বাঙ্গালী জাতি জিনগতভাবে গল্প শোনা জাতি, পুঁথি পালা এদেশের পার্বণের ইতিহাসে ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর পুরাতন সেসব পুঁথির দিকে খেয়াল করলে দেখা যায়, প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশ এতো বিশদভাবে বর্ণনা করা হয় যে আমাদের গল্প শোনার অভ্যাসটাই দাড়িয়ে গেছে তেমন, দীর্ঘ সময় ধরে।

তাই হলিউড যখন তাদের সিনেমায় গল্পের জমাট কিছুটা কমিয়ে মনোযোগ দিচ্ছে চোখ ধাঁধানো ভিএফএক্স, গ্রাফিকস, ইফেক্টের দিকে, জাঁকজমকপূর্ণ এসব আয়োজন কিছুটা ড্রাগের মতো, হলে মানুষকে টানছে, দেখছে মানুষ, কিন্তু মনে দাগ কাটছে না।

বিখ্যাত নির্মাতা এবং চলচিত্র সমালোচক পল শ্যাডার তো কিছুদিন আগে ভ্যারাইটি ম্যাগাজিনে তার কলামে লিখেছেনই, সত্যিকারের গল্প আপনি এখন আর হলিউড মুভিতে খুঁজে পাবেন না, গল্প খুঁজতে হবে আমেরিকান টিভিতে। মার্টিন স্কলস, বেনফ্লিকসহ অন্যান্য বিখ্যাত সিনেমা ব্যক্তিত্বরাও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলার চেষ্টা করছেন।

আর যেসব নির্মাতা জাঁকজমকপূর্ণ ইফেক্টের জোয়ারে না ভেসে নিজেদের গল্পটাই বলতে চান, তারা ঝুঁকছেন টিভি অথবা অনলাইন স্ট্রিমিং সাইটগুলোতে। নেটফ্লিক্স, আমাজনের মতো স্ট্রিমিং সাইটগুলোও এই সৃষ্টিশীল নির্মাতাদের সুযোগ করে দিচ্ছে দুই, চার, ছয় পর্বের মিনি সিরিজ অথবা ইনডিভিজুয়াল চলচিত্র তৈরীর স্বাধীনতা দিয়ে।

আর আমাদের যে তরুণ প্রজন্ম, যাদের রক্তের শিরা ধমনীতে পুথিপালায় অভ্যস্ত পূর্বপুরুষদের রক্ত বইছে, তারা সিনেমার চেয়ে বেশি আকর্ষিত হচ্ছে এসব চমৎকার গল্পের টিভি সিরিজে।

আজকের আর্টিকেলটি সাজানো হয়েছে সেরা কয়েকটি টিভি সিরিজের শর্ট রিভিউসহ তালিকা দিয়ে,

দ্য এক্স-ফাইলস (The X-files)

দুজন এফবিআই এজেন্ট, যাদের একজন পুরোপুরি বিশ্বাসী মানুষ, অন্যজনকে বলা যায় সন্দেহবাদী, অবিশ্বাসী, নাস্তিক। আর দুজনের পুরোপুরি বিপরীত স্বভাবই এদের করে তোলে প্যারানরমাল বিভিন্ন বিষয়ে গোয়েন্দাগিরিতে চমৎকার এক জুটি।

দ্য এক্স-ফাইলস ; Image Source: wallpaperdsc.net

বিটিভির কল্যাণে নব্বইয়ের দশকের ছেলেমেয়েদের জন্য এক্স ফাইলসের এই দুই তারকা একরকম আইডলের মতো, সেসময়ের মানুষ হয়ে থাকলে সিরিজটি পুনরায় দেখে ফেলে আসা ছেলেবেলায় নস্টালজিক হতে পারেন আপনিও।

আইএমডিবি রেটিং – ৮.৯/১০

টিভি.কম – ৯/১০

ফ্রেন্ডস (Friends)

ফ্রেন্ডসকে বলা হয় গত শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি শো। সিটকম জেনরের টিভি সিরিজটি আমেরিকান তরুণ প্রজন্মের আড্ডায় যেসব প্রাকটিকাল জোকস এখন পর্যন্ত উঠে আসে, তার অনেকাংশের শুরুই ফ্রেন্ডস টিভি সিরিজ থেকে।

ফ্রেন্ডস ; Image Source: getwallpapers.com

ছয়জন বন্ধু, যারা আড্ডা দেয় কফিশপে, কখনো নিজেদের এপার্টমেন্টে, আর সেখানেই প্রায় প্রতিটি মিনিটে এমন সব পান্চলাইন উঠে আসে যে, কমেডির নতুন এক ধারাই তৈরী হয় ফ্রেন্ডসের মাধ্যমে।

আইএমডিবি রেটিং – ৮.৯

টিভি.কম – ৯.২

শার্লক (Sherlock)

স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের বিখ্যাত সৃষ্টি শার্লক হোমস, খুব কম মানুষই আছে যাদের ছেলেবেলার আইডলের তালিকায় শার্লক হোমস নেই, আপনি আমি সবাই ছেলেবেলায় কখনো না কখনো শার্লক হোমস হতে চেয়েছি চমৎকার সব গোয়েন্দা গল্প পড়তে পড়তে। এমনকি আমাদের প্রিয় আরো অনেক গোয়েন্দা চরিত্রকেও কখনো কখনো শার্লক হোমসের অনুসরণ করতে দেখেছি বিভিন্ন গল্পে, লেখায়।

শার্লক ; Image Source: moviedeskback.com

শার্লক হোমসের কয়েকটি বিখ্যাত গল্প যার পটভূমি প্রেক্ষাপট সময়কালকে কিছুটা পরিবর্তন করে টিভি পর্দায় নিয়ে আসা হয়েছিল। প্রথম সিজন থেকেই সিরিজটি এতো বেশি জনপ্রিয় হয় যে, আমেরিকান টিভি সিরিজের ইতিহাসই পাল্টে যায় শার্লকের মাধ্যমে। যদিও চতুর্থ এবং শেষ সিজনে এসে শার্লকের যে হালকা ব্যক্তিত্ব পর্দায় দেখানো হচ্ছিল, তা ভীষণ সমালোচিত হয় এবং সিরিজের জনপ্রিয়তায়ও বেশ ভাটা পড়ে।

আইএমডিবি রেটিং – ৯.১/১০

টিভি.কম – ৮.৯/১০

প্রিজন ব্রেক (Prison Break)

বড়ভাই কারাগারে বন্দী, সে কারাগারও ভয়ংকরতম কারাগার, ভয়ংকর সব সন্ত্রাসীদের বন্দী রাখা হয়েছে, সেখানে যেমন আছে সিরিয়াল কিলার, রেপিস্ট, ঠান্ডা মাথার সাইকো কিলার। এমন সব সন্ত্রাসীদের আস্তানা যেখানে, সে কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যে নিচ্ছিদ্র হবে তা বলাই বাহুল্য।

প্রিজন ব্রেক ; Image Source: recipeapart.com

এই নিচ্ছিদ্র ব্যবস্থা থেকেই ভাইকে নিয়ে পালানোর অদ্ভুত জটিল এক পরিকল্পনা আঁটে ছোটভাই স্কর্ফিল্ড, আর্কিটেকচার এবং সায়েন্সের প্রায় সব ক্ষেত্রেই যার অসম্ভব প্রতিভা এবং দক্ষতা।

দারুণ সব ঘটনায় এগিয়ে চলা সিরিজটিকে প্রচুরসংখ্যক মানুষের পছন্দের তালিকায় সবার উপরে রাখতে দেখা যায়।

আইএমডিবি রেটিং – ৮.৩/১০

টিভি.কম – ৯/১০

ব্রেকিং ব্যাড (Breaking bad)

একজন অসম্ভব প্রতিভাবান রসায়নবিদ, যে হঠাৎ করেই জানতে পারে, ঘাতক ক্যান্সারের বদৌলতে পৃথিবীতে তার আয়ুকাল বাকি অতি অল্পদিন। মৃত্যুর পর তার পরিবার জলে ভেসে যাবে, এ দুঃশ্চিন্তাই তাকে তার শিক্ষকতার সৎ আদর্শ থেকে সরিয়ে দেয়, ঠেলে দেয় নিজের কেমিস্ট প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে ড্রাগস তৈরীর দিকে। অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে থাকে এরপর থেকে।

ব্রেকিং ব্যাড ; Image Source: hdwallpaper.nu

দর্শকপ্রিয় তো বটেই, সমালোচকদের কাছেও ব্রেকিং ব্যাড উচ্চ প্রশংসিত এক টিভি সিরিজ। সিরিজটি থেকে নির্মিত একটি মুভি সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে, এল কামিনো।

এছাড়া, সিরিজটির প্রিকুয়েলও টেলিকাস্ট হচ্ছে বর্তমানে, বেটার কল সওল নামে।

আইএমডিবি রেটিং – ৯.৫/১০

টিভি.কম – ৯/১০

গেম অফ থ্রোনস (Game of Thrones)

ইতিহাস বদলে দিয়ে টিভি সিরিজকে পৃথিবী জুড়ে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে গেম অফ থ্রোনস এক অসম্ভব উচ্চতায় বিরাজ করে। সিরিজটির প্রতিটি এপিসোড টেলিকাস্টের আগে পরে গুগোল, টুইটারের ট্রেন্ডের শীর্ষ স্থান অধিকার করে নেয় তা, এতো বেশিই জনপ্রিয় সিরিজটি। এমনকি ইউটিউব, ফেসবুকে গেম অফ থ্রোনসের এপিসোড এনালাইসিস, এক্সপ্লানেশন এবং প্রেডিকশন নিয়ে এতো বেশি কনটেন্ট পাওয়া যায়, এবং তাদের জনপ্রিয়তাও অবিশ্বাস্য পর্যায়ের।

গেম অফ থ্রোনস ; Image Source: wallpaperacces.com

পাশাপাশি সাত রাজ্যের মধ্যে এক মহাকাব্যিক যুদ্ধ আয়রণ থ্রোন দখলের, যা ক্ষমতার প্রতীক। এসবের সাথেই উঠে এসেছে ইতিহাস, পরিবার, পারিবারিক শত্রুতার বিভিন্ন গল্প।

সেক্স, ন্যুডিটি, পার্ভাসন, ওয়াইন, ভায়োলেন্স, ইনসেস্ট, ম্যাজিক, আইস জম্বি এবং ড্রাগন, সবকিছু মিলিয়ে ফ্যান্টাসির এক অন্য জগতে নিয়ে যাবে সিরিজটি, অথচ কখনোই মনে হবে না ফ্যান্টাসি, বরং অনেক বেশি রিয়েলস্টিক করেই সাজানো হয়েছে গল্প।

তবে গেম অফ থ্রোনসের জনপ্রিয়তার মূল কারণ সম্ভবত গল্প আনপ্রেডিক্টেবল হওয়া৷ প্রতি মুহূর্তে আপনি অনুমান করতে চাইবেন পরবর্তীতে কী হবে সে কৌতূহল মেটাতে, এবং প্রতিবারই আপনার অনুমানকে মিথ্যা প্রমাণ করে নতুন চমকের সৃষ্টি করেছেন কাহিনীকার।

আইএমডিবি রেটিং – ৯.৪/১০

টিভি.কম – ৯/১০

এছাড়াও পারসন অফ ইন্টারেস্ট, ব্ল্যাকলিস্ট, লস্ট, ব্লাইন্ডস্পট, ব্ল্যাক মিরর, ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড, স্ট্রেন্জার থিংস সহ আরো প্রচুর টিভি সিরিজ অতীতে এবং বর্তমানে প্রচুর জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। আমাদের দেশের দর্শকদের মাঝেও এ প্রবণতা দারুণভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷

Related Article

0 Comments

Leave a Comment