আচ্ছা ভাবুন তো এমন একটা সময়ের কথা, যখন মানব সভ্যতা প্রায় ধ্বংসের পথে। কী হতে পারে তখন? কিভাবে ঘটতে পারে মানব সভ্যতার অন্ত এ ব্যাপারে যুগে যুগে কম জল্পনা কল্পনা হয়নি। তারই ফলস্বরূপ এ নিয়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য শিল্প-সাহিত্য, নাটক ও সিনেমা। বিশেষ করে হলিউডে এ নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রচুর ছবি তৈরি হয়েছে, এখনো তৈরি হচ্ছে এবং হলফ করে বলা যায় ভবিষ্যতেও তৈরি হবে।

বার্ড বক্স মুভির ফ্যান আর্ট; Source: reddit.com

এ ধারার কিছু মুভি আজীবন দর্শকদের মনে দাগ কেটে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মায়া সভ্যতার ভবিষ্যদ্বাণীর উপর ভিত্তি করে বানানো মুভি ২০১২ (2012)। তবে মন্দ মুভির সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তবে পৃথিবী ধ্বংসের গল্প বলতে এবার এগিয়ে এসেছে বিশ্বখ্যাত অনলাইন স্ট্রিমিং সার্ভিস নেটফ্লিক্স। বলছিলাম, ২০১৪ সালে প্রকাশিত হরর থ্রিলার অবলম্বনে নির্মিত মুভি বার্ড বক্স এর কথা। কী এমন আছে এ মুভিতে যার ফলে এটি রাতারাতি ইন্টারনেট সেনসেশনে পরিণত হলো এবং নেটফ্লিক্স আর এফবিআইকে বাধ্য করলো একাধিকবার জনগণের উদ্দেশ্যে সতর্কবার্তা প্রেরণ করতে! চলুন জেনে আসা যাক বার্ড বক্সের আদ্যোপান্ত।

কাহিনী সংক্ষেপ

বার্ড বক্স মুভিটির ঘটনাবলী দুই সময়সীমাতে দেখানো হয়। এক ভাগে দেখানো হয় একদা চিত্রশিল্পী হিসেবে জীবনযাপন করা ম্যালোরি হেয়েসের দুটি নামহীন শিশুকে নিয়ে এক নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেয়ার গল্প। অপরভাগে ম্যালোরির দৃষ্টিকোণ থেকে ৫ বছর পূর্বের ঘটনাবলী দেখানো হয়, যে সময় এক অশুভশক্তির আগমনে মানব সভ্যতা হুমকির মুখে পড়ে।

বার্ড বক্স মুভিতে ম্যালোরি চরিত্রে স্যান্ডা বুলক; Source: pinterest.com

আমরা একদিকে দেখতে পাই পাঁচ বছর পূর্বের ম্যালোরিকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়। নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে লড়তে থাকা ম্যালোরির সাথে তার বড় বোন জেসিকার বেশ কিছু ব্যাপারে মনোমালিন্য হয়। এরই মধ্যে টেলিভিশনে সম্প্রচার হতে থাকে অদ্ভুত এক সংবাদ। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে রাশিয়ায় মানুষজন গণ আত্মহত্যা শুরু করেছে। তবে আশঙ্কাজনক ব্যাপার হলো ধীরে ধীরে বিষয়টি পুরো ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাজার মাইল দূরে ঘটতে থাকায় ম্যালোরিকে খুব একটা বিচলিত হতে দেখা যায় না।

জেসিকাকে সাথে নিয়ে ম্যালোরি হাসপাতালে যায় মাতৃত্বকালীন রুটিন চেক আপের জন্য। তবে চেক আপ শেষে ফেরার সময় হঠাৎ ম্যালোরির চোখে পড়ে এক অদ্ভুত ঘটনা। সে দেখল এক মহিলা কাচের মধ্যে নিজের মাথা দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবেই আঘাত করছেন, অনেকটা যেন নিজেকেই নিজে জখম করার চেষ্টা করছিল। এ ঘটনা দেখে ভয় পেয়ে দ্রুত হাসপাতাল থেকে তারা দুজন যখন নিজেদের বাসায় ফিরতে থাকে। তখন পথিমধ্যে মূহুর্তেই যেন চারপাশের পরিস্থিতি পাল্টে যেতে শুরু করে।

কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সবাই পালাতে শুরু করে। চারদিকে দুর্ঘটনা এবং ভাংচুর শুরু হয়ে যায়। এরই মধ্যে জেসিকার নজরে আসে অদ্ভুত কিছু। তারপরেই কেমন যেন অস্বাভাবিক হয়ে যায় সে। নিজেদের গাড়ির ইচ্ছাকৃতভাবেই দুর্ঘটনা ঘটায় এবং গাড়ি থেকে বের হয়ে এক চলন্ত ট্রাকের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। এরই সাথে শুরু হয় ম্যালোরির নিজের এবং নিজের অনাগত সন্তানকে সে অজানা অশুভ শক্তি থেকে রক্ষার সংগ্রাম।

বার্ড বক্স মুভিতে টম চরিত্রে টেভান্তে রোডস; Source: quora.com

অপরদিকে, আমরা দেখতে পাই পাঁচ বছর পরের ম্যালোরি এবং তার সাথে দুটি শিশুকে। সে রেডিও মারফত এক নিরাপদ স্থানের সন্ধান পেয়েছে যেখানে গেলে তারা নিরাপদ থাকতে পারবে। তবে এর জন্য পাড়ি দিতে হবে এক নদী। পথিমধ্যে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে অশুভ কিছু। সেই অশুভশক্তি যার কারণে ম্যালোরির জীবন বদলে গিয়েছে, তার প্রভাব এখন বিশ্বব্যাপী।

একবার যদি কেউ সেই প্রাণী বা অজানা জীবটিকে দেখে ফেলে তবেই সে আত্মহননের পথে এগিয়ে যায়। তবে শক্তিটি কখনো নিজ থেকে কাউকে আক্রমণ করে না। অবশিষ্ট মানবজাতি তাই বের করেছে এক অভিনব উপায়। তারা যখনই বাইরে বের হয় তখনই নিজেদের চোখ বন্ধ রাখে অথবা কাপড় দিয়ে বেঁধে নেয়। আরো লক্ষ্যণীয় যে, যেখানে কোনো পাখি থাকে, শক্তিটি সাধারণত সেসকল জায়গা এড়িয়ে চলে। তাই নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসের পাশাপাশি একটি বাক্সে নিরাপত্তার জন্য ভরে নেয় ছোট দুটি পাখি। এরপর ম্যালেরি তার দুই সন্তানকে নিয়ে শুরু করে চোখে কাপড় বেঁধে এক দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার অসম্ভবপ্রায় যাত্রা।

পরিচালনা, চিত্রনাট্য এবং অভিনয়

বার্ড বক্স মুভিটি পরিচালনা করেছেন ড্যানিশ পরিচালক সুজান বায়ার। বায়ার বিশ্বের প্রথম নারী পরিচালক যিনি একই সাথে অ্যামি আ্যাওয়ার্ড, গোল্ডেন গ্লোব আ্যাওয়ার্ড এবং অস্কার পেয়েছেন। তাই পরিচালক হিসেবে তার যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রকার সন্দেহ নেই। তবে বার্ড বক্সে পরিচালক হিসেবে মোটামুটি ভালোই কাজ করেছেন বলা যায়। বিশেষ করে তিনি দুটি ভিন্ন সময়সীমার গল্প একের পর এক যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তা ভালোই লেগেছে।

বার্ড বক্স মুভিতে জন ম্যালকোভিচ; Source: quora.com

বার্ড বক্স মুভিটির সবচেয়ে দুর্বল অংশ এর চিত্রনাট্য। ঠিক একই রকমের গল্প এবং চিত্রনাট্য নিয়ে হলিউডে এর আগে প্রচুর মুভি হয়েছে। বিশেষ করে বিপদ এড়াতে চোখে কাপড় বেঁধে চলাফেরা করার ব্যাপারটি প্রথমে দর্শকদের কৌতূহল উদ্দ্রেক করলেও সিনেমার ধীরগতি দর্শকদের হতাশ করবে। অনেকে এটাও দাবী করছেন যে মুভিটির দুটি টাইমলাইনের একটির মার্ক ওয়ালবার্গ অভিনীত দ্য হ্যাপেনিং মুভিটির ঘটনার অনুকরণে বানানো এবং অপরটি ২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আরেক মুভি আ কোয়াইট প্লেস থেকে অনুপ্রাণিত। সব মিলিয়ে গল্পে নিজস্বতার অভাব মুভিটিকে অনেকখানি পিছিয়ে দিয়েছে।

বার্ড বক্স মুভিতে র‍্যাপার মেশিন গান কেলি; Source: pinterest.com

মুভিটিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন হলিউড অভিনেত্রী স্যান্ড্রা বুলক। বেশ কিছুদিন বিরতির পর হলিউডে ফেরা বুলক বার্ড বক্সের মাধ্যমে নিজের উপস্তিতি বেশ ভালোভাবেই জানান দিয়েছেন। তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন অস্কারজয়ী মুনলাইট মুভিতে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়ানো অভিনেতা ট্রেভান্তে রোডস্। তবে রোডসের চরিত্র অনেকটাই গৌণ ছিল বলা যায়। এছাড়া মুভিতে আরো আছেন অস্কারজয়ী অভিনেতা জন ম্যালকোভিচ। অতিথি শিল্পী হিসেবে একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন র‍্যাপার মেশিন গান কেলি।

রেটিং, সমালোচনা এবং বার্ড বক্স চ্যালেঞ্জ

বার্ড বক্স মুভিটির রেটিং মোটামুটি গড়পড়তা ধাঁচের বলা যায়। মুভিটির আইএমডিবি রেটিং ৬.৭ এবং রটেন টমেটোতে মুভিটি ৬৩ শতাংশ ফ্রেশ। মুভিটির স্ক্রিপ্টে নতুনত্ব না থাকার কারণেই এমন রেটিং বলে সকলের ধারণা।

মুভিটি একটি কারণে বেশ সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে। মুভিটিতে দুর্যোগময় বিশ্ব দেখাতে গিয়ে একটি বাস্তব সড়ক দুর্ঘটনার ক্যামেরা ফুটেজ দেখানো হয়েছে। ২০১৩ সালে কানাডার সেই রেল দুর্ঘটনায় ৪৭ জন মানুষ নিহত হয়েছিল। সে দুর্ঘটনা থেকে যারা বেঁচে গিয়েছিলেন তাদের অনেকে নেটফ্লিক্সকে অনুরোধ করেন দুর্ঘটনার ওই ক্লিপটি মুভিটি থেকে সরিয়ে ফেলার জন্য। কিন্তু নেটফ্লিক্স ক্লিপটি সরাতে অস্বীকৃতি জানায়।


মুভিটীর একটি দৃশ্যে স্যান্ড্রা বুলক; Source: youtube.com

নেটফ্লিক্স অস্ট্রেলিয়া মুভিটি মুক্তির পর ঘটায় আরেক কান্ড। তারা দুজন গেমারকে চ্যালেঞ্জ দেয় বার্ড বক্স মুভিটির মতো চোখে কাপড় বেঁধে ভিডিও গেমস খেলার জন্য। তাদের ভিডিও প্রচারের হবার পরে বিশ্বব্যাপী খুব দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় এই বার্ড বক্স চ্যালেঞ্জ। তবে শুধু গেমিং নয় মানু্ষজন অনেক বিপজ্জনক কাজও এ চ্যালেঞ্জের নামে চোখে কাপড় বেঁধে করতে থাকে।

এর ফলস্বরূপ নেটফ্লিক্স সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে বেশ কয়েকবার বিবৃতি দেয় এবং মুভিটির ভক্তদের অনুরোধ করেন এরকম কোনো চ্যালেঞ্জে অংশ না নিতে। তবে তারপরও ২০১৯ সালের জানুয়ারী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের উতাহতে ১৭ বছর বয়সী এক তরুণী বার্ড বক্স চ্যালেঞ্জ করে গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ঘটনাস্থলেই মারা যায় সে। তারপর এফবিআই বাধ্য হয় দেশব্যাপী নেটফ্লিক্সের মতো একই ধরনের সতর্কবার্তা জারি করতে।

যে কারণে মুভিটি দেখবেন

আপনি যদি পোস্ট এপোক্যালিপটিক (Post Apocalyptic) ধাঁচের মুভিগুলোর ফ্যান হয়ে থাকেন তবে বার্ড বক্স আপনার খারাপ লাগবে না বলে আশা করা যায়। মুভিটির ব্যাপারে বলা যায় যে, এটি দ্য হ্যাপেনিং মুভিটির চেয়ে ভালো কিন্তু আ কোয়াইট প্লেসের চেয়ে খারাপ। সব মিলিয়ে এ মাঝারি মানের মুভিটি সময় কাটানোর উপাদান হিসেবে ভালোই লাগবে দর্শকদের।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment