আগাথা ক্রিস্টিকে বলা হয় ‘কুইন অব ক্রাইম’, যার মানে হলো অপরাধ জগতের রানী। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের পরই তার অবস্থান। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের লেখক হিসেবে পরিচিত আগাথা ক্রিস্টি। তার বই এই পর্যন্ত ৫৬টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তার সৃষ্ট বিখ্যাত দুটি চরিত্র এরকুল পোয়ারো ও মিস মার্পল। মার্ডার ইন মেসোপটেমিয়া রহস্যোপন্যাসটিতে প্রধান চরিত্র হিসেবে রয়েছেন এরকুল পোয়ারো। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় যুক্তরাজ্যে, কলিন্স ক্রাইম ক্লুবন থেকে। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশিত হয়।

কাহিনী সংক্ষেপ

নার্স অ্যামি লিথেরানকে দায়িত্ব দেওয়া হলো মিসেস লুইস লিডনারের, যিনি সবসময় আতঙ্কে ভোগেন। মিসেস লিডনার প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. লিডনারের স্ত্রী। এই দম্পতি একটি বিশাল বাড়িতে একঝাঁক মানুষ নিয়ে বসবাস করছেন, যারা সবাই ইরাকি মরুর একটি স্থান হাসানিয়ার তেল ইয়ারিমজাহয় প্রত্নতত্ত্বের ওপর কাজ করেন। এখানে তারা সবাই এসেছেন প্রাচীন সমাধি ও মাটি খনন করে পুরাকীর্তি উদ্ধার করতে।

অ্যামি লিথেরান তাই এই বাড়িতে এসে লিডনার দম্পতি ছাড়াও আটজন মানুষের মুখোমুখি হলেন, যারা মিসেস লিডনারকে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করেন। বাড়িটির বাতাসে কেমন এক ধরনের অস্থিরতা ভেসে বেড়ায়। কিছুদিন বাড়িটিতে থাকার পর নার্স লিথেরান উদঘাটন করতে পারলেন, মিসেস লিডনার কেবল নির্দিষ্ট একজন মানুষকেই ভয় পান।

মার্ডার ইন মেসোপোটেমিয়ার ইংরেজি বইয়ের প্রচ্ছদ; Image source: finenooksmagazine.com

রহস্যময়ভাবে বাড়িটিতে খুন হয়ে গেলেন একজন। খুনটির রহস্য উদঘাটন করার জন্য অনুরোধ করা হলো এরকুল পোয়ারোকে। বাইরে থেকে প্রাসাদোপম বাড়িটির ভিতরে ঢুকে খুন করাটা প্রায় অসম্ভব। এরকুল পোয়ারো তাই সন্দেহের তালিকায় রাখলেন ভিতরের মানুষগুলোকেই। কারণ বাড়ির ভিতরে বাইরের কেউ ঢুকে হত্যাকাণ্ডটি সম্পন্ন করে আবার নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

অন্যদিকে, প্রত্নতত্ত্বের খননকার্যে নিয়োজিত একেকজন মানুষ একেক দিক থেকে সন্দেহের তীরে বিদ্ধ। কে করলো খুনটি? এই খুন করে কার কী লাভ? বেনামি চিঠিগুলোই বা কে পাঠিয়েছিলো? যুদ্ধাপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া লুইস লিডনারের প্রথম স্বামী ফ্রেডরিক বসনার কি সত্যিই বেঁচে আছে? নাকি ফ্রেডরিক বসনারের ভাই উইলিয়াম বসনারই প্রতিশোধ নিচ্ছে? এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে শুরু করলেন এরকুল পোয়ারো।

মার্ডার ইন মেসোপোটেমিয়ার টিভি সিরিজের প্রত্নস্থল; Image source: poirot.us

এরকুল পোয়ারোর তদন্তের মাঝেই খুন হয়ে গেলো আরোও একজন। আসলে এটা আত্মহত্যার মতো দেখানোর চেষ্টা করা হলেও, সেই মৃত্যুটি যে আত্মহত্যা নয়, তার প্রমাণও পাওয়া গেল হাতেনাতেই। এই মানুষটিকে মরতে হলো, কারণ তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে ফেলেছিলো।

কী সেই তথ্য, যার জন্য এক রাতের মধ্যেই মরতে হলো তাকে? খুনি কি তাহলে সত্যিই পরিচিতদের মধ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে, নাকি বাইরে থেকেই কেউ এসে খুনগুলো করছে? নার্স লিথেরানের জবানিতে পুরো উপন্যাসটি নিপুণভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

মার্ডার ইন মেসোপোটেমিয়ার বাংলা অনুবাদ বইয়ের প্রচ্ছদ; Image source: মাদিহা মৌ

পাঠ প্রতিক্রিয়া

যেকোনো মার্ডার মিস্ট্রি বা মিস্ট্রি জনরার বই হয় খুবই দ্রুতগতিসম্পন্ন। সেই দিক বিবেচনা করলে মার্ডার ইন মেসোপটেমিয়ার শুরুটা খুবই মন্থর গতির। প্রতিটি চরিত্রকে ভালোভাবে বোঝার জন্য, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা ব্যাখ্যা করার জন্য এর অবশ্যই দরকার ছিলো। তবে দ্রুতগতিসম্পন্ন রহস্যোপন্যাস পড়ে অভ্যস্ত পাঠক বইয়ের শুরুতে কিছুটা বিরক্ত হতে পারেন। তবে আপনি যদি ধৈর্য ধারণ করে ওই অংশটুকু মনোযোগ দিয়ে পড়ে যান, সামনে আপনার জন্য দারুণ জিনিস অপেক্ষা করছে!

আগাথা ক্রিস্টির লেখনশৈলীর গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তার লেখা রহস্যোপন্যাসগুলোর ব্যাখা যখন দেওয়া হবে, তখন তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হবে। এত চমৎকারভাবে ঘটনার প্রতিটি দিক বিশ্লেষণ করেন তিনি, যেন আর কোনোভাবে অন্য কিছু হতেই পারতো না। দায়সারা ভঙ্গিতে হত্যা রহস্যগুলো সমাধান করেন না তিনি, বরং অনেক বেশি গভীর পর্যবেক্ষণসমৃদ্ধ বিবৃতি দেন। এই অংশটুকু প্রতিটি পাঠকের ভালো লাগতে বাধ্য। মার্ডার ইন মেসোপটেমিয়া উপন্যাসে এরকুল পোয়ারোর বর্ণনাগুলো এমন ধারার নাটকীয়ই ছিলো, যা বিরক্তির উদ্রেক না করিয়ে বইয়ের প্রতি মনোযোগ আরোও বাড়িয়ে দেবে।

মার্ডার ইন মেসোপোটেমিয়ার টিভি সিরিজের পোস্টার; Image source: amazon.com

অনুবাদ প্রসঙ্গ

ইংরেজিতে পড়তে না চাইলে মার্ডার ইন মেসোপটেমিয়ার বাংলা অনুবাদ পড়তে পারেন। বইটির বাংলা অনুবাদ খুবই ভালো হয়েছে। অনুবাদে খটমটে ভাবটুকু নেই বললেই চলে। প্রাঞ্জল ও ঝরঝরে বাংলা অনুবাদ পড়ে সর্বস্তরের পাঠকের ভালো লাগবে বলেই মনে হয়েছে।

মার্ডার ইন মেসোপটেমিয়া উপন্যাস অবলম্বনে টিভি সিরিজ

মার্ডার অব মিস্ট্রি উপন্যাস অবলম্বনে ২০০১ সালে টিভি সিরিজ তৈরি করা হয়েছে, যেটি পরিচালনা করেছেন টম ক্লেগ। টিভি সিরিজটিতে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র এরকুল পোয়ারো চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ডেভিড সাশেট। এছাড়াও অ্যামি লিথেরান, মিসেস লুইস লিডনারের, প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. লিডনার, বিল কোলম্যান, শিলা রাইলি, ফাদার ল্যাভিগনি ইত্যাদি চরিত্রে যথাক্রমে অভিনয় করেছেন জর্জিনা, বারবারা, রন বারগ্লাস, জেরেমি, প্যানডোরা, ক্রিস্টোফার প্রমুখ অভিনেতা অভিনেত্রীবৃন্দ অভিনয় করেছেন। টিভি সিরিজটির আইএমডিবি রেটিং ৭.৫।

মার্ডার ইন মেসোপোটেমিয়ার টিভি সিরিজের একটি দৃশ্য; Image source: pinterest

প্রসিদ্ধ সমালোচকের উক্তি

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস: প্রাঞ্জল, অভিনব ও দারুণ উপভোগ্য।

ডেইলি মেইল: এ পর্যন্ত পাঠকের দেওয়া মিসেস ক্রিস্টির সেরা কাজ।

লেখক পরিচিতি

আগাথা ক্রিস্টির পূর্ণনাম ড্যাম আগাথা মেরি ক্লারিসা ক্রিস্টি। উনিশ শতকের ইংরেজ এই সাহিত্যিকের জন্ম ১৮৯০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। তিনি মেরি ওয়েস্টম্যাক্ট ছদ্মনামে লিখেছেন। সব মিলিয়ে আগাথা মোট ৬৬টি রহস্যোপন্যাস লিখেছেন। এছাড়াও ১৪টি ছোটগল্প ও রোমান্টিক গল্প। ১৯৭৬ সালের ১২ই জানুয়ারি ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ারের উইন্টারব্রুকে ৮৬ বছর বয়সে এই লেখিকা মারা যান। তাকে অক্সফোর্ডশায়ারের সেন্ট মেরি চার্চে সমাধিস্থ করা হয়েছে।

ইংরেজ লেখক আগাথা ক্রিস্টি; Image source: Walter Bird/Getty Images

বই পরিচিতি

বই: মার্ডার ইন মেসোপটেমিয়া
লেখক: আগাথা ক্রিস্টি
অনুবাদক: রুদ্র কায়সার
জনরা: মার্ডার মিস্ট্রি
মূল্য: ২২০
প্রকাশনী: ভূমি প্রকাশ
প্রাপ্তিস্থান : অনলাইন বুকশপ, নীলক্ষেত এবং বাংলাবাজার

Feature Image: মাদিহা মৌ

Related Article

0 Comments

Leave a Comment