সিগমা ফোর্স সিরিজটি আসলে আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগের অত্যন্ত গোপন দলের উপর নির্ভর করে লেখা। এই দলটি গঠিত হয়েছে সাবেক স্পেশাল ফোর্সের অফিসারদের নিয়ে, যারা অসাধারণ দক্ষতার অধিকারী। লেখক সিগমা ফোর্সের চরিত্রগুলো তৈরি করেছেন এমনভাবে, যারা বিজ্ঞান সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন, সেই সাথে বন্দুক চালনায় পারদর্শী। দলটির সদস্যরা বিভিন্ন মিশন নিয়ে পুরো পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়, রহস্য উদঘাটন করে।

সিগমা ফোর্সের সবগুলো চরিত্রই চমৎকার। দলনেতা পেইন্টার ক্রোর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হবেন না, এমন পাঠক কমই আছেন। তিনিই এই এলিট ফোর্সের পরিকল্পনাকারী এবং তিনিই ঠিক করেন কীভাবে মিশন পরিচালিত হবে। এছাড়াও সিগমা ফোর্সের নারী চরিত্রগুলোও ঈর্ষা করার মতো। বিশেষ করে শেইচানের কথা বলতেই হয়। খুব আকর্ষণীয় ও চিত্তাকর্ষক এই নারী চরিত্রটি। সেই সাথে প্রচুর খ্যাতিও পেয়েছেন তেজস্বী মনোভাব ও কাজের জন্য।

আই অফ গডের প্রচ্ছদ; Image source: harpercollins publisher

ক্রমানুসারে সিগমা ফোর্স সিরিজের বইগুলো হলো স্যান্ডস্টর্ম, ম্যাপ অফ বোনস, ব্ল্যাক অর্ডার, কোয়ালস্কি ইন লাভ, দ্য জুডাস স্ট্রেইন, দ্য লাস্ট ওরাকল, দ্য ডুমসডে কি, দ্য স্কেলেটন কি, দ্য ডেভিল কলোনি, ট্র্যাকার, ব্লাডলাইন, দ্য আই অফ গড, দ্য ডেভিল বোনস, দ্য সিক্সথ এক্সটিঙ্কশন, দ্য মিডনাইট ওয়াচ, দ্য বোন ল্যাবরিন্থ, ক্র্যাশ অ্যান্ড বার্ন, দ্য সেভেন্থ প্লেগ, ঘোস্ট শিপ, দ্য ডেমন ক্রো। সিগমা ফোর্স সিরিজের অষ্টম বই দ্য আই অফ গড সম্পর্কে আলোচনা করা হবে আজ।

কাহিনী সংক্ষেপ

কৃত্রিম উপগ্রহটির নাম আই অফ গড। সেটা বিধ্বস্ত হয়ে পড়লো মঙ্গোলিয়ায়। উপগ্রহটির গ্রহণ করা ছবিতে দেখা গেল আমেরিকার তিনটি প্রধান শহর নিউ ইয়র্ক, বোস্টন, ওয়াশিংটন ডি.সি. আগুনে জ্বলছে। অথচ শহর তিনটির পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তাহলে এই ছবি কি ভবিষ্যদ্বাণী?

আই অফ গডের প্রচ্ছদ; Image source: plintherest.eu

ভিগোর ভেরোনাকে মানুষের চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা বই এবং ১৩ শতাব্দীর অজ্ঞাত একজনের মাথার খুলি পাঠিয়েছেন অন্যদিকে ১০ বছর আগে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ফাদার জসিপ। ডিএনএ টেস্ট করে চমকে উঠলেন। খুলির মালিক স্বয়ং চেঙ্গিস খান। খুলিটিতে লেখা আছে একটি বাক্য। চার দিনের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাবে এই দুনিয়া।

একই দিনে দুনিয়ার দুই প্রান্তে ঘটলো এমন বিপরীতধর্মী দুটি ঘটনা, যার ফলাফল একই। শুধু তাই নয়, এই ফলাফলটি ভয়াবহ। চারদিনে ধ্বংস হয়ে যাবে পৃথিবী। সিগমার অভিজ্ঞ কয়েকজন সদস্য দুই দলে বিভক্ত হয়ে নেমে পড়লেন মিশনে। একদলে রয়েছেন পূর্বপরিচিত সন্ন্যাসী, ফাদার ভিগোর, নবাগত জ্যাডা আর ডানকান। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই দলটি নেমে পড়লো অ্যাকশনে। তাদেরকে একই সাথে খুঁজে বের করতে হবে আই অফ গডের ধ্বংসাবশেষ, আর সেই সাথে লুকিয়ে রাখা সংরক্ষিত স্মৃতিচিহ্ন (Relics)। এই বইয়ে চেঙ্গিস খানের দেহের সংরক্ষণ করা অংশবিশেষকে রেলিক বলা হয়েছে। আবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রেলিকে রাখা ধাঁধার সমাধান করতে হবে।

সিগমা ফোর্সের ডায়াগ্রাম; Image source: imagenesmy.com

অপর দলে রয়েছে কমান্ডার গ্রে, তার সঙ্গিনী সেইশান আর কমান্ডার কোয়াস্কসি। দ্বিতীয় দলের পৃথিবী বাঁচানোর মিশনে নামতে খানিকটা দেরিই হয়ে গেল। কারণ ঐ সময়ে তাদেরকে সেইশানের মাকে খুঁজতে এবং পরবর্তীতে বন্দী সেইশানকে উদ্ধার করার জন্য উত্তর কোরিয়ায় ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল। দুইদল একত্র হয়ে কঠিন আর দুর্গম পথ অতিক্রম করলো। দুর্যোগ আর বিপর্যয় মোকাবেলা করে চরম মুহূর্তটায় পৌঁছে গেল। কিন্তু সেখানেও তাদের জন্য দাঁড়িয়ে ছিল কঠিন বাঁধা। বরাবরের মতোই রোলিন্সের বইয়ের চরম মুহূর্ত নির্বিঘ্নে শেষ হয়নি। প্রাকৃতিক বৈরিতা, শত্রুপক্ষের আক্রমণ দুটির উপস্থিত থাকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেরি করানোর জন্য।

পাঠ প্রতিক্রিয়া

যারা সিরিজ বই পড়েন, তারা জানেন, যখন সিরিজের এক বইয়ে হারিয়ে যাওয়া কিংবা মরে যাওয়া চরিত্র অন্য বইয়ে ফিরে আসেন, তখন অন্যরকম অনুভূতি হয়। বই পড়ার আনন্দটা স্বাভাবিকের চেয়েও কয়েকগুণে বেড়ে যায়। একই কথা রোলিন্সের সিগমা ফোর্স সিরিজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যারা দ্য জুডাস স্ট্রেইন পড়েছেন, তারা দেখেছেন জুডাস স্ট্রেইন বইটিতে সেই সন্ন্যাসী সাগরে তলিয়ে গিয়েছেন। তাকে যখন দেখবেন, আই অফ গড বইটিতে বেঁচে আছে, তখন খুশিতে লাফিয়ে ওঠার মতোই আনন্দ হবে। আবার সেইশান আর গ্রের বিচ্ছেদ হয়ে গেলেও এই বইয়ে একসাথে থাকতে দেখে ভালো লাগবে।

আই অফ গডের বাংলা অনুবাদের প্রচ্ছদ; Image source: মাদিহা মৌ

রোলিন্সের অন্যান্য বইয়ের মতো এটিতেও রয়েছে ধর্ম, বিজ্ঞান, ইতিহাস, অ্যাডভেঞ্চার, অ্যাকশন- সবকিছুর যথাযথ সংমিশ্রণ। এমন সব অসাধারণ বিষয় এক বইয়ে রাখার পরও লেখক থেমে যান না। একটু আধটু জীবনবোধও থাকে বইয়ে। যদিও সেই জীবনবোধ খুব সূক্ষ্ম, তবুও থাকে। উদাহরণস্বরূপ একটি লাইনের কথা উল্লেখ করা যায়।

আমাদের নশ্বর শরীরের আয়ু অল্প। ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া একটি উপহার। এই উপহারকে অপচয় কোরো না, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে ভেবে আলমারিতে তুলে রেখো না, দুই হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরো আর কাজে লাগাও।

প্রচ্ছদ; Image source: Amazon.co.uk

পৃথিবীর আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস, সংস্কৃতি আর রোমাঞ্চকে সংমিশ্রিত করে একজন পশু চিকিৎসক আপনাকে পুরো পৃথিবী ঘুরিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছেন; এই ব্যাপারটিই অভিভূত করার জন্য যথেষ্ট। সেই অভিযান প্রচন্ড রোমাঞ্চকর এবং রহস্যে মোড়া। একমূহুর্ত বিরতি দেবার কোনো সুযোগ নেই।

সিগমা ফোর্স সিরিজে সবচেয়ে ভালো লাগবে যেটি, লেখক প্রতিটা বইয়েই শত্রু মিত্র দুই পক্ষেই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে নারীদের রাখছেন। সেই নারী চরিত্রগুলোও হবে অভূতপূর্ব। বুদ্ধিমতী, করিৎকর্মা, একরোখা। বিশেষ করে সিগমার চিরশত্রু গিল্ট এর হয়ে কাজ করা নারীরা আপনাকে মুগ্ধ করবেই। স্যান্ডস্টর্মে ক্যাসান্দ্রা, দ্য জুডাস স্ট্রেইনে শেইচানকেও ভালো লাগবে। তাই বলে সিগমার হয়ে কাজ করা নারীরাও যে পিছিয়ে আছেন, তা নয়। তারাও অসাধারণ। সবমিলিয়ে রোলিন্সের বই হাতে নেওয়া মানেই, অসম্ভব ভালো কিছু সময় পার করা।

সিগমা ফোর্স সিরিজ; Image source: Amazon. Com

অনুবাদ প্রসঙ্গ

ইংরেজিতে পড়তে না চাইলে দ্য আই অফ গডের বাংলা অনুবাদ পড়তে পারেন। রোদেলা প্রকাশনী থেকে অনুবাদ করেছেন আরিফ জামান। ঝরঝরে অনুবাদে বইটি পড়তে বেশ ভালো লাগবে। অনুবাদ পড়ে মনেই হয়নি, এটি অনুবাদকের প্রথম অনুবাদ।

বই পরিচিতি

বই: দ্য আই অফ গড
লেখক: জেমস রোলিন্স
রূপান্তর: আরিফ জামান
প্রকাশক: রোদেলা প্রকাশনী
প্রকাশকাল: আগস্ট, ২০১৬
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ৪০০ (লেখকের সংযোজিত অতিরিক্ত তথ্য সহ)
মূদ্রিত মূল্য: ৪৬০ টাকা

Feature Image: মাদিহা মৌ

Related Article

0 Comments

Leave a Comment