আচ্ছা আপনি কি এমন কোনো পৃথিবীর কথা কল্পনা করতে পারেন যেখানে কোনো শিশু নেই। একটি সদ্যজাত শিশুর হাসি সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যের একটি। শিশুদের কোলাহল যেকোনো জায়গায় প্রাণ এনে দিতে সক্ষম। তাদের ছুটোছুটি, বেড়ে উঠা ব্যতীত কোনো পৃথিবীর কথা কল্পনা করাও দুষ্কর। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো শিশুবিহীন পৃথিবী মানে হচ্ছে একটি ভবিষ্যৎবিহীন মানব সমাজ, যে মানব সমাজ অচিরেই বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

এরকমই এক ভবিষ্যতের গল্প নিয়ে বানানো হয়েছে চিলড্রেন অফ মেন (Children of Men) মুভিটি। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত একই নামের উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে বানানো হয়েছে মুভিটি। মুভিটি পরিচালনা করেছেন পরিচালক আলফোনসো কুয়েরন এবং অভিনয়ে আছেন ক্লাইভ ওয়েন, জুলিয়ান মুর এবং মাইকেল কেনের মতো নামীদামি অভিনেতারা। ২০০৬ সালে মুক্তির পর এ মুভিটি তিনটি অস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিল।

কাহিনী সংক্ষেপ

মুভিটিতে ২০২৭ সালের এমন এক পৃথিবী দেখানো হয়েছে যেখানে কোনো শিশুর অস্তিত্ব নেই। বিশ্বজুড়ে রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় পদার্থের ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন মহামারী দেখা দিয়েছে এবং রোগ বালাইয়ের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ব্যাপার হলো বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে বন্ধ্যাত্ব। এছাড়া ক্ষতিকারক ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অভিবাসীদের (Immigrants) তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। গ্রেট ব্রিটেন বিশ্বের সেসব দেশের একটি যারা এ খাতায় নাম লেখালেও এখনো উচ্ছেদ কার্যক্রম পুরোদমে শুরু করতে পারেনি।

থিও চরিত্রে ক্লাইভ ওয়েন; Source: telegraph.co.uk

২০০৯ সালের পর পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয়নি নতুন কোনো শিশু, কোনো নারী পায়নি মাতৃত্বের স্বাদ। মুভিটির শুরু হয় পৃথিবীর কনিষ্ঠতম ব্যক্তি ১৮ বছর বয়সী এক মেক্সিকান বালকের মৃত্যুর সংবাদের মাধ্যমে। মানব সভ্যতার সর্বশেষ জন্মগ্রহণকারী মানুষটি নিজের সেলেব্রিটি তকমার ভার সহ্য করতে পারেনি। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে বিশ্বজুড়ে। এমনই এক অবস্থায় শুরু হয় মুভিটি এবং আমরা দেখতে পাই থিও ফ্যারন নামক এক ব্যক্তিকে।

থিও ফ্যারন পেশায় একজন ব্রিটিশ সরকারী কর্মকর্তা হলেও পূর্বে তিনি একজন মানবাধিকার কর্মী ছিলেন। পৃথিবীর কনিষ্ঠতম ব্যক্তির মৃত্যু তাকেও নাড়া দিয়ে যায়। মনে করিয়ে দেয় তাদের পুত্র ডিলানের কথা যে কিনা ২০০৮ সালে ঘটে যাওয়া মহামারীতে মারা গিয়েছিল। ডিলানের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী জুলিয়ানের সাথেও তার বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

মুভির একটি দৃশ্যে জুলিয়ান মুর; Source: youtube.com

এমতাবস্থায় হঠাৎ তাকে ফিসেজ (Fishes) নামক একটি সশস্ত্র সংঘ অপহরণ করে যারা ইমিগ্রান্টদের অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করে চলেছে। থিও পরে জানতে পারে তার প্রাক্তন স্ত্রী জুলিয়ান নিষিদ্ধ এ সংগঠনের নেতা হিসেবে কাজ করছে। অপহরণের পর তাকে জুলিয়ানের কাছে নিয়ে আসা হলে জুলিয়ান তার কাছে সাহায্য চায়।

কিই (Kee) নামক এক রিফিউজি নারীকে নিরাপদে ট্রানজিটের জন্য সরকারী কাগজপত্র পেতে থিওকে সাহায্য করতে বলে জুলিয়ান। বিনিময়ে উপযুক্ত পারিশ্রমিকেরও প্রস্তাব দেয় জুলিয়ান। পরবর্তীতে এক মন্ত্রীর সহায়তায় থিও মেয়েটির জন্য কাগজপত্র জোগাড় করে দেয়। তবে সে বুঝে উঠতে পারে না এত মানুষ থাকতে জুলিয়ান কেন বিশেষ করে এ মেয়েটির উপকার করতে চাইছে।

এরপর জুলিয়ান এবং থিও যখন মেয়েটিকে নিরাপদ স্থানে রেখে আসতে যাচ্ছিল তখন তাদের উপর সেনা আক্রমণ হয়। হামলায় জুলিয়ান মারা যায় এবং বাকিরা কোনো মতে পালিয়ে বাঁচে সেবারের মতো। এরপর ফিশেজের একটি সেফ হাউজে তারা গেলে কিই থিওকে জানায় সে অন্তঃস্বত্তা। পৃথিবীতে প্রায় ১৮ বছর পর কোনো নারী গর্ভধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। সে থিওকে বলে যে জুলিয়ান মৃত্যুর আগে তাকে বলেছে থিওকে ছাড়া অন্য কাউকে বিশ্বাস না করতে।

কিই এবং তার দাই মরিয়ম; Source: imdb.com

থিও দেখতে পায় কিইকে যদি ফিশেজদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় তবে তারা তাকে নিজেদের আন্দোলনের সুবিধার্থে ব্যবহার করবে। আবার যদি তাকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় তবে তারা কেই এর কাছ থেকে তার সন্তান কেড়ে নেবে। কারণ তাদের অভিবাসী বিরোধী অবস্থানের জন্য তারা তাদেরকে এমন কোনো অবস্থানে যেতে দিবে না। তার সামনে একটিই পথ খোলা থাকে, তা হলো পর্তুগালের হিউম্যান প্রজেক্ট নামক একটি রিসার্চ ল্যাবে তাকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া যারা কিনা মানবজাতির এ বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত থিও কি পারবে মানব জাতির অস্তিত্ব রক্ষার শেষ আশ্রয়কে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিতে? মুভিটির শেষ দৃশ্যটিই জানাবে সে কথা।

পরিচালনা এবং চিত্রনাট্য

চিলড্রেন অফ মেন মুভিটি পরিচালনা করেছেন ম্যাক্সিকান পরিচালক আলফোনসো কুয়েরন। বর্তমানে বিশ্বের হেভিওয়েট পরিচালকদের একজন তিনি। ২০১৩ সালে তিনি গ্র্যাভিটি (Gravity) মুভিটির জন্য এবং এ বছর রোমা (Roma) মুভিটির জন্য মোট দুইবার তিনি সেরা পরিচালক হিসেবে অস্কার জিতে নেন। চিলড্রেন অফ মেন মুভিটিতেও পরিচালক হিসেবে তার দক্ষতার এ ঝলক দেখতে পাওয়া যায়।

আলফোনসো কুয়েরন; Source: latimes.com

চিত্রনাট্য এ মুভিটির অন্যতম শক্তিশালী দিক। ২০০৬ সালে মুক্তির পর এ মুভিটি সেই বছর অস্কারে যে তিনটি ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পেয়েছিল তার মধ্যে দুটি ছিল চিত্রনাট্য সংক্রান্ত। বিশেষ করে মুভিতে বেশ কিছু শক্তিশালী এবং আবেগঘন দৃশ্য রয়েছে যা দেখলে আপনি আবেগী হয়ে উঠতে বাধ্য।

অভিনয় এবং রেটিং

মুভিটিতে হলিউডের অনেক হেভিওয়েট তারকার সমাহার ঘটেছে। থিও চরিত্রে আছেন ক্লাইভ ওয়েন এবং জুলিয়ান চরিত্রে আছেন অভিনেত্রী জুলিয়ান মুর। এছাড়া মাইকেল কেনের মত বর্ষীয়ান অভিনেতারাও মুভিটিতে পার্শ্ব চরিত্রে আছেন। তাদের সবার সাবলীল অভিনয় মুভিটিকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

মুভিটির একটি দৃশ্যে মাইকেল কেন; Source: indiewire.com

অস্কার মনোনীত এ মুভিটি সমালোচকদের প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছে বিশেষ করে এর অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি এবং চিত্রনাট্যের জন্য। মুভিটির আইএমডিবি রেটিং ৭.৯ এবং রটেন টমেটোতে মুভিটিকে ৯২ শতাংশ ফ্রেশ বলা হয়েছে। এছাড়া মেটাক্রিটিক্সে মুভিটিকে ১০০ এর ভেতরে ৮৪ স্কোর দেওয়া হয়েছে।

মুভিটি যে কারণে দেখবেন

আমাদের প্রিয় এ পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা যে ধরনের আশঙ্কা করি সে ধরনের একটি গল্প ফুটে উঠেছে চিলড্রেন অফ মেন মুভিটিতে। মুভিটিতে যেমন আছে সাসপেন্স, তেমনি আছে যুদ্ধ ও গোলাগুলি। মুভিটির বেশ কিছু দৃশ্য আপনার মন ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। সব মিলিয়ে এক দুর্দান্ত প্যাকেজ চিলড্রেন অফ মেন মুভিটি।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment