কৌশিক গাঙ্গুলির চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ‘খাদ’ টলিউডের একটি প্রতিশ্রুতিশীল ছবি। ব্যবসা সফল এই ছবিটি গতানুগতিক গল্পের আবহ থেকে বেরিয়ে এসে দর্শকদের রুচিতে এনেছে ভিন্নতা। অনেকগুলো চরিত্রের সমাগম ঘটানো সিনেমার অসুবিধা এই যে, গল্পের গতি হুটহাট দিক পরিবর্তন করে ফেলে। এতে মনোযোগ ধরে রাখা সম্ভব হয় না। কিন্তু ‘খাদ’ এর কাহিনীটি সত্যিই সিনেমাপ্রেমীদেরকে শুরু থেকে শেষপর্যন্ত এক সুতোয় গেঁথে রাখবে। ব্যতিক্রমী গল্প, দৃঢ় অভিনয়, চমৎকার দৃশ্যায়ন, ভিন্ন স্বাদের সঙ্গীত আয়োজনের জন্য ছবিটি আলোচনায় এসেছিল। আরেক আলোচিত ছবি ‘অপুর পাঁচালী’র পর কৌশিক গাঙ্গুলির একটি সফল সংযোজন এই ‘খাদ’। এর মাধ্যমে তিনি দর্শকদের নিজের জাত চিনিয়েছেন বলা যায়।

‘খাদ’এর একটি দৃশ্যে সবাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে; Source : hoyejak

কাহিনী সংক্ষেপ

গল্পটা একদল পর্যটকের। যারা নিজেদের সঙ্গী বাদে অন্যকারো সাথে পরিচিত নয়। হানিমুনে বেড়াতে আসা সদ্য বিবাহিত দুই তরুণ-তরুণী, এক পুরোনো দম্পতি ও তাদের ছেলেমেয়ে, একজন ক্যান্সার আক্রান্ত মা ও তার বয়স্ক ছেলে, খ্রিস্টান ধর্মের একজন যাজক, টিভি সিরিয়ালের অভিনেত্রী ও তার অস্বাভাবিক ভাই, একজন ট্র্যাকার, বাসের হেলপার, সন্দেহজনক দুজন ভাই বোন এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। এদের কারো সাথে কারো মিল নেই, আলাপ তো নয়ই। কিন্তু নিয়তি তাদের সবাইকে এক সুতোয় গেঁথেছে। তারা আটকা পড়েছে জলপাইগুঁড়ি জেলার শুনশান নিউ মল জংশনে।

স্টেশন চত্বরে দন্ডায়মান অবস্থাতেই সকলে জানতে পারল যে, উত্তর বাংলায় যাবার সমস্ত ট্রেন ধর্মঘটের কারণে বন্ধ রয়েছে। আপাতত তাদের সামনে এগোবার বা পেছনে ফেরার দুটো সম্ভাবনাই ক্ষীণ। তবু যে যার মতো উপায় খুঁজে চলেছে। অবশেষে সেই ধর্ম যাজকটি সফল হয়। পাশের গীর্জা থেকে তিনি একটি মিনি বাস সংগ্রহ করেন এবং সবাইকে আমন্ত্রণ জানান।

‘খাদ’এর একটি দৃশ্য; Source : Dailymotion

উত্তর বাংলার বৈচিত্রময় রূপ, প্রকৃতির গা বেয়ে বাসটি ছুটতে থাকে। কিন্তু সেই অনাকাঙ্খিত ভ্রমণ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। পাহাড়ি বিপদসঙ্কুল রাস্তায় বাসটি দুর্ঘটনার স্বীকার হয়ে খাদে পড়ে যায় এবং সকলে কমবেশি আহত হয়। এদিকে বেলা গড়িয়ে আসছিল। এই পাহাড়ি জঙ্গল সমৃদ্ধ জায়গায় দিনের আলো আছে আর বড়জোর ২/৩ ঘন্টা। এই অল্প সময়ে সঠিক পথ খুঁজে ৪০০/৫০০ ফুট উঁচুতে পৌঁছানো অসম্ভব। বরং রাতটা এই বেজ ক্যাম্পের মতো জায়গায় কাটিয়ে সকালে ভিন্ন কোনো পথ খুঁজে বের করাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে ট্র্যাকার মনে করেন।

নদীটি দুটো পাহাড়কে বিরহে ফেলে দিয়েছে। পাশাপাশি দাঁড়িয়েও ওরা কেউ কাউকে ছুঁতে পারছে না। হালকা শীতের মৌসুম। তাই ব্যস্ত হাতে আগুন জ্বালানো হলো। ওপাশে একটি তাঁবু। তাতে সবার জায়গা হবে না। অগত্যা সবাই যার যার অবস্থান থেকে সেই আগুনের পাশে নিজেকে সঁপে দিয়ে যেন এক হয়ে গেল। কিন্তু রাত ঘন হয়ে এলে সন্দেহজনক সেই ভাই-বোনের মুখোশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। এরই রেশ ধরে যাজক একটি অদ্ভুত খেলার প্রস্তাব করেন। প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু সত্য আছে, যা তারা সকলের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে। যা জগত সংসারের ঐ উন্মুক্ত ধারায় প্রকাশ করার মতো সাহস নেই। সেই কথাগুলো আজকে এই খাদে ফেলে রেখে যেতে হবে। কালকের ভোরটি হবে সকলের জীবনে নতুন করে শুরু করার প্রথম অধ্যায়।

‘খাদ’এর একটি দৃশ্যে গার্গি রায় চৌধুরী ও লিলি চক্রবর্তী; Source : The Indian Express

চিত্রনাট্য ও পরিচালনা

‘খাদ’ এর চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন কৌশিক গাঙ্গুলি নিজেই। শ্রী ভেঙ্কটেশ ও সুরিন্দর ফিল্মের ব্যানারে ছবিটির দৃশায়নের জন্য কোশিক বেছে নেন প্রতিভাবান চিত্রগ্রাহক সৌমিক হালদারকে। প্লটের ভাবনা, চরিত্রায়ন, সংলাপ, অভিনেতা-অভিনেত্রী নির্বাচন থেকে শুরু করে আবহ সঙ্গীত, সবকিছুতেই ছিল মুন্সিয়ানার ছাপ। যারা কৌশিক গাঙ্গুলিকে চেনেন, তারা সকলে জানেন যে, বর্তমান সময়ে কৌশিক মানেই অন্যরকম ভাবনা, অন্য এক ধারার জন্ম দেওয়া।

২০০৪ সালে ‘ওয়ারিশ’ ছবির মাধ্যমে সিনেমা জগতে পা রাখা কৌশিক গাঙ্গুলি একে একে উপহার দেন জ্যাকপট (২০০৯), রঙ মিলান্তি (২০১১), ল্যাপটপ (২০১২), শব্দ (২০১৩), অপুর পাঁচালী (২০১৩), বাস্তুসাপ (২০১৬), বিসর্জন (২০১৭), কিশোর কুমার জুনিয়র (২০১৮), বিজয়া (২০১৯) এর মতো আলোচিত ছবি।

‘খাদ’এর শ্যুটিং; Source : IMDb

কিন্তু খাদের গল্পটি যেন একেবারে ভিন্ন স্বাদের। কৌশিক যে বাংলা ছবির জগতে রাজত্ব করতে মোটেও পিছুপা হবেন না, এ যেন তারই আভাস ছিল। এতগুলো চরিত্রকে সাজিয়ে গুছিয়ে, প্রত্যেকের জীবনের আলাদা গল্প, আলাদা দুঃখগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে তিনি ‘খাদ’ উপস্থাপন করেন। কোথাও একমুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি- গল্পটা টলে গেছে।

বরং কোনো কোনো দৃশ্যে, কোনো কোনো সংলাপে এমন হয়েছে যে, দর্শকরা পেছনে টেনে গিয়ে বারবার দেখেছেন। কখনো বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে উঠেছে। কখনো জয় হয়েছে ভালোবাসার, কখনো বা জেদের কাছে পরাজিত হয়েছে সিদ্ধান্তের। কেউ বা নিজের ভেতরকার অভিমানের গরল উগরে দিয়েছে সবান্ধবে। আজকে যেন আর জীবনের কোনোরূপ বাঁধা নেই, নেই কারো আঘাত পাবার সম্ভাবনা। সবাই সবার দুঃখটুকু এই নদীর কাছে বিলিয়ে দিয়ে যাবে।

ট্র্যাকার চরিত্রে কমলেশ্বর মুখার্জী; Source : IMDb

অভিনয় ও সঙ্গীত

‘খাদ’ ছিল একঝাঁক প্রতিভাবান অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মিলনমেলা। কমলেশ্বর মুখার্জী, লিলি চক্রবর্তী, রুদ্রনীল ঘোষ, সাহেব ভাট্টাচার্য, মিমি চক্রবর্তী, ভারত কাউল, তানুশ্রী চক্রবর্তী, পল্লবী চ্যাটার্জী, কৌশিক ব্যানার্জী থেকে শুরু করে স্বয়ং কৌশিক গাঙ্গুলী পর্যন্ত।

এখানে কমলেশ্বরের স্বভাবসিদ্ধ গম্ভীর্য্য দারুণভাবে প্লটের সাথে মিলে গেছে। হানিমুন দম্পতির চরিত্রে মিমি ও জিত বেশ খুনসুঁটির আবহ গড়ে তুলেছিল। ছুটি কাটাতে বাইরে আসা পরিবারটিকে আপাত দৃষ্টিতে পোক্ত মনে হলেও তার ভেতরটা ঘুণে ধরে ভেঙে যাচ্ছে। পল্লবী চ্যাটার্জি, কৌশিক ব্যানার্জী ও ত্রিধা চৌধুরী এর অনবদ্য অভিনয় সে প্রতিচ্ছবিকে আরো স্পষ্ট করেছে। গার্গী রায় চৌধুরী ও রাজদ্বীপ ঘোষের বোঝাপড়া ভাই-বোনের চিরন্তন শুদ্ধতাই প্রকাশ করে।

‘খাদ’এর একটি দৃশ্যে কৌশিক গাঙ্গুলি ও রুদ্রনীল ঘোষ; Source : IMDb

অসুস্থ মা লিলি চক্রবর্তী ও তার ছেলের চরিত্রে কৌশিক গাঙ্গুলীর আক্ষেপপূর্ণ অনুযোগ, যা কখনো মুখ ফুটে বলা যায় না, অথচ নিজের ভেতর সেঁধিয়ে গিয়েও সেই ব্যাপারটা খোলাসা করার ভাবনাটা দর্শক হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছে বলে আমার বিশ্বাস। আবার ভারত কাউল ও তনুশ্রী চক্রবর্তীর লুকোছাপার খেলা আমাদেরকে এক অমোঘ সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এছাড়াও ধর্ম যাজক, স্কুল শিক্ষক, বাসের কন্ডাকটর চরিত্রের স্বরূপ ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন যথাক্রমে আর্ধেন্দু ব্যানার্জী, মাসুদ আকতার ও রুদ্রনীল ঘোষ।

‘খাদ’ এর সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন ইন্দ্রদ্বীপ দাসগুপ্ত। তার কম্পোজিশনে ছবিটিতে চমৎকার দুটি গান সংযুক্ত হয়েছে। শ্রীজাতো ও কৌশিক গাঙ্গুলীর লেখা গানগুলো গেয়েছে অরিজিত সিং ও স্বয়ং ইন্দ্রদ্বীপ। এর মধ্যে ‘আসাতমা সাধগামায়া’ গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

‘খাদ’এর একটি দৃশ্যে সাহেব ভট্টাচার্য, মিমি চক্রবর্তী ও ত্রিধা চৌধুরী; Source : IMDb

বক্স অফিস ও রেটিং

ভিন্ন ধারার গল্প ও অনবদ্য অভিনয়ের জন্য টলিগঞ্জের এই আলোচিত ছবিটি অনেক গুণীজনের প্রশংসা কুড়ালেও বক্স অফিসে আশানুরূপ আয় করতে পারেনি। আইএমডিবি রেটিং হিসেবে ‘খাদ’কে ১০-এ ৭.২ দিয়েছে। এছাড়া টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এক রিভিউয়ে ৫৮,৮৮৮ জন মন্তব্যকারীদের পছন্দ যোগ করলে এর গড় রেটিং দাঁড়ায় ৩.৫/৫।

যে কারণে সিনেমাটি আপনাকে টানবে

‘খাদ’ আগাগোড়া কয়েকটি খণ্ডকালীন জীবনধর্মী প্লটের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও এর ভেতর উত্তেজনার কোনো কমতি নেই। যারা থ্রিলার জনরার মুভি দেখতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি আদর্শ না হলেও এর ভেতরকার উত্তেজনাকে একেবারে এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই। আবার টানা অনেকগুলো অ্যাকশন ধর্মী সিনেমা দেখার পর আপনার একঘেয়েমি কাটানোর চমৎকার উপায় হতে পারে ‘খাদ’।

রাতের বেস ক্যাম্পের দৃশ্য; Source : ShareSpark.net

গল্পের টুইস্ট নিয়ে বলার কিছু নেই। শুরু থেকে মাঝ, মাঝ থেকে শেষপর্যন্ত যে সুতো আপনাকে বেঁধে রাখবে, শেষ অবধি সে আপনাকে কোথায় নিয়ে যাবে- তার ভাবনা আপনি কখনোই ভাবেননি। আর শুরুতে একটু বিরক্ত লাগতে পারে। কিন্তু যারা কেবলই গল্প চান না, বরং দৃশ্যায়ন, আবহ সঙ্গীত, অভিনয়ের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে থাকেন, তাদের উচিত একটু ধৈর্য ধরে গল্পের মধ্যে প্রবেশ করা। এরপর গল্পটা আপনাআপনি টেনে নিয়ে যাবে সভ্যতার বাইরের সেই জগতে, যেখানে আপনি কেবল নিজের দিকে তাকাতে পারেন। সেখানে কেউ কারো নয়।

Feature Image Source : Times of India

Related Article

0 Comments

Leave a Comment