বিশ্বের সকল মুভি ইন্ডাস্ট্রিতে একেবারে শুরর দিকে যে ধরণের মুভি বানানো হতো তার মধ্যে রোমান্টিক ধাঁচের মুভি বেশ উপরের দিকে থাকবে। ভালোবাসার গল্প যেন মুভির উপাদান হিসেবে সবসময়ই মুখরোচক। দর্শকরা হয়ত সবসময়ই চান নতুন কোনো কিছু নতুন কোনো মন মাতানো গল্প। তবে কিছু কিছু গল্প যেন কালজয়ী, যেগুলো কখনো পুরানো হয় না। আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব এমন এক মুভির কথা, বিভিন্ন যুগে যা বেশ কয়েকবার রিমেক করা হয়েছে এবং প্রায় প্রতিবারই মুভিটি বাজিমাত করেছে।

বলছিলাম আ স্টার ইজ বর্ণ (A Star is Born) মুভিটির কথা। সম্প্রতি লেডি গাগা এবং ব্রাডলি কুপার অভিনীত এ মুভিটি অস্কারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য মুভির মধ্যে একটি ছিল। কিন্তু এ মুভিটি মৌলিক কোনো মুভি নয়। সর্বপ্রথম ১৯৩৭ সালে মুক্তি পায় এ স্টার ইজ বর্ণ মুভিটি। মুভিটির সফলতার পর ১৯৫৪ সালে একই নামে মুভিটির রিমেক বানানো হয়৷ ১৯৭৬ সালে আবারো একই নামে মুভিটির রিমেক বানানো হয়। সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে ২০১৮ সালে আবারো একই নামে মুভিটির তৃতীয় রিমেক তৈরি করা হয়।

চার প্রজন্মের চারটি ‘আ স্টার ইজ বর্ণ’; Source: nytimes.com

এ রিমেকের প্রতিযোগিতায় বলিউডও পিছিয়ে নেই। ২০১৩ সালে মুক্তি পায় এ মুভিটির হিন্দি রিমেক আশিকী ২ যা কিনা তৎকালীন সময়ের অন্যতম হিট এবং ব্যবসাসফল মুভিগুলোর মধ্যে একটি ছিল। ২০১৪ সালে আবার আশিকী ২ এর তামিল রিমেক নে জাঠাগা নেনান্দালি। আজ আমরা পুরাতন কোনো সংস্করণ নয় বরং আপনাদের সামনে তুলে ধরব লেডি গাগা এবং ব্র‍্যাডলি কুপারের এ স্টার ইজ বর্ণের কথা।

কাহিনী সংক্ষেপ

জ্যাকসন মেইন ওরফে জ্যাক একজন বিখ্যাত কান্ট্রি মিউজিশিয়ান যে কিনা প্রতিনিয়ত মাদকের সাথে লড়াই করে চলেছে। তার ছন্নছাড়া জীবনে তার দেখভালের দায়িত্ব সামলান তার সৎ ভাই ববি। ববি একই সাথে আবার জ্যাকের ম্যানেজারের দায়িত্বও পালন করে থাকেন।

আ্যলি চরিত্রে লেডি গাগা; Source: twitter.com

একবার ক্যালিফোর্নিয়াতে কনসার্ট করতে আসেন জ্যাক। তখন কনসার্ট শেষে একটি বারে হঠাৎ একটি মেয়ের গাওয়া গান তাকে অনেক মুগ্ধ করে। আ্যলি নামের সে মেয়েটি পেশায় একজন ওয়েট্রেস, একদিন অনেক বড় গায়িকা হবার স্বপ্ন থাকলেও তার জীবন বারে গান গাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সে রাতে আ্যলির সাথে পরিচয়ের পর জ্যাক আর সে পুরো রাত শহরে ঘুরোঘুরি এবং গল্প করে কাটিয়ে দেয়। আ্যলি জ্যাকের সামনে তুলে ধরে একজন প্রফেশনাল মিউজিশিয়ান হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে তার প্রতিনিয়ত কি ধরণের বাধার সম্মুখীন হতে হয়। সে জ্যাককে তার নিজের লেখা এবং সুর করা একটি গান গেয়ে শোনায় যা জ্যাককে মুগ্ধ করে।

জ্যাকসন মেইন এবং আ্যলি; Source: collider.com

সে রাতের পর আ্যলির জন্য বেশ কিছু নতুন চমক অপেক্ষা করছিল। জ্যাক আ্যলিকে তার পরবর্তী শোতে একসাথে স্টেজে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। নিজের স্বাভাবিক জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া আ্যলি প্রথমে অস্বীকৃতি জানালেও পরবর্তীতে জ্যাকের পীড়াপীড়িতে তারা দুজন একসাথে কনসার্টে গান গায়। এ ঘটনার পর যেন আ্যলির জীবন পুরোপুরি পাল্টে যায়। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ করে অ্যালি এবং খুব দ্রতই খ্যাতির শিখরে উঠতে থাকে।

এর মধ্যে জ্যাকসনের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পরে সে এবং দুজনের মধ্যেকার মিষ্টি মধুর সম্পর্ক চলতে থাকে। তবে তাদের এ সুখের সময় বেশিদিন টিকে না। আ্যলির উর্ধ্বগামী ক্যারিয়ারের সাথে তাল মিলিয়ে যেন জ্যাকের মদ এবং মাদক সেবনের পরিমাণ বেড়ে চলেছিল এবং তার ক্যারিয়ার পড়তির দিকে নেমে যাচ্ছিল। এভাবে ধীরে ধীরে জটিলতার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে এ স্টার ইজ বর্ণ মুভিটির কাহিনী।

নির্মাণ এবং অভিনয়

এ স্টার ইজ বর্ণ মুভিটি পরিচালনা প্রযোজনা, চিত্রনাট্য, অভিনয় সব কিছুর মূলে রয়েছেন হলিউড অভিনেতা ব্র্যাডলি কুপার। এ মুভিটির মাধ্যমে প্রথমবারের মত তিনি পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। প্রথমবার হিসেবে তার সাফল্য ঈর্ষণীয় পর্যায়ের। মুভিটি মৌলিক না হওয়ায় এবং চতুর্থ রিমেক হওয়াতে এটি বানানো হয়ত কুপারের জন্য অপেক্ষাকৃত সহজতর ছিল কিন্তু মুভিটিতে মূল চ্যালেঞ্জ ছিল বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এ গল্পটিকে ভালোভাবে উপস্থাপন করা। ব্র‍্যাডলি কুপার এ কাজে বেশ ভালোভাবে সফল হয়েছেন বলা যায়।

চিত্রনাট্যের দিক দিয়ে মুভিতে নতুনত্বের কোনো ছিটেফোঁটাও নেই। এ মুভিটির এখন পর্যন্ত যে কয়টি সংস্করণ রয়েছে তার যেকোনো একটি দেখলে এ মুভিটির প্রথম দৃশ্য থেকে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত কি হতে যাচ্ছে তা আপনি অনায়াসে বলে দিতে পারবেন। এর বলিউড সংস্করণ আশিকী ২ এর সাথে এর পার্থক্য হল এতে বলিউডের মতো অতটা নাটকীয়তা আর আবেগের বাহুল্য নেই। এছাড়া বাদবাকি সব কিছুতেই দর্শকরা হুবুহু মিল খুঁজে পাবেন। অফিসিয়াল রিমেকের ক্ষেত্রে অবশ্য খুব বেশি পরিবর্তন আশা করাও ঠিক না।

মুভিটির সকল অভিনেতা ও কলাকুশলীরা; Source: vogue.com

অভিনয়ে ব্র্যাডলি কুপার ছিলেন সহজাতরূপে এবং বেশ সাবলীল। কুপারের বিপরীতে নায়িকা আ্যলি হিসেবে ছিলেন গ্র্যামি বিজয়ী গায়িকা লেডি গাগা। লেডি গাগার উপস্থিতি এ মুভিতে অবাক করার মতো। সচরাচর উদ্ভট পোশাক আশাকের জন্য আলোচনায় থাকা লেডি গাগাকে তার ভক্তরা প্রথমবারের মতো দেখতে পেয়েছেন মেকাপহীন অবস্থায় এবং অত্যন্ত সাদামাটা রূপে। তার অভিনয়ও ছিল বেশ নজরকাড়া। এর পাশাপাশি এ মুভিটির সাফল্য তাকে ভবিষ্যতে আরো মুভিতে অভিনয় করতে উদ্বুদ্ধ করবে বলে আশা করা যায়।

সংগীত এবং সাফল্য

এ মুভিটি তৃতীয় রিমেক হওয়াতে এর কাহিনীতে উল্লেখযোগ্য কিছু না থাকলেও যে বিষয়টি সবাইকে আকৃষ্ট করেছে তা হচ্ছে এ মুভিটির গান এবং আবহ সংগীত। রোমান্টিক মিউজিকাল ড্রামা হওয়াতে এ মুভিতে গানের কোনো কমতি ছিল না। মুভিতে গান গেয়েছেন লেডি গাগা এবং আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, অভিনেতা ব্র‍্যাডলি কুপার! এ মুভিটির জন্য তাদের বানানো গানের আ্যালবাম ২০১৮ সালের গ্র্যামি আ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন পায়।

এছাড়া এ আ্যালবামের শ্যালো (Shallow) গানটি এ বছর একই সাথে বছরের সেরা গানের গ্র্যামি আ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন পায় এবং অস্কারে সেরা মৌলিক গানের আ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়। এভাবে সংগীত এবং চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা লাভ যেকোনো গান এবং শিল্পীর ক্ষেত্রেই অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা।

অস্কার জয়ের পর একসাথে শ্যালো গানটি অস্কারের স্টেজে পারফর্ম করেন গাগা ও কুপার; Source: vox.com

মুভিটি ব্যবসায়িক ভাবে সফল হবার পেছনে অন্যতম কারণ মুভিটির অসাধারণ গানগুলো। তবে মুভিটি মূল বাজিমাত করেছে অস্কারে। অস্কারে মুভিটি ৮টি মনোনয়ন পায় এবং এদের মধ্যে সেরা মৌলিক গানের পুরষ্কারটি জিতে নিতে সক্ষম হয়। এছাড়া মুভিটি বিভিন্ন আ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে সম্মাননা প্রায়। সবগুলো অনুষ্ঠান মিলিয়ে ২০১টি মনোনয়ন পাওয়া এ মুভিটি এর মধ্যে ৬৪টি পুরষ্কার জিতে নেয়।

কেন এ মুভিটি দেখবেন

এ স্টার ইজ বর্ণ মুভিটি যদি আপনার ভালো লাগে তবে শুধুমাত্র দুটি কারণে। একটি হলো যদি আপনি লেডি গাগা অথবা ব্র্যাডলি কুপারের ভক্ত হয়ে থাকেন, অপরটি হলো যদি মুভিটির গানগুলো আপনার ভালো লেগে থাকে। আপনি যদি নতুন কিছু দেখার আশায় বসে থাকেন তবে আশাহত হতে হবে, তবে আপনি যদি এ মুভিটির পুর্বের সংস্করণ গুলো না দেখে থাকেন তাহলে মুভিটি আপনার ভালো লাগবে বলে আশা করা যায়।

Related Article

0 Comments

Leave a Comment