সিগমা ফোর্স সিরিজটি আসলে আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগের অত্যন্ত গোপন দলের উপর নির্ভর করে লেখা। এই দলটি গঠিত হয়েছে সাবেক স্পেশাল ফোর্সের অফিসারদের নিয়ে, যারা অসাধারণ দক্ষতার অধিকারী। লেখক সিগমা ফোর্সের চরিত্রগুলো তৈরি করেছেন এমনভাবে, যারা বিজ্ঞান সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন, সেই সাথে বন্দুক চালনায় পারদর্শী। দলটি বিভিন্ন মিশন নিয়ে পুরো পৃথিবী চষে বেড়ায়। সিগমা ফোর্সের দলনেতার নাম পেইন্টার ক্রো। ক্রো’ই এই এলিট ফোর্সের পরিকল্পনাকারী। সে ঠিক করে কীভাবে মিশন পরিচালিত হবে।

সিগমা ফোর্সের সবগুলো চরিত্রই চমৎকার। বিশেষ করে শেইচানের কথা বলতেই হয়। খুব আকর্ষণীয় ও চিত্তাকর্ষক এই নারী চরিত্রটি। সেই সাথে প্রচুর খ্যাতিও পেয়েছেন তেজস্বী মনোভাব ও কাজের জন্য। ব্যক্তিগতভাবে আমিও এই চরিত্রটিকে পছন্দ করি।

সিগমা ফোর্স সিরিজ; Image source: amazon.com

ক্রমানুসারে, সিগমা ফোর্স সিরিজের বইগুলো হলো স্যান্ডস্টর্ম, ম্যাপ অফ বোনস, ব্ল্যাক অর্ডার, কোয়ালস্কি ইন লাভ, দ্য জুডাস স্ট্রেইন, দ্য লাস্ট ওরাকল, দ্য ডুমসডে কি, দ্য স্কেলেটন কি, দ্য ডেভিল কলোনি, ট্র্যাকার, ব্লাডলাইন, দ্য আই অফ গড, দ্য ডেভিল বোনস, দ্য সিক্সথ এক্সটিঙ্কশন, দ্য মিডনাইট ওয়াচ, দ্য বোন ল্যাবরিন্থ, ক্র্যাশ অ্যান্ড বার্ন, দ্য সেভেন্থ প্লেগ, ঘোস্ট শিপ, দ্য ডেমন ক্রো। সিরিজের প্রথম বই স্যান্ডস্টর্ম এই ফিচারটি, যার পুরোটা জুড়েই রয়েছে পেইন্টার ক্রোর সদর্প পদার্পণ।

কাহিনী সংক্ষেপ

লন্ডন মিউজিয়ামে প্রচন্ড এক বিস্ফোরণে এক ধনী মহিলার মূল্যবান সব সংগ্রহ উড়ে গেলো। কে করলো এই কাজ? কারা তার বাবার স্মৃতিচিহ্ন উড়িয়ে দিলো? কেমন করে এত সিকিউরিটি ভেদ করে বিস্ফোরণ হলো সেখানে? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বের হলো লেডি কারা কেনসিংটন, সুন্দরী এবং তার বোনসম বান্ধবী, বিদূষী ড. সাফিয়া আল-মায়াজ। সেই সঙ্গে সাফিয়ার প্রাক্তন প্রেমিক, ওমাহা ডান। ওমাহা একজন নামকরা প্রত্নতাত্ত্বিক। এদের সাথে জুড়ে গেলো সিগমা ফোর্সের দলনেতা পেইন্টার ক্রো।

স্যান্ডস্টর্মের ইংরেজি বইয়ের প্রচ্ছদ; Image source: jamesrollins.com

তাদের সবার লক্ষ্য উবার শহর খুঁজে বের করা। সেটা করতে হলে অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে, অনেক ধাঁধার সমাধান করে, অনেক বিপদ মাড়িয়ে যেতে হবে। একে একে সবগুলো ধাঁধা সমাধান করলো তারা। মরুভূমির মরুঝড়কে ছাপিয়ে প্রবেশ করলো এমন এক শহরে যা কল্পনাকেও হার মানায়। কিন্তু সবকিছু একদম সহজভাবে ঘটবে, তা কি হয়? যেখানেই দুনিয়া আলোড়নকারী কোনো বিশেষ আবিষ্কার সাফল্যের মুখ দেখবে, সেখানে দুর্বৃত্ত অবশ্যম্ভাবী। তাদের পিছু পিছু ধেয়ে এসেছে শত্রুর দল। যাদের উদ্দেশ্য সারা দুনিয়া জুড়ে বয়ে আনবে বিশৃংখলা। সেই সাথে আরব মরুভূমির বিপদ তো আছেই।

সবার লক্ষ্য একই। সেটি এমন এক ক্ষমতার উৎস খুঁজে বের করা, যেটা দুনিয়াকে পরিণত করতে পারবে স্বর্গে অথবা ধ্বংস করে দেবে মানব সভ্যতাকে। লক্ষ্য পূরণে সামনে এগোতে গিয়ে এমন একসময় কাঙ্ক্ষিত জায়গায় তারা পৌঁছালো, যখন মরুভূমি ধারণ করেছে করাল রূপ। ভয়াবহ বালি ঝড়ে ঢেকে গেলো সব।

স্যান্ডস্টর্মের ইংরেজি অন্য একটি প্রচ্ছদ; Image source: theworks.co.uk

পাঠ প্রতিক্রিয়া

রলিন্সের বই মানেই অন্য ধরনের কিছু

এটা হলো রলিন্স সম্পর্কে বহুল ব্যবহৃত বাক্য। ঠিক যেন বিজ্ঞানের সাথে ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম, এডভেঞ্চার আর রহস্য অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ।

রলিন্সের বর্ণনা খুবই জীবন্ত। মরুভূমিতে যখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে, সে দৃশ্যটি যেন চোখের সামনে দেখছি। লাল সূর্য ডুবছে, ওদিকে মসৃণ ধু ধু বালিতে মরীচিকায় সূর্যের প্রতিফলন কখনো না দেখেও যেন অবলোকন করছিলাম। বালিঝড়ের সময়ে, বালির প্রবল ঘূর্ণনের ঠিক নিচে স্থির তড়িৎএর ফলে নীলাভ আলো সৃষ্টি হয়। বালিঝড়ের বর্ণনাটুকু এত বাস্তব যে, নীল রঙের স্থির তড়িৎশিখা যেন একদম পরিস্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। যে দৃশ্য জীবনে কখনো দেখিনি, সেটা চোখের সামনে একদম বাস্তবরূপে ফুটিয়ে তোলা মোটেও সহজ কথা নয়। লেখক নিজের চোখে এসব দেখেছেন বলেই হয়তো বর্ণনা একদম নিখুঁত।

স্যান্ডস্টর্মের বাংলা অনূদিত বই; Image source: মাদিহা মৌ

রলিন্সের বইয়ের সাথে বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়গুলো ওৎপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। স্যান্ডস্টর্মে ছিলো পদার্থবিজ্ঞান। পদার্থের ছাত্র হওয়ায় এই সম্পর্কিত বিষয়গুলো পড়ে খুব মজা পেয়েছি। তবে অনেকগুলো ব্যাপার জেনেছি, যার নামই শুনিনি আগে। এরকম একটি পদার্থ হলো প্রতি পদার্থ। রলিন্স আগ্রহ জাগিয়ে দেওয়ায় এই বিষয়ে আরোও জানার চেষ্টা করেছি। রলিন্স এমনই এক লেখক, যিনি পড়াশোনার মতো অপছন্দনীয় ব্যাপারেও আগ্রহ জাগিয়ে তোলেন।

মরুভূমির বালিঝড়; Image source: YouTube

বইয়ের কাহিনী কোথাও একটুও ঝুলে যায়নি। প্রতিনিয়তই ছিলো টান টান উত্তেজনা। কিছু কিছু ঘটনা এত আচমকা ঘটেছে যে পড়তে গিয়ে রক্ত ছলকে উঠেছে। স্যান্ডস্টর্ম বইটি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। হৈ-হট্টগোলের মধ্যে কিংবা বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে এই বই পড়লে আরাম পাওয়া যাবে না। হয়তো অনেক ছোট কোনো ব্যাপারই চোখ এড়িয়ে যাবে, যা কাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগতভাবে আমার ইতিহাস প্রচন্ড ভালো লাগে, সেই সাথে গা শিউরে ওঠা রোমাঞ্চকর কাহিনীর বই ছেড়ে ওঠাই যায় না। সময় হাতে নিয়েই বইটি পড়তে বসা ভালো, নইলে একবার বইয়ের নেশায় ডুবে গেলে গুরুত্বপূর্ণ কাজ সব ভেসে যাবে।

বালিঝড়ের করাল রূপ; Image source: YouTube

লেখক পরিচিতি

আমেরিকান পশু চিকিৎসক জেমস পল চ্যাকস্কি’র ডাক নাম জেমস রলিন্স। তিনি ১৯৬১ সালের ২০ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। রলিন্সের লেখায় অ্যাকশন-রোমাঞ্চ, রহস্য, ইতিহাস – সবই উঠে এসেছে। তাই তার লেখাগুলোকে টেকনো-থ্রিলার নামে অ্যাখ্যায়িত করা হয়। তিনি কিছুকাল সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন। রলিন্স স্কুবা ডাইভিং ও গুহার মধ্যে মন্থকূপ সন্ধানকারী হিসেবে খণ্ডকালীন কাজ করতেন। তাই তার অভিজ্ঞতাগুলো নিজের লেখায় ব্যবহার করেছেন। তার বেশ কিছু উপন্যাসের গুহা ও পানির নিচের দৃশ্যপট এসেছে। রলিন্সের উপন্যাসগুলোতে গবেষণা, চিন্তাশক্তির সাথে সাথে তার বিভিন্ন দেশ ঘোরার অভিজ্ঞতাও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

জেমস নিজস্ব অ্যাডভেঞ্চারের উপর ভিত্তি করে অনেক উপন্যাস লিখেছেন। সেগুলো হলো সাবটেরান, এক্সক্যাভেশন, ডিপ ফ্যাদম, আমাজনিয়া, আইস হান্ট, ইন্ডিয়ানা জোনস অ্যান্ড দ্য কিংডম অফ দ্য ক্রিস্টাল স্কাল। এসব ছাড়াও একক ও যৌথ অনেক উপন্যাস লিখেছেন তিনি। বর্তমানে জেমস রলিন্স আমেরিকায় বসবাস করছেন।

জেমস রলিন্স; Image source: houstoniamag.com

অনুবাদ প্রসঙ্গ

ইংরেজিতে পড়তে না চাইলে স্যান্ডস্টর্মের বাংলা অনুবাদ পড়তে পারেন। আদী প্রকাশনী থেকে রূপান্তরিত করেছেন মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ। বইয়ের রূপান্তর সত্যিই হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ইংরেজি শব্দের যথাযথ বাংলা হয় না, সেসবের ব্যাখ্যা ব্র্যাকেটে লিখে দেওয়ার ধারণাটি বেশ প্রশংসনীয়। সেই সাথে কার্যকরীও। তবে অনুবাদে ইংরেজি শব্দের আধিক্য বেশ দৃষ্টিকটু।

বই পরিচিতি

বই: স্যান্ডস্টর্ম
লেখক: জেমস রলিন্স
রুপান্তর: মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
প্রচ্ছদ: সামিউল ইসলাম অনিক
পৃষ্ঠা: ৪৩২
মূল্য: ৪৮০
প্রকাশনী: আদী প্রকাশন
প্রকাশকাল: মার্চ, ২০১৬

Feature Image: ফয়সাল খান

Related Article

0 Comments

Leave a Comment