সত্যজিৎ রায় ভারতীয় সিনেমাকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বহু গুণে গুণান্বিত মানুষটি চলচ্চিত্র পরিচালনা ছাড়াও একাধারে ছিলেন লেখক, চিত্রনাট্যকার, গ্রাফিক শিল্পী এবং সঙ্গীত সুরকার।

সত্যজিৎ রায় ; Image Source: thestar.com

সত্যজিৎ রায় তার পেশাজীবন শুরু করেন বইয়ের প্রচ্ছদে গ্রাফিক ডিজাইন করা দিয়ে। বহু বইয়ের প্রচ্ছদ তিনে নিজে করেন এ সময়। এদের মধ্যে অন্যতম হলো জিম করবেটের ‘ম্য়ান ইটার্স অব কুমায়ুন’ ও পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া‘।

ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া বইয়ের প্রচ্ছদ ; Image Source: rajeshmehta.blogspot.com

১৯৫৫ সালে পথের পাঁচালী সিনেমা দিয়ে তিনি রূপালী পর্দার জগতে পরিচালক হিসাবে পদার্পন করেন। সবমিলিয়ে মোট ৩৬টি সিনেমা তিনি পরিচালনা করেছিলেন যার মধ্যে তথ্যচিত্র ও শর্ট ফিল্মও ছিল।

সত্যজিতের সেরা সিনেমাগুলির মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত হল অপুর ত্রিলজি, চারুলতা, মহানগর, অরণ্যের দিনরাত্রি, সোনার কেল্লা, হীরক রাজার দেশে, ঘরে-বাইরে, পরশ পাথর, নায়ক ইত্যাদি।

সত্যজিৎ রায়ের সেরা কিছু সিনেমা নিয়েই আজকের আয়োজন,

পথের পাঁচালী

১৯৪৮ সালে নির্মিত ভিত্তোরিও ডি সিকা দ্বারা পরিচালিত ইতালিয়ান ছবি ‘দ্য বাই সাইকেল থিভস’ দেখে অনুপ্রাণিত হন সত্যজিৎ রায়। এরপরই তিনি বিখ্যাত লেখক বিভূতিভূষণের লেখা উপন্যাস থেকে পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রটি তৈরি করেন, যা ভারতীয় সিনেমার প্রেক্ষাপটকে বদলে দেয়। ভারতীয় সিনেমাকে বিশ্বের দরবারে জায়গা করে দেয় এ চলচ্চিত্র।

পথের পাঁচালী ত্রিলোজি ; Image Source: gaanpar.com

নিম্নবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা অপু-দূর্গা নামের দুই ভাইবোনের সুখ দুঃখ, কষ্ট আনন্দের রসায়ন নিয়ে তৈরী পথের পাঁচালী সিনেমার সিক্যুয়েল হিসেবে পরবর্তীতে অপরাজিত এবং অপুর সংসার নামে আরো দুটো চলচ্চিত্র বানান সত্যজিৎ রায়।

তিনটি সিনেমা একত্রে অপুর ত্রিলোজি নামে পরিচিতি পায়।

দ্বিধাহীনভাবে ভারতের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অন্যতম সেরা ছবি ‘পথের পাঁচালী’। দুর্গা ও অপুর বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর বড় বোনের চরিত্রে অভিনয় করেন উমা দাসগুপ্ত। গ্রামের কঠিন ও রূঢ় জীবনকে ফুটিয়ে তোলা হয় ছবিটিতে।

পথের পাঁচালী প্রযোজনা করেছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। শুধু ভারতেই নয়, গোটা বিশ্বেও ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে ‘পথের পাঁচালী’র। মোট ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে ‘পথের পাঁচালী’। যার মধ্যে অন্যতম ১৯৫৬ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে অর্জন করা বেস্ট হিউম্যান ডক্যুমেন্ট পুরস্কার।

তবে এই তিন ছবির জন্য সত্যজিৎ যত বেশি জনপ্রিয়তা এবং ভালোবাসা পেয়েছেন, পুরষ্কার তার সামনে নস্যিমাত্র। নির্মাণের বহু বছর পরও পথের পাঁচালীর আবেদন বিন্দুমাত্র কমেনি। চলচ্চিত্র প্রদর্শনের যে কোন অনুষ্ঠানে পথের পাঁচালী এখনো আয়োজকদের প্রথম পছন্দ।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম পথের পাঁচালী দেখে নিজেদের অপু-দূর্গার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে বেড়ে ওঠে৷

সতরঞ্জ কি খিলাড়ি

সত্যজিৎ রায় পরিচালিত প্রথম হিন্দি চলচ্চিত্রের নাম ‘সতরঞ্জ কি খিলাড়ি’।

মুন্সি প্রেমচাঁদের ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়েছিল ছবিটি। ১৮৫৬ সালের পটভূমিতে নির্মিত হয় ‘সতরঞ্জ কি খিলাড়ি’। যেখানে দুজন অর্থশালী ব্যক্তির দাবা খেলার প্রতি আসক্তি এবং ভারতের আওয়াধ অঞ্চল ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যকার টানাপড়েন বর্ণনা করা হয়েছিল।

ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সঞ্জীব কুমার, সাইদ জাফরি, শাবানা আজমি, ডেভিড আব্রাহাম ও টম অল্টার।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, বলিউড তথা পুরো ভারত উপমহাদেশেরই কিংবদন্তী অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন এ সিনেমার সাথে যুক্ত ছিলেন, তার উপস্থিতি দর্শকরা প্রতিমুহূর্তে পেলেও তিনি অভিনয় করেননি এ সিনেমায়। সত্যি বলতে সত্যজিৎ পরবর্তীতে বাংলা সিনেমা নির্মাণে অধিক মনোযোগ দেয়ায় অমিতাভ-সত্যজিৎ জুটি আর দেখা যায় নাই। এ ছবিতে বর্ণনাকারীর ভূমিকায় ছিলেন অমিতাভ বচ্চন। সত্যজিতের পরিচালনা এবং অমিতাভের দরাজ গলায় ভরাট কন্ঠ সিনেমাটিকে নিয়ে যায় অন্য মাত্রায়।

অস্কারের জন্য ছবিটিকে ভারত থেকে পাঠানো হলেও পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়নি ছবিটি।

চারুলতা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস নষ্টনীড় অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন ‘চারুলতা’ বা ‘দ্য লোনলি ওয়াইফ’। অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায় ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন। সামাজিক বেড়াজালের মধ্যে ‘চারুলতা’র এগিয়ে যাওয়াকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিতে।

চারুলতা সিনেমার দৃশ্য ; Image Source: moviesdrop.com

মুক্তির পর পরই সেরা পরিচালক এবং সেরা ছবি, এই দুটি বিভাগে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে ‘চারুলতা’।

ভারতীয় বিশেষত বাঙ্গালী নারীদের জাগরণে চারুলতা সিনেমাটি ছিলো ভীষণ এক আলোড়ন।

কাঞ্চনজঙ্ঘা

১৯৬২ সালে কাঞ্চনজঙ্ঘা সিনেমাটি তৈরি করেন সত্যজিৎ। ওটাই ছিল প্রথম রঙীন বাংলা ছবি। এই সিনেমায় অভিনয় করেন ছবি বিশ্বাস, অনিল চট্টোপাধ্যায়, করুণা চট্টোপাধ্যায়, অনুভা গুপ্ত প্রমুখ।

কাঞ্চনজঙ্ঘা সিনেমার দৃশ্য ; Image Source: kholakagojbd.com

গল্প, কথোপকথন, অভিনয় এসবের বাইরে গিয়ে ক্যামেরাও কখনো কখনো যে মূল আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে, সেই প্রথম বাংলা সিনেমার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশ দেখতে পায়। দার্জিলিং এ শ্যুটিং করা সিনেমাটিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে পর্দায়।

হীরক রাজার দেশে

“ভরপেট নাও খাই, রাজকর দেওয়া চাই”


“বাকি রাখা খাজনা, মোটে ভালো কাজ না”


“যায় যদি যাক প্রাণ, হিরকের রাজা ভগবান”

“যে করে খনিতে শ্রম যেনো তারে ডরে যম”


“অনাহারে নাহি খেদ, বেশি খেলে বাড়ে মেদ”

“লেখাপড়া করে যেই, অনাহারে মরে সেই”


“জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই”


“বিদ্যা লাভে লোকসান, নাই অর্থ, নাই মান”

সিনেমা দেখতে পছন্দ করে অথচ সত্যজিৎ রায়ের “হীরক রাজার দেশে” দেখেনি এমন দর্শক খুজে পাওয়া দুষ্কর। তবে মজার ব্যাপার হলো আপনি যদি এদের কাওকে জিজ্ঞেস করেন সিনেমাটা কেমন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর পাবেন যে, এটি মজার সিনেমা। কেউ কেউ বলবে এটা বাচ্চাদের সিনেমা। যদিও বাস্তবে এটি একটি পুরোপুরি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র।

হীরক রাজার দেশে ; Image Source: youtube.com

এই চলচ্চিত্রের প্রতিটি চরিত্রই প্রতিকী। রাজসভার সবাই রাজার কথার সাথে সুর মেলায়। রাজার প্রতিটি কথার শেষেই ওরা বলে, ঠিক ঠিক ঠিক। জনগন যখন অনাহারে মরে তখন রাজা তার সভার লোকদের হীরের হার বিতরন করে। তারমধ্যে আছে শিক্ষামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী প্রমুখ। রাজা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দেয় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আগে রাজ্য থেকে দারিদ্রের সব চিহ্ন যেনো নির্মুল করে দেয়। কোন ভিখারীকে যেনো পথে দেখা না যায়। এ যেনো আমাদের এই বৈষম্যমূলক সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। জনগন যখন অনাহারে অর্ধাহারে মৃতপ্রায় তখন রাষ্ট্রের সুবিধাভোগীরা বিলাশবহুল জীবন যাপন করে। নগরের সৌন্দর্য বর্ধনের নামে উচ্ছেদ করা হয় ছিন্নমূল মানুষদের। অথচ মানুষকে অনাহারী রেখে যে কোন নগরের সৌন্দর্য বর্ধন যে সম্ভব না সেটা আমাদের শাসক শ্রেণী বুঝতে চায় না।

তবে এতকিছুর পরও সমাজে বিপ্লবী চরিত্রের অস্তিত্ব থাকে। ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমায় এই বিপ্লবী চরিত্র হচ্ছে উদয়ন পন্ডিত। উদয়ন পন্ডিতই হচ্ছে রাজার সবচেয়ে বড় শত্রু।

মূল দুই চরিত্র গুপী ও বাঘাকে নিয়ে নির্মিত তিনটি চলচ্চিত্রও ত্রিলোজি হিসেবেই পরিচিত।

সত্যজিৎ রায়কে সাম্মানিক ডক্টরেট দেয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। চার্লি চ্যাপলিনের পর দ্বিতীয় ফিল্ম ব্যক্তিত্ব হিসাবে এই সম্মান পান তিনি। সত্যজিৎ রায় সাম্মানিক অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পান। তবে তার কোনও সিনেমাই অস্কার জেতেনি। মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে তাঁকে ভারত রত্ন পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর বহু বছর পরও ভারতীয় উপমহাদেশের সিনেমার প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে তিনি এখনো পরিচিত করে যাচ্ছেন বিশ্ব চলচ্চিত্রে। পৃথিবীর বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যসূচিতে সত্যজিতের চলচ্চিত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

Related Article

No Related Article

0 Comments

Leave a Comment