নাটক, সিনেমা, টিভি সিরিজ নির্বিশেষে সব বিনোদন মাধ্যমেই মানুষের মধ্যকার ভালো খারাপ উভয় দিকই তুলে ধরা হয়। এমনও অনেক অভিনেতা রয়েছেন যারা বিভিন্ন খল চরিত্রে অভিনয় করেন বলে বাস্তবেও ভক্তদের রোষানলের শিকার হয়েছেন। তবে সেগুলো তো স্রেফ অভিনয়, পর্দায় যতই ভয়ংকর হন না কেন বাস্তব জীবনে তারা আমার আপনার মতোই সাধারণ মানুষ। আজকে আমরা আপনাদের সামনে এমন একটি টিভি সিরিজের কথা তুলে ধরবো যার মূল চরিত্র কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয় এবং সেই চরিত্রের অভিনেতা আসলে ততটাই ভয়ংকর যতটা তাকে এখানে দেখানো হয়েছে।

বলছিলাম আমেরিকার সর্বকালের সবচেয়ে ভয়ানক সিরিয়াল কিলার টেড বান্ডির কথা। সম্প্রতি আমেরিকান স্ট্রিমিং নেটফ্লিক্স তাকে নিয়ে চার পর্বের একটি ডকুমেন্টারি সিরিজ বানিয়েছে। সিরিজটির নাম কনভারসেশন উইথ এ কিলার: দ্য টেড বান্ডি টেপস (Conversations with a Killer: The Ted Bundy Tapes)। চলুন জেনে আসা যাক টেড বান্ডি এবং এ সিরিজটি সম্পর্কে।

কে এই টেড বান্ডি?

থিওডোর রবার্ট কোয়েল বান্ডি ওরফে টেড বান্ডি আমেরিকার সবচেয়ে ভয়ানক সিরিয়াল কিলার। তার কুখ্যাতির জন্য তাকে আমেরিকান জ্যাক দ্য রিপার হিসেবেও ডাকা হয়। তিনি ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ সালের ভেতর প্রায় ৩০ জনেরও বেশি তরুণী এবং কিশোরীকে হত্যা করেন। আমেরিকার ৭টি স্টেটজুড়ে এই খুনগুলো করেছিলেন তিনি।

গ্রেফতারকৃত অবস্থায় টেড বান্ডি; Source: cbsnews.com

সেসময় আমেরিকায় সিরিয়াল কিলিংয়ের ঘটনা একেবারেই নতুন নয়। ইতোপূর্বে কিছু সিরিয়াল কিলিংয়ের ঘটনা ঘটেছিল তবে জনগণের মনে এ ধরনের আসামীর সম্পর্কে ধারণা ছিল অন্যরকম। তাদের কাছে সিরিয়াল কিলার মানেই ভয়ংকর চেহারার মানুষিক বিকারগ্রস্থ একজন মানুষ অথবা নেশাগ্রস্থ সমাজ থেকে একেবারে আলাদা হয়ে যাওয়া কেউ।

কিন্তু টেড বান্ডির করা হত্যা এবং পরবর্তীতে গ্রেফতারের পুরো ঘটনাটি সিরিয়াল কিলার সম্পর্কে মানুষের এসব ধারণা ভেঙে চুরমার করে দেয়। কারণ টেড বান্ডিকে দেখলে কোনোদিক থেকে বোঝার উপায় নেই তিনি এত ভয়ংকর সব অপরাধ করতে পারেন।

শুনানি চলাকালীন টেড বান্ডি; Source: variety.com

তিনি দেখতে যেরকম সুদর্শন ছিলেন তেমনি কথাবার্তায় ছিলেন স্মার্ট। মনোবিজ্ঞান এবং আইনে স্নাতক সম্পন্ন করা টেড বান্ডি ছিলেন নারীদের মন ভোলানোয় ওস্তাদ। তার মতো একজন উচ্চশিক্ষিত এবং সভ্য সমাজের বাসিন্দা যে এ ধরনের অপরাধের সাথে কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট থাকতে পারেন এ ব্যাপারটি তার পরিবার এবং কাছের মানুষজন তার গ্রেফতারের পরও বিশ্বাস করতে চাননি।

টেড বান্ডির ধারণকৃত বিভিন্ন ছদ্মবেশের একাংশ; Source: pinterest.com

চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা, হত্যার পূর্বে ধর্ষণ, হত্যার পরে মৃত লাশ ধর্ষণ, এক গার্লস হোস্টেলে ঢুকে ঘুমন্ত ছাত্রীদের উপর রীতিমতো গণহত্যা চালানো এমনকি যেসব নারীকে তিনি হত্যা করেছিলেন তাদের মধ্যে ১২ জনের মাথা আলাদা করে কেটে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের ফ্রিজে রেখে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তবে সকল ধরণের অভিযোগ ধরা পরার পর থেকেই অস্বীকার করে গেছেন তিনি। টেড বান্ডি ছদ্মবেশ ধারণে বেশ পারদর্শী ছিলেন এবং এ কারণে তার করা হত্যাগুলোর মধ্যে যোগসাজশ খুঁজে পেতেও অনেক সময় পার হয়েছে। তবে প্রায় ৩০ জনের বেশী মানুষ হত্যা এবং দুবার জেল থেকে পালানো আসামী বান্ডি এক সময় নিজের পাপের সাজা ঠিকই পেয়েছিলেন।

সিরিজটিতে যা থাকছে

কনভারসেশন উইথ এ কিলার: দ্য টেড বান্ডি টেপস সিরিজটি একটি ডকুমেন্টারি সিরিজ। তবে এ ডকুমেন্টারি আর দশটা ডকুমেন্টারির মতো নয়, এখানে চমক হিসেবে থাকছে বাস্তবের টেড বান্ডির প্রচুর ক্যামেরা ফুটেজ যা দিয়ে রীতিমতো একটি মুভি বানানো সম্ভব। ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট প্রথমবারের মতো গ্রেফতারের পর থেকেই বান্ডি তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। এছাড়া তৎকালীন আইন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এক স্টেটের পুলিশ অন্য স্টেটের পুলিশের সাথে তথ্য এবং প্রমাণ আদান-প্রদান করতে পারতেন না। এজন্য তার বিরুদ্ধে শক্ত প্রমাণ দাঁড় করানো যাচ্ছিল না।

টেড বান্ডির হাতে নিহত নারীদের একাংশ; Source: scoopwhoop.com

এ সুযোগে টেড বান্ডি নিজেকে বারবার নির্দোষ দাবী করতে থাকেন এবং মিডিয়ার কাছে দাবী করেন তার দিকটাও শোনা হোক। তারই ফলস্বরূপ সাংবাদিক স্টিফেন মিশড (Stephen Michaud) প্রায় ১০০ ঘন্টার মতো তার সাক্ষাৎকার নেন যেখানে বান্ডি নিজের জীবন সম্পর্কে বলেছেন। যদিও সেসময় তার দাবী ছিল তার বিরুদ্ধে আনা খুনের অভিযোগের সাথে সে কোনোভাবে জড়িত নয়, কিন্তু এ টেপগুলোর মধ্যে সে একজন মনোবিজ্ঞানী হিসেবেও এ সকল খুনের আসামী কেন এবং কিভাবে খুনগুলো করেছে সে ব্যাপারে বিস্তারিত বিবরণ জানায়।

টেড বান্ডির পুরো ঘটনা তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিল। তাই টেলিভিশন মিডিয়ার নজরও তার দিকে কম ছিল না। এ কারণেই তার প্রচুর ক্যামেরা ফুটেজ রয়েছে। এছাড়া আদালতে বান্ডির শুনানি দেশের প্রায় সব কয়টি টেলিভিশন চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছিল, সেসব ফুটেজও থাকছে ডকুমেন্টারিতে।

টেড বান্ডি এবং ক্যারোল অ্যান বুন; Source: medium.com

এছাড়া বান্ডির কেসের সাথে জড়িত আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্য এবং যে সকল পরিবার তার এসব অপরাধের কারণে স্বজনহারা হয়েছে তাদেরও সাক্ষতাকার এবং মতামত দেখতে পাবেন সিরিজটিতে। বিচার চলাকালীন সময়েও নারী সমাজে বান্ডির আবেদন কমেনি। বরং এ ভয়ংকর সিরিয়াল কিলারের প্রেমে পড়েছেন অনেক নারী। তারই মধ্যে একজন তার পূর্ব পরিচিত বান্ধবী ক্যারোল আ্যান বুনকে তিনি আদালতে বিচার চলাকালীন অবস্থায় প্রশ্নোত্তর চলাকালীন সময়ে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং তারা পরবর্তীতে বিয়েও করেন।

পরিচালনা

সিরিজটি পরিচালনা করেছেন আমেরিকান প্রযোজক এবং পরিচালল জো বারলিংগার। তিনি ইতোপূর্বে বাস্তবে ঘটে যাওয়া অপরাধের উপর ভিত্তি করে বেশ কিছু ডকুমেন্টারি বানিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে বলা যায়। দ্য টেড বান্ডি টেপস সিরিজটিতে তার সে দক্ষতার প্রতিফলনই দর্শকরা দেখতে পাবেন।

পরিচালক জো বারলিংগার; Source: metro.us

প্রায় ১০০ ঘন্টার অডিও টেপ, পুলিশ এবং টেলিভিশন মিডিয়ার আর্কাইভ থেকে একগাদা ফুটেজ নিয়ে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন ক্যামেরাতে ধারণ করা কোনো টিভি সিরিজ চলছে। বিশেষ করে টেড বান্ডির অপরাধের দৃশ্যগুলো (Crime Scene) আপনাকে শিহরিত করতে বাধ্য।

যে কারণে সিরিজটি দেখবেন

বিশ্ব জুড়ে সিরিয়াল কিলাররা বরাবরই চাঞ্চল্যকর খবরের খোরাক। আর সিরিয়াল কিলার সম্পর্কে যদি আপনি জানতে আগ্রহী থাকেন তবে এতদিনে টেড বান্ডির নামের সাথে আপনার পরিচিতি থাকার কথা। তবে এখন পর্যন্ত এ ভয়ংকর সিরিয়াল কিলারকে নিয়ে যে কয়টি ডকুমেন্টারি বানানো হয়েছে তাদের মধ্যে সবথেকে বেশি তথ্যপূর্ণ এবং গোছানো এ সিরিজটি। এছাড়া এ সিরিজটিতে টেড বান্ডির এমন অনেক ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে যা এতদিন পর্যন্ত কোথাও দেখা যায় নি। তাই যাদের এ ধরনের গল্প এবং ঘটনা সম্পর্কে জানতে ভালো লাগে তারা সিরিজটি উপভোগ করতে পারেন।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment