গত বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ সহ ভারতীয় উপমহাদেশে দক্ষিণ ভারতের মালায়লাম ভাষার সিনেমা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মুভি ব্লগ এবং সোস্যাল মিডিয়া অনুসরণ করলে দেখা যায়, চমৎকার মৌলিক গল্প, সাবলীল অভিনয়, দারুণ মিউজিক মালায়লাম মুভির জনপ্রিয়তার কারণ। এছাড়া সাধারণ কস্টিউম, মেকআপের আধিক্য না থাকা ইত্যাদি কারণে সিনেমার চরিত্ররা খুব সহজেই দর্শকদের কাছের মানুষ হয়ে ওঠে।

ব্যাপারটা এমন না যে মালায়লাম মুভি আগে এসব বিবর্জিত ছিল। তবে ইন্টারনেটের বদৌলতে বিভিন্ন দেশ ও ভাষার সিনেমা আমাদের কাছে সহজলভ্য হয়ে ওঠায় এবং তরুণ প্রজন্মের বিশেষ একটা অংশ বিদেশী ভাষার মুভির প্রতি অন্যরকম একটা আগ্রহ থাকায় ইরানী মুভি, টার্কিস মুভি, কোরিয়ান মুভির মত দক্ষিণের মুভি, বিশেষ করে তামিল, তেলেগু এবং মালায়লাম ভাষার মুভি মানুষের ওয়াচিং লিস্টে রাখতে দেখা যায়।

শুধু যে জনপ্রিয় হচ্ছে মালায়লাম মুভি, এমন না। মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রিতে হওয়া ভালো ভালো গল্পের সিনেমার রিমেক হচ্ছে বলিউড সহ ভারতের অন্যান্য প্রদেশের ভাষাতেও।

বেঙ্গালোর ডেইজ মুভি পোস্টার ; Image Source: imdb.com

বেঙ্গালোর ডেইজ মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রিতে হওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমাগুলোর একটি। চমৎকার মিষ্টি একটা গল্পের সিনেমা বেঙ্গালোর ডেইজকে রোমান্টিক ড্রামা জেনরে রাখা যায়। তবে ঘটনার পরতে পরতে চমকের ছোঁয়া থাকায় সিনেমাটি পেয়েছে অন্য এক মাত্রা, যা রোমান্টিক ড্রামা জেনরের সাধারণত্বের সীমা পেরিয়ে অন্য পরিসীমা সৃষ্টি করেছে সমালোচকদের দৃষ্টিতে।

কাহিনী সংক্ষেপ

গল্পটা তিন বন্ধুর, দিভ্যা প্রকাশ ওরফে কুনজু, ক্রিষ্ণাণ পি.পি ওরফে কুট্টন আর অর্জুন ওরফে অজু।

কুট্টনের বলা তাদের ছোটবেলার গল্পের স্মৃতিতে সিনেমার শুরু। আর সেই স্মৃতি ধরেই বলা যায়, তিনজন তিন মেরুর মানুষ কিভাবে যেন হয়তো ছোটবেলার বদৌলতেই হয়ে গেছে কাছের বন্ধু। গল্পটা তাই বন্ধুত্বেরও, গল্পটা ভালোবাসার এবং জীবনের, জীবন ভালোবাসার গল্প বেঙ্গালোর ডেইজ।

অর্জুন, মোটরসাইকেল মেকানিক, বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেছে, যার জীবনের আলাদা কোন লক্ষ নেই বলে বেড়ায় মানুষকে, যে চলতে চায় নিজের মতো।

কুট্টন, কুনজু এবং অর্জুন ; Image source: minisiren.com

কুট্টন, সফটওয়্যার ইন্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ার পরও যে শুধু গ্রামে ফিরতে চায়। আর অন্যদিকে কুনজুর ঠিক উল্টো ইচ্ছা, এমবিএ করতে সে বেঙ্গালোরে যেতে চায় অথচ রক্ষণশীল পিতা মাতাকে রাজি করাতে পারে না। উল্টো বাবা মায়ের ইচ্ছাতে বিয়ের পিড়িতেই বসে যেতে হয়৷ যদিও বিয়ের পর কুনজু স্বামীর সাথে বেঙ্গালোরেই স্থায়ী হয়৷

গল্প শেষ না, বলা যেতে পারে গল্পের শুরুই এখানে। অর্জুনের বাইকের প্রতি ভালোবাসা তাকে কোথায় নিয়ে যায়, সদা লাজুক কুট্টন কখনো সিঙ্গেল রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসকে কাপল করে কিনা, কুনজুর ইচ্ছে কি পূরণ হয়! আর কুনজুর স্বামী দাশ, তারই বা কেমন স্বভাব, কি চাই তার? সেখানেও রয়েছে অন্য এক গল্প।

তরুণ বয়সের ক’জন মানুষের চাওয়া পাওয়া, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষার ছবি প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে গল্পে, উঠে এসেছে তাদের নিজের সাথে সংগ্রামের কথা। সমাজ পরিবারের সাথে মানিয়ে নেয়ার, আবার কখনো বা বিদ্রোহ করার উপাখ্যানই হলো বেঙ্গালোর ডেইজ।

অভিনয়

দিব্যা যাকে ডাকনাম কুনজু নামে ডাকতে শোনা যায় পুরো মুভি জুড়ে চরিত্রটিতে অভিনয় করেছে নাজরিয়া নাজিম। ক্রিষ্ণান পি.পি/কুট্টন চরিত্রে ছিলেন নিভিন পৌলি এবং মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রিতে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকা দুলকার সালমান অভিনয় করেছেন অর্জুন চরিত্রে যার ডাকনাম অজু শুনতে পাই আমরা মুভিতে।

মূলত এই তিনজনের দূর্দান্ত অভিনয় মুভিটিকে টেনে নিয়ে গেছে চোখের পলকে। এমনিতেও মালায়লাম মুভিতে অভিনেতা অভিনেত্রীদের অনাড়ম্বর সাবলীল অভিনয় বেশ চোখে লাগার মত। বলিউড মুভির এতো বেশী সুযোগ সুবিধা এবং বিশাল বাজেট থাকার পরেও তাদের পাশে মালায়লাম মুভি ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয় হয়ে দাড়াতে পারার মূল দুটি কারণই হচ্ছে চমৎকার মৌলিক গল্প এবং দূর্দান্ত অভিনয়।

বেঙ্গালোর ডেইজ মুভি টিম ; Image Source: onlookersmedia.in

এই তিনজন ছাড়াও বেঙ্গালোর ডেইজ মুভিতে অন্যান্য চরিত্রে অভিনয করেছেন ফাহাদ ফাসিল (শিভা দাস), পার্ভতী (সারাহ), ঈশা তালওয়ার (মিনাক্ষি), নিথিয়া মেনন (নাতাশা) , কল্পনা, মানিয়ানপেল্লা রাজু, প্রভিনা, বিজয রাঘভন, বিজয় ভারগিস সহ আরো অনেকে।

চিত্রনাট্য ও পরিচালনা

বেঙ্গালোর ডেইজের এই জায়গায় এসে অন্জলি মেননের একক আধিপত্য। বেঙ্গালোর ডেইজের মূল গল্প, চিত্রনাট্য, ডাযলগ সবই তিনি নিজেই তৈরী করেছেন।

এ্যাওয়ার্ড নিচ্ছেন পরিচালক অন্জলি মেনন ; Image Source: en.wikipedia.com

আর নিজেই যখন সিনেমাটি পরিচালনা করতে এসেছেন, তখন সবকিছু নিজের মতো করতে পারাতেই বোধহয় চমৎকার একটি হারমোনি দাড়িয়েছে সিনেমাটিতে, যা দর্শককে আকর্ষণ করে আরো দারুণ ভাবে।

মিউজিক

মালাযলাম মুভিতে মিউজিক অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় মিউজিক। অসাধারণ আবহ সঙ্গীত মুভির আনন্দ বাড়িয়ে দেবে বহুগুনে। বেঙ্গারোর ডেইজে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন গোপি সুন্দর।

দারুণ যে ইংরেজি বাসার গানটি মুভিতে ব্যবহৃত হযেছে তাতে কন্ঠ দিয়েছেন পশ্চিমা গায়িকা এ্যানা ক্যাতেরিনা । মুভির নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করা নাজরিয়া নাজিমও একটি গানে প্লেব্যাক করেছেন।

সিনেমাটোগ্রাফি

বেঙ্গালোর ডেইজের সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন সামির তাহির।

রেটিং

আইএমডিবি রেটিং – ৮.৩

টাইমস অফ ইন্ডিয়া – ৩.৫/৫

এ্যাওয়ার্ড

জনপ্রিয় মুভি, সেরা পরিচালকের পুরষ্কার সহ সাতটি ক্যাটাগরিতে এ্যাওয়ার্ড পায় বেঙ্গালোর ডেইজ এবং আরো একটি নমিনেশন পায়।

এ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে বেঙ্গালোর ডেইজ মুভি টিম ; Image Source: silverscreen.in

কেন দেখবেন মুভিটি

কিছু সিনেমার গল্প মুখে বলতে গেলে কিংবা ভাষায় লিখতে গেলে অতিসাধারণ হয়ে যায়, কিন্তু পর্দায় যখন প্রদর্শিত হতে শুরু করে, পুরো ব্যাপারটাই হয়ে যায় ‘চোখের শান্তি’র। বেঙ্গালোর ডেইজ প্রায় তিন ঘন্টার মত দীর্ঘ সময় আপনার চোখের শান্তিময় ব্যাপার নিশ্চিত করবে।

আর সাথে চমৎকার একটা গল্প তো আছেই, যেখানে বন্ধুত্ব, ক্যারিয়ার, প্রেম ভালোবাসা সবকিছু ছাপিয়ে জীবনের ছবি উঠে এসেছে। দৃশ্যে দৃশ্যে চমকের ছোঁয়া থাকায় আগে থেকে আন্দাজ করার উপায় যেমন নেই, তেমনি বিরক্ত হওয়ার সুযোগও কম।

রবীন্দ্রনাথের ছুটি গল্পে যেমন চৌদ্দ বছর বয়সের সমস্যা উঠে এসেছিল ফটিককে অবলম্বন করে, বেঙ্গালোর ডেইজ বোধহয় পঁচিশ বছরের গল্প, পড়াশোনা শেষে ক্যারিয়ার গড়ার শুরুর সময়ের এক অদ্ভুত দোলাচলের গল্প।

Related Article

No Related Article

0 Comments

Leave a Comment