মানুষে মানুষে পছন্দের পার্থক্য থাকে। সবাই একই রকম খাবার যেমন পছন্দ করে না, কেউ ঝাল পছন্দ করে তো কারো পছন্দ মিষ্টি, কেউ ঝাল পছন্দ করে আবার কারো মুখে তেতোও ভালো লাগে খুব। কেউ পছন্দ করে রঙীন কাপড়, কারো আবার সাদাসিধেতেই স্বস্তি। কেউ পছন্দ করে সারা দেশ, পুরো দুনিয়া চষে বেড়াতে, কারো আবার ছুটির দিনে ঘরের কোণ আর নেটফ্লিক্সটাই বেশি পছন্দ।

পছন্দের মুভি সিরিজের জনরা নিয়ে মানুষের মধ্যে থাকে বিভক্তি। কেউ ক্লাসিক কাজ পছন্দ করে তো কোন থ্রিলার প্রেমীর কাছে তা একরকম বোরিং সময়। থ্রিলারের রকমফেরেও হয় পছন্দের দূরত্ব, হরর প্রেমীরা সায়েন্স ফিকশন থেকে হয়তো দূরে থাকে, এডভেঞ্চার প্রিয় কারো, কারো বা ক্রাইম, কপস থ্রিলারের মত কন সায়েন্সও কম জনপ্রিয় না মুভি সিরিজের দুনিয়ায়।

আচ্ছা, কেমন হতো যদি থ্রিলারের সব পছন্দের জনরাকে ব্লেন্ডারে রেখে জুসের মতো ব্লেন্ড করেই পরিবেশন করা হয়?

কেমন হবে তা হয়তো নির্ভর করবে কোনটা কি পরিমাণ আর কেমন অনুপাতে মেশানো হয়েছে তার উপর। সঠিক অনুপাতে মেশানো হলে সুস্বাদু হবে, অনুপাত ঠিক না থাকলে বিস্বাদ হয়ে যাওয়াও অযৌক্তিক কিছু না।

টিভি সিরিজ লস্ট এর পোস্টার ; Image Source: realitybite.com

এবিসি টিভি চ্যানেলে ২০০৪ সাল থেকে প্রচার শুরু হওয়া লস্ট টিভি সিরিজটিকে প্রথম ক্যাটাগরিতে রাখা যায়৷

লস্ট এমনই একটা টিভি সিরিজ, যেটি শুরুতে নিছকই সারভাইভাল এডভেঞ্চার জনরায় ফেলে দিয়ে দর্শক প্রতি পদে পদে হোঁচট খেতে থাকে নিজের ভুল নিয়ে। আর সংশয়ে ডুবতে থাকে সিরিজের জনরা নির্ধারণ করতে গিয়ে, হরর নাকি সায়েন্স ফিকশন, কন থ্রিলার না ফ্যান্টাসি? সাইকোলজিক্যাল থ্রিলও বেশ ভালোই টের পেয়েছে লস্ট প্রেমীরা,

কাহিনী সংক্ষেপ

অস্ট্রেলিয়া থেকে নিউইয়র্কগামী একটি উড়োজাহাজ হঠাৎ করেই মুখ থুবড়ে নীচের দিকে পড়তে থাকে। পাইলট বহু চেষ্টা করেও সামলাতে পারেন না, দু খন্ড হয়ে যাওয়া প্লেনটা আছড়ে পড়ে একটা জনশুন্য দ্বীপের দু প্রান্তে।

মুখ থুবড়ে পড়া বিমানের দিকে তাকিয়ে হতবিহ্বল বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা ; Image Source: popoptic.com

আহত প্রায় সবাই, নিহতও অনেকে। তবে যারা বেঁচে গেল, তারা জড়িয়ে গেল যেন আরো বড় রহস্যে। একটা রহস্য বরং বলেই দেয়া যাক, জন, মেরুদন্ডে আঘাত পেয়ে কোমরের নীচে থেকে অচল একজন মানুষ প্লেনে উঠেছিলেন এয়ার হোস্টেজদের সহায়তায়, এমনকি প্লেন অ্যাকসিডেন্টের আগে যখন সবার মতো সেও প্যানিকড হয়ে গেছে, তখনো তার নড়বার চড়বার উপায় নেই কারো সাহায্য ছাড়া। আর সে সময় কে ই বা সাহায্য করতে যাবে তাকে, দিকশূন্য জ্ঞানহীন তো সবারই অবস্থা।

সেই জনই অ্যাকসিডেন্টের পর যখন জ্ঞান ফিরে পেলেন, মাটিতে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই টের পেলেন তিনি তার পা নাড়াতে পারছেন।

পরবর্তীতে দেখা যায়, জন হাঁটতে দৌড়াতে তো পারছেনই, দ্বীপে আটকে পড়া সবার মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। জনশূন্য এই দ্বীপে টিকে থাকার লড়াইয়ে সবচেয়ে কার্যকর যোদ্ধা হয়ে গেল জন নিজেই।

জ্যাক, যে একজন চমৎকার ডাক্তার, সদা সুন্দর ব্যবহার করা একজন মানুষ কিন্তু সারাজীবন থেকে গেছেন বাবার ছায়ায়, বাবার চেয়েও মেধাবী সার্জন হয়েও ছাপিয়ে না গিয়ে বরং বারবার বাবার ছায়ায় হারিয়ে গিয়েছেন বারবার, সেই জ্যাককেই দ্বীপে আটকে পড়ার পর সবাই কিভাবে কিভাবে যেন সবার নেতা ভাবতে শুরু করলো। নেতৃত্ব দিতেও থাকলেন চমৎকারভাবে জ্যাক, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে।

ক্যাট, পুলিশ-এফবিআই যাকে ভয়ংকর সন্ত্রাসী অপরাধীর তকমা দিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছিল, যে বহু বছর ধরে সৎ বাবাকে খুনে অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের হুলিয়া মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল বহু বছর, দ্বীপে এসে সেই ক্যাটই হয়ে গেল প্রত্যেকের খোঁজখবর রাখা, সবার প্রতি ভীষন যত্নশীল মমতাময়ী এক নারী।

এ যে উল্টে গিয়ে পাল্টে যাওয়ার এক অনবদ্য চিত্র৷ তবে চিত্রটা কেবল এইটুকুতেই বোঝা যাবে না, মনে হতে পারে, এ তো নেহাৎই টিকে থাকার লড়াই, অন্য অনেক প্রোগ্রামের মতো সারভাইভাল শো!

লড়াইয়ের মাঝেই যখন দ্বীপে অন্য কারো অস্তিত্বের খোঁজ তারা অনুভব করতে শুরু করবে, তখন মনে হবে গা হিম করা হরর কোন শো, আবার দ্বীপের মাঝে তারা এমন এক গর্তে তৈরী ঘরে সকল প্রকার আধুনিক সুযোগ সুবিধা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সন্ধান পাবে, তখন হয়তো একে সায়েন্স ফিকশন ফিল্মও মনে হতে পারে।

আবার একটার পর একটা অতিপ্রাকৃত রহস্য যখন দর্শকের মনে উঁকি দিয়ে সমাধানের দিকে টানতে চায়, আর সমাধানের পূর্বেই নতুন রহস্য, নতুন প্রশ্ন দোরগোড়ায় এসে হামাগুড়ি খায়, তখন একে এক জবরদস্ত ফ্যান্টাসি না বলেই কি উপায়?

আর এতো কিছুর মাঝে দীর্ঘকাল ধরে চরিত্রগুলোকে দেখতে দেখতে দারুণ একটা সাইকোলজিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স হয়ে যাবে। হিউম্যান সাইকোলজি যে কত বিচিত্র, তার চমৎকার একটা উদাহারণ লস্ট টিভি সিরিজে দাঁড় করিয়েছেন নির্মাতা।

আর মনে মধ্যে কৌতুহল দানা বেঁধে কেবল বড়ই হতে থাকবে, কোথা থেকে, কেন, কী কারণে হচ্ছে এতো কিছু, এতো বিচিত্র রহস্যের শুরুটা কোথায়?

অভিনয়

জ্যাক শেফার্ডের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ম্যাথিউ ফক্স। কেট অস্টিনের চরিত্রে ইভ্যানজলাইন লিলি এবং জেমস সয়্যার ফর্ডের চরিত্রে জশ হলওয়ে। পুরো সিরিজে বি নোদন দিয়ে যাওয়া হুগো হার্লির চরিত্রটি চিত্রায়ন করেছেন জর্জ গার্সিয়া। জন লকের চরিত্রে টেরি ও’কুইন, মাইকেলের চরিত্রে হ্যারল্ড হ্যারল্ড পেরিনেয়ি, মাইকেলের পুত্র ওয়াল্টের চরিত্রে ম্যালকম ডেভিড ক্যালি ছিলেন। এছাড়াও ম্যাগি গ্রেস, ন্যাভিন এন্ড্রুস, এমিলি ডি রাভিন, ইয়ানজিন কিম, ড্যানিয়েল ডি কিম, মোনাঘান সহ আরো অনেকেই সিরিজটিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

লস্টে অভিনয় করেছে প্রচুর অভিনেতা অভিনেত্রীরা ; Image Source: hemelte.blogspot.com

একই সাথে দীর্ঘ এবং বড় পরিসরে নির্মিত লস্ট টিভি সিরিজে অনেক চরিত্র থাকায় হুট করে সবাইকে মনে করা কিংবা মনে রাখা একটু কঠিনই বৈকি। তবে স্টোরিলাইন এতো বেশী কৌতুহল জাগাবে যে মনোযোগ ধরে রাখতে তেমন কষ্ট হবেও না।

চিত্রনাট্য ও পরিচালনা

জেফরি লেইবার, জে. জে. এ্যাব্রামস এবং ডেমন লিন্ডলফ একত্রে টিভি সিরিজটি নির্মাণ করেন। তাদের সাথে আরো নয় জন পরিচালক নির্মাণ সহায়তায় ছিলেন।

মিউজিক

সিরিজের মাঝে মাঝেই চমৎকার আবহ সঙ্গীত তৈরীর কৃতিত্ব মিখাইল গিয়াচিনোর।

সিজন এবং এপিসোড

ছয়টি সিজনে মোট ১২১ টি এপিসোডে নির্মিত হয়েছে সিরিজটি।
প্রথম সিজনে ২৫টি, দ্বিতীয় সিজনে ২৪ টি, তৃতীয় সিজনে ২৩ টি, চতুর্থ সিজনে ১৪ টি, পঞ্চম সিজনে ১৭ টি এবং মেষ সিজনে ১৮ টি এপিসোড ছিল।

রেটিং

আইএমডিবি রেটিং – ৮.৪

মেটা ক্রিটিক রেটিং – ৮৪%

রোটেন টমেটো – ৯০%

এ্যাওয়ার্ড

একটি গোল্টেন গ্লোব সহ ১০৯ টি এ্যাওয়ার্ড জিতে লস্ট

এ্যাওয়ার্ড হাতে লস্ট টিম ; Image Source: pinterest.com

এছাড়া বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ৩৭৯ টি ক্যাটাগরিতে নমিনেশন পায়।

কেন দেখবেন সিরিজটি?

ছোটবেলার বর্ণ পরিচয়ের বই ‘একের ভেতর পাঁচ’ কিংবা বিভিন্ন মাল্টি টুল কিট যেমন কাজের, তেমনি একই সিরিজে বিভিন্ন জনরার স্বাদ পাওয়া টিভি সিরিজ বিস্বাদ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

আর বিপন্ন পরিবেশে মানব চরিত্রের অন্ধকার দিক প্রকাশের এমন নিদারুণ চিত্র খুব কমই পর্দায় দেখাতে পেরেছে কেউ।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment