জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকে চেনেন না এমন কাউকে হয়তো বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সত্তরের দশকের পর থেকে যতদিন পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন নির্মাণ করেছেন অসংখ্য নাটক, সিনেমা, লিখেছেন অনেক গল্প ও উপন্যাস। তিনি সৃষ্টি করেছেন হিমু, মিসির আলী, শুভ্রর মতো চরিত্রদের যাদের নিয়ে রচনা করেছেন বেশ কিছু গল্প ও উপন্যাস। তবে এসব গল্প উপন্যাস অবলম্বনে বড় পর্দায় ২০১৮ সালের আগ পর্যন্ত কোনো ছবি দেখা যায়নি।

২০১৮ সালে চিত্রনাট্যকার এবং পরিচালক অনম বিশ্বাস হুমায়ূন ভক্তদের জন্য নিয়ে এসেছেন ‘দেবী’। একই নামে রচিত হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি এ মুভিটি। এ মুভিটির মাধ্যমে তার তৈরি অন্যতম রহস্যময় চরিত্র মিসির আলি এবং তার রহস্যঘেরা জগতের একটুখানি ঝলক হলেও দেখতে পাবেন বিশ্বজুড়ে ছিটিয়ে থাকা দর্শক এবং ভক্তরা। তবে চলুন জেনে নেওয়া যাক দেবী মুভিটির ব্যাপারে।

কাহিনী সংক্ষেপ

মিসির আলি পেশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষক। দেখতে আগোছালো এবং আলাভোলা টাইপের মনে হলেও এ মানুষটি প্রচন্ড বুদ্ধিমান এবং তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তি সম্পন্ন। তিনি একাকী, সাদামাটা জীবনযাপন করতে চাইলেও রহস্য যেন তার পিছু ছাড়ে না।

রানু চরিত্রে জয়া আহসান; Source: thedailystar.net

এরকমই এক সময়ে তার কাছে আনিস সাহেব নামক এক ব্যক্তি এসে হাজির হন। তার মতে, তার স্ত্রী রানুর কিছু মানসিক সমস্যা রয়েছে এবং এজন্য তিনি মিসির আলির সাহায্য চান। আনিস সাহেবের স্ত্রী রানু স্বামী অফিসে গেলে একাকী জীবনই কাটান। তবে তিনি মাঝে মাঝে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে খুব ভয় পান। কিছু অশরীরী আওয়াজ তাকে সবসময় ডাকতে থাকে। ছোটোবেলায় ঘটে যাওয়া কিছু অস্বাভাবিক ঘটনার ভীতি তাকে এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো রানু ভবিষ্যৎ বলতে পারেন।

নিলু এবং রানু চরিত্রে শবনম ফারিয়া ও জয়া আহসান; Source: daily-sun.com

রানু এবং আনিস সাহেব যে বাসায় ভাড়া থাকেন সেখানকার বাড়িওয়ালা তার দুই কন্যা নিলু ও বিলুকে নিয়ে নিচে থাকেন। নিলু আবার মনোবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত এবং মিসির আলির ছাত্রী। একদিন নিলু গাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় রানু তাকে গাড়িতে করে যেতে বারণ করে যার ফলে নিলু একটি বড় দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যায়। এভাবে চলতে থাকে রানুর রহস্যময় জীবন।

মিসির আলি প্রথমদিকে রানুর কেসটি নেয়ার ব্যাপারে বিরক্তবোধ করলেও পরবর্তীতে রানুর সাথে সাক্ষাত তাকে রানুর রহস্য উদঘাটনে আগ্রহী করে তুলে। শেষ পর্যন্ত তিনি তা পারেন কি না তা জানতে হলে আপনাদের দেখতে হবে মুভিটি

পরিচালনা এবং চিত্রনাট্য

দেবী মুভিটি পরিচালনা করেছেন অনম বিশ্বাস, মুভিটির চিত্রনাট্যও তার লেখা। পরিচালনার দিক থেকে তিনি কোনো অংশে কমতি রাখেননি। মুভিটি একটি হরর থ্রিলার টাইপের মুভি এবং পুরো মুভি জুড়েই তিনি এরকম শীতল এবং নিঃস্তব্ধ আবহাওয়া ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ক্যামেরার কাজ বিশেষ করে রানুর দৃশ্যগুলোতে দেখলে মনে হবে হয়তো বিদেশী কোনো ছবি দেখছেন। এছাড়া মুভিতে গানের কোনো বাহুল্য নেই, যে অল্প কয়েকটি রয়েছে তা মুভির কাহিনীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কারণে হরর মুভির মাঝখানেও অনুপম রয়ের রোমান্টিক গান শুনতে খারাপ লাগেনি।

মিসির আলি চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরি; source: dhakatribune.com

চিত্রনাট্যের কথায় যদি আসতে হয় তবে বলতে হয় অনম বিশ্বাস মূল গল্প হতে খুব বেশি পার্থক্য আনেননি। কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদের এ উপন্যাসটি এমনিতেই থ্রিলার হিসেবে খুবই ভালো এবং আগে থেকেই তার ভক্তদের নিকটও বেশ জনপ্রিয়। তাই চিত্রনাট্যে অনম বিশ্বাসের ক্রেডিট খুব একটা নেই বললেই চলে।

হুমায়ূন আহমেদের দেবী আশির দশকের পটভূমিতে হলেও অনম বিশ্বাস দেবী গল্পটির পটভূমি বর্তমান যুগে নিয়ে এসেছেন। তবে পুরো মুভি উপন্যাস অনুযায়ী বানালেও ক্লাইম্যাক্সে এসে তিনি কিছুটা তাড়াহুড়ো করেছেন। মুভিটি হঠাৎ করেই ইতি টেনে দিয়েছেন, যা কিনা অনেকের কাছে দৃষ্টিকটু লাগতে পারে। এছাড়া ইরেশ যাকেরের চরিত্র উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেও চরিত্রটির উদ্দেশ্য এবং ব্যক্তিত্ব চিত্রনাট্যে ঠিকমতো ফুটে ওঠেনি। এছাড়া মুভিতে মাঝে মাঝে কমিক রিলিফের জন্য মিসির আলি চরিত্রটিকে ব্যবহার করা হয়েছে, যা কিনা না করলেও চলতো।

অভিনয় এবং রেটিং

দেবী মুভিটিতে প্রধান তিন চরিত্র মিসির আলি, রানু এবং নিলু চরিত্রে আছেন যথাক্রমে চঞ্চল চৌধুরী, জয়া আহসান এবং শবনম ফারিয়া। যদিও মিসির আলি চরিত্রে চঞ্চলকে অনেকের কাছে মানানসই নাও মনে হতে পারে কিন্তু সব মিলিয়ে কাস্টিংয়ের জন্য নির্মাতারা প্রশংসার দাবিদার। রানু বা দেবী চরিত্রে জয়া ব্যতীত বাংলাদেশে অন্য কাউকে মানাতো বলে মনে হয় না। এছাড়া শবনম ফারিয়া ভার্সিটি পড়ুয়া চাপা স্বভাবের নিলু চরিত্রটিকেও বেশ ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

মুভিটির একটি ভৌতিক দৃশ্য; Source: dhakatribune.com

মিসির আলি চরিত্রে অনেকে হয়তবা চেয়েছিলেন প্রৌঢ় কোনো অভিনেতাকে। কিন্তু চঞ্চল চৌধুরীও মিসির আলি চরিত্রে বেশ ভালোই করেছেন। তার অভিনয় অসাধারণ হলেও মেকাপের মাধ্যমে তাকে আরেকটু বয়স্ক হিসেবে তুলে ধরা গেলে ভালো হতো।

তবে অনিমেষ আইচ আনিস চরিত্রে ছিলেন বড্ড বেমানান। আর ইরেশ যাকেরের চরিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার উদ্দেশ্য এবং কর্মকাণ্ড বেশ ধোঁয়াটে ছিল। তবে এ বিষয়ে ইরেশের নিজের চেয়ে নির্মাতাদের হাত বেশি ছিল তা মুভিটি দেখলেই বুঝতে পারবেন।

আনিস চরিত্রে অনিমেষ আইচ; Source: priyo.com

বাংলা মুভির রেটিং সাধারণত হলিউড বলিউডের মুভিগুলোর মতো খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য হয় না। কারণ বেশির ভাগ সময় দেশীয় সংস্কৃতির প্রচার এবং প্রসারের উদ্দেশ্যে ভক্তরা অন্ধভাবে বেশি রেটিং দিয়ে থাকেন। দেবীর আইএমডিবি রেটিং ৮.৪ তবে মুভিটি যে এত ভালো রেটিং যেমন পাওয়ার যোগ্য তাও না আবার এর চেয়ে খুব একটা কমেরও যোগ্য না। আয়নাবাজির পর যে কয়টি ভালো মুভি বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে তার মধ্যে এটিকে একটি বলা যায়।

কেন মুভিটি দেখবেন

হুমায়ূন আহমেদের মাস্টারপিস থ্রিলার গল্পগুলোর মধ্যে একটি দেবী। আপনি উপন্যাসটি যদি ইতোমধ্যে পড়ে থাকেন তবে মুভিটি দেখার জন্য এর মুক্তির পূর্বেই আপনার আগ্রহী হয়ে ওঠার কথা। আর গল্পটি না পড়ে থাকলে যদি ভালো একটি বাংলা হরর থ্রিলার দেখতে চান তবে মুভিটি দেখে ফেলুন। মুভিটি পুরোপুরি বইয়ের মতো না হলেও মুভিটি আপনাকে একেবারে হতাশ করবে না।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment