একটি চলচ্চিত্রের সফলতার জন্য যে সকল উপাদান প্রয়োজন তার মধ্যে অন্যতম হলো সঠিক সময়। কথাটি শুনে হয়তবা অনেকে অবাক হবেন৷ কিন্তু ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম অনেক মুভি পাওয়া যাবে যেগুলো সঠিক সময়ে সঠিক মূল্যায়ন পায়নি।

বক্স অফিসে ব্যর্থ কিন্তু পরবর্তীতে দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে এমন হাজারো মুভি বিশ্বের প্রায় সব মুভি ইন্ডাস্ট্রিতে খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে বর্তমানকালে ক্লাসিক উপাধি পাওয়া অত্যন্ত পরিচিত একটি হলিউড মুভির ক্ষেত্রেও যদি এমনটি ঘটেছে বলা হয় তবে তা অনেকেই বিশ্বাস করবেন না। বলছিলাম ফাইট ক্লাব (Fight Club) মুভিটির কথা। ব্র‍্যাড পিট এবং এডওয়ার্ড নর্টন, জ্যারেড লেটো সকলেই হলিউডের প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা। তবে তাদের আজকের অবস্থানের পিছে যেসব মুভির হাত রয়েছে তার মধ্যে এ মুভিটি অন্যতম। এ মুভিটি তৎকালীন সমাজেও বেশ প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। তবে চলুন জেনে আসা যাক এ মুভিটির আদ্যোপান্ত।

কাহিনী সংক্ষেপ

মুভিতে আমরা এডওয়ার্ড নর্টনকে দেখতে পাই এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির চরিত্রে যিনি পেশায় একজন গাড়ি মেরামতকারী। ভয়াবহ পর্যায়ের ইনসোমনিয়া বা নিদ্রাহীনতায় ভুগতে থাকা তার জন্য রাতে সময় কাটানো বেশ কষ্টকর হয়ে যায়। তাই সময় কাটানোর জন্য সে ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আয়োজিত গ্রুপ থেরাপি সেশনে ভুয়া রোগী সেজে যেতে শুরু করে, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের মানসিক প্রশান্তির জন্য প্রতিনিয়ত সময় কাটিয়ে থাকে।

অজ্ঞাতনামা নায়কের চরিত্রে এডওয়ার্ড নর্টন ; Source: youtube.com

সেখানে একদিন হঠাৎ তার সাথে পরিচয় হয় তারই মত আরেক ইনসোমনিয়া রোগী মার্লা সিংগারের যে কিনা ভুয়া ক্যান্সার রোগী হিসেবে থেরাপিগুলোতে যাতায়াত করছিল। তবে ব্যাপারটা তাদের উভয়ের জন্যই বেশ অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় একে অপরের ছায়া মাড়াবে না এবং আলাদা থেরাপি সেশনে যাবে।

এরই মধ্যে নায়কের সাথে এক ফ্লাইটে পরিচয় হয় এক সাবান কোম্পানির সেলসম্যান টাইলার ডার্ডেনের। ঘরে ফিরে সে দেখে তার এপার্টমেন্ট কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বিস্ফোরণের শিকার হয়ে ধব্বংস হয়ে গিয়েছে। ঘরহারা অবস্থায় সে শরণাপন্ন হয় সদ্য পরিচিত হওয়া টাইলার ডার্ডেনের। টাইলারের অদ্ভুত জীবনদর্শন যেন তাকে খুব দ্রুতই গ্রাস করে ফেলে। আর অনেকটা পাগলামিবশতই এক পার্কি লটের বাইরে তারা নিজেদের ভেতর মারামারি শুরু করে শুধুমাত্র নিছক বিনোদনের ছুতোয়।

মার্লা চরিত্রে হেলেনা বোনহ্যাম কার্টার; Source: youtube.com

ব্যাপারটাতে মজা পেয়ে তারা দুজনে মিলে শুরু করে ফাইট ক্লাব। ধীরে ধীরে তাদের সাথে যোগ দেয় তাদের মতই আরো অনেক হতাশাগ্রস্থ যুবক। ফাইট ক্লাব যেন তাদের নিষ্প্রাণ এবং উদ্দেশ্যহীন জীবনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। ফাইট ক্লাবের জনপ্রিয়তা খুব দ্রুতই চারিদিকে ছডিয়ে পরে এবং টাইলারের নেতৃত্বে ফাইট ক্লাব শহর জুড়ে প্রোজেক্ট মেইহ্যাম শুরু করে। এ প্রোজেক্ট খুব দ্রুতই ভয়ংকর আকার ধারণ করতে থাকে, যা কিনা আমাদের নাম না জানা সে নায়কের কাছে সন্দেহজনক মনে হতে থাকে। ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নেওয়া হয় ধ্বংসযজ্ঞের, সেই সাথে বের হয়ে আসে অনেক অজানা এবং অপ্রিয় সত্য।

নির্মাণ ও অভিনয়

পরিচালক ডেভিড ফিঞ্চারকে হলিউডের মাস্টারমাইন্ডদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি তার ক্যারিয়ারে খুব স্বল্পসংখ্যক মুভি বানিয়েছেন, তিরিশ বছরের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত মাত্র ১০টি মুভি এবং তিনটি টিভি সিরিজ রয়েছে তার ঝুলিতে, তবে তার প্রত্যেকটাই যেন মনে রাখার মত কাজ। ফাইট ক্লাবও তাদের মধ্যে একটি। মুভিটি যে সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক আধুনিক চিন্তাধারার মুভি ছিল। মুভিটির নির্মাণ, পরিচালনা ও চিত্রনাট্যে যে পরিমাণ সূক্ষ্মতা ও নিপুণতা দেখতে পাওয়া যায় তা হলিউডের মত বড় ইন্ডাস্ট্রিতেও সচরাচর দেখা যায় না।

টাইলার ডার্ডেনরূপে ব্র্যাড পিট; Source: youtube.com

১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া এ মুভিটিতে তারকার কোনো কমতি নেই। মূল চরিত্রে আছেন দুই হলিউড সুপারস্টার ব্র‍্যাড পিট এবং এডওয়ার্ড নর্টন। হার্টথ্রব হিসেবে পরিচিত ব্র‍্যাড পিট এ মুভিতে তার অভিনয়ের সবটুকু নিংড়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া এডওয়ার্ড নর্টনের অভিনয় মুভিটিতে সাসপেন্স ধরে রাখতে বেশ সাহায্য করেছে। মুভিতে পার্শ্ব চরিত্রে আছেন জ্যারেড লেটোর মতো অভিনেতাও।

বক্স অফিস,প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক প্রভাব

ফাইট ক্লাব মুভিটি মুক্তি পায় ১৯৯৯ সালে। মুক্তির পর মুভিটি বক্স অফিসে ভালো ব্যবসা করতে ব্যর্থ হয়। ৬০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এ মুভিটি মাত্র ১০০ মিলিয়ন ডলার আয় করে। মুভিটির প্রযোজকরাও মুভিটির ব্যাপারে বিশেষ একটা আশাবাদী ছিলেন না এবং এর জন্য তারা পরিচালক ডেভিড ফিঞ্চারকে দায়ী করেন। গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত এবং মুভিটি আর দশটি সিনেমার মত সকলের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যেতে পারত যদিও এ মুভিটির বেলায় তা ঘটেনি।

মুভিটির একটি দৃশ্যে পিট; Source: foxmovies.com

মুক্তির পরে যদিও দর্শকরা মুভিটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং মুভিটি সমালোচকদেরও অবহেলার শিকার হয়েছিল কিন্তু যতই দিন যেতে থাকে মুভিটির জনপ্রিয়তা যেন ক্রমাগত বাড়তে থাকে। লোকমুখে খুব দ্রুত মুভিটির জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পরে যার প্রভাব দেখতে পাওয়া যায় পরবর্তী বছরগুলোতে মুভিটির ডিভিডি রিলিজ পাবার পর। মুভি রেটিং সাইটগুলোতেও মুভিটির রেটিং বাড়তে থাকে এবং মুভিটি জনপ্রিয় মুভিদের কাতারে স্থান করে নেয়।

ব্র্যাড পিট এবং এডওয়ার্ড নর্টন; Source: youtube.com

মুভিটির সামাজিক প্রভাবও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কাল্ট ক্লাসিক হিসেবে খ্যাত এ মুভিটির কারণে আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠেছিল ফাইট ক্লাব। টেক্সাস, নিউ জার্সি, ওয়াশিংটন, আলাস্কাসহ বিভিন্ন জায়গায় কিশোরদের ফাইট ক্লাব গঠন এবং আহত হবার খবর পাওয়া যায়।

২০০০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রির কিছু কর্মচারী গোপনে ফাইট ক্লাব খুলেছিলেন যা কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতেও এরকম একটি ফাইট ক্লাব খোলা হয়েছিল বলে জানা যায়। ২০০৬ সালে এবং ২০০৯ সালে দুটো বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার খবর পাওয়া যায় যা কিনা অনেকটা মুভিতে উল্লেখিত প্রজেক্ট মেইহ্যামের অনুকরণে করা হয়েছে।

কেন এ মুভিটি দেখবেন

ফাইট ক্লাব মুভিটি সর্বকালের সেরা থ্রিলার মুভির মধ্যে একটি। শুরুতে খ্যাতি না পেলেও কালের বিবর্তনে মুভিটি পায় তার যোগ্য সম্মান। আপনি যদি থ্রিলার মুভির ভক্ত হয়ে থাকেন এবং এ মুভিটি এখনো না দেখে থাকেন তবে আজই দেখে ফেলুন ফাইট ক্লাব। মুভিটির সংলাপ,অভিনয় কিংবা সাসপেন্সে ভরপুর গল্প কোনোটিই আপনাকে আশাহত করবে না।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment