ব্রিটিশ উপকথায় এক উল্লেখযোগ্য নাম রবিন হুড। তার অস্তিত্বের কোনো সত্যতা রয়েছে কিনা তা হলফ করে বলা না গেলেও, কালের বিবর্তনে রবিন হুড চরিত্রটির গল্প বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এককালে ব্রিটিশ শাসিত আমাদের এ দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। তাকে নিয়ে যে প্রচলিত গল্প রয়েছে তার সারমর্ম অনেকটা এরকম যে, রবিন হু্ড এক দস্যু যে কিনা ধনীদের কাছ থেকে সম্পদ লুট করে গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দিত।

তার সম্পর্কে বেশ কিছু ভাসা ভাসা গল্প রয়েছে যার সাথে বিভিন্ন সময়ে কল্পনার সংমিশ্রণে অনেকে তৈরি করেছে নানারকম গল্প। তাকে নিয়ে লেখা শিশুতোষ গল্পের বই, সিনেমা, টিভি সিরিজ, ভিডিও গেমস কোনোকিছুরই কমতি নেই। সাধারণত দেখা গিয়েছে এসব মাধ্যমে তার ব্যাপারে যেসব গল্প তুলে ধরা হয়েছে, তার সবগুলোর মূলভাব একই। যদিও প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু স্বকীয়তা রয়েছে।

রবিন হুডের সর্বশেষ সংস্করণ; Source: variety.com

এ ধারায় সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে যোগ হয়েছে ২০১৮ সালে নির্মিত রবিন হুড নামক আ্যাকশন-এডভেঞ্চার মুভিটি। মুভিটি চেষ্টা করেছে রবিন হুডের বীরত্বপূর্ণ কল্পকাহিনীকে অনেকটা বাস্তবতার আলোকে তুলে ধরার৷ তবে এ ব্যাপারে মুভিটি কতটা সফল হয়েছে চলুন তা জেনে আসা যাক।

কাহিনী সংক্ষেপ

রবিন হুড মুভিটির পটভূমি ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামে। লর্ড রবিন অব লক্সলি তার প্রেমিকা ম্যারিয়ানের সাথে সুখে জীবনযাপন করছিল। তবে নটিংহ্যামের দুর্নীতিবাজ শেরিফ তার জমিজায়গা দখলের উদ্দেশ্যে তাকে ততকালীন সময়ে আরবদের বিরুদ্ধে চলমান তৃতীয় ক্রুসেডে যোগ দেয়ার সরকারি পরোয়ানা জারি করে। রবিন তাই দেশ ছেড়ে যুদ্ধে যোগ দিতে আরবদেশে পাড়ি জমায়।

চার বছর যুদ্ধে কাটানোর পর সে যুদ্ধের ভয়াবহতায় একদম হতাশ হয়ে পড়ে। এরপর যখন তার কমান্ডার গিসবর্ণ তাকে নির্দেশ দেয় এক কিশোর বন্দীকে হত্যা করার, সে সাহস করে তার আদেশ অমান্য করে যার শাস্তিস্বরূপ তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

ক্রুসেডে থাকাকালীন রবিন; Source: theverge.com

দেশে ফিরে রবিন সম্পুর্ণ ভিন্ন এক চিত্র দেখতে পায়। নটিংহ্যামের শেরিফ রবিনকে মৃত ঘোষণা করে তার সব সম্পত্তি দখল করে নিয়েছে এবং চার্চের এক দুর্নীতিবাজ পাদ্রীর সাথে হাত মিলিয়েছে যাদের উদ্দেশ্য যুদ্ধকে পুজি করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করা। তারা গোপনে আবার তাদের আরব প্রতিপক্ষকে পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছিল যাতে যুদ্ধ প্রতিনিয়ত চলতে থাকে।

তবে আশার ব্যাপার হল, জনগন এসব অন্যায়ের বিরদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং তাদের নেতৃত্বে আছে উইল টিলম্যান নামক এক উদীয়মান নেতা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, রবিনের মিথ্যা মৃত্যুর সংবাদ শুনে তার প্রেমিকা ম্যারিয়ান অতীত ভুলে উইলের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে।

রবিন ও ম্যারিয়ান; Source: thevulture.com

এমতাবস্থায় রবিনের সাথে এসে যোগ দেয় সে আরব ব্যক্তি যার কিশোর পুত্রের জীবন রক্ষার কারণে রবিনকে দেশে ফেরত আসতে হয়েছে। ইয়াহিয়া ওরফে জন নামক সে ব্যক্তি জানায় সে আর রবিন মিলে যদি একসাথে কাজ করে তবে তার দুই দেশের মধ্যকার এ যুদ্ধ থামাতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।।

তারা দুজনে মিলে দুর্নীতিবাজ শেরিফ ও তার দোসরদের সম্পদ লুটপাট করতে থাকে এবং তা গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতে থাকে। নটিংহ্যামের শেরউড জংগলে তারা এসব গেরিলা হামলা চালাতে থাকে। অচিরেই লোকেমুখে ‘রবিন হুড’ হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে যায়। একদিকে শেরিফ তার গোটা বাহিনী নিয়ে রবিনের পেছনে লাগে তাকে পাকড়াও করার জন্য, অপরদিকে রবিন হুডের দল ধীরে ধীরে ভারী হতে থাকে যাদের নিয়ে সে শেরিফকে শায়েস্তা করার স্বপ্ন দেখতে থাকে।

নির্মাণ, অভিনয় এবং দর্শক প্রতিক্রিয়া

রবিন হুড মুভিটি পরিচালনা করেছেন পরিচালক অটো ব্যাটহার্স্ট এবং চিত্রনাট্যের দায়িত্বে ছিলেন বেন চ্যান্ডলার এবং ডেভিড জেমস কেলি। মুভিটির পরিচালনা অত্যন্ত সাদামাটা গোছের ছিল এবং সে সাথে মুভিটির চিত্রনাট্যও। না মুভিটির নির্মাণে আহামরি ধরণের উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ ছিল না গল্পে আলাদাভাবে তুলে ধরার মত কিছু।

রবিন ও জনরূপে ট্যারন এগারটন ও জেইমি ফক্স; Source: pinterest.com

মুভিটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুভিটি অত্যন্ত সাধারণ মানের মনে হয়েছে এবং দর্শকদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে এমন কোনো উপাদান চোখে পড়ে নি। তারা রবিন হুডের যে গতানুগতিক গল্প রয়েছে তার মাঝে চমক সৃষ্টি করার জন্য কিছু পরিবর্তন আনলেও সেগুলোর উপস্থাপন ভালো না হওয়ায় উল্টো বরং ব্যাপারগুলো বিরক্তিকরই লেগেছে।

মুভির আ্যকশন দৃশ্যগুলোও ছিল খুব গতানুগতিক ধারার। এরকম আ্যাকশন বর্তমানকালের প্রায় সকল মধ্যযুগীয় মুভিগুলোতেই দেখা যায়। এছাড়া হাস্যরসের দৃশ্যগুলোও বেশ জোরপূর্বক করা মনে হয়েছে।

নটিংহ্যামের শেরিফ ও তার বাহিনী; Source: nytimes.com

মুভিটির মূল চরিত্র রবিন হুড হিসেবে ছিলেন কিংসম্যান মুভি খ্যাত ব্রিটিশ অভিনেতা ট্যারন এগারটন। রবিন হুডের সাথী লিটন জন চরিত্রে ছিলেন হলিউড তারকা জেইমি ফক্স। এছাড়া মুভির মুখ্য চরিত্রগুলোতে আরো ছিলেন বেন মেন্ডেলসন, ইভ হিউসন, জেইমি ডোর্নানের মত অভিনেতারা।

মুভিটির একটি দৃশ্যে রবিন ও ম্যারিয়ান; Source: pinterest.com

মুভির অন্যান্য দিকের মত অভিনয়েও ছিল বেশ দুর্বলতা। এগারটন রবিন হুড রূপে নজরকাড়া কোনো অভিনয় দেখাতে পারেন নি। এছাড়া আরব যোদ্ধার চরিত্রে জেইমি ফক্সের মত নামীদামি অভিনেতাও ছিলেন বড্ড বেমানান।

দর্শক সমালোচকরা এ মুভিটির উপর খুব একটা সদয় হননি। অনেকে মুভিটিকে গাই রিচির ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া কিং আর্থার (King Arthur : Legend of the Sword) মুভিটির সাথে তুলনা করেছেন। উভয় মুভিই পুরান ফর্মুলা নিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টায় থাকলেও উভয়েও বক্স অফিসে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। ১০০ মিলিয়ন ডলারে নির্মিত এ মুভিটি বক্স অফিসে আয় করেছে মাত্র ৮৫ মিলিয়ন ডলার।

যে কারণে এ মুভিটি দেখতে পারেন

আপনি যদি মধ্যযুগীয় ফ্যান্টাসি ধারার মুভির ভক্ত হয়ে থাকেন তবে এ মুভিটি দেখতে পারেন সময় কাটানোর জন্য। অথবা যদি ছোটবেলায় টেলিভিশনে দেখা রবিন হুড সিরিজটির কথা মনে করে স্মৃতিকাতর হতে চান তাহলে দেখার চেষ্টা করতে পারেন। তবে এ মুভিটি থেকে যদি বেশি কিছু আশা করে থাকেন তাহলে হতাশ হবেন।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment