এরিক মারিয়া রেমার্ক যে বইটির জন্য পৃথিবীজোড়া খ্যাতি লাভ করেছেন, তা হলো অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। প্রথম মহাযুদ্ধে প্রায় দেড় কোটি মানুষ নিহত এবং দুই কোটি মানুষ আহত হয়েছিল। রেমার্ক ছিলেন সেই মহাযুদ্ধের একজন যোদ্ধা, যিনি রাইফেল হাতে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন মাত্র ১৮ বছর বয়সে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, বীভৎসতা, ধ্বংসযজ্ঞ তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন। তারপর একসময় যুদ্ধে গোলার বিস্ফোরণে তার ডান হাত, বাঁ পা ও ঘাড় মারাত্মক জখম হয়। একটি জার্মান পত্রিকা ১৯২৮ সালে তার প্রথম উপন্যাস ছাপে, ইংরেজি অনুবাদের পর যেটির নামকরণ করা হয় ‘অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’। 

১৯৩৩ নাৎসিদের অত্যাচারে রেমার্ককে নির্বাসন গ্রহণ করতে হয়। হিটলার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া শুরু করে। তখন রেমার্কের লেখা সমস্ত বইয়ের কপি পুড়িয়ে ফেলার হুকুম দেয় হিটলার এবং বইগুলো নিষিদ্ধ ঘোষণা দেওয়া হয়। সেই সাথে লেখককেও ইহুদি বানানোর অপচেষ্টা চলে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে রেমার্ককে মিথ্যা অপবাদ দিয়েই দেশছাড়া করা হয়।

অল কোয়ায়েট অন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের ইংরেজি বইয়ের প্রচ্ছদ; Image source: editoreric.com

১৯৩০ সালে আমেরিকায় উপন্যাসটির কাহিনী অবলম্বনে চলচ্চিত্র বানানো হয়, যা সাধারণ মানুষের কাছে বইটির মতোই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলো। লেউইস মাইলস্টোন পরিচালনা করা ছবিটি ১৯৩০ সালে অস্কারে শ্রেষ্ঠ ছবি, শ্রেষ্ঠ পরিচালক এবং শ্রেষ্ঠ সিনেম্যাটোগ্রাফি; এই তিন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পায়। আমেরিকার ফিল্ম ইন্সটিউটের সর্বকালের সেরা ১০০ সিনেমার তালিকায় ৫৪ নম্বরে আছে অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েষ্টার্ন ফ্রন্ট। বইয়ের মতোও ছবিটিতেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমস্ত খুঁটিনাটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কাহিনী সংক্ষেপ

অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট বইটিতে এক জার্মান কিশোর পল বোমার জার্মান সরকারের মিথ্যা প্রচারণার ফাঁদে পা দিয়ে সৈনিক জীবন বেছে নিয়েছিলো। সতেরো বছর বয়সী পলের সাথে তার সাত বন্ধু কাট, ক্রপ, মুলার, লিয়ার, জাদেন, ডেটারিং আর হাই। দুইজন ছাড়া বাকি সবার বয়স পলের মতোই। যাদের সবাইকেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দেওয়া হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। এরপর খুব দ্রুত পল নিজেকে প্রতারিত মনে করতে থাকে। এই অল্পবয়সী কিশোরদের ট্রেনিং ক্যাম্পে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে।

অল কোয়ায়েট অন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের ইংরেজি বইয়ের অন্য একটি প্রচ্ছদ; Image : sourceElizabethbains.blogspot

সতেরো বছর বয়সেই ট্রেঞ্চে বসে যুদ্ধের স্বরূপ দেখে এবং সহযোদ্ধাদের মৃত্যু উপন্যাসের মূল চরিত্র পলকে দুমড়ে মুচড়ে দেয়। সেই সাথে নিদারুণ খাদ্যের অভাব, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অপরিসীম দুর্ব্যবহার সহ্য করে সামনে বিশাল এক শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীর আক্রমণ মোকাবেলা করা পলের বয়সী কিশোরের জন্য ছিল ভয়াবহ।

যুদ্ধের নারকীয় তান্ডবে পল অনুভব করলো, হাজার বছরের সভ্যতাও মানুষের পশুত্বকে মুছে দিতে পারেনি। সে অনুভব করলো, যুদ্ধের প্রথম বোমাটা ঠিক হৃদয়ের মধ্যেই পড়ে, গুঁড়িয়ে দেয় সমস্ত চেতনা আর মানবিক মূল্যবোধ। অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট একটি যুদ্ধবিরোধী উপন্যাস, যার পরতে পরতে উদ্ভাসিত হয়ে আছে কান্না, দীর্ঘশ্বাস, স্বজন হারানোর ব্যথা আর যুদ্ধের নৃশংসতা।

অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট সিনেমার পোস্টার; Image source: filmsite.org

পাঠ প্রতিক্রিয়া

যুদ্ধ কতটা নৃশংস হতে পারে? একজন মানুষ যদি যুদ্ধের নৃশংসতা কল্পনা করতে চায়, কতটুকু করতে পারবে? আমি নিজের কথা বলতে পারি। আমি যুদ্ধ সম্পর্কে যেটুকু জানি, সেটা হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। একসময় ভাবতাম, পাকিস্তানীরা যেসব নৃশংসতা করেছে, তার সাথে কোনো নির্যাতন আর দুর্বিষহতার তুলনা হয় না। কিন্তু বইটি পড়ে বুঝেছি আমি ভুল ছিলাম। যুদ্ধ কতটা বীভৎস, ভয়ঙ্কর, অমানুষিক, একঘেয়ে আর পাশবিক হতে পারে; বইটি না পড়লে জানা হতো না।

আহত সৈনিকদের জখমের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা, গাদা গাদা লাশের মধ্যে ভয়ঙ্করভাবে আহত হয়ে বেঁচে থাকা একজনের বাঁচার ব্যর্থ আকুতি, ছোট্ট ছোট্ট অনভিজ্ঞ বাচ্চা ছেলেগুলোকে ফ্রন্টে মশা মাছির মতো মরতে পাঠানো, প্রচন্ড গরম কিংবা প্রচন্ড বৃষ্টিতে অমানুষের মতো মানুষ মারার সেই যুদ্ধগুলোর স্বার্থকতা খুঁজে পাই না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের আকুতি ছিল স্বাধীনতার, ছিল নিজেদের অধিকার আদায় করার স্পৃহা। যুক্তিযুক্ত কারণ তো ছিল। কিন্তু দুই দুইটা বিশ্বযুদ্ধ যে হল, সেগুলোর উদ্দেশ্য কী ছিল? বছরের পর বছর ধরে এই হত্যাযজ্ঞ সংগঠিত করার পর কী লাভ হয়েছিল?

পল বোমার; Image source: Amazon.com

যুদ্ধের নারকীয় বর্ণনাগুলো পড়ে শিউরে উঠলেও, ঘৃণায় মন তিক্ত হয়ে উঠলেও চোখ ভিজে আসেনি। কিন্তু গল্পকথক যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বিরতি নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন, ছুটি শেষে আবার ফিরে যাবার সময় হলো সে সময়কার অনুভূতিগুলোর বর্ণনা পড়তে গিয়ে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। তবে পলের বোন যখন চিৎকার করে বলছিল, ‘মা মা তোমার পল এসেছে, পল এসেছে তোমার’, তখন কেমন যেন শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছিল। এরকম ভয়াবহ যুদ্ধ থেকে বাড়ি ফিরে যাবার অনুভূতি বুঝি এতটাই অপার্থিব হয়। বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া বুঝি এতটাই হৃদয়বিদারক হয়!

অল কোয়ায়েট অন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের সিনেমার একটি দৃশ্য; Image source: YouTube

বইটি পড়লে আশ্চর্য ধরনের অবসাদ আর বিষণ্ণতা জেঁকে বসে। এই প্রাত্যাহিক সাদামাটা জীবন, লৌকিকতা সব কেমন অর্থহীন হয়ে পড়বে। উপন্যাসটি পাঠকের চোখের সামনে যুদ্ধের বীভৎস রূপকে নগ্ন সত্যের মতো তুলে ধরবে।

‘বৃষ্টি তো প্রকৃতির সমস্ত ময়লা ধুয়ে মুছে চলে যায়, হৃদয়ের ময়লা মুছে যায় না?’


‘জীবনের শিকড় মাটিতে গেড়ে বসার আগেই অতীতের স্মৃতি মুছে গেছে যুদ্ধের তোড়ে। যুদ্ধ সবকিছু ধুয়ে মুছে দিয়েছে। এখন আমরা পতিত জমির মতোই। আর কখনো আমাদের জীবনের ফুল ফুটবে না।’


‘কোথায় এর শেষ জানি না। যুদ্ধ আমাদের স্বাভাবিক মূল্যবোধকে কী ভীষণ পাল্টে দিয়েছে। সবকিছু কেমন বদলে গেছে।’

এমন অনেক অসাধারণ লাইন উক্তি রয়েছে ছোট কিন্তু ওজনদার বইটিতে।

অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের সিনেমার একটি দৃশ্য; Image source: YouTube

এখন পর্যন্ত রেমার্কের তিনটি বই পড়েছি। তিনটি বইয়ের প্রেক্ষাপটই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। দ্য রোড ব্যাক, থ্রি কমরেডস এবং সবশেষে অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। তিনটির মধ্যে অন্য কোনোটিই এই বইয়ের মতো নাড়া দেয়নি। সবগুলোতেই যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং যুদ্ধ পরবর্তী জটিলতাগুলো উঠে এসেছে।

লেখক পরিচিতি

জার্মান সাহিত্যিক এরিক মারিয়া রেমার্ক তার যুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের জন্য বিখ্যাত। তিনি ইংরেজি ১৮৯৮ সালের ২২ জুন জার্মানির ওয়েস্ট ফেলিয়ার ওসনাব্রায়কে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম হলো এরিক পল রেমার্ক। তিনি তার প্রথম উপন্যাস অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট লেখার সময় নিজের নাম বদলে এরিক মারিয়া রেমার্ক রাখেন। আনা মারিয়া ছিলো তার মৃত মায়ের নাম। মায়ের নামটি জুড়ে দেন নিজের নামের সাথে। আর রেমার্ক পদবীটি এসেছে তার ফরাসী পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে।

এরিক মারিয়া রেমার্ক; Image source: listal.com

রেমার্ক শিক্ষকতা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যবিড়ম্বিত হয়ে তাকে যেতে হলো যুদ্ধে। শত্রুপক্ষের গোলার আঘাতে আহত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসেন। যুদ্ধ মানুষের সহজ স্বাভাবিক জীবনকে ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়। একজন সৈনিক হিসেবে নিজের চোখে প্রথম মহাযুদ্ধের বিভীষিকা দেখেছিলেন রেমার্ক। তাই লেখনীর মধ্য দিয়ে বারবার ঘুরেফিরে যুদ্ধ বিরোধী কথাই বলতে চেয়েছেন। এরপর যুদ্ধ দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন দারুণ সব উপন্যাস। অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট, দ্য ড্রিম রুম, দ্য রোড ব্যাক, দ্য স্পার্ক অব লাইফ, এ টাইম টু লাভ অ্যান্ড এ টাইম টু ডাই, হ্যাভেন হ্যাজ নো ফেভারিটস, দ্য নাইট ইন লিসবন, দ্য প্রমিস ল্যান্ড, শ্যাডোস ইন প্যারাডাইস, থ্রি কমরেডস, ব্ল্যাক অবিলিস্ক প্রভৃতি।

উপন্যাসগুলোয় যুদ্ধের চরম বিভীষিকা বাস্তবরূপ বর্ণনা করে রেমার্ক শান্তির কথাই বলতে চেয়েছেন বার বার। পৃথিবীর ইতিহাসে যে কয়জন যুদ্ধবিরোধী লেখক রয়েছেন তাদের মধ্যে এরিক মারিয়া রেমার্ক অন্যতম।

অল কোয়ায়েট অন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের বাংলা অনূদিত বইয়ের প্রচ্ছদ; Image source: teddobblog.wordpress.com

বই পরিচিতি

বই: অল কোয়ায়েট অন দা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট
লেখক: এরিক মারিয়া রেমার্ক
রূপান্তর: জাহিদ হাসান
পৃষ্ঠা: ১২০
মূল্য: ১৮০ টাকা
প্রচ্ছদ: আলীম আজিজ
প্রথম প্রকাশ: ১৯৮৬
প্রকাশনী: প্রজাপতি প্রকাশন

Feature Image: Elizabethbains.blogspot

Related Article

0 Comments

Leave a Comment