মাদকাসক্তি, এক ভয়াবহ অভিশাপের নাম। এই অভিশাপে কত সম্ভাবনাময় জীবনের অকালেই ঝরে পড়ছে, কোনো হিসাব নেই। এই অভিশাপে শুধু মাদকাসক্ত ব্যক্তিই না, তার কাছের মানুষগুলোর জীবনও যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনই এক মাদকাসক্ত তরুণ এবং তার পরিবারের গল্প নিয়ে বানানো মুভি বিউটিফুল বয়।


বিউটিফুল বয় মুভিতে টিমোথি শ্যালামে (বামে) এবং স্টিভ ক্যারেল (ডানে); Image Source: IMDb.com

কাহিনী সংক্ষেপ

যুক্তরাষ্ট্রের স্যান ফ্র্যান্সিস্কো শহরের কিশোর নিক শেফ। একাধারে একজন অ্যাথলেট, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা এবং লেখক। শুধু তাই না, পড়ালেখায়ও ভালো সে। মা বাবার অতি আদরের ছেলে নিক। শৈশবে বাবা মায়ের বিচ্ছেদের পর থেকে বাবা ডেভিড শেফ এর সাথে থাকছে নিক। ডেভিডের দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যারেন, তাদের দুই সন্তান জ্যাসপার আর ডেইজি, আর নিককে নিয়ে ডেভিডের সুখের সংসার।

হাস্যজ্জ্বোল নিক; Image Source : imdb.com

একদিন এই সুখের সংসারে অশান্তি দেখা দেয়, যখন হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যায় নিক। দুই দিন ধরে তার কোনো হদিস খুঁজে না পেয়ে পাগলপ্রায় অবস্থা বাবা ডেভিডের। এমন সময় হঠাৎ করেই নিক আবার ঘরে  ফিরে আসে, পুরোপুরি মাদকাসক্ত অবস্থায়।

সাথে সাথেই ডেভিড তাকে একটি বিলাসবহুল মাদকাসক্তি নিরাময় ক্লিনিকে নিয়ে যান। ৪০,০০০ ইউ এস ডলার ফি এবং উচ্চ সাফল্যের হার সম্পন্ন এই ক্লিনিকে নিককে ভর্তি করানোর পর ডেভিড আশা করেন তার আদরের ছেলেটি হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠবে।

শঙ্কিত ডেভিড ; Image source : imdb.com

কিন্তু তার সেই আশায় গুঁড়ে বালি। মাত্র কয়েকদিন সেখানে থাকার পরই নিক সেখান থেকে পালিয়ে যায়। আবারো ছেলের খোঁজে পাগলপ্রায় ডেভিড। অনেক খোঁজার পর ডেভিড অবশেষে নিককে খুঁজে পায়। খোলা রাস্তায় দিশেহারার মতো হেঁটে বেড়াচ্ছে নিক।

তারপরও আশা ছাড়েন না ডেভিড। আবারো নিককে সেই ক্লিনিকে ভর্তি করান। কিছুদিন পর নিকের অবস্থার উন্নতি হলে তাকে কলেজে পাঠান, তার ছেলে একজন বিখ্যাত লেখক হবে এই আশায়। সেখানে গিয়ে আবারো নিকের অধঃপতন হওয়া শুরু হয়। গাঁজা, কোকেন, অ্যালকোহল থেকে শুরু করে ক্রিস্টাল মেথ, যাবতীয় সব মাদক দ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ে নিক। তার শারীরিক আর মানসিক অবস্থার দিন দিন অবনতি ঘটতে থাকে।

সেই সাথে শুরু হয় তার নৈতিক অধঃপতন। নেশা করার জন্য প্রতিনিয়ত মিথ্যা কথা বলে বাবার কাছ থেকে টাকা নিতে থাকে সে। ছেলেকে কারণে অকারণে টাকা দিতে দিতে এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে যখন ডেভিড টাকা দেয়া বন্ধ করে দেয়, তখন নিক শুরু করে নিজের ঘরের জিনিসপত্র চুরি করে সেই টাকা দিয়ে নেশা করা। এমনকি তার ছোট্ট বোনের জমানো ৮ ডলারও সে চুরি করে ফেলে, এতটাই মরিয়া সে!

প্রাথমিকভাবে ডেভিডের ধারণা থাকে যে নিক এখন মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে মুক্ত হতে পেরেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে নিকের আচার আচরণে সন্দেহ হতে থাকে ডেভিডের। অবশেষে ডেভিড জানতে পারে যে না, নিক নেশার হাত থেকে মুক্ত তো হয়ইনি, উলটো আরও বেশি আসক্ত হয়ে পড়েছে। খেলাধুলা, লেখালেখি সব বাদ দিয়ে নিক এর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান শুধুমাত্র নেশা করা। অতিরিক্ত মাদক গ্রহণের প্রভাবে তার স্বাস্থ্যেরও অবনতি হচ্ছে। মাদকের বিষাক্ততা এখন নিকের রক্তে  ছড়িয়ে পড়েছে। সেই বিষাক্ততায় তার মস্তিষ্কও আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। যার কারণে নিকের স্বাভাবিক চিন্তাধারাও হ্রাস পাচ্ছে। ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথে চলে যাচ্ছে নিক।

আর যে নিককে নিয়ে ডেভিডের এত চিন্তা, তার নিজের মনের ভেতর আসলে কী ঘটছে? কিভাবে সে বারবার তার কাছের মানুষগুলোকে এভাবে কষ্ট দিয়ে যাচ্ছে? সে কি তার আচার আচরণ নিয়ে একটুও অনুতপ্ত না?

আপন মনে নিজের ডায়েরিতে লিখছে নিক; Image source : imdb.com

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় নিকের ডায়েরিতে লেখা একটি উক্তির মাধ্যমে। “The more I use drugs, the more I do things I’m ashamed of, and then I use more, so that I never have to face that shame”। অর্থাৎ নিক যতই মাদক গ্রহণ করে, ততই লজ্জাজনক কাজে জড়িয়ে পড়ে। সেই অনুশোচনায়, সেই লজ্জার মুখোমুখি না হতে পারার কারণে ঘুরে ফিরে আবার সেই মাদকের কাছেই ফিরে যায় সে। শেষ পর্যন্ত কী পরিণতি হবে নিকের? ডেভিড কি পারবে তার ছেলেকে পুরোপুরিভাবে মাদকের গ্রাস থেকে ফিরিয়ে আনতে?

বাবা ও ছেলের আবেগঘন মুহূর্ত; Image source: imdb.com

জানতে হলে দেখতে হবে মুভিটি।

পরিচালনা ও চিত্রনাট্য

ডেভিড শেফ এবং নিক শেফ কোনো কাল্পনিক চরিত্র নন। সম্পূর্ণ বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে বানানো হয়েছে এই মুভি, এ বিউটিফুল বয়: এ ফাদার্স জার্নি থ্রু হিজ সন’স অ্যাডিকশন (A Beautiful Boy : A Father’s Journey Through His Son’s Addiction) ডেভিড শেফ এর লেখা এই আত্মজীবনী অনুসারে।

গল্পটি হয়তো খুব একটা অসাধারণ কিছু নয়। কিন্তু এমন সাধারণ একটি গল্পকেই অসাধারণ করে তুলে ধরেছেন বেলজিয়ান পরিচালক ফেলিক্স ফন গ্রোনিঙ্গেন। এর আগে বেলজিয়ান মুভি দ্য ব্রোকেন সার্কেল ব্রেকডাউন মুভির জন্য বেস্ট ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ মুভি ক্যাটেগরিতে অস্কার মনোনয়ন পাওয়া ফেলিক্সের প্রথম ইংরেজি ভাষার মুভি এটি।

অভিনয়

এই মুভিতে নিক শেফের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন কল মি বাই ইউওর নেম মুভি দিয়ে বাজিমাত করা ফ্রেঞ্চ-আমেরিকান অভিনেতা টিমোথি শ্যালামে (Timothee Chalamet)। সেই মুভির জন্য অস্কার ইতিহাসের তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে সেরা অভিনেতা ক্যাটেগরিতে মনোনয়ন পাওয়া টিমোথি এবারো গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডস,  ব্রিটিশ একাডেমি ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন অ্যাওয়ার্ডস (বাফটা) ইত্যাদিতে বেস্ট সাপোর্টিং অ্যাক্টর ক্যাটেগরিতে মনোনয়ন পেয়েছেন।

অপরদিকে, নিকের বাবা ডেভিড শেফের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আমাদের অনেকের পছন্দের অভিনেতা স্টিভ ক্যারেল। সাধারণত কমেডি চরিত্রে অভিনয় করা স্টিভ এই গুরুগম্ভীর চরিত্রেও দারুণ অভিনয় করেছেন। আরেকটা মজার ব্যাপার জানতে চান? মুভিটির প্রযোজনায় আছেন আমাদের অনেকের প্রিয় অভিনেতা ব্র্যাড পিট!

বক্স অফিস এবং রেটিং

বক্স অফিসে প্ভিরায় ১৪ মিলিয়ন ইউ এস ডলার আয় করা মুভিটির আইএমডিবি রেটিং ৭.৩ এবং রটেন টম্যাটোস রেটিং ৬৯%।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment