হলিউড কিংবা বলিউড, সবদিকেই যেন আজকাল তারকাদের আত্মজীবনী নিয়ে মুভি বানানোর হিড়িক লেগেছে। হলিউডে অবশ্য এ ধারা বেশ আগে থেকেই চলে আসছে, বিশেষ করে সংগীতশিল্পীদের জীবনের গল্প যেন মুভি হিসেবে বেশ বহুমুখী এবং মুখরোচক হয়। এর ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ সংযোজন হলো বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ ব্যান্ড কুইন এবং তাদের ভোকাল ফ্রেডি মার্কারির (Freddie Mercury) জীবনকাহিনী অবলম্বনে মুভি।

শুধু কালজয়ী ব্যান্ড কুইনের (Queen) সদস্য হিসেবে নয়, বরং গায়ক হিসেবেও মার্কারিকে সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার গায়কী যেমন ছিল ব্যতিক্রমধর্মী, তেমনি স্টেজ পারফর্মার হিসেবে তিনি সর্বকালের সেরাদের একজন মানা হয়।

রেমি মালেকের সাথে কুইন ব্যান্ডের বর্তমান জীবিত সদস্যরা; Source: express.co.uk

ফ্রেডি মার্কারির ব্যক্তিগত জীবনও ছিল বেশ সেসময়ের বেশ আলোচিত এবং সমালোচিত বিষয়। কালজয়ী বেশ কিছু গানের অধিকারী এ শিল্পীর জীবনের উত্থান পতন এবং তার ব্যক্তিগত জীবনের অজানা দিকগুলোই তুলে ধরা হয়েছে বোহেমিয়ান র‍্যাপসোডি (Bohemian Rhapsody) মুভিটিতে। কুইন ব্যান্ডের অন্যতম সফল আ্যালবাম বোহেমিয়ান র‍্যাপসোডির নামানুসারে মুভিটির এ নামকরণ করা হয়েছে। মুভিটিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেতা রেমি মালিক।

কাহিনী সংক্ষেপ

বোহেমিয়ান র‍্যাপসোডি মুভিটি মূলত ফ্রেডি মার্কারির জীবনকাহিনী। তবে কুইন ব্যান্ডটির সাথে তার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকায় কুইন ব্যান্ডটির আদ্যোপান্তও মুভিটিতে অনেকটা উঠে এসেছে। মুভির শুরু হয় সে সময় থেকে যখন ফ্রেডি মার্কারি ও কুইন বলতে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না।

বাস্তবের ফ্রেডি মার্কারি; Source: rollingstone.com

তানজানিয়ার জাঞ্জিবারে ১৯৪৬ সালে এক ভারতীয়-পার্সি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ফারুখ বুলসারা ওরফে আজকের ফ্রেডি মার্কারি। তরুণ বয়সে পরিবারের সাথে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান তিনি। মুভিটির কাহিনী শুরু হয় তখন থেকে যখন তিনি হিথ্রো এয়ারপোর্টে কাজ করতেন। একটি পাব থেকে তার পরিচয় হয় একটি ব্যান্ড এবং তাদের সদস্যদের সাথে, যাদের নিয়ে তিনি পরবর্তীতে কুইন ব্যান্ডটি প্রতিষ্ঠা করেন। বাবা মার দেওয়া নাম পালটে নিজের নাম রাখেন ফ্রেডি মার্কারি।

বাস্তব জীবনের ফ্রেডি (বামে) এবং মুভিতে ফ্রেডিরূপে রেমি (ডানে); Source: mirror.co.uk

মুভিটিতে এরপর ব্যান্ডটির উত্থান দেখানো হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ হলো ব্যান্ডটির বিভিন্ন বিখ্যাত গানের রেকর্ডিং এবং তার পেছনের অজানা সব গল্প। তাদের আ্যালবামগুলো মুক্তি পাওয়া এবং তার পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম এবং বিভিন্ন জটিলতা উঠে এসেছে মুভিতে।

এছাড়া ফ্রেডির ব্যক্তিগত জীবনও এ মুভিটির অন্যতম প্রধান অংশ। তার পিতামাতার সাথে সম্পর্কের টানাপোড়ন, ম্যারি অস্টিন নামক এক নারীর সাথে প্রণয়ের পর বিয়ে, মার্কারির নিজেকে উভকামী হিসেবে আবিষ্কার এবং ম্যারির সাথে সম্পর্কের ইতি, কুইন ব্যান্ডের বাকিদের সাথে তার দ্বন্দ্ব, বেপরোয়া জীবনযাপন, উদ্ভট ফ্যাশন সেন্স, মরণব্যাধি এইডসে আক্রান্ত হওয়া কোনো কিছুই বাদ যায়নি এ মুভিতে। মুভিটি তার করা কনসার্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ১৯৮৫ সালের ‘লাইভ এইড’ কনসার্টের মাধ্যমে শেষ হয়।

নির্মাণ ও চিত্রনাট্য

মুভিটি পরিচালনা করেছেন জনপ্রিয় পরিচালক ব্রায়ান সিংগার। আত্মজীবনী সংক্রান্ত মুভির অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো এ ধরনের মুভিতে কাল্পনিক অথবা নাটকীয় উপাদান যোগ করার সুযোগ তেমন একটা থাকে না। তাই পুরোটাই আসলে নির্ভর করে মুভির নির্মাতারা কীভাবে মুভিটিকে উপস্থাপন করবেন দর্শকদের সামনে। এক্ষেত্রে ব্রায়ান সিংগার পুরোপুরি সফল হয়েছেন বলা যায়।

মুভিটির একটি দৃশ্যে রেমি মালেক; Source: pitchfork.com

এছাড়া মুভিটির এডিটিং এ মর্মে অনেকটা প্রশংসার দাবী রাখে। ফ্রেডি মার্কারির বর্ণাঢ্য জীবন কাহিনীর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এডিটর জন অটম্যান আড়াই ঘন্টায় তার জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশগুলো তুলে ধরতে পেরেছেন। তার এ পরিশ্রমের ফল তিনি পেয়েছেন, সেরা এডিটিংয়ের জন্য অস্কার লাভের মাধ্যমে।

মুভিটির চিত্রনাট্যের ব্যাপারে দায়িত্বে ছিলেন আ্যান্থনি ম্যাককার্টেন। হলিউড মুভির দর্শকরা সাধারণত ২ ঘন্টার উপরে মুভি দেখে অভ্যস্ত নয়। তাই প্রায় আড়াই ঘন্টাব্যাপী এ মুভিটি শুরুর দিকে ধীরগতিতে চললেও দ্বিতীয়ার্ধে তা খুব দ্রুতই জমে উঠে।

অভিনয় এবং সংগীত

বোহেমিয়ান র‍্যাপসোডির অভিনয়ের কথা যদি তুলতে হয় তবে তার পুরোটা জুড়েই থাকবে রেমি মালিক। নিজেকে ফ্রেডি মার্কারি হিসেবে উপস্থাপন করতে এ অভিনেতা নিজের সর্বস্ব নিংড়ে দিয়েছেন। তার অভিনয় কতটা সাবলীল হয়েছে তার বেশ ভালোমতো বোঝা যায় যদি কেউ মুভিতে রেমি মালিকের স্টেজ পারফরম্যান্সের সাথে বাস্তবের ফ্রেডি মার্কারির কনসার্টের ভিডিওগুলো মিলিয়ে দেখেন। তার অসাধারণ অভিনয়ের স্বীকৃতিসরূপ তিনি এ বছর অস্কার, গোল্ডেন গ্লোবসহ প্রায় সবকয়টি গুরুত্বপূর্ণ আ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে সেরা অভিনেতার পুরষ্কার লাভ করেছেন।

অস্কার লাভের পর রেমি মালিক; Source: bustle.com

মুভিটি একটি আত্মজীবনীর পাশাপাশি একটি মিউজিকাল ড্রামাও। মুভিতে প্রচুর গানের ব্যবহার হয়েছে যার সবকটি কুইন ব্যান্ডের সেরা বাছাইকৃত গান। মুভিতে গানের পাশাপাশি আবহ সংগীতেও ব্যবহার করা হয়েছে কুইনের বিভিন্ন গান। এছাড়া রেমি মালেকের খালি গলায় গান গাওয়ার দৃশ্যগুলোতেও সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে প্রয়াত ফ্রেডি মার্কারির কন্ঠ ব্যবহার করা হয়েছে। মুভিটি সেরা সাউন্ড এডিটিং এবং সাউন্ড মিক্সিং এর জন্য মুভিটি অস্কার অর্জন করেছে।

কেন এ মুভিটি দেখবেন

২০১৮ সালে যে কয়টি মুভি মুক্তি পেয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম সেরা মুভি এটি। মুভিটির মাধ্যমে আপনি যেমন রক লিজেন্ড ফ্রেডি মার্কারি এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যান্ড কুইন সম্পর্কে জানতে পারবেন, তেমনি এর পাশাপাশি ব্রায়ান সিংগারের অসাধারণ মেকিং এবং কুইনের সেরা গানগুলোও পুনরায় উপভোগ করতে পারবেন।

দর্শক এবং সমালোচকদের ব্যাপক সাড়া পাওয়া এ মুভিটি বক্স অফিসে যেরকম বাজিমাত করেছে তেমনি জয় করে নিয়েছে এ বছরের গোটা অস্কার অনুষ্ঠান। ৫টি ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পেয়ে তার মধ্যে ৪টি জিতে নেওয়া এ মুভিটি এবারের সর্বাধিক অস্কারপ্রাপ্ত মুভি। মুভিটির আইএমডিবি রেটিং ৮.১ মুভিটির শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রতিফলন ঘটায়। তাই দেরি না করে দেখে ফেলতে পারেন বোহেমিয়ান র‍্যাপসোডি।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment