বিশ্বে যে কয়টি মুভি ফ্র্যাঞ্চাইজি আছে তাদের একটি তালিকা তৈরি করা হলে ছেলে বুড়ো নির্বিশেষে সকলের তালিকায় থাকবে এরকম একটি সিরিজ হলো হ্যারি পটার মুভি ফ্র্যাঞ্চাইজি। ব্রিটিশ লেখিকা জে. কে. রাউলিং হ্যারি পটারের জাদুতে গোটা বিশ্বকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। তার বইগুলো যেমন বেস্টসেলার হয়েছিল ঠিক তেমনি বই অবলম্বনে বানানো মুভিগুলোও ছিল সুপারহিট।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের পুরোটাই মাতিয়ে রেখেছিল হ্যারি পটার সিরিজ। নতুন বই বের হলে যেমন বই কেনার হিড়িক পড়ে যেতো ঠিক তেমনি নতুন মুভি বের হলে হল থাকতো হাউজফুল। তবে ২০১১ সালে শেষ মুভিটি বের হবার পর হ্যারি পটারের গল্পের শুভসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু এতদিন ধরে উপভোগ করা যাদুর জগতকে পাঠক ও দর্শকরা এত সহজে ছেড়ে দিতে নারাজ। তারাও যেন চাইছিলেন আরো কিছু আসুক হ্যারি পটার সংক্রান্ত।

নিউট স্ক্যামান্ডার; Source: verge.com

এছাড়া প্রায় দুই দশক ধরে সফলতার শিখরে থাকা জে. কে. রাউলিংয়ের ক্যারিয়ারেও কিছুটা ভাটা পড়ে। সবকিছু মিলিয়ে সূচনা ঘটে হ্যারি পটারের জাদুর জগতকে ঘিরে গড়ে উঠা ফ্যান্টাস্টিক বিস্ট (Fantastic Beasts and Where to Find Them) সিরিজ। ২০১৬ সালে এ সিরিজের প্রথম মুভি বের হবার পর ২০১৮ সালে আসে দ্বিতীয় মুভি। এ সিরিজের দ্বিতীয় মুভি অর্থাৎ সিক্যুয়েল ফ্যান্টাস্টিক বিস্টস: দ্য ক্রাইমস অব গ্রিন্ডেলওয়াল্ড (Fantastic Beasts : The Crimes of Grindelwald) নিয়েই আমাদের আজকের এ রিভিউ।

কাহিনী সংক্ষেপ

ফ্যান্টাস্টিক বিস্টের পটভূমি হ্যারি পটার সিরিজের কাহিনী ঘটে যাওয়ার বহুদিন আগের ঘটনা। প্রথম মুভিটির কাহিনীর ঠিক পর পরই দ্বিতীয় মুভির কাহিনী শুরু হয়। ১৯২৭ সালে ডার্ক লর্ড গিলার্ট গ্রিন্ডেলওয়াল্ডকে আমেরিকা থেকে লন্ডন নিয়ে যাচ্ছিল আমেরিকান যাদু সংক্রান্ত সংঘ মাকুসা (MACUSA – Magical Congress of the United States of America)। এমন সময় কিছু গুপ্তচরের সহায়তায় সেখান থেকে পালিয়ে যায় সে এবং পুনরায় জনগণের মাঝে ত্রাস ছড়াতে সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকে।

একই ফ্রেমে মুভিটির তারকারা; Source: quora.com

এ ঘটনার তিন মাস পর মুভিটির প্রধান চরিত্র নিউট স্ক্যামান্ডারকে প্রথম মুভিতে নিউইয়র্ক শহরে তার কীর্তিকলাপের ফলস্বরূপ জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হয়। তার বিদেশ ভ্রমণের উপরেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তবে তারা কিছু গোপনীয় কাজের বিনিময়ে পুনরায় তাকে সেসব সুযোগ সুবিধা ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়।

এদিকে নিউট এবং প্রফেসর আ্যালবাস ডাম্বলডোরের মধ্যে গোপন বৈঠক হয়। ডাম্বলডোরকে যাদু মন্ত্রণালয় থেকে গ্রিন্ডেলওয়াল্ডকে পাকড়াও করতে বলা হলেও তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানায়। ডাম্বলডোর আর গ্রিন্ডেলওয়াল্ড দুজন বাল্যবন্ধু হওয়ায় তাদের সন্দেহ হয় যে, তিনি গ্রিন্ডেলওয়াল্ডের সাথে কোনোভাবে জড়িত। তাই তিনি এবং নিউট মিলে গ্রিন্ডেলওয়াল্ডের ব্যাপারটা সুরাহা করতে একমত হন।

ডাম্বলডোর এবং নিউট; Source: youtube.com

এরই মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝির কারণে নিউটের প্রেমিকা টিনা মনে করে নিউট তাকে ছেড়ে অন্য কারো বাগদত্তা হয়ে গিয়েছে। তাই সে ইউরোপের প্যারিসে চলে যায়। তাই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই নিউট তার আমেরিকান বন্ধু কোয়ালস্কিকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। এরপর তাদের সাথে ঘটতে থাকে একের পর এক মজার এবং বিপদজনক ঘটনা।

পরিচালনা ও চিত্রনাট্য

এ মুভিটি পরিচালনা করেছেন হ্যারি পটার মুভির প্রায় সবগুলোর পরিচালক ডেভিড ইয়েটস এবং চিত্রনাট্য লিখেছেন হ্যারি পটারের স্রষ্টা জে.কে. রাউলিং নিজে। এ কারণে বলা যায়, নির্মাণের দিক দিয়ে অন্তত মুভিটি হ্যারি পটার সিরিজের বাদবাকি মুভিগুলোর চেয়ে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। হ্যারি পটার সিরিজের একমাত্র কলাকুশলী ব্যতীত আর সবকিছুই দর্শকরা এ মুভিটি থেকে উপভোগ করতে পারবেন। বিশেষ করে গ্রাফিক্সের কাজ অতীতের তুলনায় বরং আরো ভালো হয়েছে বলা যায়।

মুভিটির একটি দৃশ্য; Source: pinterest.com

চিত্রনাট্যের দায়িত্বে জে.কে. রাউলিং থাকলেও তিনি কিছুটা হতাশই করেছেন বলা যায়। মুভিটির গল্প যে ভালো না তা নয় তবে একে কোনোভাবেই হ্যারি পটার সিরিজের এমনকি ফ্যান্টাস্টিক বিস্টের প্রথম মুভিরও সমমানের বলা যায় না।

পুরো মুভিটি দেখে আপনার মনে হতে পারে এটি আপনাকে কেবলমাত্র হ্যারি পটারের ছোটোখাটো ব্যাপার মনে করিয়ে আপনাকে চমকে দেয়ার জন্যই বানানো হয়েছে। মুভির মূল গল্পের বিকাশের চেয়ে তিনি কিভাবে এখান থেকে আরো দু-তিনটি সিক্যুয়েল দাঁড়া করানোর মতো ঘটনা বানানো যায় সেদিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। নির্মাতারা যদি এরকম ব্যবসায়িক মনোভবের পরিচয় না দিয়ে ভক্তদের একটি পরিপূর্ণ গল্প উপহারের দিকে মনোযোগ দিতেন, তবে এ মুভিটি আরো ভালো একটি মুভি হিসেবে বিবেচিত হতে পারতো।

অভিনয় এবং রেটিং

মুভিটিতে ড্যানিয়েল র‍্যাডক্লিফ, এমা ওয়াটসনের মতো হ্যারি পটারের জাদুজগতের পরিচিত মুখগুলো না থাকলেও রয়েছে একঝাঁক শক্তিশালী অভিনেতা। বিশেষ করে ডাম্বলডোর চরিত্রে ব্রিটিশ তারকা জুড ল’ এবং গ্রিন্ডেলওয়াল্ড চরিত্রে জনি ডেপের সংযোজন মুভিটির জৌলুস অনেকাংশে বাড়িয়েছে। এ দুই তারকার অভিনয়ই দর্শক-সমালোচকদের নিকট বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

ডার্ক লর্ড গিলার্ট গ্রিন্ডেলওয়াল্ড; Source: ign.com

পুরো মুভিতে হ্যারি পটারের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি দাঁড়া করানোর প্রচেষ্টার আভাস পাওয়া যায়। পটার ভক্ত এবং মুভির সমালোচকেরা বিষয়টা ভালো চোখে দেখেননি। তাই মুভিটির রেটিংও বেশ মাঝারি মানের। অনলাইন রেটিং ওয়েবসাইট রটেন টমেটোর মতে, মুভিটি মাত্র ৩৭ শতাংশ ফ্রেশ এবং এতে নতুনত্বের বেশ অভাব রয়েছে। আইএমডিবিতে মুভিটির রেটিং তুলনামূলকভাবে ভালো বর্তমানে যা কিনা ৬.৮। তবে এ রেটিং দিন দিন কমে আসছে।

কেন এ মুভিটি দেখবেন

এ মুভির দর্শক মূলত হ্যারি পটার ফ্যানরাই এবং এটি আসলেও তাদের জন্যই বানানো। তবে আপনি যদি আশা করে থাকেন যে হ্যারি পটারের মানের কোনো মুভি দেখতে যাচ্ছেন তবে হতাশ হবেন। কিন্তু যদি হ্যারির সেই জাদুর জগত এখনো আপনাকে আগের মত টেনে থাকে, তবে এ মুভিটি সে পুরনো স্বাদ কিছুটা হলেও দিতে পারবে।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment