হলিউডের ২০১৮ সাল বিবেচনায় বছর জুড়ে মুভির সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তবে এর বেশিরভাগই বাণিজ্যিক ধারার মুভি। পুরো বছর জুড়ে দাপট চলেছে সুপারহিরো মুভি এবং এবং হরর ঘরানার মুভিগুলোর। ইনফিনিটি ওয়ার, ব্ল্যাক প্যান্থার থেকে শুরু করে দ্য নান, এনাইলেশন – ধাঁচের ব্যবসা সফল মুভিগুলোই গত বছরটা মাতিয়ে রেখেছিলো। সাথে রয়েছে মিশন ইমপসিবল এর মতো ব্যবসাসফল মুভিগুলোও। তবে আপনি যদি রেটিং দেখে মুভি দেখতে বসতে অভ্যস্ত হন এবং কিছুটা ভিন্ন ধারার ও অভিনব নির্মাণশৈলীর মুভি আপনার পছন্দের হয়, তবে সে ধরনের মুভি ভক্তদেরও ২০১৮ একেবারে হতাশ করেনি।

এরকম একটি মুভি হলো ‘ব্যাড টাইমস আ্যট দ্য এল রয়্যাল’। বিশেষ করে বিখ্যাত পরিচালক কুয়েন্টিন টরেন্টিনোর বিগত কয়েক বছরের মুভিগুলো যারা মিস করছিলেন তাদের জন্য এ মুভিটি অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো। তাই বলে ভেবে বসবেন না, মুভিটি টরেন্টিনো নিজে তৈরি করেছেন অথবা মুভিটির সাথে তার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন জাগতে পারে মনে, কেন এলো টরেন্টিনোর নাম। তবে চলুন জেনে নেওয়া যাক মুভিটি সম্পর্কে, তবেই সবকিছু পরিষ্কার বুঝে উঠা সম্ভব হবে।

ব্যাড টাইমস আ্যট দ্য এল রয়্যাল‘ মুভিটি ড্রামা, থ্রিলার এবং মিস্ট্রি ঘরানার ছবি। মুভিটি পরিচালনা করেছেন টিভি সিরিজ লস্ট এবং নেটফ্লিক্সের ডেয়ারডেভিল সিরিজটির পরিচালক ড্রু গোডার্ড। তিনি কেবিন ইন দ্য উডস, ওয়ার্ল্ড ওয়ার জেড, ক্লোভারফিল্ড, ডেডপুলের মতো মুভিগুলোর চিত্রনাট্যকার হিসেবেও কাজ করেছেন। পরিচালনার পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও তিনি রয়েছেন ‘ব্যাড টাইমস আ্যট দ্য এল রয়্যাল’ মুভিটিতে।

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে মুভিটি মুক্তি পেয়েছিল। মুভিটিতে অভিনয় করেছেন বর্ষীয়ান হলিউড অভিনেতা জেফ ব্রিজেস, থর খ্যাত ক্রিস হেমসওয়ার্থ, ফিফটি শেডস অফ গ্রে খ্যাত ড্যাকোটা জনসনসহ প্রভৃতি নামীদামি হলিউড শিল্পীরা।

কাহিনী সংক্ষেপ

১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া এবং নেভাদা সীমান্তের মাঝামাঝিতে অবস্থানরত এক হোটেলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ‘ব্যাড টাইমস আ্যট দ্য এল রয়্যাল’ মুভিটির পটভূমি। এল রয়্যাল নামের সেই হোটেলটির একমাত্র কর্মচারী হিসেবে রয়েছে মাইলস মিলার নামক এক যুবক। হোটেলটির পূর্ব জৌলুশ থাকলেও পরবর্তীতে লোক সমাগম কমে যাওয়ায় খুব কালেভদ্রে সেখানে অতিথিদের আগমন ঘটতো। তাই রিসিপশনিস্ট থেকে শুরু করে বারটেন্ডিং, রুম সার্ভিসসহ সকল প্রকার কাজ মাইলসকে একাই সামলাতে হয়।


মুভিটির এক দৃশ্যে মূল অভিনেতারা; Source: pinterest.com

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে যখন হোটেলে চারজন অতিথির আগমন ঘটে। ক্যাথলিক পাদ্রী ফাদার ড্যানিয়েল ফ্লিন, পড়ন্ত ক্যারিয়ারের গায়িকা ডার্লিন সুইট, সেলসম্যান লেরেমি সিম্যুর সুলিভান এবং এমিলি সামারস্প্রিং নামক এক রহস্যময় তরুণী।

এমিলি সামারস্প্রিং এর চরিত্রে ডাকোটা জনসন; Image Source: Twentieth Century Fox

আপাতদৃষ্টিতে এদের দেখে সাধারণ মনে হলেও এদের প্রত্যেকেরই এ হোটেলটিতে অবস্থানের পেছনে কোনো না কোনো রহস্য রয়েছে। সেলসম্যান সুলিভান যিনি কিনা আসলে একজন আন্ডারকভার এফবিআই এজেন্ট, তিনি যখন হোটেলটিতে তার একটি গোপন মিশন চালাতে থাকেন তখন ধীরে ধীরে এসব রহস্য উন্মোচন হতে থাকে। মুভিটির নামের মতো আক্ষরিক অর্থেই খারাপ সময়ের আগমন ঘটতে থাকে এল রয়্যাল নামক হোটেলটিতে। শেষ পর্যন্ত এ খারাপ সময় শেষ হয় কিনা তা জানতে আপনাকে দেখতে হবে পুরো মুভিটি।

পরিচালনা এবং চিত্রনাট্য

পরিচালক ড্রু গোডার্ড ইতোপূর্বে যেসব মুভিতে কাজ করেছেন তার থেকে ‘ব্যাড টাইমস আ্যট দ্য এল রয়্যাল’ মুভিটির কোনো প্রকার মিল নেই বললেই চলে। তবে প্রথমবার এরকম মুভির পরিচালক হিসেবে তার পারফরমেন্স বেশ ভালোই বলা যায়। তবে তার এ মুভিটি পরিচালনায় এবং চিত্রনাট্যে হলিউডের অন্যতম সেরা পরিচালক কুয়েন্টিন টরেন্টিনোর প্রভাব বেশ ভালোমতো চোখে পড়ে। এমনকি কোনো মুভিভক্ত যদি পরিচালকের নাম না দেখে মুভিটি দেখতে বসেন তবে এ মুভিটিকে ভুলে কুয়েন্টিন টরেন্টিনোর মুভি মনে করে বসতে পারেন।


কুয়েন্টিন টরেন্টিনো; Source: telegraph.co.uk

এছাড়া মুভিটিতে একটি রহস্যময় মুভি রিল দেখানো হয় কিন্তু তার ভেতরে কী আছে তা পুরো মুভি জুড়ে কখনোই দেখানো হয় না। এর সাথে দর্শকগণ টরেন্টিনো পরিচালিত পাল্প ফিকশন মুভিটির স্যামুয়েল এল জ্যাকসনের সেই রহস্যময় স্যুটকেসের সাথে মিল খুঁজে পেতে পারেন। সব মিলিয়ে বলা যায়, ড্রু গোডার্ডের কাজ এ মুভিতে বাহবা পাবার মতো হলেও তাতে স্বকীয়তার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

অভিনয়

‘ব্যাড টাইমস আ্যট দ্য এল রয়্যাল’ মুভিটির অন্যতম ভালো দিক এর কলাকুশলীদের অভিনয়। তারকাখচিত এ মুভিটিতে প্রত্যেকে যেন পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। অস্কারজয়ী অভিনেতা জেফ ব্রিজেস কেন হলিউডের অন্যতম সেরা তা তার অন্য কাজ না দেখে থাকলেও এ মুভিটি দেখে বুঝতে পারবেন।

ফাদার ড্যানিয়েল ফ্লিন চরিত্রে তার অভিনয়ের মুন্সিয়ানাই সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। এছাড়া বাস্তব জীবনের ব্রিটিশ গায়িকা সিনথিয়া এরিভো অভিনয় জগতে অপেক্ষাকৃত নতুন হলেও ডার্লিন সুইট চরিত্রে ছিলেন যথেষ্ট সাবলীল। এছাড়া হলিউডের আরো দুই হেভিওয়েট ড্যাকোটা জনসন এবং জন হ্যামও ছিলেন নিজ নিজ চরিত্রে যথেষ্ট প্রাণবন্ত।

ক্রিস হেমসওয়ার্থ; Source: pinterest.com

এত তারকার ভিড়ে হলিউডে নবাগত লুইস পুলম্যান হোটেল কর্মচারী মাইলস মিলার চরিত্রের মাধ্যমে নিজের জাত চিনিয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড় চমক ছিল মুভিটির দ্বিতীয়ার্ধে গ্যাংস্টার এবং কাল্ট লিডার বিলি লি চরিত্রে মার্ভেলস মুভির থর খ্যাত অভিনেতা ক্রিস হেমসওয়ার্থের আগমন। সচরাচর আ্যাকশন হিরো ধাঁচের চরিত্রে অভিনয় করা হেমসওয়ার্থ এ মুভিতে খল চরিত্রে অভিনয় করেন যেখানে তার অভিনয় ছিল চোখে পড়ার মতো। নিজ খোলস থেকে তার এভাবে বেরিয়ে আসাটা ভবিষ্যতের আরো অনেক মুভিতেই এরকম চরিত্রে অভিনয় করার পথ সুগম করে দিল বলা যায়। সব মিলিয়ে এ মুভিটির শিল্পীদের প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সেরাটা দিয়েছেন বলা যায়।

বক্স অফিস এবং রেটিং

বক্স অফিস বিবেচনায় আনলে ব্যাড টাইমস আ্যট দ্য এল রয়্যাল ফ্লপ মুভি হিসেবে গণ্য হবে। ৩২ মিলিয়ন ডলারের এ মুভিটি নিজেদের পুঁজিও পুরোপুরি তুলতে পারেনি। মাত্র ৩১.৬ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। মুভিটির দীর্ঘ প্রায় আড়াই ঘন্টাব্যাপী ধীরগতির কাহিনী সাধারণ দর্শকদের হল বিমুখতার মূল কারণ বলে ধারণা করা যায়।

তবে সমালোচকদের নিকট এ মুভিটি যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছে। মুভি রেটিং ওয়েবসাইট রটেন টমেটো মুভিটিকে ৭৪% ফ্রেশ রেটিং দিয়েছে এবং মুভিটিকে স্টাইলিশ, স্মার্ট ও সলিড পারফরমেন্সে ভরপুর হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এছাড়া মুভিটির আইএমডিবি রেটিং ৭.২ যা কিনা ড্রামা থ্রিলার মুভি হিসেবে যথেষ্ট ভালো। যদিও মুভিটিতে কুয়েন্টিন টরেন্টিনোর প্রভাব সমালোচকদের চোখে পড়েছে তবে সব মিলিয়ে মুভিটির চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা বেশ প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়া মুভিটির গান এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও অসাধারণ ছিল।

যে কারণে মুভিটি দেখবেন

অপরিচিত বিভিন্ন চরিত্রের এক জায়গায় একত্র হওয়ার ফর্মুলাটি বেশ পুরনো হলেও এ মুভিটির এক্ষেত্রে নিজস্বতা রয়েছে. ২ ঘন্টা ২০ মিনিটব্যাপী চলমান এ মুভিটির কাহিনীতে রয়েছে যথেষ্ট রহস্য এবং নাটকীয়তা যা দর্শকদের মনোযোগ ধরে রাখতে বাধ্য করবে। তবে কেউ যদি মুভিটির ব্যাপারে কোনো প্রকার ধারণা ছাড়া মুভিটি দেখতে বসেন, তবে এর ব্যাপারে শুরুতে বেশ আশাবাদী হলেও শেষ দৃশ্যের পর তাদের মনে কিছুটা হলেও আক্ষেপ থেকে যাবে। তবে সত্তরের দশকের পটভূমিতে বানানো এ মুভিটির গল্প দর্শকদের সে সময়ের মুভির যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, যা এ মুভিটিকে যথেষ্ট আকর্ষণীয় করে তুলেছে। হলিউডের সব নামীদামি অভিনেতাদের সাবলীল পারফরমেন্স এ মুভিটি দেখার অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া কুয়েন্টিন টরেন্টিনো ভক্ত যারা অনেকদিন ধরে তার কোনো কাজের আশায় বসে রয়েছেন তাদের আশা করি এ মুভিটি ভালো লাগবে।

Related Article

1 Comment

Sumon February 6, 2019 at 1:07 am

Nice

Leave a Comment