বর্তমানকালে হলিউডে গ্যাংস্টার, মাফিয়া এ শব্দগুলো অত্যন্ত পরিচিত। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে রয়েছে বিংশ শতাব্দী হতে শুরু করে বর্তমানকাল পর্যন্ত তৈরি হাজারো মাফিয়া সংক্রান্ত মুভি। তবে বাস্তবে এ মাফিয়া শব্দটির সাথে বিশ্ববাসীর প্রথম পরিচয় ঘটে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। আর বিশ্বের প্রথম মাফিয়া বস ছিলেন আলফোনসো কাপোন ওরফে আল কাপোন (Al Capone)। ইটালিয়ান বংশদ্ভূত এ আমেরিকান ব্যক্তি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত নিউ ইয়র্কে ত্রাস বিস্তার করে রেখেছিলেন। অপরাধ জগতে তার পূর্বে কোনো চক্রকে এতটা সংঘবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায় নি।

দুর্ধর্ষ এ অপরাধীকে নিয়ে তার জীবদ্দশায় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত তৈরি হয়েছে অনেক মুভি। কোনটি সরাসরি তার চরিত্রায়ন অথবা কোনোটি তার জীবনকাহিনী বা চলাফেরার উপর ভিত্তি করে তৈরি। আজকের যুগে মুভিগুলোতে মাফিয়া বলতে স্যূট টাই পড়া মাথায় হ্যাটওয়ালা বেশ ভূষা দেখা যায়, তা সবই কোনো না কোনোভাবে আল কাপোনের থেকে অনুপ্রাণিত। মারিয়ো পুজোর গডফাদার উপন্যাস অবলম্বনে যে গডফাদার ট্রিলজি বানানো হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান চরিত্র ভিটো করলিওনিও আল কাপোনের চরিত্রের উপর ভিত্তি করে বানানো।

স্কারফেস মুভিতে আল পাচিনো; Source: fanpop.com

তবে এ মুভিগুলোর মধ্যে যদি আলাদা করে কোনোটার নাম উল্লেখ করতে হয় তবে চলে আসবে স্কারফেস (Scarface) মুভিটির কথা। আশির দশকে মুক্তিপ্রাপ্ত এ মুভিটি যেমন আল কাপোনের উপর ভিত্তি করে বানানো সেরা মুভি, সে সাথে আল কাপোন চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে অভিনেতা আল পাচিনোর হলিউডে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে নেওয়ারও মুভি যদিও মুভিটিতে সরাসরি আল কাপোনকে চরিত্রায়ন করা হয় নি। আশির দশকের পরবর্তী সময়ে প্রচুর মুভিতে দেখা গিয়েছে স্কারফেস মুভিটির প্রভাব। তবে আসুন জেনে আসা যাক এ মুভিটির ব্যাপারে বিস্তারিত।

কাহিনীসংক্ষেপ

স্কারফেস মুভিটির মূল চরিত্র কিউবান রিফিউজি টনি মন্টানা। আ্যান্টনিও মন্টানা ওরফে টনি তার তিন বন্ধু ম্যানি, চিচি এবং আংগেলসহ কিউবান রিফিউজি হিসেবে ১৯৮০ সালে আমেরিকার মিয়ামিতে পা রাখে। তাদের সবার স্থান হয় রিফিউজি ক্যাম্পে যদিও সেখানে থেকে যাবার উদ্দেশ্য তাদের কারোই ছিল না। বিশেষ করে ছোটোখাটো অপরাধের সাথে জড়িত টনি ছিল বেশ উচ্চাভিলাষী।

কিউবান রিফ্যুজি ক্যাম্পে টনি ও তার বন্ধু ম্যানি; Source: twitter.com

মিয়ামির ড্রাগ লর্ড ফ্র‍্যাংক লোপেজের নির্দেশে তারা তাই এক সাবেক কিউবান জেনারেলকে হত্যা করে, বিনিময়ে লোপেজ তাদের দেয় আমেরিকার নাগরিকত্ব। তবে নাগরিকত্ব লাভের পর রেস্টুরেন্টে থালাবাসন মাজার চাকরির প্রতি ক্রমশই বিরক্ত হয়ে উঠে উচ্চাভিলাষী টনি, তাই আবার সে তার বন্ধুদের নিয়ে শরণাপন্ন হয় ফ্র‍্যাংক লোপেজের কাছে।

লোপেজের ডান হাত হিসেবে পরিচিত ওমর সুয়ারেজ তাদের চারজনকে পাঠায় কলম্বিয়ান কোকেন ডিলারদের সাথে কোকেন পাচার করার জন্য, কিন্তু সেখানে হঠাৎ তাদের গোলাগুলির সম্মুখিন হতে হয়। টনির বন্ধু আংগেলের প্রাণ হারাতে হয় এবং বাকি তিনজন কোনোমতে পালিয়ে বাঁচে।

ফ্র্যাংক লোপেজের মুখোমুখি টনি ও ম্যানি; Source: youtube.com

টনির সন্দেহ হয় লোপেজ ইচ্ছাকৃত ভাবে তাদের বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল, তাই সে শুরু থেকেই প্রতিশোধের সুযোগ খুজতে থাকে। এর মধ্যে টনির নজর পরে ফ্র‍্যাংক লোপেজের স্ত্রী এলভিরা হ্যানককের উপর। সব মিলিয়ে সে সুযোগ খুজতে থাকে ফ্র‍্যাংককে হটিয়ে নিজে সবকিছু দখল করে নেয়ার।

নিজের সাহসীকতা এবং পাগলামির দরূণ খুব অল্প সময়েই অপরাধ জগতে উপরের দিকে উঠতে থাকে টনি। কিন্তু যতই ফ্র‍্যাংকের কর্মী হিসেবে সে উপরে উঠছিল ততই তার উদ্ধত আচরণ বেড়ে চলেছিল। এভাবে চলতে চলতে একসময় তার সামনে সুযোগ এসেই যায় ফ্র‍্যাংককে হটিয়ে সব নিজের দখলে নিয়ে নেয়ার। শেষ পর্যন্ত কি হয় টনি মন্টানার পরিণতি তা জানতে আপনাদের দেখতে হবে স্কারফেস মুভিটি।

নির্মাণ,অভিনয় এবং দর্শক প্রতিক্রিয়া

স্কারফেস মুভিটি পরিচালনা করেন পরিচালক ব্রায়ান ডি পালমা, প্রযোজনা করে মার্টিন বার্গমেন। চিত্রনাটকার হিসেবে মুভিটিতে দায়িত্বে ছিলেন অলিভার স্টোন। স্কারফেস মুভিটি আশির দশকে পুনরায় নির্মাণের আশা জাগে যখন অভিনেতা আল পাচিনো ১৯৩২ সালে মুক্তি পাওয়া একই নামের মুভিটি দেখেন এবং এ মুভিটির একটি রিমেক বানানোর ইচ্ছা পোষণ করেন।

ম্যানি এবং টনির বোন জিনা; Source: pinterest.com

পাচিনো প্রযোজক বার্গমেনের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তাকে মুভিটি প্রযোজনা করতে রাজি করান। বার্গমেন মুভিটির পরিচালিক হিসেবে টুয়েলভ আ্যাংরি মেন মুভির পরিচালক সিডনী লুমেটকে নিযুক্ত করেন। লুমেট মুভিটির চিত্রনাট্যকার হিসেবে নিয়োগ দেন অলিভার স্টোনকে। যদিও অলিভার স্টোনের কাছে ১৯৩২ সালের মূল মুভিটি ভালো লাগেনি তবে লুমেটের অনুরোধে তিনি রিমেকের জন্য চিত্রনাট্য লিখতে রাজি হন। পরবর্তীতে কিছু মতবিরোধের কারণে লুমেট পরিচালকের আসন থেকে পিছু হটে যান এবং সে জায়গায় আসেন ব্রায়ান ডি পালমা।

আল পাচিনোর মাধ্যমে এ মুভিটির সূচনা ঘটলেও মূল চরিত্র টনি মন্টানা হিসেবে প্রথমে অভিনয় করার কথা ছিল হলিউড তারকা রবার্ট ডি নিরোর। তবে নিরো এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে শেষ পর্যন্ত আল পাচিনো নিজেই টনি হিসেবে অভিনয় করেন।

পাচিনোর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুভি এটি; Source: youtube.com

ইতোপূর্বে হলিউডের সুপ্রতিষ্ঠিত নাম হলেও টনি মন্টানা চরিত্রটি আল পাচিনোর ক্যারিয়ারে বেশ প্রভাব ফেলে। চরিত্রটি তাকে হলিউডের উপরের কাতারের অভিনেতার আসনে পাকাপোক্ত জায়গা করে দেয় এবং এরপর ক্যারিয়ারে তার অভিনীত বিভিন্ন চরিত্রের চলাফেরা এবং বাচনভঙ্গিতেও টনি মন্টানা চরিত্রটির ছাপ লক্ষ্য করা যায়।

এছাড়া মুভিটির নায়িকা মিশেল ফাইফার হলিউডের বর্তমান সময়ের বর্ষীয়ান এবং পরিচিত মুখ হলেও সে সময়ে তিনি একদমই অজানা একজন অভিনেত্রী ছিলেন। হলিউডের মূল ধারায় তিনি স্কারফেস মুভিটির মাধ্যমেই পা রাখেন।

মুভিটিতে নায়িকা চরিত্রে মিশেল ফাইফার; Source: youtube.com

স্কারফেস মুভিটির প্রাথমিক দর্শক প্রতিক্রিয়া মোটেও ভালো ছিল না। বিশেষ করে মুভিটতে ভায়োলেন্স এবং গালাগালির আধিক্যের কারণে মুভিটিকে কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে কালের বিবর্তনে মুভিটির প্রতি মানুষের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটে এবং মুভিটি ক্লাসিক মুভি হিসেবে হলিউডের ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

যে কারণে মুভিটি দেখবেন

স্কারফেস আশির দশকের ক্লাসিক মুভিগুলোর একটি। আপনি যদি গ্যাংস্টার মুভির ফ্যান হয়ে থাকেন এবং ক্রাইম ড্রামা ছবিগুলো আপনার ভালো লেগে থাকে তবে স্কারফেস মুভিটি আপনার অবশ্যই ভালো লাগবে। এছাড়া হলিউড মুভির একজন ভক্ত হিসেবে আল পাচিনোর অসাধারণ অভিনয় দেখার জন্য হলেও উপভোগ কর‍তে পারেন স্কারফেস মুভিটি

Related Article

0 Comments

Leave a Comment