ভারতে গ্যাংস্টার মুভির সংখ্যা নেহায়েত কম না হলেও তার মধ্যে এ নিয়ে সিরিজের চল প্রায় নেই বললেই চলে। ভারতীয় সিরিজ মানেই যেন বৌ-শাশুড়ি এবং পারিবারিক ও দাম্পত্য সংক্রান্ত গল্প। তবে ২০১৮ সালে নেটফ্লিক্স এ ধারা থেকে বের হয়ে ছোট পর্দার দর্শকদের জন্য নতুন কিছু নিয়ে আসার চেষ্টা করে। সাইফ আলি খান, নওয়াজউদ্দীন সিদ্দিকী এবং রাধিকা আপ্টেদের মত তারকাদের নিয়ে তৈরি হয় ক্রাইম থ্রিলার ওয়েব সিরিজ ‘স্যাক্রেড গেমস’।

এ সিরিজটির তুমুল সফলতার পর এবার আরেক ইন্টারন্যাশনাল অনলাইন স্ট্রিমিং জায়ান্ট আমাজন প্রাইম উপমহাদেশে পা রেখেছে আরেকটি ক্রাইম থ্রিলার ওয়েব সিরিজের মাধ্যমে। বলছিলাম আমাজন প্রাইমের তৃতীয় ভারতীয় সিরিজ মির্জাপুর (Mirzapur) এর কথা। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে সিরিজটির প্রথম সিজন মুক্তি পায়। নয় পর্বের এ সিজনে ক্রাইম, ড্রামা, সাসপেন্স কোনো কিছুরই যেন কমতি নেই।

সিরিজটির সাথে স্যাক্রেড গেমস এবং নওয়াজউদ্দীন সিদ্দিকীর হিট মুভি গ্যাংস অব ওয়াসেপুরের কিছুটা সাদৃশ্য পাওয়া গেলেও এটি দেখে মনে হবে যেন সিরিজটি এদের সাথে পাল্লা দেওয়ার জন্যই বানানো। চলুন জেনে আসা যাক সিরিজটির ব্যাপারে।

কাহিনী সংক্ষেপ

ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি মফস্বল শহরের নাম মির্জাপুর। ছোট এ শহরের মাফিয়া ফ্যামিলি হিসেবে দাপটের সাথে বসবাস করছে ত্রিপাটি পরিবার। পরিবারের কর্তা অখন্ডানন্দ ত্রিপাটি ‘কালিন ভাইয়া’ নামেই শহর জুড়ে অধিক পরিচিত। নিকে ‘কিং অব মির্জাপুর’ উপাধি দেওয়া কালিন ভাইয়া আর তার গ্যাং পুরো শহরজুড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে রয়েছে। পিতা সত্যানন্দ ত্রিপাটির গড়া সাম্রাজ্য পুত্র অখন্ডানন্দ যেন আরো পাকাপোক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।

কালিন ভাইয়া চরিত্রে পংকজ ত্রিপাটি; Source: tenor.com

কার্পেটের বৈধ ব্যবসার আড়ালে যেমন তারা চালায় আফিমের ব্যবসা, তেমনি তাদের অবৈধ বন্দুকের ব্যবসাও রয়েছে। ট্রাকের স্টিয়ারিংয়ের নলের সাহায্যে বানানো এ সস্তা বন্দুকের মাধ্যমে তারা পুরো শহরেই বন্দুক বেশ সহজলভ্য করে দিয়েছে যার ফলে আইনের প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। উল্টো পুলিশ যেন তাদের কর্মকান্ডে সহায়তা করতেই অধিক আগ্রহী।

মুন্না ও তার গ্যাং; Source: imdb.com

পিতা অখন্ডানন্দের এ অবৈধ ব্যবসা সামলায় কলেজপড়ুয়া পুত্র ফুলচন্দ ত্রিপাটি ওরফে মুন্না ভাইয়া। পিতা কালিন যেরকম ঠান্ডা মেজাজী পুত্র মুন্না যেন ঠিক ততটাই বেপরোয়া এবং লাগামহীন। মাদকের নেশায় বুদ হয়ে প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানো তার কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এমনকি সম্পূর্ণ বিনা কারণে খুন করতেও পিছপা হয়না সে। নিজ পরিবারের দাপট সর্বদা প্রদর্শনে ব্যস্ত মুন্না চায় নিজের পরিবারের কর্তার আসনে বসতে, কিন্তু তার বেপরোয়া আচরণে তার পিতা কালিন ঠিক যেন ভরসা পান না। তবে প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন আসতে শুরু করে যখন একবার মুন্নার বিপক্ষে এক মার্ডার কেস নেওয়ায় মুন্না সে উকিলকে শাসাতে গিয়ে উল্টো বরং মার খেয়ে আসে।

সিরিজটির একটি দৃশ্য; Source: hindustantimes.com

উকিল রমাকান্ত পন্ডিত একজন সৎ এবং আদর্শবান উকিল যিনি মির্জাপুরে ঘটে যাওয়া এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু ঘটনা চক্রে পড়ে তার দুই পুত্র গুড্ডু পন্ডিত এবং বাবলু পন্ডিত একসময় যোগ দেয় ত্রিপাটি পরিবারের গুন্ডা হিসেবে।

উচ্চভিলাষী দুই ভাই গুড্ডু আর বাবলু খুব দ্রতই মির্জাপুরের দৃশ্যপট পাল্টে দিতে শুরু করে। এদিকে গুড্ডুর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে পুলিশ ইন্সপেক্টরের মেয়ে সুইটি যার প্রেমে আবার মুন্না পাগলপ্রায়। সুইটি গুপ্তর ছোটবোন গোলু গুপ্তর সাথে আবার বাবলুর খুনসুটি চলতে থাকে। তবে এদের কারো কপালেই সুখের স্থায়িত্ব বেশিদিন হয় নি। নিজেদের অন্তকোন্দলের পাশাপাশি বিভিন্ন শত্রুপক্ষেরও আবির্ভাব ঘটতে থাকে,যার ফলশ্রুতিতে যেন এক বিস্ফোরকে পরিণত হয় পুরো মির্জাপুর শহর।

নির্মাণ ও চিত্রনাট্য

মির্জাপুর সিরিজটির নির্মাণ,পরিচালনা এবং চিত্রনাট্যের দায়িত্বে ছিলেন করণ অণ্ষুমান। তিনি ইতোপূর্বে ভারতে প্রযোজিত আমাজন প্রাইমের প্রথম সিরিজ ইনসাইড এজের দায়িত্বে ছিলেন যা কিনা এমি আ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন পেয়েছিল। তাই আমাজন প্রাইমের কর্তাব্যক্তিরা তাকেই মির্জাপুর সিরিজটির জন্য যোগ্য লোক মনে করেছিলেন। নির্মাণের দিক থেকে কোনো অংশেই সিরিজটিতে কমতি নেই। বিশেষ করে খুব সাদামাটা লোকেশন হওয়া স্বত্তেও ক্যামেরার কাজ এবং সিরিজটির এডিটিং বেশ ভালো। এছাড়া আবহ সংগীত এ সিরিজটির আরো একটি শক্তিশালী দিক।

ওয়েব সিরিজ হওয়াতে সিরিজটিতে সেন্সরশিপের বালাই ছিল না। তাই সিরিজটিতে প্রচুর খুন-খারাবি এবং রক্তারক্তির সরাসরি সেন্সরহীন দৃশ্য রয়েছে। এছাড়া পুরো সিরিজ জুড়েই গালিগালাজ এবং আবেদনময়ী খোলামেলা দৃশ্য রয়েছে, তাই সিরিজটি শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বানানো হয়েছে বলা যায়।

বীনা চরিত্রে রাসিকা দুগল; Source: quora.com

চিত্রনাট্যের দিক থেকে মির্জাপুরে নতুনত্ব অনেকটা কম। সিরিজটির প্রথম পর্ব আপনাকে যেভাবে টানবে মাঝখানের পর্বগুলো অতটা টানবে না। সিরিজটির গল্প আপনাকে ইতোপূর্বে দেখা বেশ কিছু বলিউডি গ্যাংস্টার মুভির কথা মনে করিয়ে দিবে যার উদাহারণসরূপ গ্যাংস অব ওয়াসেপুর মুভিটির নাম বলা যায়। সিরিজটির শুরু এবং শেষটা বেশ আকর্ষণীয় হলেও মাঝের কিছু পর্ব অযথা টেনে লম্বা করা হয়েছে বলে আপনার মনে হতে পারে।

বিশেষ করে অভিনেত্রী রাসিকা দুগল দ্বারা অভিনয়কৃত মুন্নার সৎ মা বীনা নামক যে চরিত্রটি রয়েছে, তাকে যেন আনাই হয়েছে সস্তা খোলামেলা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। এ ধরণের পার্শ্ব গল্পগুলো বেশ অমূলক মনে হতে পারে। পরিচালক যদিও কিছু কিছু মুহুর্তে দর্শকদের চমকে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন, তবে তার কোনোটাই অত আহামরি কিছু ছিল না। সিরিজটির সংলাপ গুলো ক্ষেত্রবিশেষে বেশ ভালো হলেও এর ধারাবাহিকতা সব চরিত্রের ক্ষেত্রে দেখা যায় না।

অভিনয় এবং প্রতিক্রিয়া

মির্জাপুর সিরিজটিতে অভিনয়ের মূল প্রাণ অভিনেতা পংকজ ত্রিপাটি কালিন ভাইয়া চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ঠান্ডা মাথার মাফিয়া বস চরিত্রে তার অভিনয় আপনাকে অবশ্যই মুগ্ধ করবে। ধীরে ধীরে এ ধরণের চরিত্রে যেন নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে নিচ্ছেন তিনি। মুন্না চরিত্রে অভিনেতা দিব্যেন্দু শর্মার অভিনয়ও দর্শকদের বেশ ভালো লেগেছে। এছাড়া সিরিজটিতে গুড্ডু এবং বাবলু চরিত্রে আলী ফজল এবং ভিক্রান্ত মাসেই ভালোই মানিয়ে গিয়েছেন। বাদবাকি কলাকুশলীদের অভিনয় মোটামুটি বলা যায়।

বাবলু চরিত্রে ভিক্রান্ত মাসেই (বামে) এবং গুড্ডু চরিত্রে আলী ফজল (ডানে); Source: scoopwhoop.com

অধিকাংশ দর্শকের নিকট মির্জাপুর সিরিজটি বেশ সমাদৃত হয়েছে। সিরিজটির আধুনিক নির্মাণ যেন গতানুগতিক সিরিয়ালগুলো থেকে কিছুটা ভিন্নতা এনেছে বলা যায়। এছাড়া ক্রাইম এবং ভায়োলেন্স সংক্রান্ত খোলামেলা সিরিজের কমতি থাকাই অনেকেরই সিরিজটি বেশ ভালো লেগেছে।

সমালোচক এবং তাদের বিভিন্ন রিভিউয়ের ক্ষেত্রে অবশ্য সম্পূর্ণ বিপরীত দৃশ্য দেখা যায়। সিরিজটি প্রায় সব সমালোচকই প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছেন এবং সাদামাটা এবং ব্যর্থ প্রচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের এ আক্রোশের মূল কারণ সিরিজটির নতুনত্বের অভাব। এছাড়া মাত্রাতিরিক্ত রক্তপাত এবং বেশ কিছু অমূলক চরিত্রের সংযোজনও তাদের বেশ বিরক্ত করেছে বলা যায়। সিরিজটিতে যে ধরণের গ্যাংস্টার চরিত্র দেখানো হয়েছে, তা একেবারে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে দর্শক আকৃষ্ট করার জন্য করা হয়েছে বলে তাদের ধারণা।

সিরিজটি যাদের জন্য

সিরিজটি মূলত পাপ্তবয়স্কদের জন্য যারা ক্রাইম এবং থ্রিলার ধাঁচের গল্প পছন্দ করেন। আপনি যদি মির্জাপুরকে নেটফ্লিক্সের স্যাক্রেড গেমসের মানের টিভি সিরিজ ভেবে থাকেন তবে আশাহত হবেন, তবে মির্জাপুরকে খুব বেশি দূরেও রাখা যাবে না। কারণ এখন পর্যন্ত এ ধরনের বাজেট এবং কাস্টিং নিয়ে সিরিজ খুব বেশি তৈরিই হয় নি।

নেটফ্লিক্সের মতো ভারতীয় বাজার ধরার জন্য হোক অথবা অন্য যে কারণেই হোক না কেন, গতানুগতিক ভারতীয় সিরিয়াল এবং বস্তাপচা অনেক শো এর ভিড়ে আমাজন প্রাইমের এ সিরিজটি নির্মাণ এবং উপস্থাপনের দিক দিয়ে এক নতুন মাত্রা নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। সবকিছু ভালোমন্দ মিলিয়ে দর্শকরা নয় পর্বের এ সিরিজটি বেশ উপভোগ করবেন বলা যায়। সে সাথে অপেক্ষা করতে থাকুম সিরিজটির দ্বিতীয় সিজনের জন্য

Related Article

0 Comments

Leave a Comment