জাত, ধর্ম, পেশা দিয়ে কখনো মানুষ চেনা যায় না। সবকিছুতেই ভালো মন্দ থেকে যায়। মসজিদের ইমাম কিংবা গির্জার পাদ্রীও কখনো কখনো জঘন্যতম অপরাধে অভিযুক্ত হয়। আবার সন্ত্রাসী সংগঠনের মাঝেও মানবিক মানসিকতার কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়।

ব্ল্যাকলিস্ট টিভি সিরিজ পোস্টার ; Image Source: devianart.com

ব্ল্যাকলিস্ট টিভি সিরিজটিও এমন একজন মানুষকে ঘিরে, তার গল্প নিয়েই তৈরী হয়েছে। মাফিয়া রাজ্যে যার ক্ষমতা প্রায় ঐশ্বরিক পর্যায়ে, তবু কোথাও, কোন এক কোণায় যেন থেকে গেছে নিখাদ এক মানবিক মন, আর এ মনকে কাজে লাগিয়েই এফবিআই এর এক টিম অপারেশন চালাতে থাকে একের পর এক। বধ হয় ভয়ংকর সব অপরাধী। আমেরিকা বেঁচে যায় ভীষণরকম বিপর্যয় থেকে প্রতিবার।

কন সায়েন্স অথবা কপস থ্রিলার, যে কোন একটি দিয়ে জেনারালাইজ করা যেতে পারে ব্ল্যাকলিস্ট টিভি সিরিজটিকে। প্রতি এপিসোডে আলাদা আলাদা কেইস সমাধানের সাথে সাথে চলে আসে আলাদা একটা রহস্য, যার পেছনে ছুটে চলতে হবে প্রতি পর্বেই, শেষ পর্ব অবধি।

কাহিনী সংক্ষেপ

একটা সাধারণ দিন, অন্যান্য সব দিনের মত রোদের সকাল। ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, এমন সময় মধ্যবয়স্ক কিংবা প্রৌঢ় এক ভদ্রলোক স্যুটেড ব্যুটেড হয়ে সুটকেস হাতে ব্যাংকের কাউন্টারে, যেন এসেছেনই টাকা জমা করতে কিংবা তুলতে।

হুট করে পেছন থেকে রিভালবার বের করে তাক করলেন ব্যাংকের ভেতরে থাকা সব মানুষদের প্রতি, হোস্টেজ করলেন সবাইকে। এফবিআই কর্মকর্তাদের উপস্থিতি দাবী করলেন ফোনে। কিন্তু কে তিনি? কোন ব্যাংক ডাকাত? তাহলে এফবিআই খুঁজছেন কেন? ঠিক এফবিআইও নয়, তিনি চাইছেন বিশেষ একজন এফবিআই এজেন্টকে, এলিজাবেথ কিন।

এলিজাবেথ কিন কেন? এলিজাবেথ নিতান্তই একজন সাধারণ তরুণী, যে সদ্যই তার স্বপ্নের কাছে পৌছতে শুরু করেছেন। এফবিআইতে জয়েন করা তার আজন্ম স্বপ্ন, আর তা সত্যি হতে চলেছে সেদিনই।

আবেগঘন দৃশ্যে এলিজাবেথ এবং রেডিংটন ; Image Source: pinterest.com

ট্রেনিং শেষে যোগ দিতে চলেছেন এফবিআই প্রোফাইলার হিসেবে, অথচ জয়েনের দিন সকালে ঘর ছেড়ে বেরুনোর আগেই এফবিআই এর বিশেষ এক টিমের তলব, ঘাড়ে এসে পড়লো বিশাল এক কেস, রেমন্ড রেড রেডিংটনের ইনভেস্টিগেশন।

হ্যাঁ, রেডিংটন, মাফিয়া জগতের এক কিংবদন্তির নাম। নিজেকে যে এমন পর্যায়েই নিয়ে গিয়েছিল যে আন্ডারগ্রাউন্ডেও তার নামে রহস্য বিরাজ করতো। কারো কারো ধারণাই ছিল রেডিংটন নামে কেউ নেই, পুরোটাই মিথ। তবুও তারা ভয় পেত, আতঙ্কিত হতো রেডিংটনের যে কোন অন্তভূক্তিতে৷

বন্দী অবস্থায় রেডিংটন ; Image Source: tvinsider.com

হ্যাঁ, ব্যাংকের সেই ভদ্রলোকই রেমন্ড রেড রেডিংটন। শুধু কথা দিয়েই যে অস্ত্রের মত ঘায়েল করতে পারে তুমুল প্রতিপক্ষকে। রেডিংটন সেখানে গিয়েছিল ব্যাংক ডাকাতি করতে নয়, বরং আত্মসমর্পণ করতে।

প্রশ্ন জাগছে না মনে, এত ক্ষমতাধর একজন মাফিয়া কেন সেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করবেন? এফবিআই এর ভেতরে ঢুকে তার উদ্দেশ্য কী? আর কেনই বা চাইছেন শুধু এলিজাবেথ কিনের কাছেই মুখ খুলতে? কী এমন বিশেষত্ব এই তরুণীতে? কী সম্পর্ক এলিজাবেথের সাথে রেডিংটনের?

এমন সব প্রশ্ন মাথায় নিয়েই উত্তরের আশায় দৌড়ে চলবেন ব্ল্যাকলিস্ট জুড়ে, সাথে প্রতি এপিসোডে রেডিংটনের সাথে এফবিআই টিমের নতুন নতুন সব কেইস সলভ তো থাকবেই অন্যান্য সব কপস থ্রিলারের মত।

আর বোনাস হিসেবে রেমন্ড রেডিংটনের দুর্দান্ত ডায়লগ ডেলিভারি মুগ্ধ হয়ে শোনার সুযোগ তো থাকছেই।

অভিনয়

ব্ল্যাকলিস্টের অভিনেতাদের যদি র্যাংকিং করতে বসি, তাহলে রেমন্ড রেড রেডিংটন চরিত্রে অভিনয় করা জেমস স্প্যাডার যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে। ব্যাপারটা এমন নয় যে অন্যরা খারাপ অভিনয় করেছে, যেমন এফবিআই প্রোফাইলার এলিজাবেথ কিন চরিত্রে অসাধারণ ছিলেন মেগান বুন অথবা ডোনাল্ড রেসলার চরিত্রে ডিয়েগো ক্লাটেনহল্ফ ছিলেন চমৎকার।

রেডিংটন চরিত্রটিকে অন্য এক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন জেমস স্প্যাডার ; Image Source: etonline.com

কিন্তু রেমন্ড রেড রেডিংটন চরিত্রে জেমস স্পাডার নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যে তাকে ছাপিয়ে যাওয়া বোধহয় তার পক্ষেও সম্ভব নয়।

এছাঢ়া অন্যান্য গুরুত্বপুর্ণ চরিত্রে ছিলেন হ্যারি রেনিক্স, হিশাম তাওফিক, আমির এ্যারিসন, মোঝান মার্নো, রায়ান এ্যাগগোল্ড, সুশান ব্লোমার্ট, ব্যাজ, পারমিন্দর নাগরা সহ আরো বিশাল একটি কাস্টিং টিম নিয়ে তৈরী হয়েছে ব্ল্যাকলিস্ট টিভি সিরিজটি।

চিত্রনাট্য ও পরিচালনা

ব্ল্যাকলিস্ট টিভি সিরিজটির মূলগল্প জন বোকেনক্যাম্পের লেখা, টিভি সিরিজে রূপান্তরের জন্য চিত্রনাট্য তৈরীর কাজে টেইলর মার্টিন, ব্র্যান্ডন মারগুলিস, ব্র্যান্ডন সোনিয়ার সহ মোট ৪৩ জন বোকেনক্যাম্পকে সহযোগিতা করেন।

সিরিজটি পরিচালনার ক্ষেত্রেও মোট ৪৪ জন পরিচালক কাজ করে। মাইকেল ডাব্লিউ. ওয়াটকিনসের নেতৃত্বে বিল রয়, এ্যান্ড্রু ম্যাককার্থি, ডোনাল্ড ই. থোরিন জুনিয়র, টেরেন্স ও’হেরা, স্টিভেন এ. এ্যাডেলসন সহ মোট ৪৩ জন সহকারী ওয়াটকিনসনকে সহায়তা করে।

সিনেমাটোগ্রাফি

মাইকেল কারাসিওলোর নেতৃত্বে এ্যারিক ময়নিয়ের, সাদ মোস্তফা, ফ্রাংক প্রিন্জি, আর্থার আলবার্ট, ইয়াসু টানিডা এবং পিটার রেনিয়ের অর্থাৎ মোট সাতজন মিলে ব্ল্যাকলিস্ট টিভি সিরিজটির সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন।

মিউজিক

সিরিজ চলাকালীন সময়ে পেছনে চলা চমৎকার আবহসঙ্গীতের স্রষ্টা হিসেবে ছিলেন দুইজন, ডেভ পোর্টার এবং জেমস এস. লেভিন।

সিজন এবং এপিসোড

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া ব্ল্যাকলিস্ট টিভি সিরিজটি ২০১৯ সালের জানুয়ারির প্রথমে এসে ষষ্ঠ সিজন টেলিকাস্ট শুরু হয়।

তৃতীয় সিজন ব্যাতিত বাকি পাঁচ সিজনে ২২ টি করে এপিসোড রয়েছে। শুধুমাত্র তৃতীয় সিজনে ২৩ টি এপিসোড রাখা হয়েছে।

রেটিং

আইএমডিবি রেটিং – ৮.১

রোটেন টমেটো – ৯১%

এ্যাওয়ার্ড

দুইটি গোল্ডেন গ্লোবস এ্যাওয়ার্ডে নমিনেশন পাওয়া সহ মোট পঁচিশটি এ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয এবং দুটো পুরষ্কারও পায়।

এ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে ব্ল্যাকলিস্টের দুই অভিনেতা অভিনেত্রী ; Image Source: variety.com

কেন দেখবেন সিরিজটি

ব্ল্যাকলিস্ট হয়তো আপনার দেখা সেরা সিরিজ নয়। আকর্ষণীয় গল্প কিংবা দূর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফি দিয়েও একে আলাদা করার উপায় নেই। নেই টেকনোলজির চুরমার করে দেয়া খেল, টুইস্টের দামামা এপিসোডে এপিসোডে। তবে সব কিছুই রয়েছে যা হয়তো ব্ল্যাকলিস্টকে গড়পড়তা একটা সিরিজ হিসেবে চলার সক্ষমতা দিতো। কিন্তু সিজনের পর সিজন ধরে ব্ল্যাকলিস্ট জনপ্রিয়তা ধরে রাখার রহস্য একটাই।

রেমন্ড রেড রেডিংটন, জেমস স্প্যাডার চরিত্রটিকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছেন, যেখান থেকে শুধু দর্শককে মুগ্ধই করা যায়।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment