ষাটের দশকের গোড়ার দিকের কথা। পশ্চিমবঙ্গ তখন নানা কারণে বিতর্কিত। কংগ্রেসের ভগ্নদশা, কম্যুনিজমের বপ্য বীজের মাথাচাড়া দেয়া, নকশালপন্থীদের সশস্ত্র উত্থানের সুযোগে হিংসা, ত্রাস, বোমাবাজি, খুন এবং রক্তপাতের প্রসঙ্গ ছাড়া খবরের কাগজে আর কিছু ঠায় পায় না। এসব কারণে কলকাতাবাসী ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল। বেঁচে থাকাটাই যেন তখন দুর্বোধ্য একটি ব্যাপার।

সেই উত্তাল সময়ে আরেক অপ্রত্যাশিত চড়াইয়ের মুখে পড়লেন মননশীল সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত তার বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘রাত ভরে বৃষ্টি’র বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ আনেন ‘আমহার্স্ট স্ট্রিটের ত্রাস’ খ্যাত নীলাদ্রি গুহ নামের এক গুণ্ডামার্কা লোক। এদিকে ল’ কলেজের জৈনক ছাত্র অশ্লীলতার দায়ে মামলাই দায়ের করে বসলেন। অভিযোগের তীর ছোঁড়া হলো স্বয়ং লেখক, প্রকাশক ও কলাকুশলীদের লক্ষ করে। তারাও ছাড়বার পাত্র নন। প্রতিহিংসার বিপক্ষে লড়ে গেলেন নিজেদের সৃজনশীলতা দিয়ে। কিন্তু এই সমাজ বড্ড একরোখা, এই রাষ্ট্র যুক্তিবাদীতার তলায় লুকিয়ে রেখেছে একগুঁয়েমিকে, যা আমাদের কারো নজরে পড়ে না। তাই নিম্ন আদালত সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ হতে পারে ভেবে এই বইটিকে নিষিদ্ধ করে দিলো।

ব্যস, ল্যাঠা চুকে গেছে বলে- সুশীল সমাজ হাতপা ঝেড়ে ঘরে উঠে পড়ল। দুই বছর ধরে চলল সেই মামলার প্রহসন। অবশেষে স্বদেশে-বিদেশে সমান সমাদৃত, সাহিত্য আকাদেমি পুরষ্কার প্রাপ্ত প্রবীণ অধ্যাপক বুদ্ধদেব বসু উচ্চ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ালে তবে বিচারক প্রসন্ন হন। নিম্ন আদালতের রায়টি তিনি বাতিল করে নতুন রায় দেন। ততদিনে বইটির পাইরেটেড কপি বেড়িয়ে গেছে। অতএব সারা পড়ে গেল বাঙালি পাঠক সমাজে। সবাই হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল একটি বই। তার নাম ‘রাত ভরে বৃষ্টি’। ফলতঃ হু-হু করে বইটির বিক্রি বেড়ে গেল, এমনকি কলকাতার রাস্তার যত্রতত্র সেই পাইরেটেড কপিতে সয়লাব হয়ে গেছে।

কাহিনী সংক্ষেপ

ছোট্ট সাজানো গোছানো একটা ফ্ল্যাট। ওরা মোটে তিনজন। নয়নাংশু, মালতী, আর ছোট্ট বুবাই। তারা খুব অল্পদিন হলো বেলেঘাটার যৌথ পরিবার ছেড়ে এখানে এসে উঠেছে। এ যেন একটা আলাদা জগত। আর এই জগতের কেন্দ্রবিন্দু হলো সাহিত্যের শিক্ষক নয়নাংশু। যে কিনা পরে বিজ্ঞাপন অফিসের ঝকঝকে কর্মকর্তার পদটি পেয়েছে। যার মনোজগত তৈরি হয়েছে রবীন্দ্রনাথ, তুর্গেনিভ, চেখভের লেখা পড়ে। কিশোর বয়সে যৌন প্রলভনের চেয়ে বেশি টেনেছে মণীন্দ্রলাল বা সত্যেন্দ্রনাথ। সুধীর দত্তের কবিতার আলোচনা যার কাছে নারীসঙ্গের চেয়েও প্রিয়।

মালতী, লোকে সাধারণ মেয়ে বলতে যা বোঝে, তারচে এগিয়ে। নয়নাংশু মালতীকে নিজের মতো করে গড়ে নিতে চেয়েছিল। আধুনিক সমাজে নারী যেইভাবে নিজেদের মেলে ধরেছে, সেইভাবে মালতী তার সামনে এসে দাঁড়াক। যদিও বিয়ের পর পর সেই স্বাধীন মানুষটি হতে চায়নি সে। কিন্তু ধীতে ধীরে মালতী এক আলাদা স্বত্ত্বাই হয়ে উঠল, যা নয়নাংশু এতোদিন চেয়েছে। অথচ তাকে রাখার জায়গা ছিল নয়নাংশুর মধ্যে? নইলে সেই স্বাধীন স্বত্ত্বাটা তার চেয়ে কম শিক্ষিত, কম বিদগ্ধ, মাসিক পত্রিকার ‘গায়ে-গতরে খাটা’ সম্পাদক জয়ন্তর কাছে কেন নির্ভার করে দিল মালতী? যার ঘটক প্রকৃতপক্ষে নয়নাংশু নিজে। সে-ই জয়ন্তকে একদিন জয়ন্তকে বাড়িতে এনেছিল। তাই বুঝি স্ত্রীকে সে বাঁধা দিতে পারে না?

সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু; source : Kolkata24x7

চারিত্রিক বিশ্লেষণ

বুদ্ধদেব বসুকে যারা পড়েছেন, তারা জানেন যে- তার সৃষ্ট প্রতিটি চরিত্রের গভীরতা খুব বেশি। চরিত্রায়নের মাধ্যমেই তিনি গল্প বলতে পচ্ছন্দ করেন। তাতে করে অনেকগুলো টুকরো টুকরো ঘটনা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ‘রাত ভরে বৃষ্টি’র গল্পটা একটু ভিন্ন ধাঁচের। মালতী, নয়নাংশু- দুজনের সপক্ষেই ঘটনা সমানতালে ডালপালা মেলেছে। দুজনের আত্মধর্মই এমন শক্তিশালী যে, তাদের কাউকে কারোর থেকে এগিয়ে রাখা যায় না। নয়নাংশু শিক্ষিত মানুষ, এই সত্ত্বেও তার মালতীর কাছে নিজেকে সঁপে দেয়ার মধ্যে প্রাঞ্জলতাই প্রকাশ পেয়েছে। আবার জয়ন্তর সঙ্গে মালতীর বেশ একটা সখ্যতা গড়ে ওঠার ফলে তার উদ্বিগ্নতার ধীরস্থির বহিঃপ্রকাশও নয়নাংশুকে স্বতন্ত্র করে তোলে। নিজের জীবনের ট্রাজেডি একজন সংবেদনশীল মানুষের চোখ দিয়েই দেখতে হয়েছে তাকে।

মালতীর বেলায় আমরা দেখি যে, একটা ছোটখাটো পরিবর্তনের মাধ্যমে সে বেলেঘাটার শশুড়বাড়ি ছেড়ে আভিজাত পাড়ার ফ্ল্যাটে উঠে আসে। সেখানে নয়নাংশুর নানা বন্ধুদের যাতায়াত। স্বামীর জোরাজুরিতে মালতী সেইসব আড্ডায় সামিল হয়েছে। নিজেকে সেই হিসেবেই প্রস্তুত করেছে, যা নয়নাংশু চায়। তার প্রেক্ষিতে নিজের ভেতরে সে অন্য এক স্বত্বার খোঁজ পেয়েছে, যা এতোদিন নয়নাংশুর ভালোবাসা সম্পর্কে বিতর্কিত সব ভাবনার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল। এই চলিত বিবর্তনের গল্পেই মূলত মালতী পাঠকের সামনে স্পষ্ট অবয়ব আকারে প্রতীয়মান হয়েছে। পরবর্তীকালে জয়ন্তের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলার পরও সাবলীলভাবে নিজেকে পরিচালনার কৈফিয়ত হিসেবে মালতীর বক্তব্য যেভাবে পাঠককে স্পর্শ করে, ততটা সমবেদনা নয়নাংশুর বেলায় নিগৃহীত হয় না।

রাত ভরে বৃষ্টি’র আসল প্রচ্ছদ; source : Amazon.in

আবার জয়ন্ত। তাকে আমরা এই বইয়ের সপক্ষে না পেলেও নয়নাংশু ও মালতীর ভাষ্যে তার একটা আদল আমাদের সামনে প্রতীয়মান হয়। এবং এই যে হয়, তাতে কিন্তু মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ দেখানো হয়েছে। জয়ন্ত সম্পর্কে নয়নাংশুর ক্ষুব্ধ মনোভাব, আবার মালতীর কাছে সে এক সৌম্যদীপ্ত পুরুষ। যে তাকে বেঁচে থাকার আনন্দটুকু অনুভব করতে শিখিয়েছে। তাইতো খুব কর্মঠ, দৃঢ়চেতা, অথচ কোমল হৃদয়ের জয়ন্তকে মালতীর পাশে কখনোই বেখাপ্পা লাগেনি।

পাঠপ্রতিক্রিয়া

‘রাত ভরে বৃষ্টি’ উপন্যাসটি পড়ে শেষ করার পর প্রথমেই মনে হয়েছে- এখানে অশ্লীলতার তেমন কিছুই ঘটেনি। শুধু বুদ্ধদেব বসুর ব্যাতিক্রমী উপস্থাপনের জন্যে নয়, বরং চরিত্রিক দূর্বলতা, নিজস্ব স্বীকারোক্তি এমন অকপট যে, জয়ন্ত-মালতীর এই সম্ভাব্য রসায়নকে কোনভাবেই অপবিত্র ভাবা যায় না। বিশেষ করে মালতীর দিক থেকে।

শিক্ষিত রুচিশীল নয়ংনাংশুকে সে ভালোবাসতো কিনা, সে সম্পর্কে বিস্তর তর্ক আছে। মালতীর মতে, নয়নাংশুও তাকে ভালোবাসে না। সে তার স্ত্রীকে আট দশজনের মতো করেই ভালোবাসে- এই ধারণাকে আঁকড়ে ধরে আছে। এই ধারণাকে সে অত্যান্ত ভালোবাসে। নইলে নয়নাংশুর বন্ধু মহলে মালতীর বেশ সুনাম হবার পর তা ওর আত্মমর্যাদায় আঘাত হানতো না। বরং তা আত্ম অহমিকারই কারণ হতো।

সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু; source : independence-bd.blogspot

নয়নাংশু কেবল চাইতো, তার স্ত্রী শিক্ষা-দীক্ষায়, পদমর্যাদায় তার সাথেই সমান তালে চলুক। কিন্তু তা হবার মুহূর্তে আসন্ন বিড়ম্বনাকে গ্রাহ্য করলো বলেই তো মালতী সংসারে উপস্থিত থেকেও একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে গেল। এই যে খুব নিভৃতে মালতী বদলে গেল, তারই খোঁজটুকু পেয়েছিল জয়ন্ত। সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক, যে কিনা রোদ-বৃষ্টিতে ঘুরে ঘুরে নিজেই কাগজের জন্য বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে। তার ভেতর মালতী পেয়েছে ভরসার জায়গা। সারাদিন গতর খেটে এসেও মালতীর কথা, অভিযোগ, অনুযোগ, আবদার শোনার সময়টুকু সে ঠিক বের করে নেয়।

কিন্তু নয়নাংশু, সে কেন ঘরের লোক হয়েও সে সময়টুকু পেল না? কেন মালতী যা, তাই নিয়ে সন্তষ্ট থাকতে পারলো না? অথচ মালতী আদতে যা, তাকেই সবচে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে জয়ন্ত। জয়ন্ত তার ছোটবেলাকার স্মৃতি রোমন্থন করতে শিখিয়েছে। এখন বাবা-মা, ভাই-বোনদেরকে সে আলাদা করে স্পর্শ করতে পারে। শিক্ষিত নয়নাংশু তার ঐতিহ্যগত সংস্কারের মাধ্যমে মালতীকে এইসব অনুভূতির সামনে দাঁড় করাতে পারেনি। সুতরাং এ ভাঙন অবধারিত। মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়।

যদিও এই গল্পটার শেষাংশটুকু সকলের বুঝতে একটু সময় লাগবে। চরিত্রগুলো তখন নিজের সাথে কথা বলবে। এ যেন নিজের সাথেই নিজের দ্বন্দযুদ্ধ। তবুও সবকিছু মিলিয়ে গল্পের এই ত্রিকোণমিতিক ভাবগম্ভীর্য এতটাই প্রকট যে, শেষ করার পর একটা ঘোরের মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকবে পাঠক। শেষ কয়েক পৃষ্ঠার পথ তার কাছে অবারিতই হবে আশা করি।

সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর বইয়ের একটি ফ্ল্যাপ; source : 10 Minute School

ব্যক্তিগত রেটিং

বুদ্ধদেব বসুকে যারা পড়েছেন, তারা জানেন যে, তার যেকোন বইয়ের ক্ষেত্রে রেটিং দেয়া কতটা কঠিন। তিনি এমনই মননশীলতার অধিকারী যে, একেক পাঠকের কাছে গভীরতা ভেদে তিনি একেক জায়গায় পৌঁছতে পারেন। আমি ব্যাক্তিগতভাবে একটু মনস্তাত্ত্বিক ঘরানার বই বেশি পচ্ছন্দ করি বলে ‘রাত ভরে বৃষ্টি’কে ১০/১০ দিতে একটুও কার্পণ্য করবো না।

একনজরে রাত ভরে বৃষ্টি

বই: রাত ভরে বৃষ্টি
জনরা: মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস
লেখক: বুদ্ধদেব বসু
প্রকাশকাল: এপ্রিল, ১৯৬৭(কলকাতা)

Feature Image Source : Facebook

Related Article

0 Comments

Leave a Comment