২০১৮ সাল বলিউডের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য বছর ছিল। এ সময় যেমন প্রচলিত ফর্মুলার অনেক মুভি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছে তেমনি অনেক ভিন্নধারার মুভি সাফল্যের মুখ দেখেছে যেগুলোতে তারকা সমাগম খুব একটা ছিল না বললেই চলে। শক্তিশালী অভিনয় এবং ভালো চিত্রনাট্যের জোরে এ মুভিগুলো বক্স অফিসে যেমন মাতিয়েছে তেমনি দর্শক সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। এ ধারায় অন্যতম সংযোজন ছিল ক্রাইম থ্রিলার মুভি ‘আন্ধাধুন’।

আন্ধাধুনের একটি দৃশ্যে টাবু এবং আয়ুষ্মান; Source: youtube.com

‘আন্ধাধুন’ শব্দটির বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘অন্ধ সুর’। পুরো মুভিতে আক্ষরিক অর্থেই অন্ধত্ব এবং সুরের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আয়ুষ্মান খুররানা, টাবু এবং রাধিকা আপ্তে অভিনীত এ মুভিটি ২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি ফ্রেঞ্চ শর্টফিল্ম ‘দ্য পিয়ানো টিউনার’ এর কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয়েছে। মুভিটির পরিচালক শ্রীরাম রাঘবান তার এক বন্ধুর অনুরোধে ২০১৩ সালে শর্ট ফিল্মটি দেখেন এবং সেখান থেকে একটি মুভি তৈরিতে অনুপ্রাণিত হন। তারই ফসল হিসেবে ২০১৮ সালের ৫ অক্টোবর মুক্তি পায় আন্ধাধুন মুভিটি।

কাহিনী সংক্ষেপ

আন্ধাধুনের ঘটনা শুরু হয় আকাশ (আয়ুষ্মান খুররানা) নামক এক অন্ধ পিয়ানিস্টকে কেন্দ্র করে। মিউজিক ক্যারিয়ার নিয়ে ধুঁকতে থাকা আকাশ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যায় নিজের ক্যারিয়ারে কিছু একটা করার। পিয়ানোর নতুন নতুন সুর আবিষ্কার করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়াই তার স্বপ্ন। অন্ধত্বকে প্রতিবন্ধকতা নয় বরং হাতিয়ার হিসেবেই যেন ব্যবহার করতে চায় সে। স্বপ্ন তার লন্ডন যাওয়ার এবং সেখানে একটি নামীদামি সংগীত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়াই তার উদ্দেশ্য। তবে অর্থাভাব তার পথের সবচেয়ে বড় বাধা।

ঘটনাচক্রে একদিন সে সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। পরিচয় হয় তরুণী সোফির (রাধিকা আপ্তে)। আকাশের প্রতিভার কথা জানতে পেরে সোফি তাকে অনুরোধ করে তার বাবার রেস্টুরেন্টে নিয়মিত পিয়ানো বাজানোর জন্য। প্রতিভাবান আকাশের রেস্টুরেন্ট বাজিমাত করতেও সময় লাগে না। রেস্টুরেন্টের অতিথিদের মধ্যে সে খুব শীঘ্রই জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এদিকে ধীরে ধীরে আকাশ আর সোফি ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। একে অপরের প্রেমে মজে যেতে খুব একটা সময় লাগে না তাদের।

আয়ুষ্মান এবং রাধিকা আপ্তে; Source: pinterest.com

অপরদিকে দেখা যায়, সত্তর দশকের প্রাক্তন অভিনেতা প্রমোদ সিনহাকে (অনিল ধাওয়ান)। বর্ষীয়ান এ বলিউড তারকা শেষ বয়সে অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করেই নিজের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন। তার নিত্যদিনের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের একমাত্র সাথী তার সহধর্মিণী সিমি (টাবু)। সিমি পূর্বে একজন উদীয়মান নায়িকা হলেও ক্যারিয়ারে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেননি। বরং নিজের প্রায় দ্বিগুণ বয়সের অভিনেতা প্রমোদ সিনহাকে যেন তিনি বিয়েই করেছেন তাকে ব্যবহার করে বলিউডে প্রবেশ করার জন্য।

প্রমোদ সিনহা চরিত্রে অনিল ধাওয়ান; Source: pinterest.com

প্রমোদ সিনহা আবার সোফিদের রেস্টুরেন্ট ফ্র্যাংকো তে নিয়মিত যাতায়াত করে থাকেন। সেখানে একদিন আকাশ তার পুরোনো একটি ছবির গান গেয়ে শোনালে আকাশের পারফর্মেন্সে তিনি মুগ্ধ হন এবং সামনে নিজ বিবাহবার্ষিকীতে তার বাসায় এসে পিয়ানো বাজানোর জন্য আকাশকে ভাড়া করেন। তবে আকাশ নির্দিষ্ট দিনে যখন তার বাসায় আসে, তখনই শুরু হয় বিপত্তির। প্রমোদ সিনহার অনুরোধ রাখাটাই যেন আকাশের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। একের পর এক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে থাকে সে। ধীরে ধীরে সে এমন সব সমস্যায় জড়িয়ে পড়ে যেখান থেকে মুক্তি পাওয়া আসলেই দুষ্কর হয়ে পড়ে।

পরিচালনা এবং চিত্রনাট্য

ফ্রেঞ্চ শর্টফ্লিম থেকে অনুপ্রাণিত হলেও বলিউডের প্রচলিত ধারা বিবেচনায় আন্ধাধুন মুভিটি বাকি থ্রিলার থেকে বেশ আলাদা। মুভিটি প্রথমে খুব সাদামাটা এবং অনুমেয় মনে হলেও ধীরে ধীরে ঘটনা এমন সবদিকে মোড় নেয় যে, পরবর্তীতে কী হবে তা দর্শকদের পক্ষে আঁচ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সিনেমার মধ্যভাগে মূল গল্প থেকে কিছুটা সরে গিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জের আগমন মুভিটির সাসপেন্স আরো কয়েকগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

মুভিটির শেষ পরিণতি একটু ধীরগতির হলেও ঘটনার মারপ্যাঁচ কোনো অংশে কম বলা যায় না। আন্ধাধুনের এ ব্যতিক্রমধর্মী চিত্রনাট্যের কারণেই মুভিটি আর দশটি বলিউড থ্রিলারের মাঝে মিশে যায় নি বরং নিজস্ব জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে।

আন্ধাধুনের নায়ক ও নায়িকার সাথে পরিচালক শ্রীরাম রাঘবান; Source: timesofindia.com

সিনেমাটির পরিচালক শ্রীরাম রাঘবান বলিউডে বেশ কিছুদিন ধরে পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ করলেও তার কাজের সংখ্যা খুব একটা বেশি নয়। তবে এ পরিচালকের সীমিত সংখ্যক কাজের মধ্যে প্রায় সব কয়টিই থ্রিলার ঘরানার এবং সেগুলো বলিউডের ভিন্নধারার থ্রিলারের কাতারে পড়ে। একসময় টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা রাঘবান বলিউডে পা রাখেন ২০০৪ সালে রাম গোপাল ভার্মার প্রযোজিত এবং সাইফ আলি খান অভিনীত থ্রিলার ‘এক হাসিনা থি’ পরিচালনার মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি জনি গাদ্দার এবং বাদলাপুরের মতো সফল থ্রিলার মুভি উপহার দেন দর্শকদের। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি ২০১৮ সালে হাজির হন আন্ধাধুন মুভিটি নিয়ে। তার অন্যান্য কাজের মতো এ মুভিটির মাধ্যমেও তিনি দর্শক সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন।

অভিনয় এবং সংগীত

আন্ধাধুন মুভিটিতে বলিউডের বড় বড় তারকাদের দেখা না মিললেও যারা শ্রেষ্ঠাংশে ছিলেন তারাও বলিউডের পুরানো এবং যথেষ্ট পরিচিত মুখ। মুভিটিতে প্রধান নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছেন আয়ুষ্মান খুররানা এবং নায়িকা হিসেবে রাধিকা আপ্তে। ভিকি ডোনারের মাধ্যমে বলিউডে পা দেওয়া আয়ুষ্মান মাঝখানে খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও দুটি ফিল্মফেয়ার আ্যাওয়ার্ড জয়ী এ অভিনেতা ২০১৭ সালে ‘বারিলি কি বারফি’ মুভিটির মাধ্যমে ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরাতে শুরু করেন। ২০১৮ সালে তিনি দুটি ছবিতে অভিনয় করেন।

‘বাধাই হো’ এবং ‘আন্ধাধুন’ দুটি মুভিতেই তিনি দর্শকদের মন জয় করতে সক্ষম হন সেই সাথে সমালোচকদের প্রশংসাও পান। নায়িকা রাধিকা আপ্তে সম্প্রতি বেশ কিছু ভালো কাজের মাধ্যমে নিজেকে অভিনেত্রী হিসেবে বারবার প্রমাণ করেছেন। আন্ধাধুন মুভিটিতে নায়িকা হওয়া সত্ত্বেও গল্পের প্রয়োজনে তার চরিত্রটির দেখা খুব একটা মেলেনি, তবে সীমিত সময়ের অভিনয়েও তিনি নিজের উপস্থিতি বেশ ভালোভাবেই জানান দিয়েছেন।

এককালে প্রচুর অভিনয় করা বলিউড অভিনেত্রী টাবু বর্তমানে বলিউডে খুব একটা ব্যস্ত না থাকলেও এ মুভিটিতে তিনি নিজের জাত চিনিয়েছেন। খল চরিত্রে তার অভিনয় পুরো মুভিতেই দর্শকদের ভালোই মাতিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। মুভিটিতে অভিনয়ের প্রাণ ছিলেন তিনি। এছাড়া পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করা অনিল ধাওয়ান, জাকির হুসাইনের মতো শিল্পীরাও বেশ ভালো অভিনয় করেছেন।


একটি দৃশ্যে হাস্যোজ্জল আয়ুষ্মান খুররানা এবং রাধিকা আপ্তে; Source: youtube.com

মুভিটির মূল চরিত্র একজন পিয়ানিস্ট হওয়াতে মুভির গান এবং আবহ সংগীতে পিয়ানোর বেশ প্রভাব দেখা যায়। মুভিতে বেশ কয়েকটি সুরেলা গানও রয়েছে। বিশেষ করে বর্তমানে বলিউড মুভিগুলো যেখানে আইটেম সং তৈরিতেই বেশি আগ্রহী সেখানে এ মুভিটির গানগুলোতে সুরের দিকে অধিক মনোযোগ দেওয়া হয়েছে যা দর্শকদের মন ছুঁয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া গানগুলোও মুভির সাথে যথেষ্ট সংগতিপূর্ণ। গানগুলোর দায়িত্বে ছিলেন অমিত ত্রিভেদি, অরিজিত সিং, র‍্যাপার রাফতারের মতো প্রতিভাবান শিল্পীরা। এছাড়া নায়ক আয়ুষ্মান খুররানাও দুটি গানে নিজের কন্ঠ দিয়েছেন।

বক্স অফিস এবং রেটিং

বাজেট বিচারে আন্ধাধুন মুভিটির বাজেট খুব একটা বেশি নয়। তবে মাত্র ৩২ কোটি রুপির এ মুভিটি বক্স অফিসে আয় করে ১১১ কোটি রুপি। মুভিটি পুরো ভারত জুড়ে ৮০০টি হলে মুক্তি পায় এবং অনলাইন স্ট্রিমিং সার্ভিস নেটফ্লিক্সেও একই সাথে মুভিটি পাওয়া যায়। তবে সব মিলিয়ে মুভিটি বেশ ব্যবসা সফল হয়েছে বলা যায়।


একটি দৃশ্যে আয়ুষ্মান; Source: scroll.in

বক্স অফিসের পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসাও পায় আন্ধাধুন মুভিটি। ভারতীয় সমালোচকদের পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন মুভি রেটিং ওয়েবসাইটগুলোতেও আন্ধাধুন বেশ ভালো রেটিং অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। প্রায় ৩০ হাজার দর্শক এবং ২১ জন সমালোচকের ভোটে মুভিটি আইএমডিবিতে ৮.৭ রেটিং অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। অনলাইন রেটিং সার্ভিস রটেন টমেটোস মুভিটিকে ১০০ শতাংশ ফ্রেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

যে কারণে মুভিটি দেখবেন

আপনি যদি বলিউড মুভির ফ্যান হয়ে থাকেন কিন্তু সম্প্রতি একই ধাঁচের সব বস্তাপচা কাহিনীর মুভি দেখতে দেখতে বিরক্ত, তবে আপনার জন্য নতুনত্বের ছোঁয়া নিয়ে আসবে এ মুভিটি। মুভিটির কাহিনী আপনাকে যেমন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুভিটিকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে ঠিক তেমনি প্রতিনিয়ত ঘটনার মোড় পরিবর্তন আপনাকে একের পর এক চমক উপহার দিতে থাকবে।

হত্যা, ধোঁকাবাজি, অপরাধ, দুর্নীতি, মানবদেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গ পাচারের মতো বিভিন্ন উপাদান রয়েছে যা মুভিটিকে একটি রোমাঞ্চকর থ্রিলারে পরিণত করেছে। এছাড়া মুভির গানগুলো কখনোই আপনার কাছে অসংগতিপূর্ণ মনে হবে না, বরং থ্রিলার মুভিটিতে কিছুটা হাস্যরসের উপাদান যোগ করতে সহায়তা করবে। সব মিলিয়ে আন্ধাধুন মুভিটি অত্যন্ত উপভোগ্য একটি থ্রিলার এবং ২০১৮ সালে বলিউডের সারপ্রাইজ হিট এবং সেরা মুভিগুলোর মধ্যে একটি।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment