বিশুদ্ধ পানিরও অনেক রকমফের রয়েছে, সবচেয়ে বেশি বিশুদ্ধ পানিকে বলা হয় ডিসট্রিল ওয়াটার, এ পানি ওষুধ তৈরীর কাজে ব্যবহৃত হয়। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও চাপে বিশেষভাবে প্রস্তুত এ পানিতে কোন স্বাদ নেই, তাই বিশুদ্ধ ভেবে যদি আপনি খাওয়ার পানি হিসেবে ডিসট্রিল ওয়াটারই গ্রহন করার চিন্তা করেন তাহলে আপনাকে হতাশই হতে হবে।

ব্রেকিং ব্যাড টিভি সিরিজ পোস্টার ; Image Source: pinterest.com

পানিতে বিশুদ্ধ যেমন ডিসট্রিল ওয়াটার, তেমনি বিশুদ্ধতা চিন্তা করে যদি টিভি সিরিজের তালিকা করতে বসি, ব্রেকিং ব্যাড সেখানে অনেক উপরে থাকবে অন্য যে কোন সিরিজের চেয়ে। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, ব্রেকিং ব্যাড সিরিজটি ড্রিসটিল ওয়াটারের সাথে তুলনা করলেও তাকে স্বাদহীন বলার কোন সুযোগ তো নেইই, বরং এ নিশ্চয়তা দেয়া যায়, দেখতে বসার পর উঠতে ইচ্ছে হবে না শেষ করার আগে, আর শেষ করার পর বেশিরভাগ মানুষই ঘোষণা দিয়ে বসে, তার দেখা অন্যতম সেরা সিরিজ এটি।

আর সমালোচকরা শুধু সেরা বলেই ক্ষান্ত হন না, তারা ব্রেকিং ব্যাডকে বলেন নিখুঁত ছবি। আর তা যত দিন গেছে, তত বেশি সেরাই হয়েছে, ছাড়িয়ে গেছে নিজেকেই।

কাহিনী সংক্ষেপ

পৃথিবীর বেশিরভাগ অতি প্রতিভাবান মানুষ হয় ক্ষণজন্মা। বেশিদিন বাঁচে না তারা, কোন না কোন কারণে তাদের মৃত্যু সন্নিকটে চলে আসে বার্ধক্য দেখবার বহু আগেই। ওয়াল্টার হোয়াইট সম্ভবত সেই সীমিত প্রতিভাবানদেরই একজন।

পেশায় একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক, পড়ান রসায়ন। তিনি যতটা সাধারণ শিক্ষক, তারচেয়ে অনেক বেশি সাধারণ একজন মানুষ। স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে সাধারণ এক পরিবার ওয়াল্টারের।

ওয়াল্টার এবং স্কাইলারের সাথে জেসি পিংকম্যান ; Image Source: realnobody.com

রসায়ন শাস্ত্রে ভীষণ প্রতিভাবান ওয়াল্টার তরুণ বয়সে বন্ধুর কাছে প্রতারিত হয়ে অভিমানে স্কুলের শিক্ষক হয়ে যান ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে, সেই প্রতারণার ক্ষত যখন ভুলে পরিবার নিয়ে সাধারণ অথচ সুখী এক জীবন কাটিয়ে দেয়ার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেছেন, তখনই বজ্রপাতের মতো জীবনে নেমে আসে এক শনির আঘাত৷

ক্যান্সারের এ্যাডভান্স স্টেজে ধরা পড়েছেন ওয়াল্টার, ডাক্তার জানিয়ে দেয় তার হাতে সময় আছে এক বছরেরও কম।

বেকার স্ত্রী, শিশু কন্যা সন্তান, অটিস্টিক হয়ে জন্মানো পুত্র যে এখনো পেরোয়নি কৈশোর, মরে যাওয়া মানে এদের অকূলপাথারে ভাসিয়ে দিয়ে যাওয়া। ক্যান্সার নয়, ওয়াল্টার মরে যাচ্ছিলেন মৃত্যুর আগেই ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায়।

স্ত্রী সন্তানদের জানাননি ডাক্তারের রিপোর্ট, তবে নেমে পড়েছেন কিভাবে বাড়ানো যায় সঞ্চয় সে চিন্তায়৷ আর এমন অবস্থায়ই ঘটনাক্রমে দেখা হয়ে যায় ওয়াল্টারের সাবেক এক বখে যাওয়া ছাত্র জেসি পিংকম্যানের সাথে।

ওয়াল্টার এবং পিংকম্যান ; Image Source: amc.com

জেসি পিংকম্যান, যে স্কুলের গন্ডি পার হওয়ার আগেই ড্রপ আউট, বিভিন্ন নেশা, পার্টিতে এডিক্ট হয়ে পরিবার থেকেও বিতাড়িত। আর ওয়াল্টার যিনি পৃথিবীর বিশুদ্ধতম মানুষ বলা যায়, সাথে নিরীহও, এই দুজনের মিলে যাওয়াটা কাকতালীয়ও বটে, তবে পৃথিবীর কোন কিছুই যেমন নিশ্চিত নয়, অনিশ্চিতের ব্যাপারটাও তো তেমনি। হাইজেনবার্গ তার অনিশ্চয়তার সূত্রে এমনটাই বলেছিলেন।

জেসি পিংকম্যানের সাখে অবৈধ ড্রাগ মেথের ব্যবসা শুরুর সময় ওয়াল্টার হোয়াইটও নিজের ছদ্মনাম হিসেবে হাইজেনবার্গ ব্যবহার করেছেন।

হ্যাঁ, খুব কম সময়ে পরিবারকে যাতে ভবিষ্যৎ জীবনের একটা নিশ্চয়তা দিয়ে যেতে পারেন, খাতা কলমে সে হিসেব টেনে ওয়াল্টার হোয়াইট আর কোন উপায় খুঁজে পাননি এছাড়া।

আর অবৈধ ব্যবসায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অর্থাৎ পুলিশ বা এ জাতীয় বাহিনীর যত বাঁধা আসে, তার চেয়ে অনেক বেশি বাঁধা আসে অবৈধ ব্যবসার প্রতিযোগীদের কাছে থেকে।

ওয়াল্টারও একই রকম হুমকির মুখে পড়ছিলেন কারণ পুরনো ড্রাগ ব্যবসায়ীরা নিজেদের পন্য নিয়ে বাজারে টিকতে পারছিল না ওয়াল্টারের তৈরী ড্রাগসের সামনে।

অন্যান্য মেথ ব্যবসায়ীরা যেখানে মাত্র ৬০% বিশুদ্ধ মেথ তৈরী করতে সমর্থ ছিল, ওয়াল্টারের মেথ ছিল ৯৬% বিশুদ্ধ, যা বাজারে হাইজেনবার্গের ক্রিস্টাল মেথ নামেও পরিচিত হয়ে যায়।

তাই অন্যান্য ড্রাগস ব্যবসায়ীরা যেমন ওয়াল্টারকে ব্যবসা থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য খুঁজছিল, তেমনি খুঁজছিল ওয়াল্টারকে নিজের দলে টানার জন্যও।

কারণ এতে হাইজেনবার্গের সেরা মেথ দিয়ে পুরো বাজার নিজেরা ধরে ফেলার সম্ভাবনাও ছিল।

এমন নানা রকম সমস্যা আর বিপদের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলে ওয়াল্টার আর তার পরিবারের জীবন। একটা সমস্যা চাপা দিতে না দিতেই আরো বড় সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সামনে। কখনো ভেঙে পড়া, কখনো আবার নতুন উদ্যমে জেগে তাকে সামাল দেয়া, এভাবেই এগিয়ে চলে জীবন, কমে আসতে থাকে ওয়াল্টারের জন্য বেঁধে দেয়া আয়ু। প্রতিটা সময় যেখানে থ্রিলে ভরপুর, সেই থ্রিলিং টেস্ট দর্শকও পাবেন পুরোদমে, সে নিশ্চয়তা দেয়াই যায়।

সিজন এবং এপিসোড

ভিন্স গিলিগান প্রথমে চারটি সিজন করার পরিকল্পনা করলেও পরবর্তীতে ওয়াল্টার হোয়াইটের ‘ইভিলম্যান’ ধরণের চরিত্রটিকে পূর্ণতা দিতে পঞ্চম সিজন তৈরী করেন।

পাঁচটি সিজনে মোট এপিসোড সংখ্যা ৬২ টি। প্রথম সিজন ৭ টি এপিসোডেই শেষ হলেও দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ সিজনে এপিসোড সংখ্যা ছিল মোট ১৩ টি করে। আর পঞ্চম সিজনে এপিসোড ছিল সবচেয়ে বেশি, ১৬ টি।

অভিনয়

ওয়াল্টার হোয়াইট চরিত্রে অভিনয় করেছেন ব্রায়ান ক্র্যানস্টন। খেয়াল করলেই দেখবেন এখানে মূল চরিত্র বা মূল অভিনেতা শব্দগুলো লেখা হয় নাই। কারণ ব্রেকিং ব্যাড ফিল্মটি এমনভাবেই সাজানো হয়েছে যেখানে সবাই যার যার ভূমিকায় যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রেকিং ব্যাডের গুরুত্বপূর্ণ সব চরিত্র ; Image Source: amc.com

স্কাইলার হোয়াইট চরিত্রে অভিনয় করেছেন এ্যানা গুন, ওয়াল্টার জুনিয়র চরিত্রে আরজে মিট, জেসি পিংকম্যানের চরিত্রে এ্যারন পল। এছাড়া আরো ছিলেন ডিন নোরিস, বেটসি ব্র্যান্ডেট, বব ওডেনক্রিক, জোনাথন ব্যাংকস, জিযানকার্লো এসপোসিতো সহ আরো অনেকেই।

চিত্রনাট্য ও পরিচালনা

ভিন্স গিলিগান, পিটার গৌল্ড, জর্জ মাসট্রাস , স্যাম কলিন্স সহ মোট দশজন ব্রেকিং ব্যাডের গল্প এবং চিত্রনাট্য তৈরী করেন।

ভিন্স গিলিগানের নেতৃত্বে সিরিজটির সব এপিসোড মিলিয়ে মোট পরিচালক সংখ্যা পঁচিশ জন।

রেটিং

আইএমডিবি রেটিং – ৯.৬
আইএমডিবি রেটিং এ ব্রেকিং ব্যাডের একটা মজার জিনিস দেখা যায়। প্রথম সিজনে এর রেটিং ছিল ৭.৪, দ্বিতীয় সিজনে রেটিং দাঁড়ায় ৮.৫, তৃতীয় সিজনে গিয়ে ৮.৯ এবং চতুর্থ সিজনে তা হয়ে যায় ৯.৬ । পন্চম অর্থাৎ শেষ সিজনে তা ৯.৯ হযে যায় যা যে কোন টিভি সিরিজ ইতিহাসেই সর্বোচ্চ।
পন্চম সিজনের ১৪ তম এপিসোড পায় ১০/১০ রেটিং।

রটেন টমেটো রেটিং – ৯৬%

এ্যাওয়ার্ড

ব্রায়ান ক্র্যান্সটোন পর পর তিনবার (২০০৮, ২০০৯, ২০১০) এমি এ্যাওয়ার্ড জিতেছেন শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে। ২০১২ তে অ্যারন পল জিতেছেন শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে। ২০১৩ তে অ্যানা গান জিতেছেন শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবে এবং সিরিজটি জিতেছে শ্রেষ্ঠ ড্রামা সিরিজ হিসেবে।

এ্যাওয়ার্ড হাতে ব্রেকিং ব্যাড টিম ; Image Source: pinterest.com

দুইটি গোল্ডেন গ্লোব সহ ব্রেকিং ব্যাড এ পর্যন্ত মোট ১৪৬ টি এ্যাওয়ার্ড জিতে এবং নোমিনেটেড হয় ২২৮ বার।

কেন দেখবেন সিরিজটি?

ভিন্স গিলিগান যখন সিরিজটি তৈরীর পরিকল্পনা করেন, তখন অনেক নামী দামী অভিনেতাদের আগ্রহ ছিল সিরিজটিতে কাজ করার, কিন্তু ভিন্স শেষ অবধি যাদের কাস্ট করেন, তারা ভালো অভিনেতা হলেও জনপ্রিয় নন, আন্ডাররেটেড বলা যায়।

আর জনপ্রিয় অভিনেতা না থাকার কারণেই হয়তো এইচবিও চ্যানেল প্রথম অফার পেয়েও ভিন্সকে ফিরিয়ে দেয়, পরবর্তীতে এএমসি তা প্রচার করে।

এইচবিও কতৃপক্ষকে হয়তো এ আফসোস চিরকালই করতে হবে, কারণ গেম অফ থ্রোনসের মতো সিরিজও এপিসোড রেটিং এর বিচারে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি ব্রেকিং ব্যাডকে।

তাই আপনি যদি ব্রেকিং ব্যাড এখনো না দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েই বসে থাকেন, এইচবিও’র মত ভুল আপনিও করছেন। কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে এতো ‘পারফেক্ট’ মেকিং আর কখনো হয়নি।

Related Article

No Related Article

0 Comments

Leave a Comment