প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারুণ্যকে মুগ্ধতার মোহজালে আবদ্ধ করেছিলেন এক জাদুকর, হুমায়ূন আহমেদ। চাঁদ-জোৎস্না আর বৃষ্টিকে নেশাতুর মাতাল করে ফেলার ক্ষমতা দিয়েছেন তিনি। লেখক হুমায়ূন আহমেদ শহর জুড়ে এতো অজস্র প্রেমিক তৈরী করেছেন যে তারা যদি প্রথামাফিক প্রেম করতো, তাহলে হয়তো প্রেমের শহর হিসেবে প্যারিসের পাশে আজকাল ঢাকার নামও চলে আসতো। প্রথামাফিক প্রেম তিনি উপেক্ষা করেছেন, বরং তিনি শিখিয়েছেন, বৃষ্টি জোৎস্নার ডাকে কী করে শালবনের দিকে হাঁটতে শুরু করতে হয় রূপার মতো প্রেমিকাকে উপেক্ষা করে।

তবে হুমায়ুন আহমেদ শুধু লেখকই নন, তার ছিল আরো অসংখ্য পরিচয়। নানা গুণে গুণান্বিত এই মানুষটি ক্যারিয়ার শুরু করেন শিক্ষকতা পেশায়। রসায়ন শাস্ত্রে পিএইচডি করে আসা হুমায়ূন আহমেদ ছেলেবেলা থেকে হতে চেয়েছেন আরো অনেক বিচিত্র কিছু।

প্যারানরমাল বিভিন্ন বিষয়ে তার ছিল ভীষণ আগ্রহ, জাদু শেখার আগ্রহও ছেলেবেলার, এ আগ্রহ যে জীবনের শেষ অবধি ছিল, তা বিখ্যাত যাদুশিল্পী জুয়েল আইচের সঙ্গে তার সখ্যতা দেখলেই বোঝা যায়। প্রকৃতিকে ভীষণ ভালোবাসা হুমায়ূন আহমেদের বৃক্ষপ্রেম নুহাশপল্লীতে আসা যাওয়া করে প্রত্যেকেরই জানা। জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহ থাকায় গ্রহ নক্ষত্রের গতিবিধির প্রতি নজর রাখতেন। যাবতীয় রহস্যের প্রতি ছিল তার অসীম কৌতূহল।

তবে লেখকের পরই যে পরিচয়টি হুমায়ূন আহমেদকে সবচেয়ে বেশি পরিচিত করেছে সাধারণ মানুষের কাছে, তা সম্ভবত একজন নির্মাতা হিসেবে, নাটক এবং চলচ্চিত্রের। এ গুণটিও ছেলেবেলা থেকেই তার মধ্যে ছিল, তাও আমরা তার পরিবারের বদৌলতে জানতে পারি। ছোটবেলায় শীতকালে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলে ভাইবোনদের নিয়ে নাটক করতেন তিনি, সেখানে নির্দেশনার পাশাপাশি অভিনয়ও করতেন।

শ্যুটিং এ হুমায়ূন আহমেদ ; Image Source: mediabangladesh.net

অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক এবং বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা চলচ্চিত্রের নির্মাণ হয়েছিল এই গুণী নির্মাতার হাত ধরেই।

প্রথম পর্বে আজ আমরা দেখে নেবো হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো,

আগুনের পরশমণি

হুমায়ূন আহমেদের রচনায় প্রথম সিনেমা শঙ্খনীল কারাগার হলেও পরিচালনা করেছিলেন অন্য একজন, বাজে নির্মাণের জন্য হুমায়ূন আহমেদ জীবনের বিভিন্ন সময়ে আফসোস প্রকাশ করেছেন।

সেই আফসোস মেটাতেই ১৯৯০ সালে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দেন, সরকারী অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্রটি সম্পূর্ণ করতে সময় লাগে চার বছর। অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আগুনের পরশমণি ‘ সিনেমাটি বর্ষসেরা চলচ্চিত্র সহ আটটি ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে জাতীয় পুরষ্কার লাভ করে।

আগুনের পরশমণি ; Image Source: youtube.com

মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রথম চলচ্চিত্র মুক্তির বছরই তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। পদক প্রদান অনুষ্ঠানেই তাকে সরকারী অনুদানের ঘোষণা দেয়া হয় পরবর্তী চলচ্চিত্রের জন্য এবং তৎকালীন সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার স্ত্রী সিনেমাটির প্রযোজক হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

আইএমডিবি রেটিং – ৯.১/১০

শ্রাবণ মেঘের দিন

১৯৯৯ সালে মুক্তি পায় তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র শ্রাবণ মেঘের দিন। তারই লেখা ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ উপন্যাস অবলম্বনে নূহাশ চলচ্চিত্রের ব্যানারে ছবিটি নির্মাণ করা হয়। ছবির গুরুত্বপূর্ণ কিছু চরিত্রে অভিনয় করেন জাহিদ হাসান, শাওন, মাহফুজ আহমেদ, আনোয়ারা, মুক্তি, গোলাম মোস্তফা, সালেহ আহমেদ এবং ডা. এজাজ আহমেদসহ আরো অনেকে।

শ্রাবণ মেঘের দিন ; Image Source: adheralo.com

সুবীর নন্দীর প্লেব্যাকে শ্রাবণ মেঘের দিন সিনেমায় ‘এক যে ছিল সোনার কন্যা‘ গানটি চিরসবুজ গান হিসেবে আমাদের সঙ্গীত জগতে স্থান করে নিয়েছে।

আইএমডিবি রেটিং – ৮.৫/১০

দুই দুয়ারী

দুই দুয়ারী মুক্তি পায় ২০০০ সালে। পারিবারিক গল্পনির্ভর এই ছবিতে পরিচালক তুলে ধরেছেন একজন রহস্যমানবের মন ভালো করার কিছু রহস্যের ঘটনা।

দুই দুয়ারী ; Image Source: ytimg.com

ছবিতে মূল ভূমিকায় অভিনয় করছেন জনপ্রিয় অভিনেতা রিয়াজ অন্য প্রধান দুটি চরিত্রে অভিনয় করছেন শাওন ও মাহফুজ আহমেদ। ছবিটিতে মজার মজার কিছু রহস্যের ঘটনা আর অফুরন্ত হাসির কাণ্ড ফুটে উঠেছে।

আইএমডিবি রেটিং – ৭.৮/১০

চন্দ্রকথা

২০০৩ সালে মুক্তি পায় চন্দ্রকথা। হুমায়ূন আহমেদের এটি তার নিজের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নিজ চলচ্চিত্র নির্মাণপ্রতিষ্ঠান নূহাশ চলচ্চিত্রের ব্যানারে নির্মাণ করেন।

চন্দ্রকথা ; Image Source: youtube.com

নদীর চরের গ্রামীন পরিবেশের প্রেক্ষাপটে এক অসম প্রেমকথা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেলুলয়েডে। পানি, চাঁদ, জোৎস্না তিন প্রিয় বিষয়ই এক সাথে তুলেছেন ক্যামেরায়, এ দৃশ্য করতে গিয়ে অনেক রকম বাঁধার মুখেও তিনি যে পড়েছেন, তা তার ‘ছবি বানানোর গল্প’ বই থেকে জানতে পারা যায়৷

ছবিতে মূল দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফেরদৌস ও মেহের আফরোজ শাওন। এ ছাড়াও আছেন আসাদুজ্জামান নূর ও আহমেদ রুবেলসহ অনেকেই।

আইএমডিবি রেটিং – ৭.৩/১০

শ্যামল ছায়া

২০০৪ সালে মুক্তি পায় শ্যামল ছায়া। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হয় এই চলচ্চিত্র। এই ছবিটি ২০০৬ সালে অস্কারখ্যাত একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে ‘সেরা বিদেশি ভাষা’ বিভাগে প্রতিযোগিতার জন্য পাঠানো হয়।

শ্যামল ছায়া ; Image Source: youtube.com

ছবিটির বিশেষত্ব হচ্ছে, সরাসরি যুদ্ধের দৃশ্য না দেখিয়েও এতে যুদ্ধের আবহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

অশ্লীলতার করাল গ্রাসে যখন আমাদের চলচ্চিত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে, বাংলা সিনেমার নিয়মিত যে মধ্যবিত্ত দর্শক, তারা সিনেমা হলের আশেপাশে ভুল করে পড়ে গেলে তওবা পড়ে চোখ বাঁচিয়ে দ্রুত সরে যাচ্ছে লজ্জায়, এমন ভয়াবহ সময়ে হুমায়ূন আহমেদ শ্যামল ছায়া’র মাধ্যমে দিয়েছিলেন চমৎকার এক বার্তা, ভালো সিনেমা কাটপিস ছাড়াই দর্শক টানে, প্রশংসাও কুড়ায়।

আইএমডিবি রেটিং – ৮.৫/১০

নয় নম্বর বিপদ সংকেত

নয় নম্বর বিপদ সংকেত চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। পুরো চলচ্চিত্রটি চিত্রায়িত হয়েছে নূহাশপল্লীতে। ২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই হাস্যরসের চলচ্চিত্রটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এ ছাড়া চলচ্চিত্রটিতে নূহাশপল্লীর  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরা দিয়েছে আলাদা করে।

নয় নম্বর বিপদ সংকেত ; Image Source: youtube.com

নয় নম্বর বিপদ সংকেত একই বছর চ্যানেল আই’তে টিভি প্রিমিয়ার হয়।

আইএমডিবি রেটিং – ৬.৮/১০

আমার আছে জল

আমার আছে জল মুক্তি পায় ২০০৮ সালে। চলচ্চিত্রটি তাঁর নিজের লেখা উপন্যাস ‘আমার আছে জল’ অবলম্বনে নির্মাণ করা হয়।

আমার আছে জল ; Image Source: youtube.com

চ্যানেল আই থেকে ঘোষণা করা হয়, সে বছর লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতার বিজয়ী সুযোগ পাবে হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় ইমপ্রেস টেলিফিল্মের একটি সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পাবে। সেই সূত্র ধরেই বিজয়ী বিদ্যা সিনহা মীম আমার আছে জল ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন।

এছাড়াও চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছেন ফেরদৌস, জাহিদ হাসান, মেহের আফরোজ শাওন, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, মুনমুন আহমেদ, সালেহ আহমেদ, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় এবং ডা. এজাজ আহমেদ।

আইএমডিবি রেটিং – ৬.৮/১০

ঘেঁটুপুত্র কমলা

ঘেঁটুপুত্র কমলা মুক্তি পায় ২০১২ সালে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এই চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছে। ছবির কাহিনী ও চিত্রনাট্য হুমায়ূন আহমেদের। এটির নির্মাণকাল ২০১০-২০১১ সাল। ছবিটি কোনো রকম কর্তন ছাড়াই ২০১২ সালে মুক্তির জন্য সরকারি অনুমোদন লাভ করে। এই চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় প্রসঙ্গ সমকামী পুরুষের বালকপ্রীতি । চলচ্চিত্রের ঘেঁটুপুত্র কমলা চরিত্রে অভিনয় করেছেন শিশুশিল্পী মামুন।

ঘেটুপুত্র কমলা ; Image Source: youtube.com

মামুন তখন পরিচিত মুখ, প্যাকেট জাত ম্যাংগো জুসের একটি বিজ্ঞাপন তখন প্রচুর জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সেই মামুনকে হুমায়ূন আহমেদ নিয়ে এসেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারায়, চরিত্রে। এমন একটি চরিত্র করবার জন্য যেমন দুঃসাহস করতে হয়েছে মামুনকে তেমনি গল্পটা বলাও ছিল চ্যালেঞ্জিং হুমায়ূন আহমেদের জন্য। বাংলার ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায় লেখক, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিকরা বরাবরই কেন যেন এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন

সেই অন্ধকারকে আলোতে নিয়ে এসেছেন নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ, মৃত্যুর পূর্বে তার শেষ কাজে৷

এটি হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত সর্বশেষ চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তির আগেই ১৯ জুলাই, ২০১২ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তবে এক মাসের জন্যে দেশে ফিরে পুনরায় নিউইয়র্ক যাওয়ার আগে ৩০ মে ২০১২ তারিখে তিনি ছবিটি দেখে যেতে পেরেছিলেন।

৮৫তম অস্কার প্রতিযোগিতায় ‘সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র ’ বিভাগের জন্য বাংলাদেশ থেকে মনোনয়ন পেয়েছিল ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’। ৮৫তম অস্কার বাংলাদেশ কমিটি চলচ্চিত্রটিকে মনোনয়ন দিয়েছে। এ ছাড়া চলচ্চিত্রটি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন, কানাডা ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজক কমিটির কাছ থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছিল।

আইএমডিবি রেটিং – ৭.৫/১০

হুমায়ূন আহমেদের সিনেমার যেমন বিশাল এক ভক্ত শ্রেণী ছিল, ছিল সমালোচকও। আর সমালোচকদের মূল অস্ত্র ছিল সবারই এক, আর এই একই অস্ত্র তারা টিভিতে পূর্বে কাজ করে চলচ্চিত্রে আসা প্রত্যেকের বিরূদ্ধে ব্যবহার করেন। ‘হুমায়ূন আহমেদ সিনেমা বানান না, বানান বড় দৈর্ঘ্যের নাটক!’ এমন সমালোচনা তার সমসাময়িক পরিচালকরা প্রায়ই করে আসতেন।

যে কোন কিছুর প্রশংসা নিন্দা দুটোই থাকে, থাকবেই, তবে যে নাটকের নাম ধরে তার সিনেমার নিন্দা করা হয়, সে নাটকে তিনি বাংলাদেশের টিভির ইতিহাসে বিপ্লব সৃষ্টি করে গেছেন, সে গল্পই করবো দ্বিতীয় পর্বে।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment