স্ট্যানলি কুব্রিককে হলিউডের সেরা নির্মাতাদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রায় পুরোটা জুড়ে এ নির্মাতা বিশ্বকে উপহার দিয়ে গিয়েছেন বেশ কিছু অসাধারণ মুভি। তার কাজের সংখ্যা অন্যান্য অনেক পরিচালক থেকে খুব একটা বেশি না হলেও মানসম্মত কাজের কারণে তিনি আজও বেচে আছেন তার মুভির দর্শকদের মাঝে।

গুণী এ পরিচালক ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে ১৯৮৭ সালে নির্মাণ করেন যুদ্ধের মুভি ফুল মেটাল জ্যাকেট (Full Metal Jacket)। এ মুভিতে তুলে ধরা হয়েছে দুজন সেনাসদস্যের প্রশিক্ষণের জীবন এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গী হতে যুদ্ধের ভয়াবহতা। চলুন জেনে আসা যাক এ মুভিটির সম্পর্কে।

কাহিনীসংক্ষেপ

ফুল মেটাল জ্যাকেট মুভিটির নামকরণ করা হয়েছে রাইফেলের জন্য ব্যবহৃত ৭.৬২ মি.মি. বুলেটের নামানুসারে। মুভিটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত, প্রথম অংশে তুলে ধরা হয়েছে একদল আমেরিকান যোদ্ধাদের আর্মি বুটক্যাম্পের কঠোর ট্রেনিংয়ের জীবন এবং দ্বিতীয়ার্ধে তুলে ধরা হয়েছে তাদের মধ্যকার একজন সেনাসদস্যের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা।

গানারী সার্জেন্ট হার্টম্যানের চরিত্রে লী এরমি ; Source: youtube.com

প্রথমার্ধে আমরা দেখতে পাই ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালীন আমেরিকার এক বুটক্যাম্পে যুদ্ধ অংশগ্রহণে ইচ্ছুক বেশ কিছু যুবকের আগমন ঘটে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কিছুটা আলাভোলা স্বভাবের লিওনার্ড লরেন্স ওরফে গোমার পাইল এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধির জে.টি. ডেভিস ওরফে জোকার। তাদের প্ল্যাটুনের দায়িত্বে ছিলেন কঠোর এবং নির্দয় ড্রিল ইনস্ট্রাক্টর সার্জেন্ট হার্টম্যান।

সার্জেন্ট হার্টম্যান তার কঠিন অনুশীলনের মাধ্যমে ক্যাডেটদের প্রস্তুত করতে থাকেন। তবে ক্ষেত্রবিশেষে তিনি ছিলেন অতিরিক্ত কঠোর। পাইল বাকিদের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকায় সার্জেন্ট হার্টম্যান তাকে যুদ্ধের জন্য গড়ে তোলার জন্য কঠিন অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যান। তবে এ অনুশীলন পাইলকে শারীরিকভাবে কঠোর করে তুললেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলে যার শেষ পরিনতি হয় কল্পনাতীত।

মুভিতে দেখানো ট্রেনিংয়ের একটি দৃশ্য; Source: youtube.com

মুভিটির দ্বিতীয়ার্ধে আমরা এগিয়ে যায় বেশ কিছু বছর পার হয়ে, কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে আমরা দেখতে পাই পূর্বে পার্শ্বনায়কের আসনে থাকা জোকারকে। বর্তমানে সার্জেন্টের পদের থাকা জোকার সেনাবাহিনীর পত্রিকা স্টার্স এন্ড স্ট্রাইপ্সে (Stars & Stripes) সাংবাদিক হিসেবে কাজ করে। দক্ষিণ ভিয়েতনামের ডা নাং (Da Nang) অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা এবং বিশ্ববাসীর নিকট তা তুলে ধরাই তার কাজ। এ কাজে তার সাথী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে প্রাইভেট ফার্স্ট ক্লাস র‍্যাফটারম্যানকে, যে কিনা পেশায় একজন যুদ্ধবিষয়ক ফটোগ্রাফার।

দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা থাকার কারণে যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে না পারার আক্ষেপ জোকারকে ভোগালেও সাংবাদিক হিসেবেই সে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে থাকে। তার চোখ দিয়ে আমরা দেখতে পাই, মিত্র এবং শত্রু উভয় পক্ষের বিভিন্ন মানবিক দিক। এভাবে কাহিনী এগিয়ে যেতে থাকে।

নির্মাণ, অভিনয় ও দর্শক প্রতিক্রিয়া

ফুল মেটাল জ্যাকেট মুভিটির পরিচালনা, প্রযোজনা এবং চিত্রনাট্য সবকিছুর দায়িত্বে ছিলেন স্ট্যানলি কুব্রিক। গুণী এ পরিচালকের সর্বশেষ মুভিগুলোর মধ্যে এটি একটি। তার নির্দেশনা এ মুভিটিকে আর দশটা সাধারণ যুদ্ধের মুভি থেকে আলাদা করে তুলেছে।

ম্যাথু মোডিন অভিনয় করেছেন প্রাইভেট জে.টি. ডেভিস ওরফে জোকার চরিত্রে ; Source: youtube.com

তৎকালীন যুদ্ধের মুভিগুলো যখন নিজ দেশের বীরত্ব জাহির করতেই বেশি ব্যস্ত সেখানে কুব্রিক তুলে ধরেছেন এক অন্যরকম চিত্র। যুদ্ধ যে উভয় পক্ষের জন্যই ভয়াবহ হতে পারে এবং যুদ্ধের ট্রেনিংও যে একটা মানুষকে কতটা বিপর্যস্ত করে ফেলতে পারে তা তিনি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন এবং এখানেই তার স্বার্থকতা।

মুভিটির অভিনয়ের কথা যদি তুলে ধরতে হয় তবে চলে আসবে তিনটি চরিত্রের কথা। প্রথমত আসবে গানারী সার্জেন্ট হার্টম্যানের চরিত্রে লী এরমির অভিনয়ের কথা। ড্রিল ইন্সট্রাক্টরের চরিত্রে তার চেয়ে ভালো কেউ অভিনয় করতে পারত বলে মনে হয় না। বিশেষ করে বাস্তবে তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কালীন একজন ড্রিল ইনস্ট্রাক্টর থাকায় এ চরিত্রে অভিনয় করা তার কাছে বেশ সহজ বলে মনে হয়েছে।

মুভিটির যুদ্ধের একটি দৃশ্য; Source: youtube.com

এরপর আসবে প্রাইভেট লিওনার্ড লরেন্স ওরফে গোমার পাইলের চরিত্রে অভিনয় করা ভিন্সেন্ট ডিওনফ্রিওর কথা। স্থূলাকার এক ক্যাডেটের চরিত্রে তার অভিনয় এবং ট্রেনিংয়ের ব্যর্থতার কারণে তার পরিবর্তন বেশ সুক্ষ্মভাবে তিনি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন তার অভিনয়ের কারণে।

ম্যাথু মোডিন অভিনয় করেছেন প্রাইভেট জে.টি. ডেভিস ওরফে জোকার চরিত্রে। মুভিটির শেষের দিকের কিছু দৃশ্যে তার শক্তিশালী অভিনয় মুভিটিকে দর্শকদের নিকট আরো স্মরণীয় করে তুলবে। এছাড়া মুভির বাকি সময়েও তিনি বেশ ভালো অভিনয় করেছেন।

মুভিটির একটি দৃশ্য; Source: youtube.com

মুভিটির দর্শক প্রতিক্রিয়া বেশ ভালো ছিল বলা যায়। তবে সমালোচকদের কাছ থেকে এসেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বেশিরভাগ সমালোচক মুভিটির প্রথমার্ধের প্রশংসা করলেও দ্বিতীয়ার্ধের কাহিনী তাদের কাছে অনেকটা খাপছাড়া লেগেছে। তবে শেষের দিকের কিছু হৃদয়বিদারক দৃশ্য ঘটনাপ্রবাহের ধীরগতির ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে। তবে মুভিটির অভিনয়ের ব্যাপারে তাদের প্রত্যেকে একবাক্যে প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন।

মুভিটির প্রথমার্ধের একটি দৃশ্য; Source: youtube.com

ফুল মেটাল জ্যাকেট মুভিটির আইএমডিবি রেটিং ৮.৩, অনলাইন মুভি রেটিং সাইট রটেন টমেটো মুভিটিকে ৯১ শতাংশ ফ্রেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এছাড়া মেটাক্রিটিকে মুভিটি ১০০-র ভেতরে ৭৬ পয়েন্ট লাভ করেছে।

যে কারণে মুভিটি দেখবেন

ফুল মেটাল জ্যাকেট মুভিটিকে যুদ্ধ নিয়ে নির্মিত অন্যতম সেরা মুভি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মুভিটির বক্স অফিস সাফল্য আকাশছোঁয়া না হতে পারে এবং মুভিটির ব্যাপারে সমালোচকরাও একবাক্যে এর শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছে এমনটা নয়,তবে আপনি যদি গতানুগতিক ধারার বাইরে একটি বিষাদপূর্ণ এবং সুন্দর গল্পের আশা করে থাকেন তবে মুভিটি আপনাকে হতাশ করবে না বলে হলফ করে বলা যায়।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment