মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসগুলো কখনোই রূদ্ধশ্বাস গতিসম্পন্ন হয় না। পাঠকের মনস্তত্ব নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতেই এগিয়ে চলে কাহিনীর গতি। বি.এ. প্যারিস’র সাড়া জাগানো সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার “বিহাইন্ড ক্লোজড ডোরস” তেমনই একটি উপন্যাস। অনিশ্চিত বাঁক ও লোমহর্ষক কাহিনিবিন্যাসে মন্ত্রমুগ্ধ করার মতো মনস্তাত্ত্বিক রোমাঞ্চকর উপন্যাস এটি।

কাহিনী সংক্ষেপ

স্বামী কিংবা পরিবার কর্তৃক নির্যাতিত ও নিগৃহীত নারীদের পক্ষে লড়ে তরুণ আইনজীবী জ্যাক অ্যাঞ্জেল। সুদর্শন এই আইনজীবির রয়েছে অসম্ভবর সুন্দর একটা বাড়ি, যেটা দেখলে লোকে একনজরেই এর প্রেমে পড়ে যায়। পাশাপাশি রয়েছে সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের প্রতিমূর্তি সহধর্মিনী গ্রেস অ্যাঞ্জেল। প্রতিবেশী থেকে শুরু করে বন্ধু-বান্ধব সবার চোখে ঈর্ষণীয় তাদের এই নিপুণ দাম্পত্য জীবন। সুন্দর বাড়ি, ততোধিক মানানসই দম্পতি আর তাদের জীবনের নিখুঁত সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দেখে সবারই ঈর্ষা জাগে। বিশেষ বিশেষ সপ্তাহান্তে বন্ধুবান্ধবদের আপ্যায়ন করা হয় সেই মনোরম বাড়িটিতে, দারুণ সব খাবারের আয়োজন নিয়ে। অথচ তার মধ্যেও রয়েছে এক সূক্ষ্ম এক কাঁটাতারের বেড়া। এত পরিপাটি জীবন যাপন, অথচ গ্রেস কেন প্রতিনিয়তই আতঙ্গে ভোগে? কিসের জন্য একমুহূর্তের জন্যেও গ্রেসকে একা ছাড়ে না জ্যাক? কেন গ্রেসের কোনো মোবাইল ফোন কিংবা ইমেইল এড্রেস নেই, যার মাধ্যমে বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করা যাবে?

বিহাইন্ড ক্লোজড ডোরের ইংরেজি প্রচ্ছদ; Image source : Amazon.com

অনাকাঙ্খিত এক দুর্যোগ এসে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে গ্রেসের জীবন। থাইল্যান্ডে হানিমুনে এসে হোটেলের রুমে জ্যাক নিজের ছোট বেলার যেসব বর্ণনা দিয়েছে, তা কি আসলেই সত্যি? নাকি ভ্রম। প্রতিনিয়তই জ্যাকের নজরবন্দী হয়ে লোকের সামনে তাকে ভালো থাকার অভিনয় করতে হচ্ছে। বাহ্যিকভাবে যেটাকে নিপুণ বিবাহবন্ধন মনে হয়, সেই বিয়ের রাতেই কোথায় চলে গিয়েছিল জ্যাক? কেন গ্রেসকে বদ্ধ ঘরে জীবন যাপন করতে হচ্ছে? যদিও বা বাইরের কারোর সাথে যোগাযোগ করতেও পারে, ফায়দা হচ্ছে না কিছুই। কারণ, গ্রেস যে গল্পটা বলতে চায়, তা কেউই বিশ্বাস করছে না। প্রমাণ বলছে, সে একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত নারী। ডাউন সিন্ড্রোমে ভোগা বোন মিলিকে প্রচণ্ডভাবে ভালোবাসে বলে, তাকে রক্ষা করতে গিয়ে গ্রেস একটার পর একটা ভুল পদক্ষেপ নিয়েই চলেছে। কী হবে শেষ পর্যন্ত? গ্রেস কি মিলিকে রক্ষা করতে পারবে? নাকি আবারোও প্রমাণিত হবে সে সত্যিই মানসিকভাবে অসুস্থ?

বিহাইন্ড ক্লোজড ডোরের অন্য একটি প্রচ্ছদ; Image source : Amazon.com

যদি গ্রেস মানসিকভাবে অসুস্থ না হয়ে থাকে, তাহলে সে কী করে মুক্তি পাবে জ্যাকের হাত থেকে? প্রতিনিয়তই মস্তিস্কের ধূসর কোষগুলো ব্যবহার করে নিজের জন্য যেসব ছোট ছোট ব্যাপার অর্জন করেছে গ্রেস, তা কি কোনো বৃহৎ অর্জনে পূর্ণতা পাবে? একা একজন নারী, যাকে বিভিন্নভাবে মানসিক নির্যাতন করে প্রায় পঙ্গু করে দেওয়া হচ্ছে, সে কী করে উদ্ধার পাবে দানবের হাত থেকে? মিলিকেই বা কীভাবে বাঁচাবে?

বিহাইন্ড ক্লোজড ডোরের বাংলা প্রচ্ছদ; Image source : মাদিহা মৌ

পাঠ প্রতিক্রিয়া

বইয়ের কাহিনি এগিয়ে গিয়েছে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র গ্রেস অ্যাঞ্জেলের বর্ণনায়। প্রথম পুরুষে লেখা এই উপন্যাসে গ্রেস নিজের অবস্থার কথা এমনভাবে নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছেন যে, পাঠকের কাছে মনে হবে সে নিজেই গ্রেসের জায়গায় রয়েছে। গ্রেসের সাথে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনাই পাঠকের নিজের সাথে ঘটছে। শারিরীক ও মানসিকভাবে কেউ বন্দী হয়ে গেলে, সেই সাথে নিজের অবস্থার কথা পৃথিবীর কাউকেই যদি তা জানানো না যায়, উদ্ধার পাবার কোনো পথ যদি না পাওয়া যায়, তখন একজন মানুষের নিজেকে কতোটা অসহায় লাগতে পারে, তা অনুভব করা যাবে প্রবলভাবে। নিজের সাথে নিজেকে যুদ্ধ করতে শেখাবে উপন্যাসের পরিচ্ছেদগুলো৷ গ্রেসের ধৈর্য ধরে জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার আকুতি যেকোনো মেয়েকেই প্রভাবিত করবে। গ্রেসের কাছ থেকে টিকে থাকার অনুপ্রেরণা পাবে অনেকেই।

নিখুঁত বিয়ে নাকি নিখুঁত মিথ্যে? Image source : www.piscesofamom.com

একবার বইটি পড়ে শেষ করার পর পুনরায় পড়তে ইচ্ছে করবে, বইয়ের পরিণতির সাথে শুরুর দিকের অধ্যায়গুলো মিলানোর জন্য। এই ধরণের উপন্যাস সাধারণত একটু ধীর গতির হলেও এটি একবার পড়তে শুরু করলে হাত থেকে বই রাখতেই ইচ্ছে করবে না। মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস যারা পছন্দ করেন, তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য বই বলা যায় বিহাইন্ড ক্লোজড ডোরসকে।

বি. এ. প্যারিসের অন্যান্য বইসমূহ; Image source : jabimgo.pw

অনুবাদ প্রসঙ্গ

ইংরেজিতে পড়তে না চাইলে বিহাইন্ড ক্লোজড ডোরস বাংলা অনুবাদ পড়তে পারেন। ভূমি প্রকাশ থেকে বইটির অনুবাদ করেছেন হিমেল রহমান। ঝরঝরে অনুবাদে বইটি পড়তে বেশ ভালো লাগবে। অনুবাদ ভালো না হলে এইধরণের মনস্তাত্ত্বিক বইগুলো ঠিক যেন আবর্জনায় পরিণত হয়।
অনুবাদক হিমেল রহমান চমৎকার এই বইটির খুবই প্রাঞ্জল অনুবাদ করেছেন। তাকে সেজন্য বিশেষভাবে ধন্যবাদ দেওয়াই যায়।

লেখক পরিচিতি

বি এ প্যারিস জন্মসূত্রে আয়ারল্যান্ডের নাগরিক। বেড়ে উঠেছেন ইংল্যান্ডে। পরবর্তীকালে ফ্রান্সে কয়েকবছর একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকে ট্রেডার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তারপর শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বামীর সাথে গড়ে তোলেন একটি ভাষাশিক্ষা স্কুল। বিহাইন্ড ক্লোজড ডোরস তার প্রথম উপন্যাস। প্রকাশের পর পরই এটি বেস্ট সেলার তালিকায় চলে আসে। ২০১৬ সালে বইটি গুডরিডস চয়েজ অ্যাওয়ার্ডে একই সাথে সেরা মিস্ট্রি ও থ্রিলার ক্যাটাগরিতে পঞ্চম হয়। সেই সাথে ডেব্যু গুডরিডস অথর ক্যাটাগরিতে চতুর্থ হন বি এ প্যারিস। পাঁচ মেয়ে নিয়ে তিনি বর্তমানে ফ্রান্সে বাস করছেন।

বি. এ. প্যারিস; Image source : jabimgo.pw

বই পরিচিতি

বই : বিহাইন্ড ক্লোজড ডোরস
লেখক : বি.এ. প্যারিস
অনুবাদক : হিমেল রহমান
প্রকাশনী : ভূমিপ্রকাশ
ধরণ : সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, মিস্ট্রি
প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ : সজল চৌধুরী
পৃষ্ঠা : ২৫৪
মলাট মূল্য : ৩৫০
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৬

Feature Image : মাদিহা মৌ

Related Article

0 Comments

Leave a Comment