সায়েন্স ফিকশন ঘরানার যে কয়টি টেলিভিশন সিরিজ এখন পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছে তাদের মধ্যে সেরাদের যদি একটি তালিকা বানানো হয়, তবে তাতে নিঃসন্দেহে থাকবে ব্ল্যাক মিরর টিভি সিরিজটির নাম। সিরিজটির মূলমন্ত্র হচ্ছে বর্তমানের আলোকে ভবিষ্যতে যে সকল প্রযুক্তি আবিষ্কার হতে পারে, সেগুলোর অপব্যবহার মানব সভ্যতাকে কি করতে পারে তার একটি ঝলক তুলে ধরা। জনপ্রিয় এ শো’টি একটি আ্যান্থ্রোলোজি সিরিজ। অর্থাৎ এর প্রত্যেকটি পর্বই একেকটি আলাদা গল্প। অনেকটা ছোটোখাটো মুভির মতোই বলা যায়। তবে আজ আমরা ব্ল্যাক মিরর টিভি সিরিজ নয় বরং মুভি নিয়ে আপনাদের কাছে হাজির হয়েছি।

ব্ল্যাক মিররের মুভির কথা শুনতে অবাক লাগলেও এ মুভিটি আর দশটা মুভির মতো নয়। বরং পৃথিবীতে এ ধরনের মুভি এবারই প্রথম। হয়তো বা ভাবছেন কি এমন আছে এ মুভিতে? এর জন্য আসলে ফিরে যেতে হবে একটু পিছনে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সিরিজটির প্রথম দুই সিজন প্রচারিত হতো চ্যানেল ফোরে। কিন্তু ২০১৬ সালে চ্যানেলটি নেটফ্লিক্সের কাছে সিরিজটির স্বত্ত্ব বিক্রি করে দেয়। তারপর আরো দুটি সিজন সম্প্রচারের পর ২০১৮ সালের একদম শেষে নেটফ্লিক্স হাজির হয় বিশ্বের প্রথম ইন্টার‍্যাক্টিভ ফিল্ম (Interactive Film) ব্ল্যাক মিরর ব্যান্ডারস্ন্যাচ নিয়ে। কি এই ব্যান্ডারস্ন্যাচ আর কি এই ইন্টার‍্যাক্টিভ ফিল্ম চলুন তা জেনে আসা যাক।

ইন্টার‍্যাক্টিভ ফিল্ম সম্পর্কিত ধারণা এবং ব্যান্ডারস্ন্যাচ

আপনি যদি নিয়মিত কম্পিউটারে ভিডিও গেমস খেলে অভ্যস্ত থাকেন তবে এ ব্যাপারটি আপনার একদম অজানা নয়। আজকাল অনেক ভিডিও গেমেই স্টোরি মোড বলে একটি ব্যাপার থাকে। এর মতে, আপনি আপনার গেমটির চরিত্রগুলোকে নিয়ে আপনি খেলতে পারবেন, তবে পুরো গেমটি অনেকটা মুভির মতো মনে হবে। গেমের মাঝখানে এমন কিছু অংশ থাকবে যখন আপনি শুধু তা মুভির মতো দেখবেন, বাকি অংশে আপনাকে গেমের ঐ মূল চরিত্র অথবা চরিত্রদের নিয়ে খেলতে হবে যেখানে আপনার উপর নির্ভর করছে গল্পে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে যাচ্ছে।

স্টেফানের বানানো গেম ব্যান্ডারস্ন্যাচ; Source: ign.com

ব্ল্যাক মিরর ব্যান্ডারস্ন্যাচ এরই আরেকটি রূপ বলা যায়। তবে এক্ষেত্রে আমরা যেখানে দেখে এসেছি গেমের ভেতরে মুভি, ব্ল্যাক মিরর ব্যান্ডারস্ন্যাচে প্রথমবারের মতো যেন দেখা দিয়েছে মুভির ভেতরে গেম। তবে কোনো আ্যানিমেটেড চরিত্র নয় বরং বাস্তব চরিত্রদেরই আপনি আপনার মনমতো চালনা করতে পারবেন। হয়তোবা ভাবছেন কিভাবে সম্ভব, তবে প্রথমবারের মতো বিশ্বের সামনে এ অসম্ভবেরই চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে নেটফ্লিক্স।

কাহিনী সংক্ষেপ এবং সম্ভাব্য সমাপ্তি

ব্যান্ডারস্ন্যাচের মূল কাহিনী তরুণ কম্পিউটার প্রোগ্রামার স্টেফান বাটলারকে ঘিরে। নব্বই এর দশকে স্টেফান একটি ভিডিও গেম নির্মাণকারক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নতুন গেম বানানোর প্রজেক্ট হাতে নেয়। লেখক লুইস ক্যারোলের ব্যান্ডারস্ন্যাচ নামক একটি উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে গেমটি প্রস্তুত করতে থাকে। উল্লেখ্য, কাহিনীতে এটাও দেখানো হয় যে, লেখক লুইস ক্যারোল এই উপন্যাস লেখাকালীন কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। এরপর গেমটি নিয়ে কাজ করতে করতে স্টেফানের সাথে ঘটতে থাকে একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা।

তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে স্টেফানের সাথে ঘটতে থাকা এসব অদ্ভুত ঘটনার জন্য দায়ী আপনি, অর্থাৎ আমার আপনার মতো মুভিটির দর্শকরা। মুভির শুরুটা সবার জন্য একই থাকলেও কিছুক্ষণ পরপর স্ক্রিনের নিচে আপনার কাছে দুটি করে সুযোগ আসবে। আপনি যেদিক যাবেন ঘটনা সেখান থেকে আগাতে থাকবে। তবে ডান অথবা বাম যেকোনো একদিকে যাবার জন্য আপনার হাতে সময় মাত্র দশ সেকেন্ড।

দুটি কাজের মধ্যে যেকোনো একটি করার জন্য সময় পাচ্ছেন ১০ সেকেন্ড; Source: screenrant.com

দশ সেকেন্ডের ভেতর আপনি যেকোনো একদিকের পথে না গেলে কিছুক্ষণ পর এমনিতেই বাম দিকের ঘটনা স্ক্রিনে শুরু হয়ে যাবে। এভাবে এগোতে থাকলে আপনার চয়েস অনুযায়ীই মুভিটি শেষ হবে। তবে এভাবে করে মুভিটি মোট কতক্ষণ চলবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আপনার উপর।

মুভিটি যেমন ১৫ মিনিটের মাথায় শেষ হতে পারে আবার এটি শেষ হতে ৯০ মিনিটও লাগতে পারে। একটি সূত্র মতে, এ মুভিটি একটানা দেখতে থাকলে সবগুলো দিকে কেউ যদি আগে পিছে করে যায়, তবে তার সময় লাগবে ৫ ঘন্টা ১২ মিনিট ১৩ সেকেন্ড।

উপরে ডান পাশে তারকা চিহ্নটি যদি আপনার ডিভাইস থেকে মুভিটির পোস্টারে দেখা যায় তবেই আপনি মুভিটি দেখতে পারবেন; Source: youtube.com

তবে একটি দুঃসংবাদ হচ্ছে মুভিটি এভাবে নিজে নিজে চয়েস দিয়ে দেখতে হলে আপনাকে আপনার নেটফ্লিক্স একাউন্ট থেকে দেখতে হবে। শর্ত এখানেই শেষ নয়, শুধু নেটফ্লিক্স একাউন্ট থাকলেই হবে না। এর পাশাপাশি আপনি যে ডিভাইসে দেখবেন তাতেও নেটফ্লিক্সের এ নতুন ফিচারটি উপভোগ করতে পারবেন। তবে পুরোপুরি আশাহত হবার কোনো কারণ নেই। আপনার যদি নেটফ্লিক্স একাউন্ট না থাকে তাহলে আপনি টরেন্ট থেকে ডাউনলোড কতে পুরো ৫ ঘন্টার প্যাকেজটাই উপভোগ করতে পারবেন।

পরিচালনা এবং চিত্রনাট্য

মুভিটি দর্শকের ইচ্ছা অনুযায়ী চললেও এর প্রায় ৫ ঘন্টারও বেশি সময় দৃশ্যায়নের পেছনে যে মানুষটি দায়ী তিনি হলেন ব্রিটিশ পরিচালক ডেভিড স্লেইড। তিনি এর পূর্বে ব্রেকিং ব্যাড, হ্যানিবলের মতো সিনেমা উপহার দিয়েছেন। এছাড়া ব্ল্যাক মিররের মতো টিভি সিরিজগুলোর বেশ কিছু পর্বও পরিচালনা করেছেন। পরিচালক হিসেবে ব্ল্যাক মিরর ব্যান্ডারস্ন্যাচে বেশ ভালোই কাজ করেছেন স্লেইড। সিনেমা জগতে বিশ্বে প্রথমবারের মতো এরকম নতুন কিছু নিয়ে আসা চাট্টিখানি কথা না। তবে সে তুলনায় পরিচালক বেশ ভালোই মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন মুভিটিতে।

কলিন চরিত্রে উইল পোল্টার; Source: mtv.com

চিত্রনাট্যের দিক দিয়ে ব্যান্ডারস্ন্যাচ কিছুটা দুর্বল। নতুন ঘরানার মুভি বানাতে গিয়ে নির্মাতারা শুধুমাত্র পরিচালনা এবং নতুন ধারাটি চালু করার দিকেই মনোযোগ দিয়েছেন। কিন্তু গল্প বিচারে ব্ল্যাক মিরর সিরিজটি এতদিন যে মান ধরে রেখেছিল এ মুভিতে সেরকম মানের গল্প পাওয়া যায়নি। তবে এরকম কোনো কিছু পরীক্ষামূলকভাবে হলেও চালু করায় এরকম ত্রুটি মেনে নেওয়া যায়।

অভিনয় এবং রেটিং

এ মুভিটিতে মূল দুটি চরিত্র স্টেফান বাটলার এবং কলিন রিটম্যান। কলিন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ক্রনিকলস অব নার্নিয়া, মেজ রানারের মতো মুভিগুলোতে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনহ করা উইল পোল্টার এবং টমি চরিত্রে রয়েছে ডানকার্ক মুভিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি পাওয়া ফিওন হোয়াইটেকার। মুভির সকল অভিনেতার পারফর্মেন্স সন্তোষজনক বলা যায়।

ফিওন হোয়াইটেকার এবং উইল পোল্টার; Source: hollywoodreporter.com

এরকম ধাঁচের মুভি বিশ্বে এবারই প্রথম হলেও সেই হিসেবে মুভিটি বেশ ভালো। তাই সমালোচকদের রোষানলে পড়তে হয়নি মুভিটিকে। মুভিটির বর্তমান আইএমডিবি রেটিং ৭.৩ এবং মুভিটির রটেন টমেটোতে স্কোর ৭২ শতাংশ।

কেন দেখবেন মুভিটি

সচারাচর চলে আসা মুভির ফর্মুলা থেকে একদম ভিন্ন ধাচের কিছু দেখতে চাইলে মুভিটি আপনার জন্য। মুভিটির আর কোনো কিছু ভালো লাগুক বা না লাগুক, নিজের ইচ্ছামতো মুভিটির শেষ পরিণতিতে পৌঁছানোর ব্যাপারটি আপনাকে মুভিটির ব্যাপারে উৎসুক করে তুলবে তা হলফ করে বলা যায়।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment