ইতিহাসের সর্বাধিক আলোচিত টিভি সিরিজ গেম অফ থ্রোনসের শেষ এপিসোড প্রচারের পর একই সাথে আলোচনা এবং প্রায় সমান কিংবা অধিক পরিমাণ সমালোচনার স্বীকার হওয়ার পর নেটফ্লিক্স, এইচবিও সহ সবাই যখন একটু ঝিমিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই সময় একটি মিনি সিরিজ দিয়ে এইচবিও যেন পুরো পৃথিবীকেই ভীষণ এক নাড়া দিয়ে গেল।

“আমাদের গোটা ইতিহাসের দিকে যদি একবার তাকান, হোক সেটা সোভিয়েত ইউনিয়নের সময়কার অথবা তার পরের, এটা আসলে মানবতার এক বিশাল গণকবর। যেটি বারবার হয়েছে রক্তস্নাত। এ যেন কখনোই শেষ হতে না চাওয়া এক উপাখ্যান, যা গল্প বলে হত্যাকারী এবং নিহতের। যেখানে বারবার রাশিয়ানদের সেই প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়, কী করতে হবে এবং একই সাথে এ বিপর্যয়ের জন্য কে দায়ী?”

“বিপ্লব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ, বিরাট একটি সাম্রাজ্যের পতন, সমাজতান্ত্রিক বিশাল এক রাষ্ট্রের পতন এবং এখন এই ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ- চেরনোবিল। যেটি পৃথিবীর প্রতিটি জীবিত প্রাণীর জন্যই এক চ্যালেঞ্জ। এটিই আমাদের ইতিহাস। এটি নিয়েই আমার বই। এটিই আমার পথচলা, নরকের মধ্য দিয়ে আমার আবর্তন।”

২০১৫ সালের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী লেখিকা সভেৎলানা আলেক্সিয়েভিচ নিজের সাহিত্যিক অভিযাত্রাকে ঠিক এভাবেই তুলে ধরেছেন।

এককালের সোভিয়েত রাষ্ট্র বেলারুশের নাগরিক সভেৎলানা পেশায় ছিলেন সাংবাদিক। আর সেই সূত্রেই মাত্র এক শতাব্দীর মধ্যে বিপ্লব, গণহত্যা, মহাযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরাট পরিবর্তন দেখে ফেলা এক বিশাল রাষ্ট্রের শত শত মানুষের খুব কাছে গিয়ে তাদের নিগূঢ় গল্পের অংশ হতে পেরেছিলেন তিনি।

সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকার তাদের প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবে ইতিহাসকে যেভাবেই লিখুক না কেন, সভেৎলানা আলেক্সিয়েভিচ ১৯৯৭ সালে তার রচিত বই ‘ভয়েসেস ফ্রম চেরনোবিল: দ্য ওরাল হিস্ট্রি অফ আ নিউক্লিয়ার ডিজাস্টার’ -এ তুলে ধরেন মানব সভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর অধ্যায়ের আসল সত্যিটাকে।

চেরনোবিল ; Image Source: gamesrader.com

বইয়ের সে সত্য ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে তৈরী করা হয়েছে মিনি সিরিজ, চেরনোবিল

কাহিনী সংক্ষেপ

১৯৮৬ সালের ২৬ মে, চেরনোবিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন রাশিয়া!

মানবসভ্যতা স্বাক্ষী হয়েছিলো এমন এক বিপর্যয়ের যা কেউই দুঃস্বপ্নেও চাইবে না। সেদিন আনাতোলি দিয়াতলোভ এর ইগো আর গোয়ার্তুমির কারনে চেরনোবিল পাওয়ার প্লান্টে ঘটে যায় দুনিয়ার অন্যতম ভয়ংকর দুর্ঘটনা, পারমানবিক বিস্ফোরণ (Nuclear explosion)।

নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ; Image Source: ebaumsworld.com

তাৎক্ষণিক ভাবে ৩১ জন মানব সন্তান হারিয়ে যান কালের গর্ভে, আগে পরে মিলিয়ে খেসারত দিতে হয় ৯৪ হাজার মানুষকে (পশুপাখি বাদে)।

রেডিয়েশনের কারনে ২০ হাজার বছরের জন্যে বসবাসের অনুপোযোগী ঘোষনা করা হয় চেরনোবিল ও তার আশেপাশের শহরগুলিকে।

ক্ষতিগ্রস্থ হয় প্রায় ৭০-৮০ লাখ মানুষ! হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলো ক্যান্সারে। অসংখ্য শিশু জন্ম থেকেই বয়ে আনে রেডিয়েশন ক্যান্সারসহ আরো বহু মরণঘাতী রোগ।

সামান্য অসাবধানতা, জ্ঞ্যানহীনতার কারণে নেমে আসা বিপর্যয় সামাল দিতে কতশত মানুষের আত্মাহুতি, সে গল্পই তুলে আনা হয়েছে চেরনোবিল শহর থেকে সেলুলয়েডের পাতায়।

সিরিজের প্রধান তিন চরিত্র উপরতলার আমলারা হলেও, শুরু থেকেই সমান গুরুত্ব পেয়েছে চেরনোবিল বিস্ফোরণের সময় কাজ করা দমকল বাহিনীর এক সাধারণ সদস্য ভাসিলি ইগনেতেঙ্কোর গল্প। প্রচণ্ড তেজস্ক্রিয়তায় ধুঁকে ধুঁকে ভয়ংকর কষ্টে মৃত্যুবরণ করা ভাসিলির সঙ্গে শেষপর্যন্ত থাকায় গর্ভের সন্তান হারানো তার স্ত্রী লুদমিলার ভালোবাসার গল্প। উঠে এসেছে সেই আত্মত্যাগী শ্রমিকদের গল্প, যারা তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হওয়ার কথা জেনেও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো দিনরাত খেটে চেরনোবিলের বিস্ফোরিত পাওয়ার প্ল্যান্টের ছাদ থেকে গ্রাফাইটের খণ্ড পরিষ্কার করতে।

প্রধান তিন চরিত্র ; Image Source: cbsnews.com

সত্য গল্পের সাথে কিছু ফিকশনাল চরিত্রের উপস্থাপন চেরনোবিলকে করে তুলেছে এক শ্বাসরুদ্ধকর টিভি সিরিজে। তেমন কোন সাসপেন্স, টুইস্ট ছাড়াই চেরনোবিল যেন শিরদাঁড়া কাঁপিয়ে দেয়া ভয়ের অনুভূতি দিয়ে যায় পুরো সময় জুড়ে। এমনকি সিরিজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ঘোর থেকে বেরুনো হয়ে যায় মুশকিল।

ভ্যালারি লেগাসভ নামের সেই অকুতোভয় বিজ্ঞানী, যিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সকল লুকোচুরিকে বিশ্ব মিডিয়ার সাহায্যে ফাঁস করে দিয়েছিলেন, লেগাসভের জবানীতেই উঠে এসেছে চেরনোবিল বিপর্যয়ের মূল কারণ, ‘যখন সত্যটা শুনে কষ্ট হয়, আমরা তখন একের পর এক মিথ্যা বলেই যাই। শেষ পর্যন্ত আমরা আমরা ভুলেই যাই সত্যের অস্তিত্ব। কিন্তু সেই অস্তিত্বকে কখনও মোছা যায় না। প্রতিটি মিথ্যাই সত্যকে ঢেকে রাখার জন্য চড়া ঋণে কেনা একেকটি পর্দা। আগে হোক বা পরে, সেই ঋণ আমাদের চুকাতেই হতো। আর মিথ্যার এই ঋণ শোধ করতে গিয়েই বিস্ফোরিত হয়েছে চেরনোবিলের আরবিএমকে রিয়্যাক্টর।’

লেগাসভ বাঁচিয়ে ছিলেন লাখো কোটি মানুষের জীবন, ঠিক সে সময়ে লেগাসভ সাহসী পদক্ষেপ না নিলে হয়তো আজকের পৃথিবী হতো বসবাসের অযোগ্য, নিদেনপক্ষে ইউরোপ হয়ে যেত পুরোপুরি ধ্বংসস্তুপ, যেভাবে পড়ে রয়েছে চেরনোবিল শহর।

অভিনয়

মূল চরিত্র লেগাসভের চরিত্রে অভিনয় করা জেরার্ড হ্যারিস সম্পর্কে গেম অফ থ্রোনসের লেখক জর্জ আর আর মার্টিন সিরিজটি দেখার পর মন্তব্য করেন,

“We binge-watched HBO’s miniseries CHERNOBYL. Terrifying, exciting, heartbreaking. If this one does not win a truckload of Emmys, there is no justice in Hollywood. Jared Harris is one of those actors you may have seen a hundred times before, without quite remembering who he is… but you will never forget him here.”

লেগাসভের পাশাপাশি আরেকটি যে চরিত্র অভিনয়শৈলীর দিক থেকে মন জয় করে নিয়েছে, সেটি হলো বিজ্ঞানী উলানা খোমিউকের। ঐতিহাসিক এক ড্রামা সিরিজে ঐতিহাসিক সব চরিত্রের পাশে এই একটি চরিত্রকে নির্মাতারা তৈরি করেছিলেন তাদের কল্পনা দিয়ে। তবে সেই কল্পনার পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে নির্মাতাদের জন্য কাজ করেছে লেগাসভের সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া এক ঝাঁক সাহসী বিজ্ঞানীর অবদান। উলানা খোমিউক সেই আত্বত্যাগকারী শত শত বিজ্ঞানীর প্রতিরূপ প্রতিনিধি হিসেবে উঠে এসেছে ক্যামেরায়।

লেগাসভের চরিত্রে জেরার্ড হ্যারিস ; Image Source: tvmoviefix.com

আর অভিনয়ের কথা বলতে গেলে শুধু উলানা খোমিউকের চরিত্রে অভিনয় করা এমিলি ওয়াটসনই নন, পুরো সিরিজ জুড়েই ছোটখাটো প্রতিটি চরিত্র এতো দুর্দান্ত অভিনয় করেছে যে, চেরনোবিল শহর যেন উঠে এসেছিল প্রতিটি দর্শকের মগজে, মননে ধাক্কা দেবার যে প্রয়াস নিয়ে নির্মাতা বানিয়েছেন চেরনোবিল, সে কাজটা সহজ করে দিয়েছেন অভিনেতা অভিনেত্রীরা তাদের দক্ষতার পুরোটা সঁপে দিয়ে।

অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন জেরার্ড হ্যারিস, স্ট্যালান স্কার্সগার্ড, পল রিটার, জেসি বার্কলি সহ আরো অনেকে।

চিত্রনাট্য ও পরিচালনা

সাহিত্য থেকে নির্মিত যে কোন সিনেমা বা টিভি সিরিজ নির্মাণে চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে কাহিনীকে প্রায় সময়ই বদলে ফেলা হয় পরিচালক ও প্রযোজকের চাহিদা অনুযায়ী। গেম অফ থ্রোনসের শেষ সিজনগুলোতেও আমরা একই ঘটনা দেখতে পাই।

চেরনোবিলের পরিচালক জোহান রিক ; Image Source: collider.com

তবে চেরনোবিল যেহেতু সত্য ঘটনা অবলম্বন করে লেখা, এবং লেখিকা স্বয়ং ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে বইটি লিখেছেন, তাই নির্মাতারাও যে কোন ধরণের পরিবর্তনকে এড়িয়ে আক্ষরিক ঘটনাই তুলে আনতে চেয়েছেন। চিত্রনাট্য তৈরীতে ক্রেইগ ম্যাজিন একেবারেই গুরুত্ব দেননি যে কোন ফিল্ম জনপ্রিয় করে তোলার কমন টোটকা, হিরোইজম এবং ড্রামাকে।

অবশ্য বাস্তবই যেখানে অবিশ্বাস্য, অসম্ভব নাটকীয়, পরিচালকের আর কিসের দায় পর্দায় নতুন করে নাটকীয়তা সৃষ্টির। তবে সত্য ঘটনাকেও বাস্তবসম্মত করে ফুটিয়ে তুলতেও যে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতে হয়, তা ভালোই দিয়েছেন চেরনোবিলের পরিচালক জোহান রিক।

আবহসংগীত

চেরনোবিল সিরিজের যে ব্যাপারটির কথা আলাদা করে না বললেই নয়, তা হচ্ছে আবহসংগীত। ঘটনা তো ভয়ংকর বটেই, তার সাথে কেমন বুক খালি করে দেয়া দমবন্ধ অনুভূতি এনে দেয় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। হাড়ের ভেতর অচেনা এক কাঁপুনি রেখে যায় বহুসময়ের জন্য, সে ঘোর থেকে বেরুনো মুশকিল।

সিজন এবং এপিসোড

চেরনোবিল একটি মিনি সিরিজ। মাত্র পাঁচ এপিসোডে এক সিজনের এই সিরিজটি তৈরী করা হয়েছে। এক থেকে সোয়া এক ঘন্টা করে এক একটি এপিসোডের স্থায়িত্ব।

কোথায় পাবেন সিরিজটি

যাদের প্রিমিয়াম কার্ড আছে, তারা এইচবিও’র এ্যাপ থেকেই সিরিজটি দেখতে পারবেন। এইচবিও প্রথম এক মাস ফ্রি ট্রায়ালও দিয়ে থাকে৷

অন্যথায় দ্বারস্থ হতে পারেন টরেন্টের, প্রায় সবগুলো পরিচিত টরেন্ট সাইটেই পাওয়া যাচ্ছে চেরনোবিল।

কেন দেখবেন সিরিজটি

আপনি নিশ্চয়ই মুভি/সিরিজ লাভার? ভালো মুভি/টিভি সিরিজ পেলে সময় বের করে বসে যান দেখতে? আমাদের ওয়েবসাইটে ঘুরতে থাকা যে কারো সম্পর্কে এমন আন্দাজ করে নিতে মাইন্ডরিডার হতে হয় না। আর সে কারণেই এটাও বলে দেয়া যায়, চেরনোবিল আপনি দেখবেনই কিংবা কে জানে হয়তো দেখেও ফেলেছেন।

আপনার কাছে বরং একটু ভিন্ন অনুরোধ থাকবে, সিরিজটি সবাইকে দেখান, যে কখনো টিভি সিরিজ দেখে না, যার মুভিতে কোন আগ্রহ নেই তাকেও। অন্তত গল্প করুন, গল্পটা বলুন। পারমানবিক সচেতনতা খুব বেশি ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশেও সম্প্রতি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিচ্ছে, সরকারের এমন উদ্যোগ নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়, জনগণের কল্যাণে, উন্নত জীবন যাত্রার লক্ষ্যেই এমন প্রয়াস। তার সঙ্গে সচেতনতা এবং ভয়াবহতার উপলব্ধিও যেন থাকে, সেটাই কাম্য।

আমরা যেন আমাদের সন্তানদের জন্য পৃথিবীকে এক ভয়াল মৃত্যুকূপ করে রেখে না যাই, উন্নত জীবনযাপনের লোভে যেন খুনী না হয়ে উঠি আমাদের অনাগত সন্তানের৷

Related Article

0 Comments

Leave a Comment