জোম্বি, আমাদের সবার কাছেই অনেক পরিচিত একটি জনরা। জোম্বিদের নিয়ে বানানো মুভি বা টিভি সিরিজের অভাব নেই। কিন্তু একই সাথে হরর, থ্রিলার এবং ইতিহাসের এমন দারুণ মিশেলে সৃষ্ট জোম্বি সিরিজ এই প্রথম দেখলাম। সিরিজটি দেখে দক্ষিণ কোরিয়ান মুভি ট্রেন টু বুসান (বোধহয় এখন পর্যন্ত আমার সবচেয়ে পছন্দের জোম্বি মুভি) এর কথা মনে করিয়ে দিলো।

কাহিনী সংক্ষেপ

মধ্যযুগীয় কোরিয়া (জোসেওন ডাইনেস্টি)। সিংহাসনে আছেন রাজা চ্যাং। যদিও তার আড়ালে সব কলকাঠি নাড়ছেন রাজার দ্বিতীয় স্ত্রী কুইন চো, কুইন চো এর বাবা চো হাক জু। রাজার অন্তরালে সবকিছুই আসলে শক্তিশালী চো পরিবারের হাতের মুঠোয়। তাদের পথের কাঁটা হয়ে আছেন রাজার প্রথম স্ত্রীর ছেলে, ক্রাউন প্রিন্স ইয়ি চ্যাং। রাজার অবর্তমানে তিনিই সিংহাসনে বসবেন। তবে রাজার দ্বিতীয় স্ত্রী, অন্তঃসত্ত্বা কুইন চো যদি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন, তাহলে ইয়ি চ্যাং এর অবস্থান হুমকির মুখে পড়ে যাবে।

ক্রাউন প্রিন্স ইয়ি চ্যাং; Image Source: IMDb.com

এমন অবস্থায় হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন রাজা। এরপর নিরুদ্দেশ হয়ে যান তিনি। ১০ দিন পরও তার হদিস পাওয়া না গেলে দেশজুড়ে গুজব রটে যায় যে, রাজা মৃত্যুবরণ করেছেন এবং পরবর্তী উত্তরসূরি হিসেবে সিংহাসনে বসবেন ক্রাউন প্রিন্স চ্যাং। এসব গুজব সামাল দিতে চো পরিবার দাবি করে যে, রাজা এখনও বেঁচে আছেন। ভয়াবোহ এক ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তার আশেপাশে কাউকে যেতে দেয়া হচ্ছে না। 

কুইন চো; Image Source: IMDb.com

এদিকে, প্রিন্স চ্যাং এর ধারণা হয়, এ সবই আসলে সিংহাসন দখল করার জন্য চো পরিবারের ষড়যন্ত্র। তার বাবার আসলেই কোনো রোগ হয়েছে, তিনি আদৌ বেঁচে আছেন কিনা, এসব তদন্ত করতে সাধারণ মানুষের ছদ্মেবেশ নিয়ে রাজধানী হানইইয়াং (বর্তমান সিউল) থেকে দংনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন প্রিন্স চ্যাং। দংনেতে অবস্থানরত রাজকীয় ডাক্তারই পারবেন তার এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে।

দংনেতে পৌঁছে তিনি দেখতে পান এক ভয়াবহ দৃশ্য। কোনো এক নাম না জানা রোগের কারণে সেখানকার অধিকাংশ মানুষ এখন এক ভয়ংকর রাক্ষসে সোজা ভাষায় জোম্বিতে পরিণত হয়েছে। এসব জোম্বি আবার যেনতেন জোম্বি না, এরা দিনের বেলা মৃত মানুষের মতো পড়ে থাকে। তাদের সেই রূপ দেখলে কেউ ধারণাই করতে পারবে না যে, তারা আসলে জীবিত। দিনের আলো ফুরিয়ে গেলে, অন্ধকার হলেই তারা সেই মৃত দশা থেকে জেগে ওঠে মানুষ খাওয়ার লোভে। আর তাদের কামড়ের ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই আক্রান্ত মানুষটিও জোম্বিতে পরিণত হয়।
প্রিন্স চ্যাং কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারিদিকে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে এই ভয়াবহ রোগ। 

জোম্বিদের আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত দংনে; Image Source: IMDb.com

এদিকে রাজধানী হান্যিয়াং এ চলছে আরেক নাটক। চো পরিবার তাদের পথের কাঁটা ক্রাউন প্রিন্সকে হটাবার উদ্দ্যেশ্যে গুজব রটায়, প্রিন্স চ্যাং সিংহাসন দখল করার জন্য রাজার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। এই অপরাধে এখন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। 

একদিকে চো পরিবারের গেম অব থ্রোন্স, আরেকদিকে মহামারীর মতো ছড়াতে থাকা এই নাম না জানা রোগ। চ্যাং কি পারবেন এসবের হাত থেকে তার দেশকে রক্ষা করতে?


জম্বিদের আক্রমণ রুখতে প্রস্তুত প্রিন্স চ্যাং; Image Source: IMDb.com

চিত্রনাট্য এবং অভিনয়

দারুণ সিনেমাটোগ্রাফিই। হরর আর থ্রিলারের সংমিশ্রণে আকর্ষণীয় একটি প্লট। সেই সাথে আছে ইন্টেন্স ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। পুরো সিরিজ জুড়ে রয়েছে টানটান উত্তেজনা। এক বসায় টানা পুরো সিজন শেষ করে ফেলার পর মনে হলো, সিজনে মাত্র ৬টি এপিসোড না থেকে আরও বেশি থাকলে ভালো হতো। অভিনয়ে আছেন নেটফ্লিক্সেরই জনপ্রিয় সিরিজ সেন্স ৮ খ্যাত কোরিয়ান অভিনেত্রী বে দু না (Bae Doo Na)। যদিও তাকে খুব অল্প সময়ের জন্য পর্দায় দেখা গেছে। প্রিন্স চ্যাং এর চরিত্রে প্রথমে জনপ্রিয় কোরিয়ান অভিনেতা সং জুং কি কে নেয়ার কথা থাকলেও পরবর্তিতে অভিনেতা জু জি হুন কে নেওয়া হয়।

রোগীদের শুশ্রূষা করছেন বে দু না; Image Source: IMDb.com

পরিচালনা এবং রেটিং 

সিরিজটির প্রযোজনা এবং পরিচালনায় আছেন ২০১৬ এর ব্যবসাসফল সাউথ কোরিয়ান মুভি টানেল এর পরিচালক, এবং কোরিয়ান টেলিভিশনের অন্যতম হাই রেটিং ড্রামা সিগনাল এর লেখক কিম ইউন হি (Kim Eun Hee)। প্রায় ৭ বছর ধরে এই সিরিজের পরিকল্পনা করছিলেন তিনি। কিন্তু সিরিজের অত্যাধিক সহিংসতার কারণে কোরিয়ান কোনো টিভি চ্যানেলই এটি সম্প্রচার করতে রাজি হয়নি। এরপর যখন নেটফ্লিক্সের কাছ থেকে সিরিজ সম্প্রচারের অফার পেয়ে তিনি সেই সুযোগ লুফে নেন।

বিশাল বাজেট নিয়ে শুরু করার পরও সিরিজের প্রতিটি পর্বই সেই বাজেটকে অতিক্রম করে গেছে। প্রত্যেক পর্বের পিছনে প্রায় ১.৭৮ মিলিয়ন ইউ এস ডলার খরচ হয়েছে। এটুকু শুনেই বুঝে ফেলার কথা, এই সিরিজ যেন তেন কোনো সিরিজ না! তাদের এই বিশাল খরচের ফলাফলও মিলেছে। সিরিজটির আই এম ডি রেটিং ৮৪ এবং রটেন টম্যাটোস রেটিং ৮০%।

সিরিজ মুক্তির পরপই সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে সমালোচক, সবার কাছেই প্রশংসা কুড়িয়েছে এই সিরিজ। কেউ কেউ তো একে এখন পর্যন্ত সেরা জোম্বি সিরিজের উপাধিও দিয়ে দিয়েছেন। ২৫ জানুয়ারি, ২০১৯ এ নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া সিরিজটির প্রথম সিজনের দারুণ সফলতার পর সিরিজটি ইতোমধ্যেই দ্বিতীয় সিজনের জন্য নতুনভাবে তৈরি করা হয়ে গেছে। ফেব্রুয়ারি মাস থেকে নতুন সিজনের শুটিংও শুরু হয়ে গেছে।

কেন দেখবেন এই সিরিজ?

যেমনটা শুরুতেই লিখেছিলাম, জোম্বি নিয়ে বানানো মুভি বা সিরিজ অনেকই দেখেন। কিন্তু কিংডম এর মতো এমন ভিন্ন ধারার সিরিজ আর পাবেন না।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment