‘আসা যাওয়ার মাঝে’ বিক্রম আদিত্য সেনগুপ্ত পরিচালিত টলিউডের একটি প্রশংসনীয় সিনেমা হিসেবে অখ্যাতি পেয়েছে। ভিন্নধর্মী কাহিনী ও নির্মাণের জন্য এটি দর্শকদের কাছে সেই পুরনো দিনের বাংলা সিনেমার আবহ বয়ে এনেছে বলে মনে করছেন অনেকেই। কেউ কেউ আবার দাবী করছেন, ইরানির শর্টফিল্ম ‘অ্যাডভেঞ্চার অফ ম্যারেড কাপল’ এবং ক্যালভিনোর একটি জনপ্রিয় লেখা থেকে সিনেমাটির মূল গঠন ধার করা হয়েছে। কিন্তু ইরানির ছবিটি দেখার পর অনেকে সেই অভিযোগ অগ্রাহ্যও করেছেন।

বস্তুত, আমরা এমন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি, যখন কিনা বাংলা সিনেমা স্রেফ বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। দর্শকরা সিনেমা দেখছেন, ক্ষণিকের জন্য আনন্দ পাচ্ছেন, পরক্ষণেই ঢুকে যাচ্ছেন তার ব্যস্ত সময়ের মধ্যে। কিন্তু ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ কেবল তেমন এক বিনোদনের মাধ্যম নয়। একটি সিনেমার মধ্যে জীবনের যে এমন করুণ সুর তুলে ধরা যায় এবং যা দেখার পর আনচান করে ওঠে মন, এটা না দেখলে তা বোঝার উপায় নেই। একটি চারকোণা ফ্রেমের মধ্যে কিংবা বলয়ের মধ্যে যেন এক টুকরো জীবন খুব আলতো করে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাকে উল্টেপাল্টে দেখার দরকার নেই। সে প্রস্ফুটিত হয়েছে আপন মহিমায়।

ছবির পোস্টার; Source: Telegraph India

কাহিনী সংক্ষেপ

এই গল্পটা মধ্য কলকাতার প্রতিটি নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙালির প্রতিচ্ছবি। পুরোনো ধাঁচের বাড়ি, জাফরি কাটা বারান্দা, ঘুলঘুলি, দড়ি টেনে টেনে কাপড় শুকোতে দেয়া- এ সবই যেন মধ্য কলকাতা তথা পুরোনো বাংলারই একটা অংশ। বাসবদত্তা ও ঋত্বিক সেই অংশের বাইরের কেউ নয়। একজন কাজ করেন দিনে, মেয়েদের ব্যাগ তৈরির কারখানায় সুপারভাইজার হিসেবে।

অন্যজন রাতের ছাপাখানায়। আলাদা শিফটের ডিউটি হওয়ায় অবধারিতভাবে দুজনের অবসরও আলাদা। বলার মতো করে কেউ কারো সংস্পর্শ পাবার সুযোগ নেই। কেবল প্রতিদিনকার আসা যাওয়ার মাঝে সামান্য কিছু সময়। ব্যস, ঐটুকুই। এরপর সারাবাড়ি জুড়ে একলা একলা পড়ে থাকা, নির্ধারিত সময়, অপেক্ষার প্রহর আর রোজনামচার গল্পগুলো। এছাড়াও তাদের দুজনার প্রতিদিনকার ছোট ছোট ঘটনা, তাদের জীবনযাপন, ঘরকন্না, অভ্যাস, নিত্যদিনের গল্পই পুরো সিনেমাটাকে এক সুতোয় জুড়ে দিয়েছে।

বলাই বাহুল্য, এই ছবির কোথাও কোনো চারিত্রিক সংলাপ নেই। কেবল ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড ও মাঝে মধ্যে পুরনো কালজয়ী বাংলা গানের সুর ভেসে আসতে দেখা যায়।

ছবির একটি দৃশ্যে অভিনেত্রী বাসবদত্তা চ্যাটার্জি; Source: plumeriamovies.com

চিত্রনাট্য, পরিচালনা এবং চিত্রগ্রহণ

‘আসা যাওয়ার মাঝে’র চিত্রনাট্য লেখার পাশাপাশি পরিচালনাও করেছেন স্বয়ং বিক্রম আদিত্য সেনগুপ্ত। সিনেমাটোগ্রাফিতে ছিলেন মাহেন্দ্রা শেঠি এবং বিক্রম। এই জুটি সিনেমাটির চিত্রগ্রহণে এতটা যত্নের পরিচয় দিয়েছেন যে, যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। বলা চলে, দর্শকদের পরিশ্রম করালে তারা পরিশ্রম করতে রাজি থাকে। যদি সে চোখের তারায় ভেসে ওঠার মতো কোনো দৃশ্যায়ন হয়। সত্য বলতে, ক্যামেরায় তুলে ধরা সাধারণ মানের কোনো ঘটনাকেও এমন চমৎকার বাস্তবতার প্রলেপ দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা বুকের ভেতর অনুরণন হয়ে বাজতে থাকে।

সিনেমা চলাকালীনই যে প্রতিধ্বনি দর্শক অনুভব করতে পারেন। প্রতিটি দৃশ্যে কি নিখাদ ভালোবাসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। উত্তর কলকাতার গলি-ঘুঁজি, ভেজা পায়ের ছাপ, ট্রামলাইন, সূর্যাস্তের দৃশ্য, মেলে দেয়া ভেজা শাড়ি-সায়া-পাজামা, মাটির ব্যাংক, বেতনের টাকা গুঁজে রাখার টিনের কৌটা, বাজারের ফর্দ, মাছের জীবন্ত কানকো, কচি পেয়াজকলি, চাল-ডাল-তেল-বড়ি নাড়াচাড়ার শব্দ, আর তাদের বিচিত্র রঙ এমনভাবে বাঙালির সামনে এনেছেন বিক্রম, যেন তা কেউ কোনোদিন দেখেনি। এইসব ছোটখাটো জিনিস, নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙালির স্পন্দন যেন কোনো অনাকাঙ্খিত উৎসবের মোড়কে ফের নতুন করে সামনে এসেছে।

এই না দেখা, কথা না হওয়া, খুব বেশি যোগাযোগ না হওয়া সত্ত্বেও দিনের পর দিন একই ছাদের নিচে বসবাস। যেখানে একলা খেতে বসা, খেতে বসে টের পাওয়া- তরকারিতে লবণ কম, সকালে স্নানের পর স্ত্রীর রেখে যাওয়া ভেজা কাপড় যত্নসহকারে শুকোতে দেওয়া, ফের সন্ধ্যেবেলা সেটা তুলে নিয়ে আসছে। রাতের খাবারে শুকনো রুটি চিবোনো। তবু যেন দুজনার কোনো অভিযোগ-অনুযোগ নেই। এই যোগাযোগ না থাকাটাই যেন ওদেরকে আরো বেশি করে বেঁধে রেখেছে। ভালোবাসা তো এভাবেই বেঁচে থাকে।

ছবির একটি দৃশ্যে অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী; Source: ImgCop.com

অভিনয় ও শব্দগ্রহণ

এই ছবিতে অভিনয় করেছেন টালিগঞ্জের প্রতিভাবান অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী এবং জি বাংলার সিরিয়াল ‘বয়েই গেল’ থেকে উঠে আসা বাসবদত্তা চ্যাটার্জি। দুজনই চমৎকার অভিনয় করেছেন। অবশ্য এক সাক্ষাৎকারে বিক্রম মজা করেই বলেছিলেন যে, তিনি ওদেরকে একদমই অভিনয় করতে নিষেধ করেছিলেন। যেন ওরা খুব সাধারণ, সাদাসিধেভাবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ায়। যেমনটি ওরা খুব অবসর সময়ে বাড়িতে বসে করে থাকে।

আর এই অভিনয় না করতে চাওয়ার যে একটা অভিপ্রায়, সেটাই যেন চরিত্রগুলোকে আরো বেশি বাস্তবসম্মত, আরো বেশি স্পর্শকাতর করে তুলেছে। একটা লাইফবয় সাবান থেকে গোসলের অন্য সাবানটা আলাদা করার যে ধরণ, বাজার থেকে নিয়ে আসা মাছ-তরকারি যত্নসহকারে রান্না করার যে তৎপরতা, তার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে সমস্ত ভালোবাসা। পুরুষের বয়ে আনা কিছুর মাধ্যমেই তো নারী তার সৃষ্টির অনুপ্রেরণা পায়- এই অনুধাবনটি যেন ঋত্বিক এবং বাসবদত্তার অনবদ্য অভিনয় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

আর এই ছবির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর শব্দগ্রহণ। সংলাপের অনুপস্থিতিতে পারিপার্শ্বিক শব্দের মধ্যেই যে জীবনের গল্পগুলো লুকিয়ে থাকে, এ যেন বিক্রম আদিত্য ভালো করেই ধরতে পেরেছিলেন। তাই তো শুরুতে ভাঙা পলেস্তারা খসে পড়া দেয়ালের গা বেয়ে নামার সময় যে সানাইয়ের সুর বেজে ওঠে, তার মধ্যে যেন আমাদের সমস্ত দুঃখ-বেদনা, হাহাকার-আক্ষেপের একটা সুতো টানা আছে। যার কম্পন আমাদের বুকে এসে লাগে। ট্রামের ঢং ঢং ঘন্টি, ছাপার মেশিনের অনবরত ছুটে চলা, সাইকেলের প্যাডেল ঘোরানো, বড়ি-চাল-ডাল বয়ামে ঢেলে রাখার শব্দকে যে এত স্পর্শকাতর হতে পারে, সে ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ না দেখলে অজানাই থাকতো।

‘আসা যাওয়ার মাঝে’র একটি দৃশ্য; Source : DESIblitz

সিনেমা সম্পর্কে কিছু মন্তব্য

আসা যাওয়ার মাঝে নির্মাণের পর অনেক গুণীজনই এ সম্পর্কে কিছু কথা না বলে থাকতে পারেননি। বিশেষ করে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তার ভাষ্যমতে, “সেইসময়, আমরা যখন কাজ শুরু করেছিলাম, তখন যেভাবে সিনেমা তৈরি হতো, সত্যজিত-ঋত্বিক-মৃণালরা একদম রাস্তায় নেমে বাঙালির নাড়ির স্পন্দনগুলো ধরতেন, এই ছবিটা সেইরকমভাবে তৈরি করেছেন বিক্রম আদিত্য সেনগুপ্ত। প্রত্যেকেটা দৃশ্য এত এত বেশি স্পর্শকাতর যে, দেখতে গেলে সত্যিই চোখে জল এসে যায়।”

সিনেমাটি সম্পর্কে শর্মিলা ঠাকুর তার অনুভূতির কথা জানিয়েছেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, “আসা যাওয়ার মাঝে সিনেমাটি জীবনের অনেকগুলো স্পর্শকাতর জায়গা নিয়ে তৈরি হয়েছে এবং অবশ্যই এটি ভিন্ন স্বাদের কিছু। গল্প এগোতে এগোতেই প্রতি মুহূর্তে মনে হয়, এরপর কী ঘটবে? আর প্লট সম্পর্কে কী আর বলব! দাম্পত্যের স্বাভাবিক সমস্ত চাওয়া পাওয়া থেকে দূরে গিয়ে নিজেদের খেয়াল রাখা, ভালোবাসা, অভিযোগ-অনুযোগ থেকে দূরে থাকা, সবকিছু মিলিয়ে এটা সত্যিই অভাবনীয়।”

পুরষ্কার নিচ্ছেন পরিচালক বিক্রম আদিত্য সেনগুপ্ত; Source : Getty Images

রেটিং এবং অ্যাওয়ার্ড

আশাব্যঞ্জক এই সিনেমাটি দেশ বিদেশ ঘুরে জিতে নিয়েছে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পুরস্কার। ‘৬২তম ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে বেস্ট ফিল্ম, বেস্ট অডিওগ্রাফি ক্যাটাগরিতে। বেস্ট ফিল্ম, বেস্ট ডিরেক্টর, বেস্ট অরিজিনাল স্ক্রিনপ্লের আখ্যা পেয়েছে ‘নিউইয়র্ক ইন্ডিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ এ। সেরা পরিচালকের উপাধি দিয়েছে ‘মারাকেচ ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’। বেস্ট এশিয়ান ফিল্ম ও বেস্ট ফিউচার ফিল্ম হিসেবে পুরস্কার ঘোষণা করে যথাক্রমে ‘ব্যাঙ্গালোর ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’, ‘জয়পুর ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’। এছাড়াও সিনেমাটি প্রশংসা কুড়িয়েছে ‘আবুধাবি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ ও ‘বিএফআই লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ এর জুরিদের কাছে।

আর খুব কম বাজেটের সিনেমাটিকে রেটিং হিসেবে IMDB যদিও ১০ এ ৮ দিয়ে রেখেছে, কিন্তু কিছু ছবিকে কোনো রেটিংয়ের পাল্লায় মাপা আসলেও শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। যখন সেটা নিজের ভেতরকার চাওয়া পাওয়াকে, মনের অচেনা-অজানা গলিঘুঁজির স্বরূপ ফুটিয়ে তুলতে পারে। মনে হয়, এ তো আমারই কথা, আমারই দেখা, আমারই চেনা চারপাশ। একে এতদিন হাত বাড়িয়ে কেন ছুঁইনি!

ছবির একটি দৃশ্যে বাসবদত্তা ও ঋত্বিক; Source: asianfilmvault.com

ছবিটি অবশ্যই দেখবেন যে কারণে

এই ছবিটি বর্তমান সময়ে যে ধারায় সিনেমা নির্মাণ হচ্ছে, তার বাইরে গিয়ে তৈরি হয়েছে। ছবিতে কোনোরূপ সংলাপ না থাকায় এর সিনেমাটোগ্রাফি সেন্সকে অনেক বেশি স্পর্শকাতর করা জরুরী ছিল। পরিচালক বিক্রম আদিত্য সেনগুপ্ত ঠিক এই জায়গাটাতে কোনোরূপ ত্যাগ স্বীকার করেননি। তিনি কলকাতাকে, কলকাতার সেই পুরনো ঐতিহ্য তথা বাঙালি নিত্যনৈমিকতার যে স্বরূপটা এমনভাবে ধরতে পেরেছেন, যেমন করে সত্যজিত রায় ‘অপরাজিত’ সিনেমায় অপু কলকাতায় এলে তার চিত্রকে মানুষ নতুন করে অনুধাবন করেছে। যেমন করে ঋত্বিক ঘটকের ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ সিনেমায় শেয়ালদা স্টেশন খুব চেনা, অথচ অন্যরূপ নিয়ে চোখের সামনে উদীয়মান হয়েছিল। ঠিক সেভাবেই পুরোনো কলকাতাকে বিক্রম নতুনভাবে ‘আসা যাওয়ার মাঝে’র ফ্রেমে ধরে এনে আমাদের চমকে দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, আসা যাওয়ার মাঝে ২০১৪ সালের ২ সেপ্টেম্বরে ভেনিস ডেস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-২০১৪ তে প্রথম সিনেমা আকারে প্রদর্শিত হলেও ভারতে এটি মুক্তি পায় ২০১৫ সালের ২৬ জুন।

Feature Image Source: Times of India

Related Article

0 Comments

Leave a Comment