বই, মুভি কিংবা টিভি সিরিজ যে কোনটির ক্ষেত্রেই ক্লাসিক কাজ গুলো টিকে থাকে দিনের পর দিন, বহু বছর ধরে। তবে থ্রিলারের জনপ্রিয়তাকে হারাতে পারে না কখনোই। হয়তো মনোযোগ ধরে রাখতে খুব বেশী স্ট্রেস নিতে হয় না বলেই মানুষ বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে থ্রিলারকে ক্লাসিকের চেয়ে বেশী পছন্দ করে।

থ্রিলার জগতে ক্রাইম থ্রিলারের জনপ্রিয়তা আবার তুঙ্গে , অবশ্য ব্যক্তিগত পছন্দে এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে।

ক্রাইম থ্রিলার টিভি সিরিজগুলোর মধ্যে কপস থ্রিলার সাম্প্রতিক সময়ে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এফবিআই, সিআইএ কিংবা আমেরিকান কোন শহরের পুলিশ ডিপার্টমেন্টের কেইসের উপর ভিত্তি করে সিরিজগুলো তৈরী করা হয়। কেইসগুলো ফিকশনাল হলেও আবহ এমন ভাবে তৈরী করা হয় যে দর্শক তাতে সত্যিকারের কেইসের অনুভূতি লাভ করে।

মানুষ পর্দায় প্রিয় চরিত্রগুলোকে যেমন সাধারণের চেয়ে আলাদা করে দেখতে চায় তেমনি তার মধ্যে দেখতে চায় মানবিক ব্যাপারগুলোও । আর এ জন্যই পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে নিয়ে তৈরী সিরিজের চরিত্রের  চেয়ে অসাধারণ কিন্তু সিআইএ’র মতো অমানবিকও নয় বলে এফবিআই সিরিজ একটু বেশীই জনপ্রিয়।

ব্লাইন্ডস্পট টিভি সিরিজ পোস্টার ; Image Source: imdb.com

ব্লাইন্ডস্পট একটি এফবিআই সিরিজ যা ২০১৫ সালে প্রথম টেলিকাস্ট শুরু হয়। পূর্বে জনপ্রিয় হওয়া এফবিআই সিরিজ ব্ল্যাকলিস্ট, পারসন অফ ইন্টারেস্টের মতো ব্লাইন্ডস্পটও শুরুতেই মানুষের মনে দারুণ আলোচনার জন্ম দেয়। আরেক জনপ্রিয় টিভি সিরিজ প্রিজন ব্রেকের মতো শরীরে আঁকা ট্যাটু এবং এ থেকে এ্যানালাইসিসের গল্প থাকায় সম্ভবত প্রিজন ব্রেক ফ্যানরা নস্টালজিয়া থেকেই সিরিজটি পছন্দ করতে শুরু করেছিলেন। যদিও সিরিজের স্টোরিলাইন প্রিজন ব্রেকের সাথে কোন মিলই নেই শরীরে আঁকা ট্যাটুর ব্যাপারটি ছাড়া ।

তবে প্রিজন ব্রেকের সাথে আর একটি ব্যাপারে মিল চাইলে বলা যায়, প্রিজন ব্রেকও ফিফথ সিজনের পর সিক্সথ সিজনের ঘোষণা দিয়েও যেমন রিলিজ করছে না তেমনি ব্লাইন্ডস্পটও টানা তিন সিজন টেলিকাস্টের পর বহুদিন উধাও খাকার পর গতমাসে আবার ফোর্থ সিজন টেলিকাস্ট করতে শুরু করেছে।

কাহিনী সংক্ষেপ

আমেরিকার ব্যস্ততম শহর নিউইয়র্ক সিটির ব্যস্ততম রাস্তা টাইমস স্কয়ারে পাওয়া গেছে একটি ফ্যাকাশে সাদা রঙের ট্রাভেল ব্যাগ, কে রেখে গেছে কেউ জানে না, জানে না ভেতরে কী আছে। ব্যাগটি আবিষ্কার করে একজন ডিউটি অফিসার নিউইয়র্ক পুলিশের যিনি দেখতে পান ব্যাগের উপরের ট্যাগ কার্ডে লেখা, Call FBI!

জেন ডো’র শরীর জুড়ে ট্যাটু রহস্য ; Image Source: maxresdifault.com

ব্লাইন্ডস্পট সিরিজের প্রথম এপিসোডের প্রথম দৃশ্যটি এভাবেই শুরু হয়, আতঙ্ক আর কৌতুহল নিয়ে। সাময়িকভাবে সে আতঙ্ক কমলেও কৌতুহল ক্রমশ বাড়তেই থাকে যখন এফবিআই আর নিউইয়র্ক পুলিশের বোম্ব স্কোয়াড একসাথে এসে আবিষ্কার করে ব্যাগের ভেতরে থাকা নগ্ন এক তরুণীকে যার সারা শরীর জুড়ে বিচিত্র রকমের ট্যাটু করা ।

ব্যাগে থাকা তরুণী কোথ্বেকে এলো আর কে রেখে গেল কেউ জানে না, জানে না সে তরুণীও, কারণ ব্যাগে করে আনার আগে তার সমস্ত স্মৃতি বিশেষ এক ড্রাগের মাধ্যমে মুছে ফেলা হয়েছে।

কার্ট ওয়ালার এবং এফবিআই টিম ; Image Source: starrymag.com

এফবিআই এর যে টিম কেইসটা হাতে নেয় তাদের টিম লিডার কার্ট ওয়ালার। এই কেইস কার্ট ওয়ালারের হাতে আসার কারণটাও বেশ মজার এবং কৌতুহল জাগানো। ট্যাটু তরুণী যাকে জেন ডো নামে ডাকতে শুরু করেছে সবাই, তার পেছনে আঁকা এক ট্যাটুতে রয়েছে কার্ট ওয়ালারের নাম।

কার্ট ওয়ালারের এই ট্যাটু কেইস টিমের অন্যান্য মেম্বাররা হলো এডগার রিড, তাশা জাপাতা এবং কম্পিউটার এনালিস্ট হিসেবে প্যাটারসন। টিম ডিরেক্টর হিসেবে বেথেনি মে ফ্লাওয়ার অফিসের নেতৃত্ব দেন।

জেন ডো’র শরীরে থাকা প্রতিটা ক্ষুদ্র ট্যাটু এক একটা বিশাল কেইস নিয়ে আসে ওয়ালারদের কাছে। প্রতি এপিসোডে এক একটা করে ট্যাটুর সমাধান হয় আর টিম ওয়ালার নিউইয়র্ক সিটিকে বাঁচিয়ে দেয় এক একটা বিশাল বিপর্যয় থেকে।

পরবর্তীতে জেন ডো’ও হয়ে যায় এই টিমের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। একসাথে তারা ট্যাটু সমাধান করে এগুতে চায় আসল ভিলেনের দিকে যে জেনকে পাঠিযেছে মেমোরি ইরেজ করে যদিও তারা তখনো জানেই না পেছনের মূল হোতা কে!‍

একটা সময় যদিও জানা যায় তাবে তার জন্য আপনাকে দেখতে হবে অনেকদিন, তবে এটুকু নিশ্চয়তা দেয়া যায় ধৈর্যের কোন পরীক্ষা আপনাকে দিতে হবে না অনেকদিন যাওয়ার জন্য কারণ সিরিজটির গল্পই দর্শককে টেনে ধরে রাখবে শেষটা জানার জন্য।

আর জানার পরেও কাহিনীর নতুন নতুন মোড় কখনোই সিরিজটিকে বোরিং হতে দেয় না।
সাসপেনশন আর টুইস্টে ভরা স্টোরি প্রথম থেকেই দর্শককে টেনে ধরে রাখবে সে নিশ্চয়তা দেয়াই যায়।

অভিনয়

মূল চরিত্র জেন ডো যে সিরিজের বিভিন্ন সময়ে রেমি, টেইলর শ নামেও পরিচিত হয়, এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন জেইমি আলেকজান্ডার। এফবিআই টিম লিডার কার্ট ওয়ালার চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় টিভি অভিনেতা সলিভান স্ট্যাপলটন। এ্যাডগার রিড চরিত্রে রব ব্রাউন এবং তাশা জাপাটা চরিত্রে অড্রে এসপারেজা অভিনয় করেছেন।

ব্লাইন্ডস্পট শ্যুটিং এর ফাঁকে  ; Image source: twitter.com

এছাড়া অন্যান্য মূল চরিত্রে এ্যাশলে জনসন, লুক মিশেল, উকুয়েলি রোচ, এ্যানিস এসমার, মিশেল হার্ড, আর্চি পান্জাবি সহ আরো অনেকেই।

চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা

ব্লাইন্ডস্পটের গল্প এবং চিত্রনাট্য লিখেছেন মার্টিন জেরো। সিজন ফোর সহ মোট ৮৯ টি এপিসোড পরিচালনায় মার্টিন সাহায্য নিয়েছেন মোট ৪৪ জন পরিচালকের।

সিজন এবং এপিসোড

২০১৫ সালে শুর হওয়া সিরিজটি প্রথম তিন বছরে তিনটি সিজন বের করলেও তারপর বেশ ভালো রকমের একটা গ্যাপ থাকায় ব্লাইন্ডস্পটের ফ্যানরা বেশ হতাশই হয়ে গিয়েছিল। তবে আশার কথা হচ্ছে ২০১৯ সালে এসে ব্লাইন্ডস্পট সিজন ফোর আবার টেলিকাস্ট হচ্ছে।

প্রথম সিজনে এপিসোড সংখ্যা ২২ টি, দ্বিতীয় সিজনে এপিসোড সংখ্যা ২৩ টি এবং তৃতীয় সিজনে এপিসোড সংখ্যা ২২ টি।

রেটিং এবং এ্যাওয়ার্ড

রোটেন টমেটো রেটিং ৭২%।

আইএমডিবি রেটিং – ৭.৫

এ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে ব্লাইন্ডস্পট টিম ; Image Source: thegeekiyare.com

দুটো প্রাইম টাইম এ্যামি এ্যাওয়ার্ডে ছয়টি ক্যাটাগরিতে নমিনেশন পায় ব্লাইন্ডস্পট এবং দুটো ক্যাটাগরিতে সেরার খেতাবও পায়।

কেন দেখবেন সিরিজটি

সাধারণত বেশীরভাগ থ্রিলার সিরিজ প্রথম দিকে অর্থাত বিল্ডআপ টাইমে কিছুটা স্লো থাকলেও ব্লাইন্ডস্পট এ ক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম, প্রথম এপিসোডের প্রথম মিনিট থেকেই দরশকের আগ্রহ ধরতে সক্ষম।

প্রতিটা এপিসোড এক একটি নতুন কেইস স্টোরি নিয়ে আসা হয়েছে বলে প্রতি এপিসোডে যেমন নতনত্বের স্বাদ পাওয়া যাবে তেমনি পাওয়া যাবে প্রথম থেকেই চলে আসা রহস্যের জটিলতার মজাও।

টানটান উত্তেজনাময় গল্পের পাশাপাশি প্রেম ভালোবাসা, আবেগ, রাগ, ঘৃণার মেলবন্ধনে গল্পের চরিত্রগুলো হয়ে ওঠে দর্শকের কাছের মানুষের মতোই, যা ড্রামা জেনরের স্বাদও দেবে দর্শককে। 

Related Article

0 Comments

Leave a Comment