সিরিয়াল কিলার, খুব পরিচিত একটি শব্দ। কখনো কি ভেবেছেন, এই শব্দের উৎপত্তি কোথা থেকে? আজকালকার দিনে সিরিয়াল কিলারদের কথা অহরহ শোনা গেলেও, আগে একটা সময় ছিল যখন সিরিয়াল কিলার শব্দটির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। যখন অপরাধ বিজ্ঞান নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যাথা ছিল না। যখন তারা ধরেই নিত, অপরাধীরা জন্ম থেকেই এমন।

এমনই একটি সময়ের গল্প নিয়ে বানানো মাইন্ডহান্টার সিরিজটি। এফবিআই এজেন্ট জন ডগলাসের বাস্তব জীবনের গল্প নিয়ে লেখা বই মাইন্ড হান্টার: ইনসাইড দ্য এফবিআই’স এলিট সিরিয়াল ক্রাইম ইউনিট অবলম্বনে বানানো।

স্পেশাল এজেন্ট হোলডেন ফোর্ড; Image Source : www.elitedaily.com

কাহিনী সংক্ষেপ

কেন অপরাধীরা অপরাধের সাথে জড়িত হয়? কিভাবে একজন সাধারণ মানুষ একজন অপরাধীতে পরিণত হয়?
যাদেরকে আমরা মানসিক ভারসাম্যাহীন হিসেবে আখ্যায়িত করি, তাদের মাথার ভেতর আসলে কী চলে? তারা আসলে কিভাবে চিন্তা করে? এমনই কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে আমেরিকার ফেডারাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন, এফবিআই এর হোস্টেজ নেগোশিয়েটোর হোলডেন ফোর্ডের মাথায়।  তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার জন্য তিনি আমেরিকার কুখ্যাত খুনিদের সাক্ষাৎকার নেবেন।

শুরু হয় ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার দৈত্যাকার খুনি এড ক্যাম্পারকে দিয়ে। যিনি ১৫ বছর বয়সে তার দাদা-দাদিকে খুন করেন। কেন? কারণ –

আমি দেখতে চেয়েছিলাম, তাদেরকে খুন করতে কেমন লাগে।

এড ক্যাম্পার

কেমন ভয়ংকর চিন্তা-ভাবনা, ভাবা যায়? এতেই শেষ না, দাদিকে খুনের পর ৬ বছর নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকার পর যখন তিনি বেরিয়ে আসেন, তখন আবার তার মাকে খুন করেন।

এড ক্যাম্পারের মুখোমুখি ফোর্ড; Image Source: refinery.com

এরকম ভয়াবহ একজন খুনির সাথে মুখোমুখি বসে, তার সাক্ষাৎকার নিয়ে ফোর্ড চেষ্টা করেন তার সাইকোলজি বোঝার। যদিও এরকম ভয়াবহ খুনিদের এত কাছে যাওয়া, তাদের সাথে এভাবে কথাবার্তা বলা এই ব্যপারটি নিয়ে তার সহকর্মীরা কেউই খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না। তারপরও তাদের সব সমালোচনা উপেক্ষা করে ফোর্ড এড এর  সাক্ষাৎকার নিতে থাকেন। এডও সুযোগ পেয়ে ফোর্ডের সাথে মানসিকভাবে খেলতে (Mind Game) থাকেন।অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এডের সাথে মাইন্ড গেম খেলতে গিয়ে তিনি নিজেই এডের মাইন্ড গেমের শিকার হয়ে ফিরে আসেন।

প্রথম কয়েকবার একাই এডের সাক্ষাৎকার নেয়ার পর অবশেষে ফোর্ড তার সহকর্মী বিলকেও তার প্রজেক্টে কাজ করতে রাজি করান। এর কয়েকদিন পর তাদের দলে যোগ দেন মনরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ওয়েন্ডি কার।

এজেন্ট ফোর্ড (ডানে), এজেন্ট বিল (বামে) এবং ডক্টর ওয়েন্ডি (মাঝে); Image Source: www.flavorwire.com

এভাবে একে একে এসব খুনিদের সাক্ষাৎকার নেয়া চলতে থাকে। ফোর্ড আর বিল এসব খুনিদের শ্রেণিভেদ করেন সিকোয়েন্স কিলার (Sequence Killer) হিসেবে, অর্থাৎ যেসব খুনি একের অধিক খুন করেছে। একদিকে তারা এই সিকোয়েন্স কিলারদের সাক্ষাৎকার নিতে থাকেন। অপরদিকে সেই সাক্ষাৎকারগুলোর রেকর্ডিং শুনে ওয়েন্ডি তাদের মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করেন। ধীরে ধীরে তারা অপরাধীদের মনোবিজ্ঞান বুঝতে শুরু করেন। আর তাদের এই পদ্ধতি ব্যবহার করে কয়েকজন খুনিকে ধরতেও সক্ষম হন।

খুনিদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন ফোর্ড আর বিল; Image Source: vox.com

এতক্ষণে হয়তো বুঝে গেছেন, এই সিরিজে গতানুগতিক ক্রাইম ড্রামার মতো খুনের কেস সমাধান করা হয় না। বরং এখানে সিরিয়াল কিলারদের মন এবং মনের গতি প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা হয়। তাদের মুখ দিয়ে তাদের করা খুনগুলোর গা শিউরানো বিবরণ বের করে আনা হয়। এবং আমরা দেখি, তাদের মনের প্রকৃতি নিয়ে কাজ করতে করতে কিভাবে এক পর্যায়ে তাদের দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকেন এফবিআই এজেন্টরা।

চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা

সিরিজটির প্রথম সিজনে ১০টি পর্ব। গতানুগতিক ক্রাইম ড্রামার মতো না হওয়ার কারণে সিরিজের শুরুতে একটু ধীরগতির লাগতে পারে অনেকের কাছে। কিন্তু দেখতে দেখতে এক পর্যায়ে খেয়াল করবেন, আপনি মাইন্ডহান্টারের দুনিয়ায় হারিয়ে গেছেন।

সিরিজ তৈরিতে আছেন হলিউডের খ্যাতনামা পরিচালক ফাইট ক্লাব, সেভেন, গন গার্ল ইত্যাদি তুমুল জনপ্রিয় মুভির নির্মাতা ডেভিড ফিঞ্চার। ১০টি পর্বের মধ্যে প্রথম দুটি আর শেষ দুটি, মোট ৪টি পর্ব তিনি পরিচালনা করেছেন। ফিঞ্চার, সিরিজের লেখক জো পেনহাল এবং অন্য পর্বগুলোর পরিচালকেরা, সবাই এক কথায় অসাধারণ কাজ করেছেন।

অভিনয়

সিরিজের মূল চরিত্র হোলডেন ফোর্ডের ভূমিকায় ছিলেন জনপ্রিয় টিন ড্রামা গ্লি (Glee) তারকা জনাথন গ্রফ। তার সহকারী বিল টেঞ্চের ভূমিকায় ছিলেন হল্ট ম্যাক কালানি এবং ডাক্তার ওয়েন্ডি কারের ভূমিকায় ছিলেন বিখ্যাত টিভি সিরিজ ফ্রিঞ্জ (Fringe) খ্যাত অ্যানা টর্ভ। সবাই বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। প্রত্যেকটি সিরিয়াল কিলারের ভূমিকায় অভিনয় করা অভিনেতাদের অভিনয় একদম নিখুঁত ছিল। তাদের মুখে তাদের করা খুনের বিবরণ শুনে যে কারো গা শিউরে উঠতে বাধ্য।

এড ক্যাম্পারের ভূমিকায় ক্যামেরন ব্রিটন; Image Source: dreadcentral.com

রিলিজ এবং রেটিং

হালের জনপ্রিয় স্ট্রিমিং সাইট নেটফ্লিক্সে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে সিরিজটির প্রথম সিজন মুক্তি পায়। দ্বিতীয় সিজনের শুটিং চলছে, তবে এখনও মুক্তির তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। মুক্তির পরপরই সমালোচকদের কাছ থেকে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে এই সিরিজ। রটেন টম্যাটোস এ ৯৭% রেটিংই তার চাক্ষুস প্রমাণ। আইএমডিবি রেটিং ৮.৫। সাধারণ দর্শকরাও লুফে নিয়েছেন এই সিরিজ। ডেভিড ফিঞ্চারের ফ্যান এবং ক্রাইম ড্রামা প্রেমীরা, এখনও সিরিজটি না দেখে থাকলে দেখে ফেলুন!

Related Article

0 Comments

Leave a Comment