‘ফাগুন হাওয়ায়’ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত বহুল প্রতিক্ষীত ছবি। প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ পরিচালকদের মধ্যে তৌকীর আহমেদ অন্যতম, যারা কিনা প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে কিছু করার চেষ্টা করেছেন। গল্প উপস্থাপন, অভিনেতা-অভিনেত্রী নির্বাচন থেকে শুরু করে সিনেমাটোগ্রাফিতেও রয়েছে যার মুন্সিয়ানার ছাপ। সেই প্রচেষ্টা তিনি অব্যাহত রেখেছেন ‘ফাগুন হাওয়ায়’ নির্মাণের মাধ্যমে। ‘দারুচিনি দ্বীপ’ ‘জালালের গল্প’, ‘অজ্ঞাতনামা’, বহুল আলোচিত ‘হালদা’র পর তৌকীর আহমেদের সফল সংযোজন এই ‘ফাগুন হাওয়ায়’।

ফাগুন হাওয়ায় একটি দৃশ্যে অভিনেত্রী তিশা ও অভিনেতা আবুল হায়াত; source : rongginn

কাহিনী সংক্ষেপ

সময়টা ১৯৫১ সালের ডিসেম্বর মাস। পানিশমেন্ট পোস্টিং নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে খুলনার চন্দ্রনগরে আসেন পাকিস্তানী পুলিশ অফিসার জামসেদ। সেসময়ে একই রকেটে চেপে ছুটিতে গ্রামে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র নাসির। সহযাত্রী ছিলেন সদ্য মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া মেয়ে দীপ্তী, যে কিনা এই গ্রামেরই সম্ভ্রান্ত হিন্দু ডাক্তারের নাতনী।

চন্দ্রনগরে পা রেখেই জামসেদ নিজের স্বৈরাচারী মনোভাব কায়েম করা তোড়জোড় শুরু করে। তার মতে- এই দেশ পাকিস্তানের অধীনস্থ মুসলমানদের, এখানে কোন হিন্দুদের জায়গা নেই। তারা মালাউনের বাচ্চা। তাদের জায়গা হলো হিন্দুস্তান। এক পর্যায়ে তিনি এও ঘোষণা করেন যে, তার নিয়ন্ত্রিণাধীন এলাকায় কেউ বাংলায় কথা বলতে পারবে না। এমনকি পাখিদের ভাষাও হতে হবে উর্দূ। মানুষ থেকে শুরু করে পাখির ওপরও বাধ্যতামূলক উর্দূ শিক্ষা চাপিয়ে দেবার চেষ্টা চালাতে থাকেন। স্থানীয় মুসলিম লীগের নেতার ছত্রছায়ায় মৌলভী ডেকে এনে থানার সামনে উর্দূ শিক্ষার ক্লাস বসানো হয়।

ফাগুন হাওয়ায় একটি দৃশ্যে অভিনেতা সিয়াম আহমেদ ও অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা; source : Sada Khobor

ওদিকে গ্রামে এসে নাসির ও তার বন্ধুরা দিনবন্ধু মিত্র’র ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি মঞ্চায়ন করার উদ্দ্যেশ্যে রিহার্সেল দিতে থাকে। ঘটনাক্রমে সেখানে যোগ দীপ্তিও দেয়। এরমধ্যে লিয়াকত আলী খান উর্দূকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে আনন্দে আত্মহারা জামসেদ আরও হিংসাত্মক হয়ে ওঠে, অন্যদিকে বিদ্রোহে ফেটে পরে নাসির, নাসিরের ভাই মঞ্জুরাও।

২০ ফেব্রুয়ারিতে তারা পূর্ণাঙ্গ বাংলা ভাষায় ‘নীলদর্পণ’ মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু মঞ্চস্থ করার ঠিক আগমুহূর্তে ফোর্স সমেত জামসেদ ও মুসলিম লীগের সাঙ্গপাঙ্গরা মিল নাটক বন্ধ করে দেয়। ওদিকে মাতৃভাষা রক্ষার জন্য আন্দোলন আগুনের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এতে যোগ দেয় চন্দ্রনগর থানার বাঙালি পুলিশ সদস্যরাও৷ এভাবেই দর্শকদের অন্যকোন সময়ে টেনে নিয়ে যায় গল্পটি।

চিত্রনাট্য ও পরিচালনা

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত টিটো রহমানের ‘বউ কথা কও’ গল্প অবলম্বনে ‘ফাগুন হাওয়ায়’ এর চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন পরিচালক তৌকির আহমেদ। ২০০৪ সালের দিকে তৌকির প্রথম যখন টিটো রহমানের গল্পটা পড়েন, তখনই এই কাজটা করার ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন। কিন্তু সেইসময় এটা কাস্টিং করা তার জন্য উপযুক্ত সময় মনে হয়নি।

সেই ড্রিম প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮ সালে ইম্প্রেস টেলিফিল্ম এগিয়ে আসে। বরাবরের মতোই মুগ্ধকর সংলাপ, কাহিনীর গতি, ঘটনা প্রবাহের উত্তেজনা, থেকে শুরু করে একটা ঐতিহাসিক সময়ের আবহ- সবকিছুই ছিল চিত্রনাট্যের ভাঁজে ভাঁজে। তবে শেষ কয়েকটা দৃশ্যের ব্যাপ্তিকাল আরেকটু দীর্ঘায়িত করতে পারলে মনে হয় গল্পটা আরও সাবলীল হতো।

ফাগুন হাওয়ায় অভিনয় করেন বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা যশপাল শর্মা(ডানে); source : rongginn

দৃশ্যায়ন ও সঙ্গীতায়োজন

ফাগুন হাওয়ায় এর দৃশ্যায়নে ছিলেন এনামুল হক সোহেল। তৌকির আহমেদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবারই নতুন নয়। তৌকির আহমেদের আগের দুটি ছবি ‘অজ্ঞাতনামা’ ও ‘হালদা’তেও তার নির্দেশনায় কাজ করেছেন সোহেল। পিন্টু ঘোষের কথা ও সঙ্গীতায়োজনে ‘তোমাকে চাই’ শিরোনামে একটি চমৎকার গান সংযোজিত হয়েছে। এতে কন্ঠ দিয়েছে স্বয়ং পিন্টু ঘোষ ও তার স্ত্রী সুকন্যা মজুমদার। এরই মধ্যে গানটি শ্রোতামহলে বেশ সারা জাগিয়েছে।

অভিনয়

অভিনয়ের কথা আলাদা করে না বললেই নয়। এই ধরণের ঐতিহাসিক প্লটের আবহটা মূলত অভিনয়ের মাধ্যমেই ফুটিয়ে তুলতে হয়। যেটা খুব ভালোভাবেই পেরেছেন ‘ফাগুন হাওয়ায়’র কলাকুশলীরা। প্রথমেই বলতে হয় ভারতীয় অভিনেতা যশপাল শর্মার কথা। তার অনবদ্য অভিনয়ের মুন্সিয়ানা পর্দায় চোখ আটকে রাখতে বাধ্য করেছে। জামসেদ চরিত্রটাকে ঠিক করে উপস্থাপন করা তার জন্যে আসলেই চ্যালেঞ্জিং ছিল। কিন্তু তিনি যা করে দেখালেন, এক কথায়- অনেকদিন মনে রাখার মতো অভিনয়।

ফাগুন হাওয়ায় প্রতিবাদী সমাবেশ; source : rongginn

নাসির চরিত্রটাতে মানিয়ে নেওয়া অভিনেতা সিয়াম আহমেদের জন্য একটু কষ্টকরই ছিল। বাণিজ্যিক ছবিতে পা রেখেই সফলতা পাওয়া সিয়াম এমন ভাবগাম্ভীর্যময় চরিত্রে কতটা মানানসই- সেটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতে পারতো। কিন্তু আশার কথা এই যে, সিয়াম সেখানে পুরোপুরি না হলেও নব্বই ভাগ সফল বলা যায়। পরিশ্রম করলে সে আরো ভালো অভিনেতা হয়ে উঠবে।

তিশা বরাবরই অসাধারণ একজন অভিনেত্রী৷ কিন্তু তার গলার স্বরটা যেন খুব বেশী মোলায়েম, মিষ্টি। এখানে দ্বীপ্তি চরিত্রের জন্য এমন কাউকে নির্বাচন করা উচিত ছিল, যার গলার স্বরে খানিকটা দৃঢ়তা আছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় তিশার অভিনয় বেশ সাবলিল লেগেছে।

ফাগুন হাওয়ায় এর শুটিং সেটে অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু; source : Risingbd

মঞ্জু চরিত্রে সাজু খাদেম তার সেরাটা উজার করে দিয়েছে। তার আশ্বাস, আকুলতা, ভালোবাসা সবই জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। জমাদার চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবু যতক্ষণ পর্দায় ছিলেন, ততক্ষণ মুগ্ধ হয়ে দেখেছি তার অভিনয়। এই মানুষটা প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। রওনক হাসানও ছিলেন অসাধারণ। যদিও ডাক্তার চরিত্রে আবুল হায়াতকে একটু নিস্প্রভ মনে হয়েছে। আর ফারুক হোসেন, শহিদুল আলাম সাচ্চুরা নিজেদের স্বভাবসুলভ বাচনভঙ্গি দিয়ে ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন।

বক্স অফিস ও রেটিং

গেল ১৫ই ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাওয়া ‘ফাগুন হাওয়ায়’ অনলাইনে ‘আইফ্লিক্স’ সহ অফলাইনে দেশের সনামধন্য সিনেমা হলগুলোতে মুক্তি পেয়েছে। মুক্তির পর থেকেই বাংলাদেশী এই চলচিত্রটি আলোচনায় উঠে আসে। আইএমডিবি ১২৩টি রিভিউয়ের ওপর ভিত্তি করে রেটিং দিয়েছে- ৮/১০। ছবিটির প্রযোজক জনাব ফরিদুর রেজা সাগরও ‘ফাগুন হাওয়ায়’ নিয়ে খুবই আশাবাদী।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রক্তমাখা মিছিল; source : NTV

ব্যক্তিগত মতামত

অভিনেতা তৌকির আহমেদ থেকে নির্মাতা তৌকির আহমেদ- দুজনেই শিল্পী হিসেবে দুর্দান্ত। আরেক কিংবদন্তি হুমায়ুন আহমেদ স্যার গত হবার পর যার নির্মাণ দর্শকদের বেশি আন্দোলিত করছে, তিনি তৌকির আহমেদ। অন্যরকম গল্প, উপস্থাপনের আলাদা ভঙ্গির জন্য ক্রমেই দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছেন ২০০৪ সালে ‘জয়যাত্রা’ এর মাধ্যমে পরিচালনায় পা রাখা এই মানুষটি।

পরিচালক তৌকির আহমেদের সাথে তিশা ও সিয়াম; source : Ajkaler Khobor

‘ফাগুন হাওয়ায়’ মূলত আমাদের ভাষার গল্প। আমাদের কথা বলার শক্তির গল্প। আমাদেরই ভাইয়ের বুকের তাজা রক্তের গল্প। এবং সেইসাথে বাঙালি ও বাংলা ভাষার জন্য খুব স্পর্শকাতর এক জায়গা। সেইখানে দাঁড়িয়ে দর্শকদের ঐ সময়ের মধ্যে টেনে নিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টসাধ্যই বটে। কেবল কস্টিউম তো সব নয়, একটা দূরবর্তী সময়কে ধরার ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিকতাই সবচে বড় প্রতিবন্ধকতা। পুরনো আমলের কার, লঞ্চের বদলে রকেট, পুরনো স্কুটার, দেয়াল লিখন, ফেস্টুন ইত্যাদির ব্যবহার যেভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে, আর অভিনেতা-অভিনেত্রীরা নিজেদের যেভাবে উজার করে দিয়েছেন, তাতে করে আর বলার উপেক্ষা রাখে না যে, আমরাও এক নির্মম ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইলাম।

Feature Image Source : YouTube

Related Article

0 Comments

Leave a Comment