দারিদ্র্য, একটি ভয়াবহ অভিশাপের নাম। এই অভিশাপের হাত থেকে বাঁচতে কেউ বেছে নেয় ভিক্ষাবৃত্তি, তো কেউ পা বাড়ায় অসৎ পথে। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তেই রয়েছে এর ভয়াল ছাপ। জাপানের মতো উন্নত একটি দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। সেখানে দারিদ্র্যের চিত্রটি কেমন? কিভাবে সেখানকার মানুষ দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে? এমনই এক জাপানি পরিবারের গল্প নিয়ে বানানো মুভি শপলিফটার্স।

কাহিনী সংক্ষেপ

জাপানের রাজধানী টোকিও। জাকজমকপূর্ণ শহরের বিলাহবহুল অট্টালিকার ভিড়ে, ছোট্ট একটি ঘরে বাস করেন হাতসুয়ে নামক এক বৃদ্ধা। সেই ঘরে আরো আছেন ওসামু, তার স্ত্রী নোবুইয়ো, তরুণী আকি এবং ছোট্ট ছেলে শোবু। এই ৫ জনের কারো সাথেই কারো রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তারা একে অপরকে নিজেদের পরিবারের মতোই ভালোবাসেন।

হাস্যজ্জ্বোল ওসামু ও তার পরিবার; Image Source: filmlinc.org

টোকিওর মতো বিলাসবহুল একটি শহরে ৫ জনের পরিবার চালানো চাট্টিখানি ব্যাপার না। পরিবারের খরচ চালানোর জন্য ওসামু, নোবুইয়ো এবং আকি প্রত্যেকেই ছোট-বড় কোনো না কোনো চাকরি করছেন। কেউ কাজ করছেন লন্ড্রির দোকানে, তো কেউ কাজ করছেন নাইটক্লাবে। কিন্তু তিনজনের উপার্জনের পরও তাদের জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আরো বিপত্তি দেখা দেয় যখন দিনমজুরের কাজ করা ওসামু হঠাৎ করেই তার পা মচকে ফেলেন। অচল পা নিয়ে আর কাজ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। কিন্তু এতে কি তাদের জীবনযাপন থেমে যাবে? মোটেই না। তাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর জন্য তাদের কাছে আছে আরেক উপায়, শপলিফটিং। অর্থাৎ যেকোনো দোকান থেকে টাকা দিয়ে কোনো জিনিস কেনার বদলে সেটা চুরি করে আনা।

ছোট্ট শোতাকে ব্যাবহার করে ওসামু প্রতিনিয়নতই বিভিন্ন দোকান থেকে খাবার-দাবার, প্রসাধনী সামগ্রী থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় জিনিস চুরি করেন। নিরীহ শোতাকে  দেখে কেউ সন্দেহও করতে পারবেনা যে সে আসলে তার পিঠের ব্যাগে করে এতকিছু চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। তবে শোতা বয়সে ছোট হলেও, এই ছোট বয়সেই তার মধ্যে বিবেকবোধ ঠিকই আছে। এভাবে প্রতিদিন চুরি করা তার মোটেও পছন্দ না, টাও অসামুর জোরাজুরিতে তাকে এই কাজ করতে হয়।

শপলিফটিং করছেন ওসামু ও শোতা; Image Source: variety.com

এভাবেই চলতে থাকে তাদের দিনকাল। এরই মাঝে একদিন হঠাৎ করেই তারা দেখতে পান তাদের গলির একটি ঘরের দরজার বাইরে ২-৩ বছর বয়সী ছোট্ট একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। পরপর বেশ কিছুদিন মেয়েটিকে এভাবে কাঁদতে দেখে ওসামু মেয়েটিকে তাদের ঘরে নিয়ে আসেন।

ধীরে ধীরে তারা জানতে পারেন, মেয়েটির নাম ইয়ুরি। তার বাবা মা তাকে প্রায়শই এভাবে ঘরের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখে। শুধু তাই না, তারা ইয়ুরিকে শারিরিকভাবে নির্যাতনও করে। এসব দেখে ওসামু ও তার পরিবার সিদ্ধান্ত নেন, তারা ইয়ুরিকে তাদের কাছেই রেখে দেবেন। এই পুরো ঘটনাটি নিয়েই শোতা খুবই অসন্তুষ্ট থাকে। তার অসন্তোষ আরো বড় আকার ধারণ করে যখন ওসামু ইয়ুরিকে দিয়েও শপলিফটিং করানো শুরু করেন।

শোবু (ডানে) ও ইয়ুরি (বামে); Image Source: theguardian.com

এরই মাঝে তারা একদিন টিভিতে দেখতে পান, ইয়ুরির নিখোঁজ ঘটনা নিয়ে তদন্ত চলছে। কিন্তু এই অল্প কিছুদিনের ব্যবধানেই ইয়ুরিকে ভালোবেসে ফেলা ওসামা আর নোবুইয়ো ইয়ুরিকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে কিছুতেই রাজি না। তারা কি পারবেন ইয়ুরিকে তাদের সাথে রাখতে? শেষ পর্যন্ত কী পরিণতি হবে এই উদ্ভট পরিবারের? জানতে হলে দেখতে হবে মুভিটি।

চিত্রনাট্য ও পরিচালনা

মুভিটির চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও সম্পাদনা সবকিছুতেই আছেন জনপ্রিয় জাপানি চলচ্চিত্র নির্মাতা হিরোকাজু কোরে এদা। জাপানের চলমান অর্থনৈতিক মন্দা ও এর থেকে উদ্ভূত দারিদ্র্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এই মুভিটি নির্মাণ করেন। হিরোকাজুর প্রায় দশ বছরের চিন্তার ফসল এই মুভি।

মুক্তি এবং বক্স অফিস

২০১৮ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বপ্রথম মুক্তি পায় এই মুভি। পরবর্তীতে মুভিটি জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের থিয়েটারে মুক্তি দেয়া হয়। ২০১৮তে মুক্তি পাওয়া জাপানী মুভিগুলোর মধ্যে ২০১৮ এর অন্যতম ব্যাবসাসফল মুভির স্বীকৃতি পাওয়া এই মুভি পৃথিবীজুড়ে ৭২.৬ ইউ এস ডলার আয় করেছে।

সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া এবং পুরষ্কারসমূহ

বর্তমান সময়ের অন্যতম কান চলচ্চিত্র উৎসবে মুক্তির পর মুভিটি সেই উৎসবের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরষ্কার পাম ডি’অর জিতে নেয়। সেই সাথে ডেনভার চলচ্চিত্র উৎসব, মিউনিখ চলচ্চিত্র উৎসবসহ আরও অনেক মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবসমূহে সেরা চলচ্চিত্রের পুরষ্কার পেয়েছে এই মুভিটি।

কান চলচ্চিত্র উৎসবে শপলিফটার্স পরিবার; Image Source: japantimes.co.jp


পাম ডি’অর হাতে পরিচালক হিরোকাজু; Image Source: japantimes.co.jp

শুধু তাই নয়, ২০১৮ সালের অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব, বাফটাসহ সব মর্যাদাপূর্ণ অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানগুলোতেই বেস্ট ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ মুভি ক্যাটেগরিতে মনোনয়ন পেয়েছে মুভিটি। সেই সাথে, হলিউড রিপোর্টার, নিউ ইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, ভোগ, ভ্যারাইটি ইত্যাদি নামীদামী সমালোচকদের মতে ২০১৮ সালের সেরা সিনেমাগুলোর তালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছে মুভিটি।

রেটিং

মুভিটির রটেন টম্যাটোসে ১৯৬ জন সমালোচকের রিভিউয়ের উপর ভিত্তি করে ৯৯% ফ্রেশ রেটিং অর্জন করেছে, যেটি যেকোনো মুভির জন্যই বিশাল প্রাপ্তি। শুধু সমালোচকরাই নন, সাধারণ দর্শকদের কাছেও মুভিটি আইএমডিবি রেটিং ৮.১। বিদেশি ভাষার মুভি প্রেমীরা, এখনো এই মুভি না দেখে থাকলে দেখে ফেলুন!

Book Offer – Grab it!

Related Article

1 Comment

গুণ্মুগ্ধ ভক্ত May 3, 2019 at 3:48 pm

আপনার অসাধারণ লেখনীর জন্য ধন্যবাদ। আপনার পর্যালোচনা আরো প্রলম্বিত হউক।

Leave a Comment