রাজকাহিনী চলচ্চিত্রটিতে দেখানো হয়েছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রেক্ষাপট, উঠে এসেছে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার গল্প। একইসাথে দেখানো হয়েছে সমাজ থেকে কিছুটা দূরে পতিতাদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে পুরো ভারতবর্ষ তখন উত্তাল। কয়েকজন বিদেশি তখন গোলটেবিলে পেন্সিল হাতে নিয়ে ভারতবর্ষের মানচিত্র কাটাছেঁড়া করছেন। কারো ঘর পড়লো পাকিস্তানে আর উঠান পড়লো ভারতে। বন্ধুরা হয়ে গেলো বিদেশী। চেনা কলকাতা তখন অন্য দেশের শহর, ফরিদপুর তখন এপারে থেকে গেলো।

দিল্লির ভাইসরয় হাউজে যখন ভারতবর্ষ কাটাছেঁড়া চলছে তখন মুর্শিদাবাদ-নোয়াখালিতে চলছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। হিন্দুরা মুসলিম মারছে আর মুসলিমরা হিন্দুদের। মেয়েরা হচ্ছে গণ ধর্ষণের শিকার। কেউ কেউ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আত্মহত্যা করছে, কারো কারো পরিবার মেনে নিচ্ছে না তাদের। এদের মাঝে একজন ধর্ষিতার জায়গা হয় বেগমজানের পতিতালয়ে যার নাম দেয়া হয় শবনম। চারদিকে যখন সাম্প্রদায়িকতার আগুনে জ্বলছে পুরোদেশ তখন একমাত্র বেগমজানের এই পতিতালয়েই যেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার আঁতুড়ঘর যেখানে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই যাতায়াত পাওয়া যায়।

রাজকাহিনী পোস্টার; source: antorjatikbangali.files.wordpress.com

দেশ ভাগের সময় র‍্যাডক্লিফের সীমানা যায় সেই পতিতালয়ের উপর দিয়ে আর তাতেই এগিয়ে যায় সিমেনার গল্প। পতিতালয় সমাজ থেকে কিছুটা দূরে, লোকচক্ষুর আড়ালে এবং লোকালয়ে পতিতালকে সবাই ঘৃণা করে। আর দিনশেষে রাতের আঁধারে এই পতিতালয়েই আনাগোনা বাড়ে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের। যেখানে নিচু বর্ণের মানুষ থেকে শুরু করে স্কুলের মাস্টার, এমনকি রংপুরের নবাবকেও দেখা যায় পতিতাদের আলয়ে।

কাহিনী সংক্ষেপ

এই চলচ্চিত্রের প্রথমেই দেখানো হয় ধর্ষণের বিপর্যস্ততার একটি নির্মম রূপ যেখানে এক ধর্ষিতা নারী হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকে। ডাক্তার তার সহকারীকে জানালা খুলতে বললে মেয়েটি “খোলো” শব্দটি শুনে তার বাবার সামনে নিজের পায়জামা খুলতে শুরু করে। এই মেয়েকে তার পরিবার গ্রহণ করে না। পরবর্তীতে দেখা যায়, বেগমজান নাম্নী এক বিধবার নেতৃতে চলা একটি পতিতালয়কে। এই দালানেই আনাগোনা দেখা যায় সমাজ সেবক নামী মুখোশধারী মানুষদের। বেগমজানের পতিতালয়ে দেশ স্বাধীন কোনো আহামরি কিছু না কারণ বন্ধের দিন খদ্দের পাওয়া দায় অথচ বেগমজানের কাল হয়ে আসে তার দালানটি। কারণ সেটি পড়েছে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের মাঝামাঝি জায়গায় যেখানে কাঁটাতারের ব্যবচ্ছেদে আলাদা হয়ে যাবে দুটো দেশ।

লড়াইয়ের প্রস্তুতি; source: assets.mubi.com

এই কাঁটাতারের দেয়ালে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় বেগমজানের পতিতালয়, বেগমজান ও তার অধীনস্তরা। ভারত পাকিস্তান উভয় দেশের প্রতিনিধিরা বেগমজানকে ১ মাস সময় বেঁধে দেন এই বাড়িটি ছাড়ার জন্য কিন্তু তাতে তারা অস্বীকৃতি জানান। কেননা যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়েছে দুটো দেশ অথচ পতিতাদের ধর্ম নেই, সমাজ নেই। বরং সমাজ তাদের অস্বীকার করে। তাহলে তারা কেন ভাগ হবে। পরবর্তীতে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন কাঁটাতারের প্রতিনিধিরা।

গল্পের এক পর্যায়ে দেখানো হয়, পতিতাদের শুধু শরীর নয় বরং একটি মনও আছে। ওপাশে নবারেরা কথা দেয় বাড়ি ছাড়তে হবে না। আশায় বুক বাঁধে রুবিনা, লতা, গোলাপ ও বেগমজানেরা। হলদিবাড়ি আর দেবীগঞ্জের মাঝের বাড়িটা বেগমজানের। পুলিশ-প্রশাসন অথবা হিন্দুস্তান-পাকিস্তানের প্রতিনিধি যখন কাগজপত্রের মাধ্যমে পতিতালয় উচ্ছেদ করতে পারে না তখন তারা আশ্রয় নেয় কবির নামক এক গুন্ডার। কবির কুকুরের মাংস খাওয়ানো আর সুজনকে খুন করার মাধ্যমে বার্তা পাঠায় ঘর ছাড়ার। ওদিকে বিয়ে করার নামে মাস্টার যখন এক পতিতার সাথে প্রতারণার সময় বলে ‘বেশ্যাদের বর হয় না, বাবু হয়’।

তখন সমাজের দৃষ্টিতে পতিতাদের ভাবনা প্রকাশ পায়। রুবিনা চরিত্রে অভিনয় করা বাংলাদেশের অভিনেত্রী জয়া আহসান পতিলালয়ের কর্মী সুজনের হাত তার বুকে নিয়ে বলেছিল, এটা কী? এটা ছাতি, মাংসপিন্ড যা দিয়ে মা তার সন্তানকে দুধ খাওয়ায় আর যৌনাঙ্গে হাত নিয়ে বলেছিল, আর এটা কী জানিস? এটা হলো যোনি। আমাদের কপাল, নাক, কান ও গলার মতোই দেহের একটা অংশ। চামড়া, শুধু চামড়া। নানান রঙ্গের চামড়া। অর্থাৎ ভালোবাসা চামড়া দিয়ে মাপা যায় না। নারীরাও পুরুষের মতোই। এর মাধ্যমে পরিচালক সমাজের কাছে একটি গভীর বার্তা প্রদান করেন।


কংগ্রেসের ও মুসলিম লিগের প্রতিনিধি চরিত্রে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় (বামে) এবং কৌশিক সেন (ডানে); source: indianexpress.com

আক্রমণ আসতে পারে এই ভেবে পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে বন্দুক চালানোর প্রশিক্ষণ নেয় বেগমজান ও তার বাড়ির সকলে। কীভাবে সামলাবে তারা এই আক্রমণ? আদৌ কি বেগমজান এবং তার অধীনস্তরা সেই বাড়িটি ফিরে পাবে? জানতে হলে দেখতে হবে পুরো মুভিটি।

পরিচালনা ও চিত্রনাট্য

রাজকাহিনী চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন বিখ্যাত পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়। সৃজিত মুখোপাধ্যায় ২০১০ সালে অটোগ্রাফ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন। পরবর্তীতে হেমলক সোসাইটি, জাতিস্মর, চতুষ্কোণের মতো দর্শকপ্রিয় সফল চলচ্চিত্র উপহার দেন তিনি ।

পরিচালক সৃজিত; source:.cinestaan.com

অভিনয়

রাজকাহিনী চলচ্চিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা অর্জন করেন বাংলাদেশের জয়া আহসান। এছাড়াও প্রিয়াঙ্কা সরকার, সোহিনী সরকার সহ অনেকেই অভিনয় করেন। মূখ্য চরিত্র অর্থাৎ বেগমজান চরিত্রে অভিনয় করেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। একইসাথে খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা অর্জন করেন আবির চট্টোপাধ্যায়।

অভিনয়ে; source: indianexpress.com

বক্স অফিস ও রেটিং

২০১৫ সালের অক্টোবরে মুক্তি পায় রাজকাহিনী চলচ্চিত্রটি। ৩৫ মিলিয়ন বাজেটের চলচ্চিত্রটি বক্স অফিসে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এছাড়া ভারতের বাইরেও সুনাম অর্জন করে। আইএমডিবিতে এই চলচ্চিত্রের রেটিং ৭.৩/১০। পরবর্তীতে ভারতে হিন্দি ভাষার সংস্করণে চলচ্চিত্রটি পুনরায় মুক্তি পায় “বেগমজান” নামে। যেখানে কেন্দ্রিয় চরিত্রে অভিনয় করেন বিদ্যা বালান। এবং হিন্দি সংস্করণেও চলচ্চিত্রটি ব্যবসা সফল হয়।

Related Article

1 Comment

Mahofuz February 24, 2019 at 2:42 pm

একটি গল্প বলে শুরু করছি।
নির্জন বনের মধ্য দিয়ে পথ চলছিলো একপথিক।পথিমধ্যে সঙ্গী জুটে গেল এক সিংহ। দু জনের এক সাথে পথ চলা ও টুকটাক কথা হচ্ছে। কথার বিষয় কে বেশি শক্তিশালী মানুষ না সিংহ। পথিকের দাবী মানুষ বেশি শক্তিশালী। সিংহের দাবী শক্তির বিচারে সিংহ মানুষের চাইতে এগিয়ে। দু জনেই নাছোড়বান্দা। কেউই অন্যের কথা মানতে রাজী নয়। ইতিমধ্যে পথ চলতে চলতে তারা শহরের কাছে চলে এলো। শহরের প্রবেশ মুখে বিশাল এক মূর্তি স্থাপিত আছে যেখানে দেখানো হয়েছে একটি মৃত সিংহের মাথার উপর পা রেখে দাঁড়িয়ে আছে এক বীর পুরুষ।পথিক এই মূর্তির দিকে সিংহের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। মুখে বলল “এবার বুঝলেতো কে বেশি শক্তিশালী “
সিংহ মুচকি হেসে বলল “সিংহের যদি মূর্তি তৈরি করার ক্ষমতা থাকতো তবে তুমি এমন মূর্তি দেখতে পেতে যেখানে মানুষকে মাটিতে ফেলে তার বুক খুবলে খাচ্ছে সিংহ”
গল্পটি ইশপের গল্পগুচ্ছের একটি গল্প। বেশ কয়েক বছর আগে পরেছিলাম। এই গল্পের মর্মার্থ হচ্ছে “প্রচার যন্ত্র তার হাতে থাকে সে তার বিশালত্ব ও মহানুভাবতা!!! প্রচার করার জন্যই তা ব্যবহার করে”
কথা বলছিলাম কলকাতার ছবি “রাজকাহিনী” নিয়ে। অন লাইনে ছবিটির ভূয়সী প্রশংসা দেখে কিছু না লিখে পারছি না।
সৃজিত মুখারজি রচিত ও পরিচালিত ছবি “রাজকাহিনী”। সাড়ে তিন কোটি রুপিতে নির্মিত এই ছবির বক্স অফিসের সংগ্রহ সাত কোটি রুপি। ছবিটির হিন্দি ভার্সন তৈরি হয়েছে। নাম “বেগমজান”

ছবিটিতে পরিচালক একটি কাজ খুব দক্ষতার সাথে করেছেন যা ইতিপূর্বে কোন ভারতীয় পরিচালক এতটা দক্ষতার সাথে করতে পারেন নি। সেটি হচ্ছে মুসলমানদের চরিত্রহরন। ইতিহাস বিকৃত করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুসলমানদের উপর চাপানো হয়েছে। অগ্নিসংযোগ , খুন, নারীসম্ভোগ সংবলিত দৃশ্যগুলো কিছু লোকদের দিয়ে করানো হয়েছে যাদের মাথায় দেয়া হয়েছে টুপি, চোখে সুরমা, গালে দাড়ি। এই চিহ্ন গুলো একজন ধার্মিক মুসলমানের রূপ প্রকাশ করে। ছবিটিতে ইচ্ছে করেই একটি ধর্ম বিশ্বাসের লোকদের সন্ত্রাসবাদী ,অসহিস্নু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রকৃত ইতিহাস আজ আর অজানা নয়। কলকাতা ,বিহার ও উত্তর প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যা লঘু হওয়ায় তারা নির্মম হত্যার শিকার হয়েছিল। কলকাতায় মুসলমানরা প্রায় ২৭% ছিল তাই মুসলমানদের হামলায় বেশ কিছু হিন্দু জনতাও নিহত হয়েছিল। অন্যদিকে বিহারে মুসলমানরা সংখ্যায় ছিল ৫% তাই তারা নির্বিচারে কচুকাটা হয়েছিল। উত্তর প্রদেশেও মুসলমানরা নিহত হয়েছিল অনেক বেশি। আজকে বাংলাদেশে যে বিহারীরা তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার হয়ে এদেশে এসেছিলো। বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলাতেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে।এর শিকার হয়ে অনেক হিন্দু ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
১৯৪৬ সালে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিরীহ মুসলমান ও হিন্দু জনতার হত্যাকাণ্ড অবশ্যই মর্মান্তিক। নিরীহ জনতার হত্যাকাণ্ড সে মুসলমান হোক বা হিন্দু হোক তা ইসলাম সমর্থিত নয়।
সৃজিত মুখারজি রচিত ও পরিচালিত “রাজকাহিনী” ছবিতে যেভাবে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটেছে তার সাথে আমাদের দেশের লুফুযযামান বাবর রচিত “জজ মিয়া কাহিনী”র তুলনা চলে । সেই হিসেবে “রাজকাহিনী” আমার কাছে “জজ মিয়া কাহিনী”

Leave a Comment