বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ সবদিক থেকে এগিয়ে গেলেও বিশ্বের সকল প্রান্তে দৃশ্যপট এরকম নয়। এখনো বিশ্বের বেশ কিছু জায়গায় রয়েছে অভাব, অনটন, অনাহার। সেসব দেশে গৃহযুদ্ধে এখনো অনেকে প্রাণ হারাচ্ছে আর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা যেন রূপকথার সামিল। এরকম দৃশ্য এখনো বিশ্বের যে প্রান্তে সর্বাপেক্ষা বেশি দেখা যায় তার নাম কারো অজানা নয়, বলছিলাম আফ্রিকা মহাদেশের কথা।

মুভিটির একটি দৃশ্যে অভিনেতা ইদ্রিস আলবা; Source: pinterest.com

আফ্রিকার দারিদ্র পীড়িত অঞ্চল নিয়ে মুভি কম হয়নি। হোটেল রুয়ান্ডা, ব্লাড ডায়মন্ডের মতো অনেক মুভি যুগে যুগে মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে আফ্রিকার মানুষদের জীবনযুদ্ধ সম্পর্কিত যে কয়টি মুভি রয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য মুভি হলো দ্য বিস্টস অব নো নেশন (Beasts of No Nation)।

আফ্রিকার একটি দেশের একটি সাধারণ শিশু সাদামাটা জীবন থেকে কী করে গৃহযুদ্ধের সাথে জড়িয়ে পড়ে তা দেখতে পাবেন এ মুভিটিতে। আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত এসব দেশে প্রতিনিয়তই শিশুদেরকে ছোটবেলা থেকে অপহরণ করে তৈরি করা হয় নিষ্ঠুর ও নির্দয় হত্যাকারী হিসেবে। এরকমই এক শিশুর গল্প তুলে ধরা হয়েছে এ মুভিটিতে। চলুন জেনে আসা যাক বিস্ট অব নো নেশনের ব্যাপারে।

কাহিনী সংক্ষেপ

পশ্চিম আফ্রিকার একটি দেশের কাহিনী মুভিটিতে তুলে ধরা হলেও নির্দিষ্ট করে কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। গৃহযুদ্ধের আগুনে জ্বলতে থাকা সেই দেশে আগু নামক এক বালক তার বাবা, মা এবং তিন ভাইবোনের সাথে সীমান্ত এলাকার একটি ছোট গ্রামে বাস করে। তার বাবা একজন স্থানীয় নেতা যে কিনা তার জমিতে বিদ্রোহীদের থাকা খাওয়াসহ বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে থাকে।

আগু; Source: netflix.com

হঠাৎ করে তারা খবর পায় যে, দেশে ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটেছে এবং সামরিক বিদ্রোহীরা আসছে তাদের গ্রামে হামলা করতে। প্রাণভয়ে তাদের গ্রাম থেকে মানুষজন নিজেদের সহায়সম্বল নিয়ে পাড়ি জমাতে শুরু করে রাজধানীর উদ্দেশ্যে। আগুর বাবা তার স্ত্রী এবং কনিষ্ঠ দুই সন্তানকে নিরাপদ স্থানে পাঠাতে সফল হলেও তিনি, আগু এবং আগুর বড় ভাই নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যেতে পারেন না।

তাদের গ্রামে শুরু হয় সরকারের বাহিনী এবং বিদ্রোহীদের মধ্যে যুদ্ধ। সেখানে যুদ্ধে সরকার বাহিনী জয়ী হলে তারা যে সকল গ্রামবাসী থেকে গিয়েছিল তাদের গ্রেফতার করে এবং বিদ্রোহীদের সাহায্য করায় তাদেরকে দেশদ্রোহীতার জন্য শাস্তি দেবে বলে ঠিক করে। শাস্তিস্বরূপ যখন গুলি করে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তখন আগু এবং তার ভাইকে তাদের বাবা দৌড়ে পালিয়ে যেতে বলে। আগুর বাবাকে তাৎক্ষণাত হত্যা করা হয় এবং তাদের দু ভাইকে তাড়া করে মেরে ফেলার চেষ্টা চলতে থাকে।

কিছুক্ষণের ভেতরে আগুর বড় ভাইকে গুলি করে মেরে ফেলা হলেও আগু সে যাত্রা বেঁচে যায় এবং বনে নিজের জীবন বাঁচাতে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু সেখান থেকে তাকে নেটিভ ডিফেন্স ফোর্সেস (Native Defence Forces- NDF) নামক একতি উঠতি গেরিলা সংগঠন আটক করে বসে। তারা শিশু আগুকে জোর করে নিজেদের বাহিনীতে নিয়ে নেয়। বাহিনীতে জায়গা পাকাপোক্ত করার জন্য বিদ্রোহদের নেতা (যাকে তারা কমান্ড্যান্ট হিসেবে আখ্যায়িত করে) অনেকটা হুমকি দেখিয়েই বাধ্য করে একটি তরূণকে হত্যা করার জন্য। নিরীহ এক তরূণকে কুপিয়ে হত্যা করার মাধ্যমে শুরু হয় আগুর বিদ্রোহী সৈনিক জীবন।

বিদ্রোহী বাহিনীর কমান্ডেন্ট; Source: quora.com

এককালের নিরীহ শিশু আগু কি শেষ পর্যন্ত এ অভিশপ্ত ও ভয়ংকর জীবন থেকে বের হতে পারবে? নাকি সে পরিণত হবে মানুষরূপী এক পশুতে? সে কি আবার তার পরিবারের কাছে ফিরতে পারে? তাদেরই বা কি শেষ পরিণতি হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আজই টেলিভিশন অথবা নেটফ্লিক্সে উপভোগ করুন বিস্ট অব নো নেশন মুভিটি

নির্মাণ ও চিত্রনাট্য

দ্য বিস্ট অব নো নেশন মুভিটি পরিচালনা করেছেন আমেরিকান পরিচালক ক্যারি জোয়ি ফুকুনাগা। ইতোপূর্বে তিনি ট্রু ডিটেক্টিভ (True Detective) এর মতো জনপ্রিয় টিভি সিরিজ পরিচালনা করেছেন। এছাড়া ২০২০ সালে বন্ড সিরিজের যে নতুন মুভিটি মুক্তি পাবে তার দায়িত্বেও থাকছেন এ পরিচালক।

দ্য বিস্ট অব নো নেশন মুভিটি পরিচালকের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে একটি। মুভিটি মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি ভুক্তভোগী শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে আফ্রিকায় চলমান দৃশ্যের ভয়াবহতা তুলে ধরা। মুভিটির এ উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ সফল হয়েছে বলা যায়। এতে আমরা যেমন দেখতে পারি আফ্রিকার সাধারণ মানুষের স্বজন হারানোর দৃশ্য, তেমনি দেখতে পায় প্রতিনিয়ত কী করে শত শত বালককে সাধারণ জীবন থেকে টেনে হিচড়ে বের করে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে। তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে অস্ত্র। এছাড়া পশ্চিম আফ্রিকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও মুভিটি হতে ধারণা পাওয়া যায়।

মুভিতে দেখানো শিশুযোদ্ধাদের একাংশ; Source: pinterest.com

মুভিটির চিত্রনাট্যের সাথে আফ্রিকা সংক্রান্ত এ ধরনের অন্যান্য মুভিগুলোর কিছুটা সাদৃশ্য পেতে পারেন অনেকে। তবে এ মুভিটির বিশেষত্ব হলো এটি বিদ্রোহীদের ভয়াবহ জীবন ছাড়াও তাদের মানবিক দিক এবং তাদের ভেতরকার কোন্দল তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। মুভিটি যতটা না একটি দেশের গল্প, তার থেকে অনেক বেশি বালক আগুর গল্প।

অভিনয় এবং রেটিং

আগু চরিত্রে অভিনয় করেছে ১৭ বছর বয়সী ঘানাইয়ান বালক এবং অভিনেতা আব্রাহাম আত্তা। আমেরিকায় পড়াশোনার উদ্দেশ্যে আসা এ বালকের প্রথম ছবি এটি এবং প্রথম হিসেবে তার অভিনয় ভবিষ্যতে এ ধরনের চরিত্রে আরো ভালো কিছু করে দেখানোর আশা জাগায়।

ট্রেনিং চলাকালীন আগু; Source: netflix.com

তবে মূল চরিত্রে না থাকলেও মুভিটির প্রাণ এবং মূল জীবনীশক্তি বলতে হয় অভিনেতা ইদ্রিস আলবাকে। বিদ্রোহী গ্রুপের কমান্ড্যান্ট চরিত্রে তার অভিনয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আ্যাওয়ার্ড পাওয়ার যোগ্য এবং তিনি বেশ কয়েকটি পুরষ্কার জিতেও নেন। এমনকি গোল্ডেন গ্লোব আ্যাওয়ার্ডে মনোনয়নও তিনি পেয়েছিলেন। মুভিটির আইএমডিবি রেটিং ৭.৮ এবং নেটফ্লিক্সের এ নতুন এক দৃষ্টিকোণের গল্পের জন্য এটি রটেন টমেটোতে ৯২% ফ্রেশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০১৫ সালে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে এ মুভিটি।

কেন মুভিটি দেখবেন

এ মুভিটি যদি দেখে কারো যদি ভালো লাগে তবে তার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। একটি হলো মুভিটির হৃদয়বিদারক এবং শক্তিশালী গল্প, আরেকটি হলো অভিনেতা ইদ্রিস আলবার বলিষ্ঠ অথচ সাবলীল অভিনয়। তাই যদি আপনি যুদ্ধসংক্রান্ত বাস্তবধর্মী মুভি দেখতে ভালোবাসেন, এ মুভিটি আপনাকে হতাশ করবে না বলে আশা করা যায়।

Related Article

1 Comment

Redowan Islam Palash June 16, 2019 at 6:03 pm

চমৎকার মুভি এবং সুন্দর রিভিউ। তবে আগুর বাবা বিদ্রোহী বা সরকার দলীয় কোনটাই ছিলেন না। আগুদের এলাকায় সরকার সমর্থিত সামরিক বিদ্রোহীরা হামলা করলে সেখানে থাকা পুরুষদের আটক করা হয়। আটকের পর আগুর বাবা জানান, তিনি সেখানকার স্থানীয় নেতা এবং নিরপেক্ষ। এর প্রমান জোগাড় করতে মানসিক ভারসাম্যহীন এক মহিলার সাক্ষ্য নেয় হয়। ঐ মহিলাকে মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে মুভির শুরুর দিকেই দেখানো হয়। মানসিক ভারসাম্যহীন ঐ মহিলা জানায় আটককৃতরা কেউ সেখানকার স্থানীয় নয়, দুষ্কৃতিকারী। তার কথার উপর ভিত্তি করে আটককৃত সবাইকে মেরে ফেলার আদেশ দেয় সামরিক বাহিনীর এক সার্জেন্ট।

ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।

Leave a Comment