব আকুল হয়ে মনীষাকে ঐসব কথা বলে যাচ্ছি। আর মনীষা আমায় বারবার এড়িয়ে যাচ্ছে। যন্ত্রণায় পুড়ে যাচ্ছে আমার ভেতরটা।

আবার সেই যে সুবিমলের ভাড়া করা বাড়িতে বসে হেমন্ত আর সুনীল, দুজনেরই মনীষার প্রেমিক হয়ে থাকার ইচ্ছে ব্যক্ত করে – সেটুকুকেও কখনো অতিরঞ্জিত মনে হয়নি। সত্যিই তো, মনীষার মতো অমন ঠান্ডা, অথচ রহস্যময়তার অবয়বে ঘেরা মেয়েকে তারা কী করে চাইবে? সে যে সকল চাওয়ার ঊর্ধ্বে। তাকে নিয়ে এসে এইসব এলেবেলে জীবনের রোজকার চেনা অভ্যাসের মধ্যে ফেলে দেয়া কি শোভা পায়?

বড়জোর ওরা দুজনেই ওর প্রেমিক হয়ে থাকতে পারে। এবং সেটা সুনীলের দিক থেকেই যুক্তিসঙ্গত। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো এই ব্যাপারটি যুক্তিসঙ্গতর পর্যায়ে পড়ে, সেটি কিন্তু পাঠকই নির্ধারণ করতে পারছে। কেননা সে যুদ্ধের কোনো ইতি নেই। তারা কেবল মনীষাকে একে অপরের কাছে গছিয়ে দেবার কায়দায় ব্যাস্ত। এবং ক্রমশ এই প্রেমিক হয়ে ওঠার সময়ে পাঠকের চিন্তার মধ্যে মনীষার একটা অসম্ভব বুক জ্বালা করা আদল ভেসে ওঠে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়; Source : UpClosed

হেমন্তের মতে, মনীষার মধ্যে বিশেষ কোনো রূপ নেই। গায়ের শ্যামলা রঙ, কপালের অংশটা ছোট। স্বাস্থ্যও খুব ভালো নয়। কিন্তু এই না থাকার মধ্যেও কেবল সুনীলের চোখে চোখ রেখে পাঠক দেখেছেন – মনীষা যেন সেই চাঁদ, যাকে কালিম্পংয়ের ঘন কুয়াশামাখা সন্ধ্যার মাঝে দেখতে পাওয়া যায়। যার রূপ বর্ণনাতীত। কেবল খুব যত্ন নিয়ে ওকে ছুঁতে ইচ্ছে করে। এই আকুলতা যে কেবল সুনীলের এই বইয়েই বিদ্যমান, তা নয়। তার লেখনীর মধ্যেই যেন এক পাগলপনা, অথচ বেপোরোয়া ভাব নয়, যা বুকের কোনো খাঁজে লুকিয়ে থাকে – এমন একটি ব্যাপার বিদ্যমান।

তাই বুঝি এই উপন্যাসের প্রথম ও শেষ লাইনের মধ্যে যে পাগলামী তিনি এঁকে রেখেছেন, তা থেকে পাঠক বেরোতে পারেন না! যেন সে এক রঙ্গিন সুঁতোর মতো কিংবা কোনো এক টালমাটাল নেশা; যা অবচেতনে প্রথম ও শেষটাকে খুব কষে বেঁধে ফেলেছে। তার ভেতরে মনীষার সেই অবাক অবাক চাহনী, তার হাতে চাঁপাফুলের মতো গন্ধ, বৌবাজারের মোড়ে ট্যাক্সিতে বসে মনীষার সাথে সুনীলের সেই চোখাচোখি, ক্রমাগত উচ্ছ্বসিত এক উপেক্ষা, আর মনগড়া দুঃখবিলাস- এই সবকিছুর অনুরণন যেন পাঠককে চম্বুকের মতো টানে। সেই সংস্কৃতির মধ্যে প্রত্যেকে ডুব দিয়ে তার রস আস্বাদন করতে করতে ভাবে – আসলেই মনীষা, একদিন আমাদের প্রত্যেকের বয়স বাড়বে, আমরা সকলে বদলে যাবো, কিন্তু এই তোমার হাঁটুর ওপর থুতুনি রেখে চেয়ে থাকার এই দৃশ্যটা আসলেই কখনো পুরনো হবে না।

‘স্বপ্ন লজ্জাহীন’র আলাদা প্রচ্ছদ; Source : Flipkart

‘স্বপ্ন লজ্জাহীন’ সম্পর্কে ব্যক্তিগত অভিমত

লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অসম্ভব ভক্ত বলে বলছি না, বাংলা সাহিত্যে এই ঘরানার মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস খুব কম আছে। বরং যে ক’টা আছে, তার বেশিরভাগ সুনীলেরই। বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভরে বৃষ্টি’, সমরেশ বসুর ‘বিবর’, ‘প্রজাপতি’ মনস্তাত্ত্বিক হলেও অতে অনুভূতির এমন ঠাসা অনুরণন নেই। এসব লেখা পড়ে বরং বিশেষ কোনো চরিত্রের জন্য আফসোস হয়। কঠিনতর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে পাঠকরা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। কিন্তু ‘স্বপ্ন লজ্জাহীন’র ধারাটাই এমন যে, পড়তে পড়তে পাঠক ক্রমশও পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আবিষ্কার করে ফেলে। উপরন্ত সুনীলের সাথে সাথে তারা নিজেরাও অবলীলায় রপ্ত করে ফেলছে সেই আশ্চর্য দুঃখবিলাস। সত্যিই তো, শেষপর্যন্ত এখানে মনীষাকে না পাওয়ার দুঃখ যেন এক বিলাসিতারই নামান্তর। তাই ব্যক্তিগতভাবে আমি একে ১০/১০ না দিলে নিজের কাছে দ্বায়বদ্ধ থাকব বলে আমি মনে করি।

একনজরে বই পরিচিত

বই : স্বপ্ন লজ্জাহীন
লেখক : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
জনরা : মনস্তাত্বিক উপন্যাস

প্রকাশনা : মাঠিগন্ধা(বাংলাদেশ)
প্রথম প্রকাশ : ১লা জানুয়ারী, ১৯৭১(কলকাতা)।

Feature Image Source : Prothom Alo

Related Article

0 Comments

Leave a Comment